ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

২৫তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট_২৫(১+২)

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

গাড়িটা যখন গহীন জঙ্গলের এক পরিত্যক্ত গুদামের সামনে থামল, তিথির বিলাপ তখন থেমে গেছে। তার এখন কাজ করছে এক হিমশীতল ভয়। লোকগুলো আর ভদ্রতার মুখোশ পরে নেই। তারা তিথি আর প্রমাকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল।

সেখানে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। তার ইশারায় তিথি আর প্রমাকে চেয়ারের সাথে বেঁধে ফেলা হলো।

“ও ভাইয়া,আপনাদের পার্টস অফ স্পিচ কি একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে? একটা মেয়েকে এভাবে ধরে আনা কি কোনো প্রোপার নাউন এর কাজ?"

লোকটা কোনো কথা না বলে সপাটে এক চড় মারল তিথির গালে। তিথির ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। প্রমা চিৎকার করে উঠলে তাকেও লাথি মেরে নিচে ফেলে দেওয়া হলো। মারের চোটে দুই বান্ধবীর অবস্থা কাহিল। তিথির চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে, কিন্তু তার জেদ কমেনি।

~~~

সামনের বড় স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। ভিডিও কলে ওপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে এক রহস্যময় অবয়ব যিনি নিজেকে গড অফ ইতালি দাবি করেন।

“কাবির! আমি জানি তুমি ড্রোনের মাধ্যমে এই লাইভ ফিড দেখছো। কিন্তু দেখো, তোমার কলিজার টুকরো বোন আর ওই চঞ্চল মেয়েটা এখন আমার কবজায়।"

হঠাৎ গুদামের স্পিকারে কাবিরের বজ্রকঠিন কণ্ঠ বেজে উঠল। সে এই সিগন্যাল ট্র্যাক করে ফেলেছে।

“স্টপ ইউর ফাকিং ননসেন্স। তুই ওদের গায়ে হাত দিয়ে বড় ভুল করেছিস, নিজের মৃত্যু নিজ চোখে দেখতে রেডি থাক আমি চসতেছি।"

“মৃত্যু? না কাবির, আমি তোমাকে অফার দিচ্ছি। তুমি ব্ল্যাক বক্স ছেড়ে আমার হয়ে কাজ করো। তোমার বুদ্ধিকে আমি আমার ব্যবসায় কাজে লাগাতে চাই। বিনিময়ে আমি তোমার এই বোন আর তিথিকে ছেড়ে দেব। ভেবে দেখো, তুমি কি তোমার আদর্শের জন্য এই নিষ্পাপ মেয়ে দুটোর মৃত্যু দেখতে চাও?"

তিথি মার খেয়ে আধো বোজা চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তার সারা শরীর ব্যথায় নীল হয়ে গেছে, কিন্তু সে চিৎকার করে বলল,

“কাবির ভাইয়া! খবরদার... এই জানোয়ারটার কথা শুনবেন না। আমি মরে গেলেও এই ভিলেন এর কাছে হার মানবেন না। ওই জানোয়ার, তোর ইতালিয়ান স্টাইল আমি ঝালমুড়ি দিয়ে চিবিয়ে খাব!"

গড অফ ইতালি রাগে ফেটে পড়ল। সে তার লোককে ইশারা করল তিথিকে আবার আঘাত করতে।

“কাবির, শেষ সুযোগ। আমার গোলামি স্বীকার করো, নইলে এই মুহূর্তেই ওদের শেষ করে দেব।"

“শোন, তুই যদি মনে করছিস আমাকে ভয় দেখিয়ে তোর দলে টানবি, তবে তুই ভুল করছিস। মরে গেলেও আমি তোর মতো জানোয়ারের সাথে হাত মেলাব না।"

"গ্রেট! তাহলে ওদের মরতে দেখো। আর আমাকে খোঁজার চেষ্টা করতে পারো, যদি বেঁচে থাকো!"

ঠিক সেই মুহূর্তে গুদামের ছাদ চিরে তপ্ত সিসার মতো ব্ল্যাক বক্সের কমান্ডোরা গ্রেনেড ছুড়ে ভেতরে ঢুকল। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। কাবির স্বয়ং হাতে রাইফেল নিয়ে ঝড়ের গতিতে ভেতরে ঢুকল। তার চোখ এখন আগুনের ফুলকি ঝড়ছে ।

“কভার দাও! তিথি আর প্রমাকে আগে সুরক্ষিত করো!"

শুরু হলো এক ভয়াবহ সংঘর্ষ। একদিকে গড অফ ইতালির ভাড়াটে খুনি, অন্যদিকে কাবিরের কমান্ডো বাহিনী। ধোঁয়ার আড়ালে কাবির এগিয়ে গেল সেই চেয়ারটার দিকে যেখানে তিথি নিথর হয়ে ঝুলে আছে।

তিথির রক্তাক্ত মুখটা দেখে কাবিরের ভেতরের শান্ত মানুষটা এক নিমেষে দানব হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই লড়াই এখন আর শুধু দেশের নয়, এই লড়াই এখন তার প্রিয়তমা আর পরিবারকে রক্ষার।

টিয়ার শেলের ধোঁয়া আর গ্রেনেডের বিস্ফোরণে চারপাশ কম্পিত। ধোঁয়ার কুয়াশা চিরে ফ্ল্যাশলাইটের আলো আর আগুনের ঝলকানি এক বিভীষিকাময় দৃশ্যের তৈরি হয়েছে।

তিথি আধোবোজা চোখে, ব্যথায় অস্ফুট স্বরে গোঙাচ্ছিল। তার দৃষ্টি ঝাপসা। চরের আঘাতে একটা চোখ প্রায় ফুলে বন্ধ হয়ে গেছে। আবছা আলো-আঁধারিতে সে দেখল, গুদামের লোহার দরজা ভেঙে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল একদল কমান্ডো।

সবার সামনে কাবির। পরনে কুচকুচে কালো ট্যাকটিক্যাল গিয়ার, পায়ে ভারী বুট। তার চেহারায় আজ কোনো দয়া বা মায়া নেই, আছে কেবল ক্রোধ। ডান হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল, আর বাম হাতে ধরা ওয়াকিটকি। তার পেছনে নিঃশব্দে, সুশৃঙ্খলভাবে পজিশন নিল অন্তত ৩০ জন ব্ল্যাক বক্স কমান্ডো। প্রত্যেকের হাতে লোডেড গান, চোখে লেজার সাইট।

কাবির ওয়াকিটকিতে বলে,

“ অল ইউনিট, এনগেজ। নো প্রিজনার্স। এলিমিনেট এভরি লাস্ট ওয়ান অফ দেম।"

~

গড অফ ইতালির লোকগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কমান্ডোদের রাইফেল গর্জে উঠল। শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর সম্মুখযুদ্ধ। গুদামের ভেতরটা তপ্ত সিসার বৃষ্টিতে ভরে গেল। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, লোহার বিমে লেগে বুলেট ঠিকরে যাচ্ছে। আর্তনাদ আর গুলির শব্দে কান পাতা দায়।

তিথি পাশ ফিরে তাকানোর চেষ্টা করল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। তার পাশেই চেয়ারে বাঁধা প্রমা। প্রমার মাথাটা একপাশে ঝুলে আছে। মারের চোটে সে অনেক আগেই জ্ঞান হারিয়েছে। তার গা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

তিথি অস্ফুট স্বরে, কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,

“প্র... প্রমা! বোন রে, চোখ খোল...।"

কিন্তু প্রমা সাড়া দিল না। তিথির মনে হলো তার পৃথিবীটা থমকে গেছে। সে আবার সামনের দিকে তাকাল। কাবির তখন বাঘের মতো লড়ছে। একটা পিলারের আড়ালে কভার নিয়ে সে একে একে লোকগুলোকে খতম করছে। তার প্রতিটি গুলি সঠিক নিশানায় লাগছে। তার চোখেমুখে এখন কেবল প্রতিশোধের আগুন।

তিথির চেতনা আবার হারাতে শুরু করল। সে আর চোখ ধরে রাখতে পারল না।

(২)

ময়মনসিংহের সেই পরিত্যক্ত গুদাম এখন ধ্বংসস্তূপ। বারুদের গন্ধ আর ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়ে আছে। কাবিরের কমান্ডোরা পুরো এলাকা তছনছ করে ফেলল, কিন্তু গড অফ ইতালির কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। এই মাফিয়া নেতা বুঝতে পেরেছিল যে কাবির তার লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলেছে, তাই সংঘর্ষ শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই সে গোপন সুড়ঙ্গ পথে পালিয়ে যায়।

কাবির দাঁতে দাঁত চেপে গুদামের ভেতরটা একবার দেখে নিল। তার চোখ এখন কেবল তিথি আর প্রমাকে খুঁজছে।

প্রমাকে পাওয়া গেল একটা কোণায় নিথর অবস্থায়। তার শ্বাস চলছে কিন্তু শরীরটা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সাদা হয়ে গেছে। কাবির নিজের আবেগকে পাথর চাপা দিয়ে প্রমাকে কোলে তুলে নিল। ঝড়ের বেগে গুদাম থেকে বেরিয়ে এসে সে তার কালো জিপের পেছনের সিটে প্রমাকে শুইয়ে দিল।

“ডাক্তার! কাম ফার্স্ট!ট্রিটমেন্ট স্টার্ট করুন।"

দলের সাথে থাকা প্যারামেডিক ডাক্তার দ্রুত এগিয়ে এলেন। তিনি জিপের ভেতরেই প্রমার প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করলেন। প্রমার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে ডাক্তার বললেন,

"স্যার, ওর অবস্থা ক্রিটিক্যাল। এখনই প্রপার ট্রিটমেন্ট না পেলে ইন্টারনাল হ্যামারেজ হতে পারে।"

কাবির অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।

"রানা, তুমি ওকে নিয়ে এখনই আমাদের সেফ হাউসের ক্লিনিকে রওনা হও। কোনো ভুল যেন না হয়!"

রানা জিপ নিয়ে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল। এবার কাবিরের মনে পড়ল তিথির কথা। ওই মেয়েটাকেও তো সে একটু আগে পিলারের কাছে দেখেছিল। প্রমাকে বাঁচাতে গিয়ে তিথিকে সে এক মুহূর্তের জন্য আড়ালে রেখেছিল।

কাবির দ্রুতপায়ে আবার গুদামের ভেতর ঢুকল। যেখানে তিথিকে শেষবার দেখেছিল, সেই পিলারের গোড়ায় এখন শুধু ছিঁড়ে পড়ে থাকা তিথির ওড়নার একটা অংশ আর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা আইসক্রিমের সেই লাল কাঠিটা পড়ে আছে—যা তিথি স্কুল থেকে হাতে করে নিয়ে এসেছিল।

কিন্তু তিথি নেই!

“তিথি! তিথি কোথায়? শাট আপ এভরিওয়ান! সার্চ এভরি কর্নার!"

কমান্ডোরা পাগলের মতো গুদামের আনাচে-কানাচে খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও তিথির চিহ্ন নেই। কাবিরের মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, গড অফ ইতালি একা পালায়নি। সে যাওয়ার সময় তার শেষ চাল হিসেবে তিথিকে সাথে নিয়ে গেছে।

ওয়াকিটকিতে একটা কর্কশ শব্দ শোনা গেল। ইন্টারসেপ্ট করা সিগন্যাল থেকে গড অফ ইতালির কণ্ঠ ভেসে এল।

"কী কাবির? বোনকে তো বাঁচালে, কিন্তু তোমার সেই ডানপিটে মেয়েটাকে তো আমার সাথে নিয়ে গেলাম। মেয়েটা পারলে আমার কাছ থেকে বাঁচিয়ে দেখাও!"

কথাটা শেষ হতেই সিগন্যাল কেটে গেল। কাবির হাতের ওয়াকিটকিটা পাথরের উপর আছাড় মেরে ভেঙে চুরমার করে দিল। তার চোখের মণি এখন রক্তবর্ণ। সে জানত না তিথিকে সে কতটা নিজের করে নিয়েছে, কিন্তু আজ তাকে হারানোর ভয়ে তার ভেতরের ব্ল্যাক বক্স এজেন্ট নয়, বরং একজন পাগল প্রেমিক জেগে উঠল।

“তুই ভুল করেছিস। তিথিকে হাত দিয়ে তুই তোর নিজের চিতার আগুন জ্বালিয়েছিস। তোকে আমি ইতালির মাটিতেই দাফন করবো!"

ময়মনসিংহের সেই জনমানবহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে কাবির আজ শপথ নিল—হয় তিথি ফিরবে, নয়তো গড অফ ইতালির পুরো সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে।

(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন