ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

২৬তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট২৬

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

ময়মনসিংহের সেই কালরাত্রির পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ কয়েকটি মাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন সেপ্টেম্বর মাস চলছে। প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া থাকলেও অরণ্য কুটিরের প্রতিটি ইটে আজ কেবল হাহাকার আর নিস্তব্ধতা।

ভোর ছয়টা। কুয়াশার পাতলা চাদর তখনও পুরোপুরি সরেনি। অরণ্য কুটিরের সদর দরজায় এসে থামল পুলিশের একটি জিপ। গাড়ি থেকে নামল এক দীর্ঘদেহী যুবক। পরনে পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের নেভি ব্লু ইউনিফর্ম, কাঁধে কমান্ডারের র‍্যাঙ্ক। ব্ল্যাক বক্সের কাবির আর আজকের এই কাবিরের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ।

ইতালির সেই অন্ধকার জগত, সেই ব্ল্যাক বক্সের দাপট—সব ছেড়ে দিয়েছে সে। তিথিকে হারিয়ে ফেলার পর সে বুঝতে পেরেছে, তার আসল জায়গা এই দেশের মাটিতে, যেখানে তিথির স্মৃতিগুলো মিশে আছে। এখন সে ময়মনসিংহ পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার। কর্মস্থল বাড়ি থেকে দুই ঘণ্টার পথ হলেও, গত এক মাসে সে একবারও বাড়ি ফেরেনি। আজ কেন যেন আর পারল না।

ভেতরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোবালি আর একাকীত্বের গন্ধ তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কাবিরের চোখ দুটো লাল, ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় চোখের নিচে কালি জমেছে। সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তার গন্তব্য নিজের ঘর নয়, বরং সেই ঘরটি—যেখানে এক মাস আগে শেষবার একটি চঞ্চল কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল।

নিজের ঘরের দরজার সামনে আসতেই কাবিরের

কানে বেজে উঠল,

“এই যে শুনছেন? এত দেরি করলেন কেন? আমি কিন্তু ভীষণ রাগ করেছি!”

কাবির চমকে উঠল। হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল তার। তিথি? সে কি ফিরে এসেছে? সে দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকল। কিন্তু না, ঘরটা ফাঁকা। জানলার পর্দাটা বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে মাত্র। শূন্য ঘরে কেবল নিজের হ্যালুসিনেশন ছাড়া আর কিছুই নেই।

কাবিরের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তার সেই শক্তপোক্ত কমান্ডো সত্তাটা আজ ভেঙে চুরমার। ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই সে বিছানার এক কোণে ধপ করে বসে পড়ল। তার কাঁপা হাতের মুঠোয় ধরা সেই লাল শাড়িটা—যা সেই রাতে তিথির পরনে ছিল।

শাড়িটা নাকে চেপে ধরল কাবির। এখনও যেন তাতে তিথির সেই প্রিয় পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ লেগে আছে। হঠাৎ তার পাথরের মতো কঠিন চোখ দুটো ভিজে উঠল। দু ফোঁটা তপ্ত অশ্রু টপ টপ করে শাড়িটার ওপর আছড়ে পড়ল।

“আমি আসছি তিথি... আমি খুব কাছে পৌঁছে গেছি। ময়মনসিংহ থেকে ইতালি—যেখানেই তোমাকে লুকিয়ে রাখুক না কেন, তোমাকে আমি ফিরিয়ে আনবই। এই ইউনিফর্মের শপথ, তোমাকে ছাড়া এই কাবির আর যাই হোক, ভালো নেই পাগলী... একদম ভালো নেই।"

পুরো বাড়িটা আবার নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। শুধু দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল, যেন জানান দিচ্ছে—অপেক্ষাটা এখনও শেষ হয়নি।

~~~

সময় এখন দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট। বাইরের রোদটা আজ বড্ড কড়া, কিন্তু অরণ্য কুটিরের অন্দরমহলে এক হিমশীতল শূন্যতা বিরাজ করছে। গত এক মাসের ক্লান্তি আর নির্ঘুম রাতগুলোর ধকল সইতে না পেরে কাবির বিছানার এক কোণে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত শরীরে ইউনিফর্মটা বদলানোর শক্তিটুকুও যেন ছিল না তার। ক্লান্তিতে ঘরের দরজাটা পর্যন্ত লক করতে ভুলে গেছে সে।

সারা ইয়াসমিন ছেলের ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন। ঘরের ভেতরটা স্তব্ধ। তিনি ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে দেখলেন, তার সিংহ মতো গর্জে ওঠা ছেলেটা আজ ওই লাল শাড়িটা আঁকড়ে ধরে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। ছেলের এই বিধ্বস্ত চেহারা দেখে সারা ইয়াসমিনের কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি নিঃশব্দে বিছানার পাশে বসেছে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

মায়ের হাতের স্পর্শ পেতেই কাবির ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে উঠল।

“তিথি... বিবিজান? তুমি এসেছ? প্লিজ আর যেও না... প্লিজ থেকে যাও। আমি আর তোমাকে কোনো কষ্ট দেব না। দেখো, তোমার প্রিয় লাল শাড়িটা আমি কত যত্ন করে রেখেছি... প্লিজ থেকো...।"

ছেলের এমন আর্তনাদ শুনে সারা ইয়াসমিনের চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। এই মেয়েটাকে তিনি নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছিলেন। আল্লাহ্‌র কাছে হাজারবার হাত পেতেছেন মেয়েটার জন্য। তিনি মনে মনে ভাবলেন,

"হে আল্লাহ, তুমি কি তবে আমার ছেলেটাকে কঠিন কোনো পরীক্ষায় ফেলছ?"

হঠাৎ হাতের ওপর গরম পানির স্পর্শ পেয়ে কাবির ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। সামনে মাকে বসে কাঁদতে দেখে তার হুশ ফিরলো। দ্রুত উঠে বসে মায়ের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,

"আম্মু? তুমি কাঁদছ কেন? প্লিজ কেঁদো না। আমি কথা দিচ্ছি আম্মু, আমি ঠিক তিথিকে খুঁজে বের করব। তুমি শুধু আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করো।"

সারা ইয়াসমিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

"দোয়া তো করছি রে বাবা। তবে তোকে শক্ত থাকতে হবে। আমার মায়ের মন বলছে—আমার তিথি মা যেখানেই থাকুক, ভালো আছে। আমার মন কখোনো ভুল বলে না।"

"তাই যেন হয় আম্মু। ওর ভালো থাকাটাই এখন আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল।"

"আচ্ছা এবার ওঠ। আজ তোর জন্মদিন, সেটা কি ভুলে গেলি? যা,গোসল সেরে আয়। তোর আব্বুকে বলছি ওয়েট করতে, আজ দুপুরে কিন্তু আমরা সবাই একসাথে খাব।"

কাবিরের আজ কিছুই ভালো লাগছে না, তবুও মায়ের কথা ফেলল না। সে উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে যাওয়ার আগে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

"আম্মু, প্রমাকে বলো তো একবার আমার ঘরে আসতে? ওর সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।"

সারা ইয়াসমিন মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কাবির আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেই চিনতে পারছে না

সে। চোখের মণি লাল, গাল ভেঙে বসে গেছে।

°°°°°°°

গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে ঘরে ফিরতেই কাবিরের বুকটা ধক করে উঠল। দেখল প্রমা বিছানার এক কোণে মুখটা মলিন করে বসে আছে। কাবিরকে দেখে সে তাকালেও তার চোখেমুখে একরাশ অপরাধবোধ।

কাবির তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল,

"কী হয়েছে বোন? ওভাবে মুখ ভার করে বসে আছিস কেন?"

কাবিরের কথা শেষ হতেই প্রমা হু হু করে কেঁদে দিল। বড় ভাইয়ের কাছে এসে ভাঙা গলায় বলল,

"ভাইয়া, সব আমার দোষ। আমরা যদি সেইদিন লোকটার কাছে না যেতাম, তাহলে আমাদের জীবনটা এমন হতো না। তিথি আজ আমাদের সাথেই থাকত।"

কাবির বোনের মাথায় হাত রাখল। নিজের বুকের ভেতরটা হাহাকার করলেও বোনকে শান্ত করতে এক চিলতে হাসল।

"দূর পাগলি! ওভাবে বলে না। আল্লাহ হয়তো কপালে এমনটাই লিখে রেখেছিলেন, তাই হয়েছে। তুই একদম কান্না করবি না। আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আমি ঠিক ওকে ফিরিয়ে আনব।"

প্রমা চোখের জল মুছে একটু হেসেই ফেলল। টিপ্পনী কেটে বলল,

"ভাইয়া, তুমি তো দেখি একদম পাগল হয়ে গেছো! তোমাকে দেখলে এখন যে কেউ বলবে—ছেলেটা বড়সড় ছ্যাঁকা খেয়েছে!"

"হ্যাঁ রে, অনেক বড় ছ্যাঁকা। যেটা সাধারণ মানুষ সহ্য করতে পারে না, আমি সেটাই বয়ে বেড়াচ্ছি।"

প্রমা এবার মুচকি হেসে একটা গিফট বক্স বের করল। তিথি নিখোঁজ হওয়ার আগে কাবিরের জন্মদিনের জন্য নিজের হাতে স্পেশাল চকলেট আইসক্রিম বানিয়েছিল। প্রমা সেটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

"ভাইয়া, আজ তো তোমার জন্মদিন। ৬ই সেপ্টেম্বর , তোমার ২৮ বছর পূর্ণ হলো। তিথি তোমার জন্য সেই মার্চ মাসে বানিয়ে ফ্রিজে রেখেছিলো। আর বলেছিল তোমায় সারপ্রাইজ দিবে। এই নাও ওর দেওয়া উপহার।"

কাবির পরম মমতায় বক্সটা হাতে নিল। তিথির ছোঁয়া মেশানো জিনিসটা দেখে তার চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল। বক্সটা খুলে তিথির হাতের কাজ দেখে বলল,

"বউয়ের গিফট তো পেলাম, কিন্তু আমার বোনের গিফট কোথায়?"

প্রমা হেসে উঠল। সে পাশ থেকে একটা বেশ বড় আকারের রুবিক্স কিউব বের করল।

"হুমম, দেব তো! এই নাও ২০০০ পার্টসের এই কিউব। দেখি তো আমার জিনিয়াস ভাইয়া এটা সলভ করতে পারে কি না!"

কাবির কিউবটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। সত্যি তার কিউব খেলা ছোট্ট থেকেই বেশ পছন্দের ছিলো।প্রমার এই কথাটা মনে আছে এইভেবে খুশি হয়ে বলল,

"খুব সুন্দর হয়েছে রে বোন। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।"

প্রমা এবার একটু আমতা-আমতা করে বলল, "ভাইয়া, আমারও একটা জিনিস চাই।"

কাবির হাসল, "কী চাস শুনি?"

প্রমা গাল ফুলিয়ে বলল, "সাদ্দাম ভাইয়া ইদানীং আমাকে এসএমএস করে না, কলও ব্যাক করে না। তোমার ফোনটা যদি একটু দিতে... আমি একটু কথা বলতাম।"

কাবির কোনো কথা না বলে নিজের ফোনটা বোনের হাতে বাড়িয়ে দিল। প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়ে প্রমা একদম নেচে নেচে ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। কাবির একা দাঁড়িয়ে রইল জানলার ধারে। হাতে তিথির বানানো চকলেট আর প্রমার দেওয়া কিউব। রোদ ঝলমলে দুপুরে সে অনুভব করল—তার অন্ধকার জীবনে ভালোবাসার এই ছোট ছোট আলোই তাকে পথ দেখাচ্ছে।

~

নিচে নামতেই কাবির দেখল লিভিং রুমে আলতাফ রহমান বসে আছেন। বাবার গম্ভীর, স্নেহমাখা মুখটা দেখে কাবিরের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা শান্ত হলো। আলতাফ রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, যদিও সে হাসিতে বিষাদ মেশানো ছিল।

"জুম্মার সময় হয়ে এসেছে বাবা। চলো, আজ দুজনে একসাথেই মসজিদে যাই।"

কাবির কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল। সাদা পাঞ্জাবিটা গায়ে জড়িয়ে সে বাবার পাশে এসে দাঁড়াল। দীর্ঘ কতোগুলো মাস পর বাবা-ছেলের এই পথ চলা। রোদের তেজ কিছুটা কমতে শুরু করেছে, কিন্তু চারপাশের বাতাসে কেমন যেন এক থমথমে ভাব। মসজিদের দিকে হাঁটা শুরু করতেই আলতাফ রহমান কাবিরের কাঁধে হাত রাখলেন।

"কাবির, আমি জানি তোর বুকের ভেতরটা এখন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলছে। কিন্তু মনে রাখিস বাবা, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নেন।

হাদিসে এসেছে—আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে তিনি দুঃখ-কষ্টে পতিত করেন (সহিহ বুখারি)।"

কাবির মাথা নিচু করে হাঁটছিল। বাবার কথাগুলো তার কানে সীসার মতো বিঁধছে। আলতাফ রহমান আবার বলতে শুরু করলেন,

"ধৈর্যের পুরস্কার কখনো বৃথা যায় না বাবা। এই যে তুই আজ তিথির জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিস, নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছিস—তোর এই আত্মত্যাগ আল্লাহ দেখছেন।

আল্লাহ বলেছেন,নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে (সূরা ইনশিরাহ)। তুই তোর সাধ্যমতো চেষ্টা করছিস, এখন বাকিটা তাঁর ওপর ছেড়ে দে।"

"আব্বু, আমি কি ওকে আর কখনো ফিরে পাব না? কতোগুলো মাস হয়ে গেল, কোনো ক্লু পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাব।"

"হতাশা শয়তানের কাজ। তুই তো আমার সেই সাহসী ছেলে, যে কখনো হার মানেনি। মনে রাখিস, সবরের ফল হয় অত্যন্ত মিষ্টি। আল্লাহ যখন মানুষকে কোনো কিছু থেকে বঞ্চিত করেন, তখন তার বদলে আরও উত্তম কিছু দেওয়ার জন্যই করেন। তুই শুধু তোর ঈমান আর ধৈর্য ধরে রাখ, ইনশাআল্লাহ কুয়াশা কেটে একদিন সূর্য উঠবেই।"

মসজিদের ভেতর থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল। আলতাফ রহমানের হাত ধরে কাবির মসজিদের সিঁড়িতে পা রাখল। আজ সে শুধু নিজের জন্য নয়, তার সেই অভিমানী বিবিজানের জন্য প্রাণ খুলে দুহাত তুলে প্রার্থনা করবে। মসজিদের শান্ত পরিবেশে এসে কাবিরের মনে হলো, হয়তো সত্যি ধৈর্য ধরলে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

**********

মসজিদের ভেতর পিনপতন নীরবতা। কাবির কাতারবন্দী হয়ে বসে আছে। ইমাম সাহেব মিনারে দাঁড়িয়ে খুতবা শুরু করেছেন। আজ তার আলোচনার বিষয় ছিল—"বিপদে মুমিনের ধৈর্য ও মহান আল্লাহ্‌র কুদরত"।

ইমাম সাহেব বলতে লাগলেন,

"বাবা ইয়াকুব (আঃ) তাঁর সন্তান ইউসুফকে কতটা ভালোবাসতেন, তা আমাদের সবার জানা। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে তাঁর অন্য সন্তানরা যখন ইউসুফকে কূপে ফেলে দিয়ে এল এবং রক্তমাখা জামা দেখিয়ে বলল যে ইউসুফকে নেকড়ে খেয়ে ফেলেছে, তখন সেই বৃদ্ধ বাবার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল? তিনি জানতেন না তাঁর কলিজার টুকরো কোথায় আছে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। সন্তানের শোকে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর তিনি বিচ্ছেদের আগুনে পুড়েছেন। কিন্তু একবারের জন্যও তিনি আল্লাহ্‌র ওপর আস্থা হারাননি। তিনি কেবল বলতেন,ফাসবরুন জামিল —অর্থাৎ, উত্তম ধৈর্যই আমার একমাত্র অবলম্বন।"

কাবিরের মনে হলো, ইমাম সাহেব যেন আজ কেবল তাকে শোনানোর জন্যই এই কথাগুলো বলছেন। ৪০ বছর! যেখানে কাবির মাত্র এক মাসেই পাগলপ্রায় হয়ে যাচ্ছে। ইমাম সাহেব আরও বললেন,

"৪০ বছর পর আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ (আঃ)-কে শুধু ফিরিয়েই দেননি, বরং তাঁকে মিশরের অধিপতি বানিয়ে সসম্মানে বাবার বুকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ্‌র পরিকল্পনা মানুষের চিন্তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ধৈর্য ধরলে আল্লাহ শুধু হারিয়ে যাওয়া জিনিসই ফিরিয়ে দেন না, বরং তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করেন।"

খুতবা শেষে যখন মোনাজাত শুরু হলো, কাবির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুই হাত তুলে অঝোরে কাঁদতে লাগল সে। তার ভেতরে থাকা সেই কঠিন কমান্ডোর দেয়ালটা আজ ধসে পড়েছে। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

"হে আল্লাহ, আমি তো সাধারণ এক মানুষ। আমার ধৈর্য তো নবীদের মতো নয়। কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনার ওপর অটুট। আপনি যেমন ইউসুফকে তাঁর বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি আমার তিথিকেও আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। আমি আর পারছি না আল্লাহ, আমি আর পারছি না।"

মোনাজাত শেষ করে যখন কাবির চোখ মুছল, তখন তার মনে হলো এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। বাবার বলা কথাগুলো আর খুতবার সেই কাহিনী তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দিল। সে বুঝতে পারল, ভেঙে পড়লে চলবে না। তিথিকে খুঁজে বের করার জন্য তাকে পাথরের মতো শক্ত হতে হবে।

মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় কাবিরের চেহারায় সেই অস্থিরতা আর নেই, বরং সেখানে যুক্ত হয়েছে এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

★

একদিন শুক্রবারে। সময় দুপুর ২টা। রোদটা জানালার ভাঙা ফাঁক দিয়ে এসে ঠিক মেঝের ওপর পড়েছে। পানিহাতা গ্রামের সেই জরাজীর্ণ মাটির ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা। হঠাত ই কাঠের পুরনো খাটে শুয়ে থাকা মেয়েটি নড়েচড়ে উঠল। দীর্ঘ কয়েক মাস পর আজ সে পূর্ণ জ্ঞান ফিরে পেয়েছে।

তিথি ধীরে ধীরে চোখ মেলল। মাথার ব্যান্ডেজ আর শরীরে কালশিটে দাগগুলো এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সে দেখল, তামাটে রঙের একটা মেয়ে তার খাটের পাশেই মেঝের কোণে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। তিথি খুব কষ্টে উঠে বসার চেষ্টা করল। তার পুরো শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে।

নামাজ শেষ করে জিম যখন সালাম ফেরাল, তখন দেখল তিথি বড় বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। জিম আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল।

"আম্মা! ও আম্মা! দেইখা যান, আমাগো নূর কথা কইতে চায়!"

রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন রোজিনা বানু। পেছনে দশ বছরের ছোট ছেলে সাইফ। তিথি ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্মৃতি থেকে সব মুছে গেছে। সে কিছুই চিনতে পারছে না।

"আপনারা... আপনারা কারা? এইমাত্র ও (জিম) কী করল? কী পড়ল ওটা?"

রোজিনা বানু তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বললেন, "মাগো, ও শোকরানা নামাজ পড়ল। আল্লাহ তোমারে আমাগো উসিলায় আজরাইলের হাত থেইকা বাঁচাইয়া ফিরাই আনছে, তাই আল্লার কাছে মাথা নত করল।"

তিথি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রোজিনা বানু জানতেন ডাক্তার আগেই বলে দিয়েছেন—মেয়েটির স্মৃতিশক্তি হয়তো থাকবে না। তাই তিনি মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন, এই মেয়েটিকেই তিনি নিজের মেয়ের পরিচয় দেবেন যাতে বাইরের কেউ তাকে নিয়ে কোনো কথা বলতে না পারে।

"আমি তোর আম্মা লাগি মা। এই যে জিম, ও তোর বড় বইন। আর এই ছোটটা তোর ভাই সাইফ। তোর নাম হইলো মেহজাবীন নূর। বুঝছো?"

"হ নূর! তুমি সুস্থ হইছো দেইখা আমরা মেলা খুশি। তুমি কিচ্ছু চিন্তা কইরো না।"

তিথি যেন নিজের মনেই নামটা আওড়াল।

"মেহজাবীন নূর... আমার নাম নূর। তুমি আমার বইন, আপনি আমার আম্মা আর ও আমার ছোট ভাই?"

রোজিনা বানু মৃদু হাসলেন। তিথি তার পরিবারের পরিচয়টি খুব সহজেই গ্রহণ করে নিল। তিথি তাদের মতোই সহজ-সরল গ্রাম্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করল।

রোজিনা বানুর স্বামী আমজাদ মিয়া দিনে মজুরের কাজ করেন। এতো গুলো মাসে পাঁচশ কি হাজার টাকা বাঁচিয়ে তিনি তিথির চিকিৎসা করিয়েছেন। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে নূরকে (তিথি) ফিরে পাওয়া যেন এক বিরাট নেয়ামত।

(চলবে…)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন