ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

২৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

২.

তিথি বাঁকা হেসে বলে,

“ওরে আমার মশলাদার মমি! আপনি তো আমায় বউ হিসেবে স্বীকৃতিই দেন না, সারাদিন শুধু ধমকান। তাই আমি ভাবছি,আপনাকে আজই মনে মনে ডিভোর্স দিয়ে দেব! আর ওই ফাহিম ভাইয়াকে বিয়ে করে সুখে সংসার করব। ও অন্তত আপনার মতো এমন খাড়ুস নয়!

তিথির মুখে ডিভোর্স আর ফাহিমকে বিয়ে করার কথা শুনে কাবিরের ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঝটকা টানে তিথিকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল এবং মুহূর্তের মধ্যে তিথির ঘাড়ের পাশে শক্ত করে একটা কামড় বসিয়ে দিল!

তিথি ব্যথায় আর বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে, “আআআআহ্! ওরে বাবারে! মাগো! খেয়ে ফেলল রে!"

কাবির তিথির কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত স্বরে, “আমার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া অত সহজ নয়, পাগলু ফিঙে। আমি তোমায় স্বীকৃতি দেব কি দেব না, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। কিন্তু খবরদার! যদি ওই ডিভোর্সের কথা আর একবারও মুখে আনো, তবে তোমার দেহের প্রতিটা ভাজে এমন আঘাত দেব যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না!রিমেম্বার,আই-এম নট ইয়োর অ্যাভারেজ ভিলেন।"

“ও আন্টি গো! তোমার ছেলে তো আস্ত একটা রাক্ষস! ও তো আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাচ্ছে! বাঁচাও আমায় এই *রাক্ষস ভাইয়া*র হাত থেকে!

“আবার ভাইয়া বললে? বলেছি না এই নামে ডাকবে না? এবার যদি আবার ভাইয়া বলেছ, তবে কিন্তু ঘাড়ে নয়,একদম ঠোঁটে কামড় দিয়ে ঠোঁট ছিঁড়ে দেব!"

~~

বাইরে থেকে প্রমার গলা শোনা যাচ্ছে

— "কিরে তিথি? ভেতর থেকে এত চিল্লাচিল্লি কিসের? কাবির ভাইয়া কি তোকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাচ্ছে নাকি? দরজা খোল বলছি!"

প্রমার ডাক শুনে তিথি ভাবল এই বুঝি মুক্তি পাওয়ার সুযোগ! সে কাবিরের শক্ত বাঁধন থেকে ছুটে দরজার দিকে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়ালো।

“উফ!প্রমা এসে গেছে! এবার আমি বাঁচলাম। ছাড়ুন বলছি অসভ্য সিংহ, নইলে প্রমাকে বলে দেব আপনি আমার ঘাড়ে কামড় দিয়ে আমাকে নীল করে দিয়েছেন!"

তিথি যেই না দরজার দিকে দৌড় দিতে যাবে, অমনি কাবির এক ঝটকায় ওর কোমর ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। তিথি ছিটকে এসে আছড়ে পড়ল কাবিরের খালি বুকের ওপর। কাবির ওর দুই হাত নিজের এক হাত দিয়ে পিঠমোড়া করে ধরল।

“কোথায় যাচ্ছ বিবিজান? খেলা তো কেবল শুরু হলো। প্রমা ডাকছে ডাকুক, ও তো জানে আমি তোমায় শাসন করছি। আর তুমি যদি এখন এই অবস্থায় বাইরে যাও, তবে তোমার ঘাড়ের ওই কামড়ের দাগ দেখে সবাই কী ভাববে, সেটা ভেবেছ?"

তিথি এবার আড়চোখে আয়নায় নিজের ঘাড়ের দিকে তাকাল—লাল হয়ে ফুলে আছে জায়গাটা। এই অবস্থায় বাইরে গেলে তো নির্ঘাত কেলেঙ্কারি!

“আমার রোমান্টিক ড্রাকুলা ! আপনি তো আসলেও একটা ইবলিশ! এখন আমি বাইরে যাব কী করে? প্রমা তো ভাববে আমরা ভেতরে কুস্তি লড়ছি! দয়া করে ছাড়ুন, আমি আর কোনোদিন আপনাকে পাউডার মাখা পালোয়ান বলব না, প্রমিজ!"

কাবির বাঁকা হেসে তিথির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,

“শুধু ওটা না, আর কী কী বলবে না? ভাইয়া ডাকবে?

“না না! একদম না! আপনি যা বলবেন তাই ডাকব দরকার হলে ওগো, প্রাণনাথ,হিটলার যা খুশি! শুধু এখনকার মতো আমায় ছেড়ে দিন, আমার জান বের হয়ে যাচ্ছে!"

কাবির তিথির অসহায় মুখটা দেখে মনে মনে হাসল, কিন্তু মুখে সেই গাম্ভীর্য ধরে রাখল। ওদিকে প্রমা বাইরে থেকে আরও জোরে চিৎকার শুরু করেছে।

"কাবির ভাই! দরজা না খুললে আমি কিন্তু আব্বুকে ডাকব!"

তিথি তখন ভয়ে সিটিয়ে গেছে। তার অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কাবির তাকে ছাড়ছেও না, আবার দরজাও খুলছে না। তিথি বুঝতে পারছে, এই খাড়ুস মানুষটার কবজায় পড়ে তার আজ দফারফা হওয়ার দশা!

কাবির তিথিকে এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা মলম বের করল। তিথি দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতেই কাবির ওর ওড়না ধরে টেনে আবার দেওয়ালের সাথে দাঁড় করিয়ে দিল।

“একদম নড়বে না! ঘাড়ের যা অবস্থা করেছ, এই দাগ নিয়ে বাইরে গেলে কাল সকালেই আমাদের বিয়ের সানাই বেজে যাবে। মাথা নিচু করো, মলমটা লাগিয়ে দেই।"

"কামড় দেওয়ার সময় তো মনে ছিল না যে দাগ হবে? তখন তো একদম বাঘ সেজেছিলেন, এখন দেখি ডাক্তার সাজছেন! ইসসস... জ্বলে রে! আঙ্কেল তো বাসর রাতের কথা বলছে, আর আপনি তো আমাকে জ্যান্ত কোরবানি করার ব্যবস্থা করছেন!"

কাবির তিথির ঘাড়ে আঙুল দিয়ে মলম ঘষতে ঘষতে,

“চুপ করো তো পাগলু ফিঙে,তোমার মুখে কি কোনোদিন খিল পড়বে না?"

“খিল কেন পড়বে? কামড় তো আপনি দিয়েছেন, আমার জিব তো আর ছিঁড়ে দেননি! মলম লাগাচ্ছেন নাকি বিষ ঢালছেন? আপনার এই লোহার মতো হাত লাগলে তো মলমের চেয়ে ব্যথা বেশি লাগে।আমি তো ভাবছি আপনার এই মলম মাখানো ঘাড় নিয়েই ফাহিমকে গিয়ে বলব,দেখো ফাহিম ভাইয়া, তোমার হিরো হওয়ার সুযোগ এসেছে, এই দানবটাকে মারো!

কাবির মলম লাগাতে লাগাতে একটু জোরে চাপ দিয়ে) বলল,

“আবার ফাহিম? আর একটা কথা বললে কিন্তু মলম লাগানো বন্ধ করে আবার নতুন করে কামড় দেব! তখন কিন্তু সারারাত কান্না করেও কাজ হবে না।"

“আআআহ! মারুন আমায়, মেরেই ফেলুন! আপনার এই অসভ্য মার্কা অত্যাচার তো আর সইতে পারছি না। মলম না লাগিয়ে বরং আমাকে একটু বিষ খাইয়ে দিন, অন্তত আপনার এই খাড়ুস মুখটা তো আর দেখতে হবে না!"

**********

বাইরে থেকে প্রমার চিৎকার আরও বাড়ল,

"কিরে তোরা এতোক্ষণ ধরে কী করছিস। নিচে সবাই ডাকছে, দরজা খোল না রে বাবা!"

“প্রমা! তুই তাড়াতাড়ি আংকেলকে ডাক! তোর এই কাবির ভাই তো আমাকে মলম দিয়ে আমাকে এখন ফ্রাই করার প্ল্যান করছে! বাঁচা আমায়!"

কাবির বিরক্ত হয়ে তিথির মুখটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরল। মলম লাগানো শেষ করে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"গাড়ি তো অনেক চালালে বিবিজান, এখন গ্যারেজে ঢোকার সময় হয়েছে। এই দাগটা ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখো, নইলে কাল থেকে তোমার পড়াশোনা আমি বাথরুমে বসে করাব!"

“আপনি নিজেকে কী ভাবেন শুনি? এই অন্যায়ের প্রতিশোধ আমি নিয়েই ছাড়ব! মনে রাখবেন এর বদলা আমি এমনভাবে নেব যে আপনার ওই সিক্স প্যাক তখন সিক্স ডাব্লিউ হয়ে যাবে!"

“হু, দেখব। তোমার প্রতিশোধ তো ওই ডালের বাটি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, বিবিজান।"

“অসভ্য কোথাকার! আপনি ভাই নামের কলঙ্ক! ছিঃ ছিঃ, এমন খাড়ুস লোক যে নিজের বউকে ঘাড়ে কামড় দেয়, তাকে তো মিউজিয়ামে রাখা উচিত!"

তিথি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রমার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। প্রমা তো হ্যাবলা হয়ে তাকিয়ে আছে, ও কিছুই বুঝতে পারছে না যে ভেতরে আসলে কী এমন কুস্তি হলো!

-------------------------

পেছনে তাকিয়ে কাবির শুধু শব্দহীন একটু হাসল। ওর সেই হাসিটা ছিল গভীর এবং রহস্যময়। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ওর ফোনের ভাইব্রেশনে পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখল ওর স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্টের আনাস কল।

কাবির কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই বরফের মতো শীতল হয়ে গেল,

"বলো। কী আপডেট?"

”স্যার, চারদিকের পরিবেশ এখন শান্ত। তবে ইতালিতে একটা বড় খবর আছে। আরশাদ চৌধুরীর ওপরেও একজন বস আছে, যাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবাই গড অফ ইতালি নামে চেনে। এই লোকটা পুরো বিশ্বে ফাহিম নামের ছোট-বড় সব গ্যাংস্টারদের নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার ব্যবসা চালাচ্ছে। অস্ত্র থেকে শুরু করে ড্রাগস—সবই ওর ইশারায় চলে।"

কাবিরের চোখের মণি সরু হয়ে এল। সে জানালার দিকে তাকিয়ে অন্ধকারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল।

“আরশাদ চৌধুরীর ব্যাকগ্রাউন্ড বলো। সে কি জানেশুনে এসবের সাথে জড়িত? নাকি সেও কারো হাতের ঘুঁটি? আর এই গড অফ ইতালি লোকটা কেন আরশাদ চৌধুরীকে সামনে রেখে নিজে আড়ালে থাকছে? তার আসল উদ্দেশ্যটা কী?"

"স্যার, আরশাদ চৌধুরী বাইরে থেকে একজন বড় বিজনেসম্যান হলেও ভেতর ভেতর সে ইতালির ওই গডের সব ব্ল্যাক মানি সাদা করার কাজ করে। গড অফ ইতালি অত্যন্ত চালাক লোক। সে জানে আরশাদ চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী কাউকে সামনে রাখলে পুলিশের নজর পড়বে না। সে আড়ালে থেকে আরশাদকে দিয়ে পুরো ইউরোপের মার্কেট কন্ট্রোল করছে।"

কাবির ফোনটা নামিয়ে রাখল। ওর মাথায় এখন হাজারটা চিন্তা।

৩.

ডিনার শেষে সবাই যখন ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিচ্ছে, রাইনা তখন তিথিকে এক কোণায় ডেকে নিয়ে গেল। তার চোখে এখনো সন্দেহের রেশ।

"তিথি, একটা কথা বলো তো। তখন টেবিলে তুমি অমন করে কাবিরের গায়ের ওপর পড়লে কেন? কাবির যদি ব্যথা পেত? তোমার তো একটু সাবধানে হাঁটা উচিত।"

তিথি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত দিল। ওর চেহারায় এমন এক ভাব ফুটিয়ে তুলল যেন সে কোনো ভৌতিক সিনেমা দেখছে।

“আর বলো না রাইনা আপু! তোমাকে তো বলাই হয়নি। এই বাড়িতে আমার মেজ দিদির অতৃপ্ত আত্মা ঘোরে না। উনি মারা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন, কাবির ভাইয়া যেন কখনো সাদা আর কালো কম্বিনেশনের পোশাক না পরে। কারণ ওনার স্বামী ঠিক এই রঙের পোশাক পরেই নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। আজ কাবির ভাইয়াকে কালো শার্ট আর সাদা ট্রাউজারে দেখে মেজ দিদির আত্মা আমার ওপর ভর করেছিল! উনিই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ওনার শার্টটা নষ্ট করতে বাধ্য করেছেন। নাহলে দিদি আজ রাতেই কাবির ভাইয়াকে তুলে নিয়ে যেত!"

রাইনা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। ওদিকে প্রমা পাশ থেকে ফোড়ন কাটল।

“একদম ঠিক বলেছিস তিথি। রাইনা আপু, তুমি তো আমাদের ভাইয়াকে অনেক পছন্দ করো, কিন্তু দেখো ভাইটার কত রোগ! একদিকে জম্বি হয়ে হাঁটা, অন্যদিকে মেজ দিদির আত্মার নজর। তুমি কি পারবে কাবির ভাইকে সামলাতে?

রাইনা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "আমি... আমি তো জানি না এতো কিছু। কিন্তু আমি কাবিরকে ভালোবাসি, আমি ওকে সুস্থ করবই!"

তিথি মনে মনে হাসল— "হবে রে হবে, আজ রাতেই তোর সব ভালোবাসা হাওয়া হয়ে যাবে!"

~~~

কাবির তখন ল্যাপটপের সামনে বসা। তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই। সিসিটিভি ফুটেজে সে নজর রাখছে ফাহিমের প্রতিটি মুভমেন্টের ওপর। কিন্তু তার আসল কাজ চলছে স্ক্রিনের ওপাশে।

সে ইন্টারন্যাশনাল ব্ল্যাক বক্স গ্রুপের সাথে একটি হাই-সিকিউরিটি জুম মিটিংয়ে যুক্ত। কাবিরের আসল পরিচয় সেখানে —সে এই গ্রুপের ভাইস লিডার!

*****

ওদিকে ফাহিম বাগানের এক কোণায় গিয়ে তার স্যাটেলাইট ফোন থেকে কল করল সরাসরি ইতালি। ওপাশ থেকে ভেসে এল এক কর্কশ আর ভারী কণ্ঠস্বর— গড অফ ইতালি।

“তুমি এতো ইউজলেস কবে থেকে হলে ফাহিম? কাবিরের মতো একটা ছোট পোকাকে তুমি শেষ করতে পারছো না?"

“স্যার! আপনি যাকে ছোট পোকা ভাবছেন, সে আসলে ব্ল্যাক বক্স গ্রুপের ভাইস লিডার! ওর হাতে অঢেল ক্ষমতা আর ইনফরমেশন। আমি কীভাবে ওকে শেষ করব? ও অলরেডি আমাকে চিনে ফেলেছে। দয়া করে আমাকে বাঁচান!”

“আমি যখন বাংলাদেশে আসব, তখন পুরো দেশ জ্বালিয়ে দেব। কাবির আর কতদিন আছে সেখানে?"

“আরশাদ চৌধুরীর কাছ থেকে শুনলাম সে আর দুই মাস বাংলাদেশে থাকবে।"

“ হুম... আরশাদ চৌধুরী যেন কোনোভাবেই আমাদের হাতছাড়া না হয়। আর সে যেন না জানে যে তুমি আমার লোক। কাবিরকে ওর মতো খেলতে দাও। আমিও দেখি ওই ব্ল্যাক বক্সের ভাইস লিডার আসলে কী কী করতে পারে! আমার ইশারায় পুরো ইউরোপ কাঁপে, আর সে এসেছে আমার ব্যবসায় হাত দিতে?"

“স্যার, আরশাদ চৌধুরী তো একদম কাবিরের হাতের মুঠোয়। আমি ভয় পাচ্ছি কাবির যদি ওর ব্ল্যাক বক্সের পাওয়ার ইউজ করে আমাদের শিপমেন্ট আটকে দেয়..."

“ভয় পেও না ফাহিম। আরশাদকে বলো কাবিরকে যেন পারিবারিক জালে আটকে রাখে। আর তুমি নজর রাখো ওই মেয়েটার ওপর, যাকে কাবির সারাক্ষণ আগলে রাখে। নাম যেন কী? ওই তিথি..."

ঠিক সেই মুহূর্তে বাগানের শুকনো পাতার ওপর কারও পায়ের শব্দ হলো— মড়মড়!

ফাহিম ঝট করে ফোনের লাইনটা কেটে দিয়ে পকেটে চালান করে দিল। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল শব্দটা কোথা থেকে এল।

ঝোপের ওপাশ থেকে টর্চলাইটের আলো ফেলল তিথি। প্রমা ওর পেছনে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে।

“প্রমা! দেখ দেখ, এখানে কত সুন্দর সাদা গোলাপ ফুটেছে! আরশাদ আঙ্কেলের বাসর ঘরে সাদা গোলাপ না থাকলে তো রোমান্টিকতা জমবে না।"

“তিথি, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে বাগানে কেউ আছে। দেখলি না কেমন একটা খসখস শব্দ হলো? কোনো ভূত-টুত না তো?"

“ভূত হবে কেন?আর ভূত আসলেও আমার এই কাঁচি দেখে পালাবে!"

তিথি যেই না ঝোপের দিকে এগোতে যাবে, অমনি ফাহিম হুট করে সামনে বেরিয়ে এল। অন্ধকার থেকে হুট করে কাউকে বেরোতে দেখে প্রমা তো চিৎকার দিয়েই দিয়েছিল, কিন্তু তিথি ঝট করে ওর মুখ চেপে ধরল।

“ওরে বাবারে! ফাহিম ভাইয়া? আপনি এখানে এই ঝোপের আড়ালে কী করছেন? আপনি কি এখন জোনাকি পোকা ধরার প্র্যাকটিস করছেন?"

“আরে না তিথি! আমি... আমি আসলে একটু ফ্রেশ বাতাস খেতে বাগানে এসেছিলাম। ভেতরে বোর লাগছিল। তোমরা এত রাতে এখানে কী করছ?"

"আমরা তো ফুল তুলছি। কিন্তু আপনি ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছিলেন?"

ফাহিমের বুক ধক করে উঠল। এই মেয়েটা কি তবে সব শুনে ফেলেছে?

“তুমি ভুল শুনেছ তিথি। নেটওয়ার্ক আসছিল না তো, তাই একটু ট্রাই করছিলাম। চলো, রাত অনেক হয়েছে, ভেতরে চলো।"

“ইসসস! ফোনের নেটওয়ার্কের জন্য মানুষ কি আর ঝোপের ভেতর লুকায়? আপনার পকেটে ওটা কী ফোন ভাইয়া? এন্টেনাওয়ালা তো মনে হলো! আমায় দেখান তো একবার?"

ফাহিম বুঝতে পারল তিথিকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। সে দ্রুত কথা ঘুরিয়ে দিল।

★

রাত প্রায় বারোটা। কাবিরের স্টাডি রুমের চারপাশ অন্ধকার, শুধু পাঁচটি মনিটরের নীলচে আভা তার মুখে এক কঠোর ভাব ফুটে উঠে । সে তার ব্ল্যাক বক্স ইন্টারফেস চালু করল। স্ক্রিনে কয়েকটা পরিচিত মুখ ফুটে উঠে।

কাবির : "জেন্টলম্যান, সময় ফুরিয়ে আসছে। আমাদের টার্গেট আরশাদ চৌধুরী আর ইতালির পাঠানো কিলার ফাহিম। মনে রাখবেন, আরশাদ চৌধুরী সাধারণ অপরাধী নন। তিনি গড অফ ইতালি'র গ্লোবাল ক্যাশিয়ার। আর ফাহিম হলো ইতালির মাফিয়া পরিবারের পালিত এক হিটম্যান। তোমাদের ইনভেস্টিগেশন আপডেট দাও।"

"স্যার, আরশাদ চৌধুরীর ডিজিটাল পোর্টফোলিও হ্যাক করে আমি চমকে গেছি! সে শুধু আরশাদ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ চালায় না, তার আড়ালে সে গড অফ ইতালির শেল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সারা বিশ্বে ড্রাগস আর নিষিদ্ধ অস্ত্রের টাকা পাচার করে। এই মুহূর্তে তার অ্যাকাউন্টে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ ট্রানজ্যাকশন পেন্ডিং আছে। তাকে সরালে পুরো ইতালিয়ান মাফিয়া সিন্ডিকেট পঙ্গু হয়ে যাবে।"

"ক্যাপ্টেন, একটি বিশেষ ইন্টেলিজেন্স ইনপুট আছে। আগামী সাপ্তাহ শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে আরশাদ চৌধুরীর একটি ফার্টিলাইজার কন্টেইনার আসছে। কিন্তু আমাদের সোর্স বলছে, ওর ভেতরে উন্নত মানের অটোমেটিক রাইফেল এবং বিস্ফোরকের নীল নকশা আছে। ওটা ইতালির পরবর্তী নাশকতার মূল হাতিয়ার।"

কাবির:"আগামী সপ্তাহে বন্দরে চালান পৌঁছানোর মুহূর্তে আমরা আরশাদের সব অফশোর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করব। গড অফ ইতালি যখন দেখবে তার ক্যাশিয়ার আরশাদ খালি হাত, সে ফাহিমকে নির্দেশ দেবে আরশাদকে খতম করতে। ফাহিম যখন আরশাদের মাথায় বন্দুক ঠেকাবে, তখনই আমরা তাদের আসল রূপ দুনিয়ার সামনে আনব। আর বন্দরের কন্টেইনার খালাসের সময় কোনো স্থানীয় পুলিশ থাকবে না। আমার ব্ল্যাক বক্স কমান্ডোরা সরাসরি অ্যাকশনে যাবে। ফাহিমকে তার স্যাটেলাইট ফোন আর অস্ত্রের চালানসহ ধরতে হবে। তবে মনে রেখো, তিথি যেন এই রক্তক্ষয়ী খেলার ছায়াও না পায়। ফাহিম তাকে সন্দেহ করলে ক্ষতি করতে পারে, তাই তিথির ছায়ার সাথেও যেন আমার একজন গার্ড থাকে।"

**************

তিথি সারা ঘর ঘুরে ঘুরে এমন সব কাণ্ড করল যা কোনো সুস্থ মানুষের মাথায় আসবে না।

"প্রমা! এই নে, এই গোলাপজলটা সব বালিশে ঢেলে দে। এমন গন্ধ হবে যে আঙ্কেল আর সানজিদা আন্টি রুমে ঢুকলেই মনে করবে তারা কোনো আতরের দোকানে ঢুকেছে!"

ফাহিম বিরক্ত হয়ে বলে,

"তিথি, বাসর ঘর কি কেউ এভাবে সাজায়? এতো গন্ধে তো মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে!"

"আরে ভাইয়া! আপনি বুঝবেন না। এই কড়া গন্ধে আঙ্কেলের সব পুরনো পাপ ধুয়ে মুছে যাবে। আর শোনো প্রমা, এই যে আলপনাটা আঁকলাম বিছানার চাদরে, এটা কিন্তু সাধারণ রঙ না। এটা হলো সেই আঠা মেশানো রঙ! আঙ্কেল বসলেই চাদরের সাথে আটকে যাবে, আর উঠতে পারবে না। তখন সানজিদা খালা বলবে জান কী হয়েছে, উনি ধরে উঠানোর চেষ্টা করবেন। একেই বলে স্থায়ী ভালোবাসা!"

"কিরে তিথি! বালিশের নিচে এতগুলো কাঁচা সুপারি আর জর্দা কেন?"

"আরে! সানজিদা আন্টি তো পান খেতে পছন্দ করেন। মাঝরাতে যদি ওনার পান খেতে ইচ্ছে করে, তখন কি আঙ্কেল নিচে নামবে? তাই আগেই ব্যবস্থা করে রাখলাম। আর খাটের নিচে এই যে দশটা অ্যালার্ম ঘড়ি সেট করলাম, এগুলো ঠিক রাত ৩টায় একসাথে বেজে উঠবে। আঙ্কেল-আন্টি যেন সারারাত ঘুমিয়ে সময় নষ্ট না করে একে অপরের সাথে গল্প করে, তাই এই ব্যবস্থা!"

________

রাত বাজে একটা। অরণ্য কুটির বাড়িটি পুরো নিস্তব্ধ। কাবির তার রুমে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ দরজার বাইরে একটা ছায়া নড়াচড়া শুরু করল। রাইনা হাতে একটা ঢাউস সাইজের টর্চলাইট আর ঘাড়ে ভেজা গামছা নিয়ে ওত পেতে আছে।

“তিথি বলেছিল পিনপতন নীরবতা থাকলে কাবিরের সমস্যা হয়। এখন আমাকে ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে।"

রাইনা দরজার ছিদ্রে মুখ লাগিয়ে খুব করুণ সুরে ডাকতে লাগল— "কুউউ... কুউউ... ও ভাইজান... মোর কথা হোনেন... কুউউ!"

ভেতরে কাবিরের ঘুম ভেঙে গেল। সে ভাবল হয়তো কোনো পাখি ভুল করে বারান্দায় চলে এসেছে। সে আবার পাশ ফিরে শুলো। কিন্তু রাইনা তো দমবার পাত্রী নয়। সে ভাবল কাবিরের রোগ বোধহয় অনেক বেড়ে গেছে। এবার সে পরের ধাপে গেল।

রাইনা সজোরে দরজায় লাথি মেরে ভেতরে ঢুকল। কাবির ধড়ফড় করে উঠে বসতেই রাইনা ওর মুখের ওপর টর্চলাইটের কড়া ফ্ল্যাশ মারল।

রাইনা চিৎকার করে বলে,

“ভাইয়া! আপনার পোজ একদম জোস হয়েছে! ও ভাইজান, হুদাহুদি চিল্লাইয়েন না! জয় বাংলা! জয় বাংলা!"

কাবির চোখ কচলাতে কচলাতে ভাবল সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি কোনো পাগলা গারদে চলে এসেছে! সে রাইনার দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।

“রাইনা! একি অসভ্যতা? তুমি এই মাঝরাতে আমার রুমে ঢুকে জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছ কেন? আর আমার মুখে টর্চ মারছ কেন? পাগল হয়ে গেছ নাকি?"

“তিথি বলেছে... আপনি নাকি এখন ফ্যানকে স্যালুট দেবেন! দিন ভাইয়া, স্যালুট দিন! ফ্যান আপনার শত্রু নয়! ও ভাইজান, মোর কথা হোনেন!"

ঠিক তখনই দরজার আড়াল থেকে তিথি আর প্রমার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। কাবির মুহূর্তেই বুঝে গেল এটা কার কাজ। সে শার্টটা টেনে গায়ে দিতে দিতে তিথির নাম ধরে এমন এক ধমক দিল যে রাইনার হাতের টর্চলাইটটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল!

“তিইইইথ্থ্থিইই! আজ রাতে তোমার আর রেহাই নেই!"

কাবিরের চিৎকার শুনে প্রমা আর রাইনা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। প্রমা তো ঝড়ের বেগে নিজের ঘরে ঢুকে সজোরে দরজা লাগিয়ে দিল।তিথি ড্রাকুলা ভাইয়ার সামনে দাঁড়ায়! রাইনাও এক দৌড়ে ঘরের বাইরে।

তিথি যখনই পা টিপে দরজার দিকে এগোতে চাইল, ঠিক তখনই এক জোড়া লোহার মতো শক্ত হাত তাকে মাটি থেকে শূন্যে তুলে নিল। কাবির এক ঝটকায় তিথিকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছে!

"ওরে বাবারে! ড্রাকুলা তো জম্বি থেকে এখন স্পাইডারম্যান হয়ে গেছে! ভাইয়া, জামাই সাইরা দেন প্লিজ! ভুলেও আপনার জম্বি রোগের কথা কাউকে বলবো না! এমনকি ইঁদুর-বেড়ালকেও জানাব না, প্রমিজ!"

কাবিরের চোয়াল শক্ত, সে তিথির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন তাকে আস্ত গিলে ফেলবে। কিন্তু তিথির এই ভাইয়া ডাক শুনে তার মেজাজ আরও তুঙ্গে উঠল।

"চুপ! একদম চুপ! অনেক হয়েছে তোমার পাগলামি। এখন তোমাকে নিয়ে কী করা উচিত জানো?"

~~~

ওদিকে রাইনা যখন করিডোরে দিয়ে হন্তদন্ত পালাচ্ছিল, ঠিক মোড় ঘোরার সময় সজোরে ধাক্কা খেল কারো সাথে। সে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা শক্তিশালী হাত তাকে জড়িয়ে ধরল।

রাইনা তাকিয়ে দেখল,সামনে ফাহিম! ফাহিমের পরনে সিল্কের ব্লুটি-শার্ট, চুলে হালকা জেল আর চোখে এক মায়াবী দৃষ্টি। সে খুব ধীরস্থিরভাবে রাইনাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল।

"সাবধানে রাইনা! এতো ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো আছি।"

রাইনা তো থতমত খেয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ আগে কাবিরের সেই রুক্ষ চেহারা দেখেছে, আর এখন দেখছে ফাহিমের এই সুদর্শন রূপ। রাইনার মনে হলো, কাবিরের চেয়ে ফাহিম তো হাজার গুণ বেশি সুদর্শন! ফাহিমের চাহনিতে এক অদ্ভুত জাদু আছে।

"আসলে কাবির তো জম্বি হয়ে গেছে, তাই দৌড় দিছিলাম। আপনি তো অনেক সুন্দর করে কথা বলেন! কাবির তো সারাদিন পাত্তাই দেয় না আমায়!"

"কাবির বোধহয় একটু বেশিই রাগী। তুমি চাইলে আমার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারো, মন ভালো হয়ে যাবে।"

রাইনা মনে মনে ভাবল, "ইশ! এতো সুন্দর ছেলে থাকতে আমি ওই কাবিরের পেছনে কেন ঘুরছি? ফাহিম তো একদম ইতালির হিরোদের মতো!"

সে আর না পালিয়ে ফাহিমের সাথে গল্পে মজে গেল। সে জানত না, এই সুন্দর চেহারার পেছনেই লুকিয়ে আছে এক খুনি।

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট২৩ (২+৩)

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন