ফাহিম একটু হাসল, তার সেই ইনোসেন্ট লুকে এক ধরণের দুষ্টুমি খেলে গেল। সে বলল,
"রাজপুত্র হতে পারলাম কি না জানি না, তবে এই রাজপ্রাসাদে আপনার জন্য স্পেশাল কোনো গাইড লাগলে আমি কিন্তু ভলান্টিয়ার হিসেবে তৈরি।"
তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল। সে ইচ্ছে করেই কাবিরের দিকে পিঠ দিয়ে ফাহিমের একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
"তাই নাকি? আমি তো ভাবছিলাম একা একা ঘুরব। কিন্তু আপনার মতো এমন কিউট গাইড পেলে তো হাতছাড়া করা বোকামি হবে!"
ওদিকে টেবিলের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা কাবিরের হাতের গ্লাসটা প্রায় মড়মড় করে ভেঙে যাওয়ার দশা। তিথি যে তাকে জ্বালানোর জন্য এই ফাহিমের সাথে ফ্লার্ট করছে তার ভেতরটা রাগে রি রি করছে, কিন্তু আরশাদ চৌধুরীর উপস্থিতিতে সে কোনো সিন ক্রিয়েট করতে পারছে না।
****
বাড়ির অন্য প্রান্তে তখন ভিন্ন চিত্র। আহনাফ আর রোনা ধীরে ধীরে পুকুরঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শ্যাওলা ধরা প্রাচীন ঘাট আর চারপাশের হিজল গাছগুলো এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।
আহনাফ রোনার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—"রোনা, এই পরিবেশটা দেখলে মনে হয় সময়টা এখানেই থমকে যাক। কোনো বিজনেস ডিল নেই, কোনো টেনশন নেই—শুধু আমি আর তুই।"
রোনা আলতো করে আহনাফের হাত ছুঁয়ে বলল, —"সব সময় কি এমন থাকা যায় আহনাফ? তবে এই মুহূর্তগুলো আমি সারা জীবন মনে রাখব।"
**********
অন্যদিকে, বারান্দার এক কোণায় সাদ্দাম আর প্রমা নিজেদের মধ্যে এক তর্ক-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
সাদ্দাম বলল,
— "কি প্রমা! তুমি তো দেখি ময়মনসিংহের জমিদার বাড়ির বউ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ওই ফাহিম ছেলেটাকে দেখলে? তিথির সাথে কেমন আঠা দিয়ে লেগে আছে!"
প্রমা চোখ রাঙিয়ে বলল,
— "চুপ করুন সাদ্দাম ভাইয়া! তিথি তো অন্তত একটা কিউট ছেলেকে পেয়েছে, আর আমার কপালে জুটেছে আপনার মতো এক বেক্কল লেকচারার!"
********
বাড়ির মূল হলরুমে সারা ইয়াসমিন আর আলতাফ রহমান তখন প্রিয়ার শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে আড্ডায় মগ্ন। তুহিন শিকদার আর ফাতেমা খানম তাদের বাড়ির পুরনো দিনের গল্প শোনাচ্ছেন।
সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল সোফায়। সেখানে আরশাদ চৌধুরী আর রাইনা বসে আছেন সানজিদা খালার সাথে। তিথির লাগিয়ে দেওয়া সেই আগুনের রেশ ধরে আরশাদ চৌধুরী এবার নিজেই সানজিদা খালার সাথে একটু আলাপ জমানোর চেষ্টা করছেন। রাইনা পাশে বসে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে থাকলেও, আরশাদ চৌধুরী যেন সানজিদা খালার শান্ত ব্যবহারে মুগ্ধ। তিনি বলছেন,
— "সানজিদা, ইতালিতে তো মানুষের এত সময় নেই। আপনাদের আতিথেয়তা আমাকে সত্যিই বদলে দিচ্ছে।"
সানজিদা খালা লজ্জায় নিচু স্বরে উত্তর দিচ্ছেন, আর আরশাদ চৌধুরী যেন মনে মনে বিয়ের সেই প্রস্তাবটা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন!
তিথি আর ফাহিম তখন বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। ফাহিম খুব সুন্দরভাবে তার গলার স্বর মোলায়েম রেখে তিথিকে পটাচ্ছে। তিথিও সুযোগ বুঝে কাবিরকে জ্বালানোর জন্য ফাহিমের প্রতিটি কথায় খিলখিল করে হেসে উঠছে।
তিথি ফাহিমের চশমার ফ্রেমটা লক্ষ্য করে বলল,
— "জানেন ফাহিম ভাইয়া, আপনার এই চশমাটা আপনাকে বড্ড বেশি ইনোসেন্ট বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু আপনার চোখে অন্যরকম একটা তেজ আছে। ঠিক যেন সিনেমার কোনো মিস্টেরিয়াস হিরো!"
ফাহিম একটু ঝুকে এসে বলল,
— "হিরো কি না জানি না, তবে আপনার মতো দর্শকদের জন্য আমি ভিলেন হতেও রাজি।"
তিথি এবার কাবিরের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর বাড়িয়ে বলল,
— "আরে না না! আমাদের চারপাশে তো ভিলেনের অভাব নেই। ওই যে দেখুন, একজন তো সারাক্ষণ ড্রাকুলার মতো মুখ করে তাকিয়ে থাকে। আপনার মতো এমন মিষ্টি কথা বলা মানুষ তো আজকালের দিনে পাওয়াই যায় না।"
কাবির কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে স্থির দৃষ্টিতে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মস্তিস্ক এখন অন্য কোনো লেভেলে কাজ করছে। সে গত ৬ বছর ধরে আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্সির হয়ে যে কাজগুলো করেছে, তার সব ডেটাবেজ মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
কাবিরের ভ্রু কুঁচকে গেল। এই চেহারাটা তার খুব পরিচিত। যদিও ফাহিম শিকদার নামে সে এখানে পরিচিত, কিন্তু ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে এই চেহারাটাই দ্য গোস্ট নামে পরিচিত। ইতালি, আমেরিকা থেকে শুরু করে বহু দেশে সে ভিন্ন ভিন্ন নামে মানুষ মার্ডার আর ড্রাগ কার্টেলের সাথে জড়িত। বিশেষ করে ইতালিতে আরশাদ চৌধুরীর কোনো এক রাইভালের সাথে তার হাত ছিল কি না, সেটাও কাবিরের মাথায় এল।
ফাহিম কাবিরকে চেনে না। কারণ কাবির আন্ডারগ্রাউন্ডে খুব সাবধানে কাজ করে, তার আসল পরিচয় খুব কম মানুষই জানে। ফাহিম ভাবছে কাবির স্রেফ একজন সাধারণ বিজনেসম্যান বা ফ্যামিলি মেম্বার যে তার বোন তিথিকে নিয়ে পজেসিভ।
কাবির মনে মনে হাসল। এক ভয়ংকর শীতল হাসি। সে
পকেট থেকে ফোন বের করে খুব সংক্ষেপে একটা কোড মেসেজ টাইপ করে পাঠিয়ে দিল তার টিমের কাছে।
তিথি তখনো ফাহিমের সাথে ফ্লার্ট করতে ব্যস্ত। সে বলল,
— "ফাহিম ভাইয়া, আপনি কি আমাকে এই বাড়ির ওই পুরনো লাইব্রেরিটা দেখাবেন? শুনেছি ওখানে নাকি অনেক রহস্যময় বই আছে।"
—"অবশ্যই তিথি। আপনার জন্য তো আমি পুরো বাড়িটাই রহস্যময় করে তুলতে পারি।"
কাবির এবার ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল শিকারি বাঘের মতো শব্দহীন। সে তিথির একদম পাশে এসে দাঁড়াল এবং ফাহিমের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
কাবির শান্ত গলায় বলল,
— "ফাহিম সাহেব, আমাদের এই ময়মনসিংহের মাটি খুব অদ্ভুত। এখানে অনেক সময় মাটির নিচে এমন কিছু চাপা পড়ে থাকে যা হুট করে বেরিয়ে আসলে সবার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। আপনি কি রহস্য খুব পছন্দ করেন?"
ফাহিম একটু থমকে গেল। কাবিরের কণ্ঠস্বরে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক ধরণের বরফশীতল সংকেত। সে হেসে বলল,
— "রহস্য কার না ভালো লাগে কাবির ভাই? তবে আমি আবার রহস্য সমাধান করতে বেশি পছন্দ করি।"
কাবির তিথির দিকে একবার তাকাল। তিথি মুখ বেঁকিয়ে বলল,
— "দেখলেন তো ফাহিম ভাইয়া? উনি যেখানেই যাবেন সেখানেই জ্ঞান দিতে শুরু করবেন। আপনি ওনার কথা বাদ দিন, চলুন তো আমরা ওপাশে যাই।"
তিথি ফাহিমের হাতটা ধরতে যাচ্ছিল, কিন্তু কাবির খপ করে তিথির কবজি চেপে ধরল। তার হাতের বাঁধন এতটাই শক্ত ছিল যে তিথি উফ করে উঠল।
— "ফাহিম, মেহমানদের আদর-আপ্যায়ন করুন, কিন্তু খেয়াল রাখবেন আতিথেয়তার আড়ালে যেন নিজের আসল পরিচয়টা ভুলে যাবেন না। কারণ আমি আবার হারিয়ে যাওয়া জিনিসের খোঁজ নিতে খুব পটু।"
ফাহিম শিকদারের চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সে কি তবে ধরা পড়ে গেল? না, তা অসম্ভব! সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—"আপনি বেশ মজার কথা বলেন কাবির ভাই। আপনার সাথে আড্ডাটা জমে উঠবে মনে হচ্ছে।"
তিথি কাবিরের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল,
— "ছাড়ুন বলছি! আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? ফাহিম ভাইয়া, আপনি কিছু মনে করবেন না। ওনার মাথায় সারাক্ষণ এসব ক্রাইম থ্রিলার ঘোরে তো, তাই সবাইকে সন্দেহ করেন।"
~
কাবির তিথিকে হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে সরিয়ে আনল। তারপর ফাহিমের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে ইতালিয়ান ভাষায় একটা শব্দ বলল, যা শুনে ফাহিমের গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
কাবির এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিথির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক ভয়ংকর তেজ। সে বলল,
— "তিথি, আরশাদ আঙ্কেলের সাথে সানজিদা খালার বিয়ে হোক বা না হোক, এই বাড়িতে আজ অন্য কোনো বড় আয়োজন হবে। আর ফাহিম সাহেব... আপনার শিকার করার সময় শেষ।"
তিথি অবাক হয়ে কাবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে না কাবির কেন হঠাৎ এমন আচরণ করছে। অন্যদিকে ফাহিম শিকদার পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পেরেছে।কাবির কে!
★
দুপুর একটা বাজে। রোদের তেজ সরাসরি বাড়ির বিশাল উঠোনে এসে পড়েছে। প্রাচীন জমিদার বাড়ির প্রশস্ত উঠোনের মাঝখানে বড় একটা ছাতিম গাছের নিচে সবাই মিলে গোল হয়ে বসেছে। গরম থাকলেও চারপাশের গাছপালার কারণে একটা মোলায়েম হাওয়া বইছে। কিন্তু সেই হাওয়ার চেয়েও বেশি গরম এখন আলোচনার বিষয়বস্তু মাফিয়া আরশাদ চৌধুরীর বিয়ে!
তিথি এক হাতে একটা তালপাতার পাখা নিয়ে সানজিদা খালাকে বাতাস করছে, যেন খালা এখনই বিয়ের পিঁড়িতে বসা কনে! সে আরশাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভদ্র মানুষের মতো বলল,
— "আঙ্কেল, আমি গতকাল সারা রাত ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখলাম, ইতালিতে আপনার যে বিশাল বিজনেস, সেখানে একজন শান্ত পার্টনার খুব দরকার। আমাদের সানজিদা খালা তো শুধু শান্ত না, উনি একদম হিমালয়ের বরফ! আপনি যখন ওপার থেকে রেগেমেগে ফিরে আসবেন, খালা আপনাকে এক বাটি ধোবাউড়ার গুড়-মুড়ি মাখিয়ে দেবেন। দেখবেন আপনার সব মাফিয়াগিরি একদম জল হয়ে গেছে!"
তিথির এই লজিক শুনে সাদ্দাম আর প্রমা হাসি চেপে রাখতে না পেরে একে অপরের গায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
সাদ্দাম হাসতে হাসতে বলল,
—"আঙ্কেল, তিথির কথা কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো না। ইতালিয়ান পিজ্জার সাথে ময়মনসিংহের শুঁটকি ভর্তার একটা ফিউশন কিন্তু ওয়ার্ল্ড ফেমাস হতে পারে!"
প্রমা চোখ টিপে যোগ করল,
— "আর আরশাদ আঙ্কেলকে তো ইতালিতে সবাই ভয় পায়, আমাদের সানজিদা খালার সামনে বসলে উনি তো ভয়েই আধমরা হয়ে থাকবেন। কী দারুণ হবে না বিষয়টা?"
আহনাফ আর রোনাও বেশ মজা নিচ্ছে। আহনাফ একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
— "আঙ্কেল, তিথি যখন লেগেছে, তখন আপনার আর নিস্তার নেই। ময়মনসিংহের মেয়েরা একবার জামাই পছন্দ করলে তাকে আর ছাড় দেয় না!"
রোনা মিষ্টি করে হেসে বলল,
—"আসলে আঙ্কেল, সানজিদা খালার মতো এমন গুণবতী মানুষ খুব কমই হয়। আপনি ভেবে দেখতে পারেন।"
আরশাদ চৌধুরী পাথরের মতো বসে আছেন, আর সানজিদা খালা লজ্জায় ঘোমটা আর একটু টেনে দিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন।
তিথি এবার রাইনার দিকে তাকিয়ে আরও এক চোট শয়তানি হাসল।
— "রাইনা আপু! মুখ কালো করে আছো কেন? সানজিদা খালা তোমার মা হওয়া মানে তো বুঝতেই পারছো? তোমার ওই ইতালিয়ান মেকআপ কিট খালা কিন্তু সব ফেলে দিয়ে তোমাকে দিয়ে ডাল ঘুটুনি ঘোটাবেন! উফ! ভাবতেই আমার কী যে
আনন্দ লাগছে!"
রাইনা বিরক্তিতে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
— "ড্যাড! দেখছ তো এরা কী শুরু করেছে? এদের সাথে বসে নাটক শোনার সময় আমার নেই!"
কাবির পুরোটা সময় একপাশে পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সাইলেন্টলি সব দেখছিল। তার মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তিথির এই বিয়ের ঘটকালি দেখে সে মনে মনে বেশ উপভোগ করছে। সে জানে তিথি আরশাদ চৌধুরীকে নাজেহাল করার একটা মোক্ষম অস্ত্র খুঁজে পেয়েছে।
তিথি এবার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বলল,
— "শুনুন সবাই! বিয়ে যখন ফাইনাল, তখন আজ বিকেলেই কিন্তু পান-চিনি হবে। আরশাদ আঙ্কেল, আপনি আপনার পকেট থেকে ওই ইতালিয়ান আংটিটা বের করুন তো, খালার আঙুলে একদম ফিট হয়ে যাবে!"
আরশাদ চৌধুরী এবার রাগে আর লজ্জায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,"তিথি! তুমি কি একটুও থামবে না?"
তিথি বড় বড় চোখ করে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে বলল, —"আরে আঙ্কেল! আপনি তো দেখি এখনই সানজিদা খালাকে ভয় দেখানো শুরু করেছেন!"
সারা ইয়াসমিন আর আলতাফ রহমান হাসতে হাসতে শেষ। ফাতেমা খানম আর তুহিন শিকদারও বেশ মজা পাচ্ছেন।
সবাই যখন হাসাহাসি করছে, রাইনা তখন হুট করেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহিম শিকদারের দিকে তাকাল। ফাহিম চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে সেই ইনোসেন্ট অথচ মিস্টেরিয়াস লুক। রাইনা মনে মনে ভাবল,
— "এই ছেলেটা কে? কাবিরের চেয়েও একে তো বেশি ড্যাশিং লাগছে!"
রাইনার দৃষ্টিতে এক ধরণের মুগ্ধতা খেলে গেল, যা তিথির নজর এড়ালো না।
তিথি ফিসফিস করে কাবিরকে বলল,
—"ঐ দেখুন আপনার উডবি হাসবেন্ডের উডবি বউ আবার কার দিকে নজর দিচ্ছে! সাবধান মিস্টার ড্রাকুলা!"
★
অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, ধোবাউড়ার সেই প্রাচীন জমিদার বাড়ির আঙিনায় সানজিদা খালা আর আরশাদ চৌধুরীর চার হাত এক হলো। কাজি সাহেব যখন খুতবা পড়ছিলেন, আরশাদ চৌধুরী আড়চোখে কাবিরের দিকে তাকাচ্ছিলেন যেন বলছেন,
—"তোমার ওই পাগলী কাজিনের পাল্লায় পড়ে আমার ইমেজের বারোটা বেজে গেল!"
তখনই ফাহিম শিকদার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তুহিন শিকদারকে বলল,
— "আব্বু, আমার অনেকদিন হলো ময়মনসিংহে যাওয়া হয় না। প্রিয়া আপু আর ইমরান ভাইয়া তো যাচ্ছেই, আমি ভাবছি তিথি আর কাবির ভাইদের সাথে একটু ঘুরে আসি। ওদের সাথে আড্ডাটাও জমবে।"
তুহিন শিকদার আর ফাতেমা খানম তাদের ছোট ছেলের এই আবদারে না করতে পারলেন না। যদিও কাবিরের চোখের কোণ তখনো বরফশীতল!
খাওয়া-দাওয়া আর বিয়ের হুল্লোড় শেষে এবার ফেরার পালা। তিনটি চকচকে গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথম গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে কাবির পাশে তিথি। আর পেছনের সিটে আহনাফ,রোনা,সাদ্দাম আর প্রমা।
দ্বিতীয় গাড়িতে আছেন আলতাফ রহমান ও সারা ইয়াসমিন। তাদের সাথে নতুন বিবাহিত দম্পতি ইমরান আর প্রিয়া। প্রিয়া তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার বিষণ্নতা ভুলে ইমরানের হাত ধরে বসে আছে।
তৃতীয় গাড়িতেই আসল সার্কাস! সামনে আরশাদ চৌধুরী আর তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী সানজিদা বেগম। পেছনের সিটে রাইনা আর ফাহিম শিকদার।
আরশাদ চৌধুরী বারবার সানজিদা খালার দিকে তাকাচ্ছেন, আর সানজিদা খালা লজ্জা পেয়ে জানালা দিয়ে ধোবাউড়ার কাশফুল দেখছেন। কিন্তু রাইনার অবস্থা শোচনীয়! সে আগে কাবিরের পেছনে ঘুরঘুর করছিল, কিন্তু এখন থেকে তার চোখ জোড়া ফাহিম শিকদারের ওপর স্থির।
ফাহিম তার চশমাটা একটু ঠিক করে রাইনাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—"রাইনা, ইতালিতে কি এমন সুন্দর সবুজ মাঠ দেখা যায়? নাকি সেখানে শুধু দালানকোঠা?"
রাইনা হা করে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল,
—"কাবির তো আস্ত একটা পাথর, কিন্তু এই ছেলেটা তো জীবন্ত হার্টথ্রব! এর হাসিটা তো পুরো হলিউড হিরোদের মতো!"
রাইনা সুন্দর করে হেসে উত্তর দিলো,
—“আরে কী যে বলেন না। ইতালি থেকে এই ময়মনসিংহ কত সুন্দর শুধু মনে চায় সারাজীবন যেন এখানেই থেকে যাই।"
ফাহিম(মনেমনে)মেয়েটা কী আমার সাথে ফ্লার্ট করছে। ওয়েল,এইটা ভালো সুযোগ তিথির কাছাকাছি যাওয়ার।
***********
ময়মনসিংহের সদরে পৌঁছে আরশাদ চৌধুরী সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার স্ত্রীকে নিয়ে নতুন বাড়িতে ঢুকলেন। কাবিরদের ঠিক সামনের বাড়িটিই তিনি এর মধ্যে প্রতিবেশী এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছেন।
গাড়ি থেকে নামার সময় তিথি মুচকি হেসে আরশাদ চৌধুরীকে বলল,
— "আঙ্কেল,এখন থেকে তো আমরা প্রতিবেশী। সানজিদা খালা যখনই ভালো কিছু রান্না করবেন, আমি কিন্তু পাঁচিল টপকে খেতে চলে আসব!"
আরশাদ চৌধুরী দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, "তোমার জন্য আমি সীমানা প্রাচীরে কারেন্ট দিয়ে রাখব তিথি!"
তিথি মনেমনে বলে,
—“হুম আংকেল আপনি যতই উপর দিয়ে রাগ দেখান না কেন!আসলে আপনি নিজেও অনেক খুশি। আপনাকে স্যাটেল করলাম এবার রাইনা আপুর পালা।"( শয়তানী হাসি দিয়ে কাবিরের দিকে তাকালো। পরক্ষণেই ফাহিমের দিকে তাকিয়ে কিউট হাসি দিয়ে বলল)
—“বাই,ফাহিম ভাইয়া রাতে দেখা হবে।"
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
তিথি যখন গটগট করে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, তখনই কাবির এক হ্যাঁচকা টানে তাকে থামিয়ে দিল।
কাবির তিথিকে দেয়ালের সাথে চেপে দাড়ঁ করালো। তার চোখের দৃষ্টি তখন আগ্নেয়গিরির মতো তপ্ত।
কাবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"খুব তো বাই ফাহিম ভাইয়া বলা হচ্ছে! ওই ছেলের চোখে কী দেখেছ যে এত ডানা গজিয়েছে তোমার? রাতে আবার দেখা হবে মানে কী?"
"উফ! হাত ছাড়ুন অসভ্য সিংহ। লাগছে তো! ফাহিম ভাইয়া কত কিউট, কত ভদ্র! আর আপনি? সারাক্ষণ যেন মনে হয় কাঁচা মানুষ চিবিয়ে খাবেন। আপনি জেলাস হচ্ছেন না তো?"
"শোনো তিথি, ফাহিম কে বা ওর পরিচয় কী, সেটা তোমার ধারণার বাইরে। ওর ধারে কাছে যাওয়ার চেষ্টাও করবে না। এটা কোনো খেলা নয়।"
"আরে! আপনি তো দেখি একদম গোয়েন্দা গল্পের হিরো হয়ে গেলেন। ফাহিম ভাইয়া বুঝি আপনার কোনো পুরোনো শত্রু? নাকি আপনি ভয় পাচ্ছেন যে আপনার চেয়েও ড্যাশিং কেউ চলে এসেছে?"
"ভয় আমি পাই না তিথি, ভয় আমি দেখাই। আর রাতে যদি তোমাকে বারান্দায় দেখি, তবে ওই ফাহিমের সামনেই তোমাকে কোলে তুলে ঘরে নিয়ে আসবো।তখন সবার সামনে ইজ্জতটা কার যাবে ভেবে দেখেছ?"
তিথির হাসি এক মুহূর্তে উবে গেল। সে জানে কাবির যা বলে, তা করার ক্ষমতাও রাখে। সে আমতা আমতা করে বলল,
"আপনি... আপনি বড্ড অসভ্য!আমায় শুধু ভয় দেখান। আমি তো শুধু রাইনা আপুর একটা ব্যবস্থা করতে চাইছিলাম।"
"রাইনার ব্যবস্থা রাইনা করবে।"
“আর হ্যাঁ তুমি যদি নিজের ভালো চাও, তবে আজ রাতে ঘরে তালা দিয়ে বসে থাকবে। তোমার মুখে ফাহিমকে বলা ওই কিউট বিশেষণটা যেন আর দ্বিতীয়বার না শুনি!মাইন্ড ইট"
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট২১
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে
⭕আজকের পার্টটা কেমন হয়েছে?? তোমাদের কথায় অনেক বড় পার্ট দিয়েছি কিন্তু!! লাইক, কমেন্ট করে জানাবে আজকের পার্ট কেমন হয়েছে প্লিজ 🥹🥹