ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

২২তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

১

রাত দশটা বাজে। ময়মনসিংহ শহর এখনো কোলাহল পূর্ণ। অরণ্য কুটিরে ডিনার সময়।

আলতাফ রহমান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“প্রমা, তিথি তোমাদের তো এপ্রিল মাসে বোর্ড পরীক্ষা। তা পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন? পড়াশোনা কি ঠিকঠাক চলছে, নাকি সব ফাঁকিবাজি?"

“আঙ্কেল আপনি চিন্তা করবেন না! প্রস্তুতি একদম তুঙ্গে। বইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক এখন অনেকটা দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মতো দেখা হয় মাঝেমধ্যে, কিন্তু চেনা চেনা লাগে না!"

“ও ঠিক বলেছে আব্বু । আমার অবস্থা আরও ভালো! আমি তো বই খুললেই মনে হয় যেন কোনো মহাকাব্য পড়ছি, এক পৃষ্ঠা পড়তেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাই !"

সারা ইয়াসমিন:শোনো, কাবির তো দু মাসের ছুটি নিয়েছে আরশাদ চৌধুরীর কাছ থেকে। তোরা দুজন কাবিরের কাছেই পড়তে পারিস এই কদিন। ও বেশ ভালো বুঝিয়ে দেবে।

“হ্যাঁ, সারা ঠিকই বলেছে। কাবির মেধাবী, ও তোদের গাইড করলে রেজাল্ট ভালো হবে।”

তিথি সাথে সাথে না বোধক মাথা নেড়ে বলে,

“ওরে বাবা! না না আঙ্কেল, আন্টি—একদম না! কাবির ভাইয়ের কাছে পড়তে যাওয়া মানে তো স্বেচ্ছায় কারাদণ্ড নেওয়া। আমার এই স্বাধীন আত্মা অত নিয়ম-কানুন সইতে পারবে না।"

“ হ্যাঁ বাবা, তিথি ঠিকই বলছে। কাবির ভাই যা গম্ভীর! ওর সামনে বসলে তো পড়া ভুলে উল্টো 'ক খ' বলা শুরু করব।

আলতাফ রহমান হেসে বলে,

“ আরে,কোনো সমস্যা হবে না।"

“আঙ্কেল। আমি তো কোনো মানুষকে ভয় পাই না, আমি ভয় পাই আসল সিংহকে! মানে, কাবির ভাই যখন পড়াতে বসে তখন ওনার যা গম্ভীর চেহারা হয়, তার চেয়ে খাঁচার ক্ষুধার্ত সিংহও অনেক বেশি মায়াবী! আমি বাবা ওই সিংহের গুহায় পা দিচ্ছি না!"

সারা ইয়াসমিন: “তোরা মিছিমিছি ভয় পাচ্ছিস। কাবির বাইরে গম্ভীর হলেও মনে মনে তোদের অনেক কেয়ার করে। ও তোদের বড় ভাইয়ের মতো, একটু বকা দিলে কি আর মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? ও থাকলে তোদের রেজাল্ট অনেক ভালো হবে। তাছাড়া তিথি কাবির তোর স্বামী। নিজের স্বামীকে এতো ভয় পেলে চলে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি তো আছি!”

(সারা ইয়াসমিন রান্নাঘরের দিকে ফিরে ডাক দিলেন)

“জরিনা! ও জরিনা! এদিকে আয় তো।"

জরিনা হাতে একটা ডালের চামচ নিয়ে দৌড়ে এসে, জ্বি আম্মাজান, ডাকছেন?

“যা তো, চট করে কাবিরের ঘরে যা। ওকে গিয়ে বলবি আজ রাতে আমাদের সাথে ডিনার করতে। আর বলবি আমি নিজে ওকে আসতে বলেছি, কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না।"

“কাবির সাবরে ডাকুম? হেই যে গম্ভীর মানুষটা? আইচ্ছা আম্মাজান, যাইতাছি। দেখি যমরাজরে ডিনারে নিমন্ত্রণ দিয়া কতক্ষণ টিকতে পারি!"

তিথি ফিসফিস করে প্রমাকে বলে, দেখলি তো প্রমা? যমরাজকে ডিনারে ডাকা হচ্ছে! আজ রাতেই আমাদের ফাঁসির দড়ির মাপ নেওয়া হবে মনে হচ্ছে!

---------------------

জরিনা যখন উল্টো দিকে দৌড় দিতে যাবে, ঠিক তখনই কাবির ফোন রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার পরনে সাদা ট্রাউজার আর কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। হালকা গোলাপী ঠোঁট। ফর্সা মুখে চাপ দাড়িঁ। চোখের কালো মণির গভীরতায় চেহারার হাজার গুণ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে। একদম যেন কোনো অ্যাকশন সিনেমার হিরো!

“এই যে জরিনা খালা, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন কেন? কী হয়েছে?"

জরিনা তো ভয়ে আধমরা! সে কোনোমতে 'উঁ উঁ' করতে করতে এক দৌড়ে নিচে নেমে গেল। কাবিরও ভ্রু কুঁচকে তার পিছু পিছু নিচে নেমে আসছে।

°

নিচে তখন ডাইনিং টেবিলে সবাই বসেছে। তিথি এক হাত দিয়ে গাল টিপে ধরল কাবিরকে এই লুকে দেখে সে যেন সব ভুলে গেছে!

“ওরে আল্লাহ্! কালো শার্টে কাবির ভাইকে তো জাস্ট আগুন লাগছে! একেই কি বলে সুর্দশন সিংহ !

তিথি মন্ত্রমুগ্ধের মতো কাবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় সারা ইয়াসমিন বললেন, "কিরে তিথি, তাকিয়ে আছিস কেন? ভাত খা।"

তিথি ঘোরের মধ্যে এক দলা ভাত মুখে তুলতে গিয়ে লক্ষ্যই করল না যে সে ভাতের সাথে ডালের বাটিতে থাকা আস্ত একটা কাঁচামরিচ আর লেবুর খোসাও মুখে পুরে দিয়েছে!

“উফফ! আআআ... ইইই!

ঝালে আর তেতোয় তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, সে বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করল।

আলতাফ রহমান ও সারা ইয়াসমিন একসাথে হেসে ফেলে বলে,

“আরে আরে! দেখে খা! তোর চোখ কি প্লেটে নাকি অন্য কোথাও?"

প্রমা তিথির পাঁজরে একটা কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ফিসফিস করে বলে,

“ কিরে, ক্রাশ কি একটু বেশিই ঝাল লেগে গেল? বড্ড বেশি গিলতে গিয়েছিলি তো, তাই ডাল-ভাত আর ব্লেক শার্ট সব একসাথে তালগোল পাকিয়ে গেছে!"

প্রিয়া হেসে বলে,

“তোর কান্ড দেখে তো মনে হচ্ছে। কিছু দেখে খুব বড় শক খেয়েছিস।"

তিথি : হ্যাঁ, অসভ্য সিংহ এতো সুন্দর হলো কবে সেইটাই ভাবছি!

প্রমা: ভাবাভাবি পরে হবে, আগে খেয়ে নে।

প্রিয়া: উম্ তিথি, তোকে দেখে মনে হচ্ছে আমার ভাইকে দেখে বড়সড় ক্রাশ খেয়েছিস!

"আপু, তুমিও না।"

কাবির বরাবরের মতোই নির্বিকার। সে ধীরপায়ে চেয়ার টেনে বসল, যেন সে কিছুই বোঝেনি। কিন্তু তিথির ঝালে লাল হওয়া মুখ আর জলভরা চোখ দেখে তার ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা দেখা দিল।

আলতাফ রহমান কাবিরের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রস্তাবটা দিলেন।

"কাবির, তুমি তো আরশাদ চৌধুরীর অফিস থেকে এই দুই মাস ছুটি নিয়েছ। আমি চাইছি তুমি এই সময়টা একটু কাজে লাগাও। তিথি আর প্রমার তো সামনে বোর্ড পরীক্ষা, ওদের পড়াশোনায় একটু সময় দাও। ওদের যা অবস্থা, তুমি গাইড না করলে বিপদ আছে।"

"হ্যাঁ বাবা কাবির, তুমি ছাড়া ওদের বাগে আনা কঠিন। তুমি তো জানোই ওরা কত বড় ফাঁকিবাজ!"

“ঠিক বলেছ মা। এই দুই বাদর তো পড়তেই চায় না। সারাদিন শুধু আড্ডা আর নাটক! ভাইয়া, তুমিই পারবে ওদের লাইনে আনতে।"

ইমরান একপাশে বসে মিটিমিটি হাসছে। সে জানে কাবির পড়াতে বসলে এই দুইজনের কী দশা হবে!

সারা ইয়াসমিন জরিনাকে ডেকে বলে,

“জরিনা! ও জরিনা! শোনো, মাংস আর তরকারিগুলো তাড়াতাড়ি বড় গামলায় বাড়ো। আরশাদ চৌধুরী, সানজিদা ভাবি, রাইনা আর ফাহিমের জন্য সব আলাদা করে রেডি করো। ওরা সবাই আসছে।"

ইমরান এই সুযোগে আলতাফ রহমানের দিকে একটু ইতস্তত করে তাকাল।

“আব্বু, যদি কিছু মনে না করেন... আমার ছোট ভাই ফাহিমকে কি এই ক’দিন এই বাড়িতেই রাখা যায়? মানে ওখানে ও একা একা বোর হবে, এখানে সবার সাথে থাকলে ওর সময়টা ভালো কাটবে।"

“আরে ইমরান, এটা কোনো বলার কথা? ফাহিম তো আমার নিজের ছেলের মতোই। অবশ্যই ও এখানে থাকবে। ওর জন্য ঘর রেডি করতে বলো।"

ফাহিমের আসার কথা শুনে তিথি আর নিজের আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। সে চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল।

“ ইয়েসসস! ফাহিম আসছে! জাস্ট ফাটাফাটি হবে! আমাদের আড্ডা এবার জমবে! থ্যাংক ইউ আঙ্কেল, আই লাভ ইউ!"

তিথির এই অতি-উৎসাহ দেখে কাবির ভাতের প্লেট থেকে মাথা তুলে খুব ধীরস্থিরভাবে তার দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত চাউনি।

“ফাহিম আসছে বলে অত খুশি হওয়ার কিছু নেই তিথি। সামনে বোর্ড পরীক্ষা পুরো দমে পড়াশোনায় মনোযোগী হও। কাল সকাল আটটা থেকে তোমাদের দুজনের স্টাডি শুরু।"

তিথির মুখের হাসিটা মুহূর্তেই যেন উবে গেল। সে ফাহিমের আসার আনন্দে ডগমগ করছিল, কিন্তু কাবিরের এই সকাল আটটার হুমকি শুনে তার মনে হলো খাঁচার সিংহ আসলেই গর্জন শুরু করে দিয়েছে!

~~~

ডিনারের মাঝপথেই কলিংবেল বেজে উঠল। জরিনা দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকলেন আরশাদ চৌধুরী, সানজিদা খালা, রাইনা আর ফাহিম। রাইনার মুখটা একটু ভার। কিন্তু ফাহিম বরাবরের মতোই শান্ত।

সবাইকে দেখে আলতাফ রহমান আর সারা ইয়াসমিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন আপ্যায়নের জন্য। ঠিক তখনই তিথি বলে উঠলো,

"আরে আরশাদ আঙ্কেল! একদম সময় নষ্ট করবেন না, তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে বসে পড়ুন। তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে শরীরে একদম টাইগার শক্তি নিয়ে নিন। আজ না আপনাদের বাসর রাত! অনেক খাটনি আছে তো আপনার!"

তিথির মুখে এই কথা শুনে যেন ডাইনিং টেবিলে একটা আস্ত বোমা ফাটল!

কাবির বিস্মিত চোখে তিথির পানে তাকালো। সে মটেও আশা করেনি তিথি যে এমন লাগামহীন কথা বলতে পারে। আলতাফ রহমান ও সারা ইয়াসমিন হতভম্ব হয়ে হা করে তাকিয়ে আছেন। প্রমা হাসতে হাসতে টেবিলের নিচে গড়িয়ে পড়ার দশা! পেটে খিল ধরে গেছে ওর, কোনোমতে মুখ চেপে হাসছে ।

প্রিয়া টিস্যু দিয়ে মুখ চেপে মিটিমিটি হাসছে, আর ভাবছে এই মেয়ের পেটে এত বুদ্ধি আসে কোত্থেকে!

ইমরান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ভাবছে, এই মেয়ে কি আসলেই সুস্থ!

আরশাদ চৌধুরী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলে,

“এই... একি কথা! তিথি, বাসর রাত মানে? এই বয়সে আমি... মানে..."

“আরে আঙ্কেল, ভুল বুঝবেন না! আপনার আর সানজিদা খালার তো আজ বিয়েবার্ষিকী। মানে বিবাহবার্ষিকীর রাত মানেই তো বাসর রাত, তাই না? আপনারা বুড়োবুড়ি বলে কি রোমান্স করা বারণ? আঙ্কেল, আজ কিন্তু একদম ছাড়াছাড়ি নেই!"

সানজিদা খালা লজ্জায় কাপড়ের আঁচল মুখে চেপে দাঁড়িয়ে থাকলেন।।

কাবির কাশতে কাশতে লাল হয়ে গেছে,

“তিথি! ইনাফ! একদম চুপ করো! তুমি কি দিন দিন লিমিট ক্রস করছে না?"

✨

ডাইনিং টেবিলের পরিস্থিতি এখন থমথমে। আরশাদ চৌধুরী রা টেবিলে বসলো।

রাইনা ভাবছে তিথি,প্রমাকে কাবির পড়াবে ভালো। তবে আমার কী হবে তিথি যদি কাবিরকে নিয়ে নেয়।না,না,তিথিতো কাবিরের কাজিন ও আমাকে কাবিরকে ইমপ্রেজ করতে হেল্প করছে। ও কিছু করতে পারে না। তবে ফাহিম ওকে ও তো আমার ভালো লাগে। উফ, আমি বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ রাইনার চোখ গেল কাবিরের দিকে। সাদা ট্রাউজার আর কালো শার্টে কাবিরকে আজ যা লাগছে! রাইনা মনে মনে ভাবল,

"ফাহিম তো কাচ্চা বাচ্চা, আসল ম্যাচিউর হিরো তো এই কাবির!"

রাইনার চোখে আবার অন্যরকম ভালো লাগা খেলা করতে শুরু করল, যা তিথির তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না।

তিথি মনে মনে ভাবল,

"ওরে বাবারে! রাইনার নজর দেখি আমার হবু ক্রাশের ওপর! এটা হতে দেওয়া যাবে না।"

তিথি খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। কাবির তখন বেসিনের দিকে যাচ্ছিল হাত ধুতে। তিথি ইচ্ছা করে ওর গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল। সাথে সাথে কাবিরের ধবধবে সাদা ট্রাউজার আর কালো শার্টের ওপর ডালের বাটি আর তরকারি উল্টে গেল!

কাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে! সে তিথির দিকে এমনভাবে তাকাল যে কেউ দেখলে ভয় পেয়ে যাবে।

তিথি এক দৌড়ে সারা ইয়াসমিনের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল,

“ও মাগো! আন্টি বাঁচাও! তোমার এই ড্রাকুলা ছেলে তো এখনই আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! দেখো দেখো, চোখ দিয়ে কেমন লেজার বের হচ্ছে! আন্টি, ওকে বলো আমি তো ইচ্ছা করে করিনি, ডালটা নিজেই ওনার শার্টে গিয়ে সুইসাইড করেছে!"

“আরে বোকা মেয়ে, আমি থাকতে ও তোকে কিচ্ছু করতে পারবে না,ভয় নেই।"

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট২২ (১)

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

বিঃদ্রঃ 😌 পরীরা, আজকের পার্ট আশা করি তোমাদের ভালো লেগেছে। 😇

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন