#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট২৭
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
দুপুর ৩টা। জরাজীর্ণ মাটির ঘরের দাওয়ায় পাটি বিছিয়ে সবাই খেতে বসেছে। তিথি একপাশে দুপা ছড়িয়ে বসতেই জিম তাকে আলতো করে টেনে ঠিক করে বসিয়ে দিল।
"নূর, তুমি এমনে বইসো না। আমাদের নবী (সা.) এমনে বইতে নিষেধ করছে। তিনি কেমনে বসতো জানো?"
তিথি বড় বড় চোখ করে তাকাল। জিম বলতে লাগল, "রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি হেলান দিয়ে ভোজন করি না।' (সহিহ বুখারি)। তিনি সাধারণত এক হাঁটু খাড়া করে অথবা দুই হাঁটু পেতে বসতেন। এইটাই সুন্নাত।"
তিথি মাথা নেড়ে বলল, "উনার নাম কইলে জানি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কইতে হয়, তাই না আপা?"
"হ! যে ব্যক্তি নবীর ওপর একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন। (সহিহ মুসলিম)। এইটাই দরুদের পুরস্কার।"
তিথি ঘরের ভেতরটা দেখল। মাত্র দুটা ভাঙা খাট আর কোণায় কয়েকটা হাড়ি-পাতিল। এটাই এদের পৃথিবী। এমন সময় আমজাদ মিয়া ক্ষেত থেকে কাজ সেরে ফিরলেন। তিথি তড়িঘড়ি করে উঠে গিয়ে তাকে সালাম দিল।
"আসসালামু আলাইকুম আব্বা। কেমন আছোইন? এই নেন শরবতটা খাইয়া একটু ঠান্ডা হোন।"
আমজাদ মিয়া চোখে পানি নিয়ে শরবতের গ্লাসটা ধরলেন। বললেন, "আলহামদুলিল্লাহ মা, আমি ভালা আছি। তোমারে সুস্থ দেইখা আমি মেলা খুশি হইছি। তোমারে যখন রাস্তার থাইকা রক্তমাখা অবস্থায়..."
রোজিনা বানু পাশ থেকে কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আজ জোহরের নামাজ পড়ছোইন?"
আমজাদ মিয়া হাসিমুখে বললেন, "হ পড়ছি। তোমরা সবাই পড়ছো তো?" তিথি মাথা নেড়ে সায় দিল।
সবাই পাটিতে বসেছে। পাতে পান্তা ভাত আর তার সাথে মচমচে করে ভাজা লাল পেঁয়াজ। ভাজা পেঁয়াজের সুঘ্রাণে তিথির জিভে জল চলে এল। জিম তার মাথার ওড়নাটা ঠিক করে বলল, "নূর, খাওয়ার আগে দোয়া পইড়া লও।"
"বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারাকাতিল্লাহ।" ( অর্থ-আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর বরকতের ওপর ভরসা করে শুরু করছি।)
তিথি দোয়া পড়ে এক দলা ভাতের সাথে এক টুকরো পেঁয়াজ ভাজা মুখে দিল। পেঁয়াজ ভাজাটা বেশ স্বাদ হয়েছে। জিম তখন মুচকি হেসে বলল, "নূর, পেঁয়াজ খাওন জায়েজ কিন্তু কাঁচা পেঁয়াজ খাইয়া মসজিদে যাওয়া ঠিক না।
নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই গাছ (পেঁয়াজ বা রসুন) থেকে কিছু খায়, সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে।' (সহিহ বুখারি)।
কারণ এর গন্ধে অন্যদের কষ্ট হতে পারে। তবে রান্না করা বা ভালো করে ভাজা পেঁয়াজে সেই সমস্যা নেই।"
তিথি মন দিয়ে কথাগুলো শুনল। পান্তা ভাতে মাখানো পেঁয়াজ ভাজাটা চিবোতে চিবোতে সে আমজাদ মিয়ার দিকে তাকাল। তার মেলা মায়া লাগছে এই মানুষটার জন্য।
"আব্বা, আপনার মেলা কষ্ট হয়। আমি কাল থাইকা আপনার লগে কামে যামু।"
জিম গম্ভীর হয়ে বলল, "নূর, আমরা মেয়া মানুষ। পর্দার ভেতরে থাকাই আমাদের জন্য ফরজ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, তোমরা তোমাদের গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থান করো।' (সূরা আহজাব: ৩৩)। পরপুরুষের সাথে অবাধে মেলামেশা করা বা বাইরে গিয়ে কাজ করা শরীয়তে কঠিনভাবে নিষেধ করা হইছে।"
তিথি জিমের কথাগুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনল। পাশে বসে থাকা ছোট ভাই সাইফ তাকে আগে শিখিয়েছিল একটা কথা। তিথি মুচকি হেসে বলল, "জাযাকাল্লাহু খাইরান আপা!" (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।)
একজন ছেলেকে বলতে হয় *জাযাকাল্লাহু খইরন।*
একজন মেয়েকে বলতে হয় *জাযাকিল্লাহু খইরন।*
একাধিক জনকে বলতে হয় *জাযাকুমুল্লাহ খইরন।*
খাওয়া শেষ করে তিথি বাম হাতে পানির গ্লাসটা নিতে গেল। জিম সাথে সাথে তার হাত চেপে ধরল।
"নূর! খবরদার, বাম হাতে খাইয়ো না। নবীজি (সা.) বলছেন, তোমরা বাম হাতে আহার করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে আহার করে।' (সহিহ মুসলিম)।"
তিথি লজ্জিত হয়ে ডান হাতে গ্লাসটা নিল। পানি খেয়ে সে এক গভীর তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। স্মৃতি না থাকলেও এই দরিদ্র পরিবারের ভালোবাসা আর ইসলামের এই ছোট ছোট শিক্ষা তাকে এক নতুন শান্তির সন্ধান দিচ্ছে। সে জানে না তার আসল পরিচয়, কিন্তু নূর নামটা তার এখন খুব আপন মনে হচ্ছে।
~
সময় এখন বিকেল ৪টা। রোদের তেজ কমে আসায় পাহাড়ঘেরা পানিহাতা গ্রামে হালকা শীতল বাতাস বইছে। রোজিনা বানু মাটির চুলায় রাতের রান্না বসায়। পাহাড় থেকে তুলে আনা পালঙ শাক, ছোট মাস ভাজি রান্না শেষে ভাত বসান। আজ চেয়ারম্যান বাড়িতে গ্রামের নারীদের জন্য বড় একটা তালিমের আসর বসবে, সেখানে রোজিনা আর জিম প্রতি সপ্তাহেই যান।
আসরের নামাজ শেষ করে জিম তার পুরনো আলমারি থেকে কালো বোরকা, হিজাব আর নিকাব বের করে পরে নিল। সাইফ তখন উঠানে একটা টায়ার নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। পানিহাতা গ্রামের এই বাড়িটি অতি সাধারণ হলেও এর পরিপাটি ভাবটা চোখে পড়ার মতো। মাটির দেয়াল, ওপরে টিনের চালা, আর বাড়ির সীমানা ঘিরে রাখা হয়েছে চটের বস্তা দিয়ে দেওয়া লম্বা এক বেড়া দিয়ে। মাঝখানে বিশাল এক উঠান, যেখানে বিকেলের নরম আলো লুটিয়ে আছে।
তিথি জিমকে তৈরি হতে দেখে তার পিছু পিছু যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। জিম থমকে দাঁড়িয়ে নূরের (তিথি) দিকে তাকিয়ে বলল,
"নূর, আমাগো লগে চেয়ারম্যান বাড়ি তালিমে যাইতে চাইলে যাও, তবে ঘরে গিয়া আম্মার বোরকা, হিজাব আর নিকাব পইরা আইসো।"
তিথি নিজের সুতির জামাটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, "কেন আপা? এই সুন্দর জামাটা পইরাই তো তোমার লগে যাওয়া যায়। ওইসব ভারী কাপড় আবার পরাম কেন?"
"নূর, শোনো। পরপুরুষের নজর বিষাক্ত তীরের মতো। নবীজি (সা.) বলেছেন, নারী হলো গোপন বস্তু, যখন সে ঘর থেকে বের হয়, শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় করে দেখায়।(তিরমিজি)।
আর আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন মুমিন নারীরা যেন তাদের রূপ ঢেকে রাখে।"
জিম আরও যোগ করল, "নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, যে নারী সুগন্ধি মেখে পরপুরুষের পাশ দিয়ে যায় যাতে তারা তার ঘ্রাণ পায়, সে নারী ব্যভিচারিণীর মতো।(নাসায়ি)।
এই পর্দার মাঝেই আমগোর সম্মান আর নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে রে বোন।"
তিথি জিমের কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, বাইরের জগতের পুরুষদের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে এই পর্দা কতটা জরুরি। সে ভদ্র মেয়ের মতো ঘরের ভেতর গিয়ে রোজিনা বানুর রাখা একটা বোরকা আর নিকাব পরে নিল।
যখন সে নিজেকে পূর্ণ পর্দার আড়ালে ঢেকে উঠানে এসে দাঁড়াল, রোজিনা বানু তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন,
"মা-শা-আল্লাহ! আমার নূর মাজানরে আজকে একদম জান্নাতের হুর মনে হইতাছে। পর্দার ভিতরেই নারীর আসল রূপ ফুইটা ওঠে মা।"
পাশ থেকে সাইফ খিলখিল করে হেসে উঠল। সে তার নূর আপার দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেঙিয়ে বলল,
"ধুর! নূর আপারে তো একদম পেত্নী পেত্নী লাগতাছে! কুচকুচে কালো পেত্নী একটা!"
তিথি হাহা করে হেসে ফেলল। সাইফের এই দুষ্টুমি আর জিমের শাসন সব মিলিয়ে এই অভাবের সংসারেও সে এক অদ্ভুত শান্তির দেখা পাচ্ছে।
*****
রোজিনা বানু ভাতের হাঁড়িটা চুলা থেকে নামিয়ে ঘরের শিকল টেনে তালা ঝুলালেন। এরপর সাইফ, জিম আর তিথিকে (নূর) নিয়ে হাঁটা ধরলেন চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সরু মেঠো পথ। দুপাশে সবুজ মাঠ, মাঝে মাঝে দু-একটা মাটির ঘর আর বাঁশঝাড়। বিকেলের আলোয় প্রকৃতিটা বড্ড শান্ত মনে হচ্ছে।
তিথি তার নতুন পরিচয়ে এই প্রথম বাইরের জগত দেখছে। বোরকা আর নিকাব পরে থাকায় তার কেবল চোখ দুটো খোলা। উত্তেজনায় সে অনবরত বকবক করে যাচ্ছে। পাহাড় দেখে সে একবার অবাক হচ্ছে, তো মাঠের গরু দেখে আরেকবার জিমকে ডেকে প্রশ্ন করছে। কথা বলতে বলতে সে একসময় বেশ জোরে হেসে উঠল এবং চড়া গলায় জিমকে কিছু একটা বলতে চাইল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাস্তার মোড়ে এক গাছতলায় বসে থাকা কয়েকজন বখাটে যুবক নড়েচড়ে বসল। তারা কৌতূহলী এবং কিছুটা অভদ্র দৃষ্টিতে তিথির দিকে তাকাল। জিম দ্রুত তিথির আরও কাছে সরে এল এবং তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। জিম ইশারায় তিথিকে চুপ থাকতে বলে দ্রুত কদম বাড়িয়ে বখাটেদের এলাকাটা পার হয়ে এল।
একটু নিরিবিলি জায়গায় আসতেই জিম তিথির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল।
"নূর! তোমারে না কইলাম পর্দার ভেতরে থাকতে? শুধু শরীর ঢাকলেই পর্দা হয় না রে বোন, গলার স্বরটাও পর্দার ভেতরে রাখতে হয়। ওই যে লোকগুলা বসা ছিল, তোমার গলার আওয়াজ শুইনা ওরা কেমন কু-নজরে তাকাইলো দেখছো?"
তিথি অবাক হয়ে বলল, "আপা, কথা বলাতেও পর্দা আছে নাকি?"
"হ নূর, অবশ্যই আছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, হে নবী-পত্নীগণ... তোমরা পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে সে লালায়িত হয়। (সূরা আহজাব: ৩২)।
এর মানে হইলো, বাইরের মানুষের সামনে গলার আওয়াজ নিচু রাখতে হয়, যাতে কোনো খারাপ মানুষের মনে কুমতলব না জাগে।"
"নবীজি (সা.) বলেছেন যে, নারীর কণ্ঠস্বরও ফিতনার কারণ হইতে পারে যদি তা বিনা প্রয়োজনে পরপুরুষের কানে যায়। তাই পরপুরুষের সামনে দরকার ছাড়া কথা না বলাই ভালো, আর বললেও খুব সংক্ষেপে আর গম্ভীরভাবে বলতে হয়। তুমি যেমনে খুশিতে চিল্লাইয়া উঠছিলা, ওইটা ঠিক হয় না।"
তিথি মাথা নিচু করল। তার মনে হলো সে এক নতুন পৃথিবী আবিষ্কার করছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের সম্মান রক্ষার ঢাল রয়েছে। সে মনে মনে জাযাকিল্লাহু খইরন বলে নিজেকে সামলে নিল।
পেছন থেকে সাইফ বলে উঠল,
"নূর আপা, এবার বুঝছো? পেত্নীদের মতো চিল্লাইলে সবাই ডরাইবো!"
তিথি এবার আর শব্দ করে হাসল না, শুধু চোখের কোণে একটু হাসি নিয়ে চুপচাপ হাঁটতে লাগল।
★
চেয়ারম্যান বাড়ির সদর দরজায় আসতেই তিথি থমকে দাঁড়াল। পুরো গ্রাম যখন মাটির ঘর আর টিনের চালে ঢাকা, তখন এই বাড়িটি একদম আলাদা। বিশাল রাজকীয় এক দালান, সামনে কারুকাজ করা গেট। তিথি খুব মনোযোগ দিয়ে বাড়িটা দেখল।
মজলিসের ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল গ্রামের অনেক নারী ইতোমধ্যেই সেখানে ভিড় করেছেন। জিম আর রোজিনা বানু ঢোকা মাত্রই চারদিক থেকে গুঞ্জন উঠল। সবাই সবার কুশল বিনিময় শুরু করল। কে কেমন আছে, কার বাড়ির হাঁস-মুরগি কটা ডিম দিল—সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট এক পরিবেশ।
কথা বলতে বলতে যখন তিথির (নূর) পালা এল, তখন সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তার দিকে। গ্রামের একজন বয়স্কা নারী জিজ্ঞেস করলেন,
"ও রোজিনা, এই মেয়াডা কে রে? আগে তো দেহি নাই।"
"ও আমার মাইয়া নূর। মেহজাবীন নূর। এতোদিন দূরে এক আত্মীয়র বাসায় ছিল, অহন থাইকা আমাগো লগেই থাকবো।"
রোজিনা বানুর কথা শুনে মজলিসের দুই-তিনজন তরুণী নূরের সাথে কথা বলতে এগিয়ে এল। তারা জানতে চাইল সে কোথায় ছিল বা তার দিনকাল কেমন কাটছে। জিমের সেই উপদেশের কথা তিথির মাথায় গেঁথে গেছে। সে ভাবল, গলার স্বর পর্দার ভেতরে রাখতে হবে। তাই সে উত্তর দিতে গিয়ে নিজের কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু করল যে, পাশের মেয়েরা কিছুই শুনতে পেল না।
"জি... ভালো আছি..."
মেয়েরা কান বাড়িয়ে তার মুখের কাছে নিয়ে এল। তবুও কিছু না বুঝে একজন হোহো করে হেসে বলল,
"ওরে আম্মা! তোমার মাইয়ার গলার আওয়াজ তো দেখি পিঁপড়ার মতো! কথা শোনার লাইগা তো পুরা কানই তোমার নিকাবের ভেতরে ঢুকাইয়া দিতে হইবো!"
তিথির এই অতি-সতর্কতা দেখে জিম মনে মনে হাসল, কিন্তু সাইফ দূর থেকে মুখ চেপে হাসছে দেখে তিথি লজ্জায় মাথা নিচু করল।
সবাই যখন তালিমে বসার জন্য নিজেদের নিকাব খুলল, তখন তিথিও হাত বাড়াল নিকাবের ফিতে খুলতে। কিন্তু রোজিনা বানু দ্রুত তার হাত চেপে ধরলেন। তিনি নিচু স্বরে বললেন,
"না মা, তোর নিকাব খোলার দরকার নাই। মুখটা ঢাইকাই রাখ।"
আসলে রোজিনা বানু মনে মনে ভয় পাচ্ছেন, যদি কোনো কারণে তিথির আসল পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায় কিংবা তার এই অতুলনীয় সৌন্দর্য কারো চোখে পড়ার পর কোনো নতুন বিপদের সৃষ্টি হয়।
~~
ইমাম সাহেবের স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন,
"মা আয়েশা (রা.) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু একবার এক কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়ার কারণে মুনাফিকরা তাঁর নামে জঘন্য এক অপবাদ রটিয়ে দিল। তারা বলতে লাগল মা আয়েশা (রা.) নাকি সচ্চরিত্রা নন। ভাবুন একবার, যার পবিত্রতার সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ দেবেন, তাঁকে নিয়ে কত বড় মিথ্যা রটানো হয়েছিল! দীর্ঘ এক মাস তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন। মদিনার ঘরে ঘরে তাঁর নামে কুৎসা রটানো হচ্ছিল, অথচ তিনি ছিলেন একদম নিষ্পাপ।"
ঘটনাটি শুনতে শুনতে তিথির বুকটা ধক করে উঠল। নিকাবের আড়ালে থাকা তার চোখ দুটো আপনাআপনি ভিজে উঠল। যখন ইমাম সাহেবের স্ত্রী বলছিলেন,
"মা আয়েশা (রা.) তাঁর বাবার বাড়িতে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলতেন, হে আল্লাহ! আমি জানি আমি পবিত্র, কিন্তু মানুষ তো আমার কথা বিশ্বাস করছে না। আপনিই আমার হয়ে কথা বলুন।অবশেষে আকাশ থেকে সূরা নূরের ১০টি আয়াত নাজিল হলো, যেখানে আল্লাহ নিজে ঘোষণা করলেন যে আয়েশা (রা.) সম্পূর্ণ পবিত্র এবং যারা এই অপবাদ রটিয়েছে তারা অভিশপ্ত।"
তিথি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের অশ্রুগুলো টপটপ করে গড়িয়ে পড়ে নিকাব ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে কেন কাঁদছে সে নিজেও জানে না।
তিথিকে এভাবে কাঁদতে দেখে জিম আর সাইফ নিজেদের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সাইফ তিথির কোমর দিয়ে একটা চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলল,
"ওরে বাবারে! নূর আপা তো দেহি কানতে কানতে পুরা গাঙ্গ বানাইয়া ফালাইতাছে! এত কান্দন কই থাইকা আসে তোমার?"
জিমও মুচকি হেসে বলল, "হ নূর, তুই তো দেহি একদম নরম মনের মানুষ। নবীর স্ত্রীর কষ্টে আমাগোও খারাপ লাগতাছে, কিন্তু তুই তো দেহি নদী ভাসাইয়া দিবি!"
তারা হাসলেও তিথি কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল চোখ বুজে সেই কষ্টের গভীরতা অনুভব করার চেষ্টা করল।
ইমাম সাহেবের স্ত্রী এবার চশমাটা ঠিক করে সবার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন,
"মা বোনেরা, আয়েশা (রা.)-এর জীবনী থেকে আমরা ধৈর্য শিখলাম। এবার একটু নিজেদের আমলের দিকে তাকাই। নবীজি (সা.) মিরাজের রাতে জাহান্নাম দেখে এসে আফসোস করে বলেছিলেন, আমি জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারীদের দেখেছি।' (সহিহ বুখারি)।"
এই কথা শুনে তিথির কান্নার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। ইমাম সাহেবের স্ত্রী আরও বলতে লাগলেন কেন নারীরা জাহান্নামে বেশি যাবে,
"নবীজি (সা.) এর কারণ হিসেবে দুটি বড় অভ্যাসের কথা বলেছেন। এক—নারীরা স্বামীর অকৃতজ্ঞতা বেশি করে। স্বামী সারাজীবন ভালো করলেও সামান্য একটু ত্রুটি হলে তারা বলে ওঠে, আমি তোমার কাছে কোনোদিন সুখ পেলাম না। আর দুই—নারীরা লানত বা অভিশাপ বেশি দেয় আর গীবত বা পরনিন্দা বেশি করে।"
মজলিসের মহিলারা তখন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন। তিথি মনোযোগ দিয়ে শুনছে প্রতিটি শব্দ। এরপর তিনি নামাজের গুরুত্ব নিয়ে এক সত্য তুলে ধরলেন,
"মনে রাখবেন, কিয়ামতের দিন প্রথম হিসাব হবে নামাজের। নবীজি (সা.) বলেছেন, আমাদের এবং কাফেরদের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ; যে নামাজ ছেড়ে দিল সে কুফরি করল।' (সুনানে তিরমিজি)।
অনেক মা-বোন রান্না আর সংসারের দোহাই দিয়ে নামাজ কাজা করেন। মনে রাখবেন, যেই সংসার আপনাকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, সেই সংসার কিয়ামতে আপনার কোনো কাজে আসবে না।"
তিনি আরও যোগ করলেন, "যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে, রমজানের রোজা রাখবে, নিজের সতীত্ব রক্ষা করবে এবং স্বামীর আনুগত্য করবে—তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করো। (মুসনাদে আহমাদ)।"
তিথি অনুভব করল তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন। তার স্মৃতি নেই ঠিকই, কিন্তু সে বুঝতে পারছে এই নামাজ আর ইমানই তার একমাত্র আশ্রয়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,এই জীবনে সে কখনো এক ওয়াক্ত নামাজও কামাই করবে না।
জিম তখন তিথির কান্নারত চোখের দিকে তাকিয়ে একটু নরম হলো। সে তার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
"নূর, ভয় পাইস না। আমাগো আল্লাহ মেলা দয়ালু। তুই তো অহন থেইকা সব নামাজ পড়বি, আমগো লগে তালিমে আসবি। দেখবি আল্লাহ তোরে জান্নাতের হুর বানাইয়া দিব।"
***********
ইমাম সাহেবের স্ত্রী বললেন, "মা-বোনেরা, আপনারা আমার বাম গালে এই হালকা কালো দাগটা দেখছেন? একটা সময় এই দাগটা অনেক বড় আর গাঢ় ছিল। এই চেহারার জন্য আমি ঠিকমতো মানুষের সামনে যেতে পারতাম না, খুব লজ্জা আর হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু আমি আল্লাহর ওপর ভরসা হারাইনি। আমি জানতাম, আল্লাহ যাকে যেমন দিয়েছেন তার পেছনে কোনো না কোনো কল্যাণ আছে। আল্লাহর রহমতে এখন সেই দাগ অনেকটা মিলিয়ে গেছে। তাই নিজের চেহারা নিয়ে কখনো আফসোস করবেন না।"
এরপর তিনি হাসিমুখে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আচ্ছা, এবার আপনাদের সাপ্তাহিক আমলের কথা বলুন। এই সপ্তাহে কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কী কী বিশেষ কাজ করেছেন?"
মজলিসে বসা নারীরা একে একে তাদের আমলের কথা বলতে শুরু করলেন।
করিমন বিবি গর্বের সাথে বললেন, "আমি এই সপ্তাহে কোনো নামাজ কাজা করিনাই, এমনকি ১০ ওয়াক্ত নফল নামাজ তাহাজ্জুদ ও চাশত পড়ছি।"
হালিমা বেগম লাজুক হেসে বললেন, "আমি এই সপ্তাহে আমার অসুখ স্বামীর অনেক দেখভাল করছি, তাঁর সব কামকাইজে সাহায্য করছি।"
জব্বার মিয়ার স্ত্রী তসবিহ গুনতে গুনতে বললেন, "আমি এই সপ্তাহে ২০ হাজার বার দরুদ শরীফ পাঠ করছি।"
জিম তার নূরের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি এই সপ্তাহে একজন পথহারা মানুষকে দ্বীনি শিক্ষা দিতাছি।"
রোজিনা বানু বিনয়ের সাথে বললেন, "আমি এই সপ্তাহে কুরআন খতম দিছি।"
ছোট্ট সাইফ এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে হাত তুলে বেশ কায়দা করে বলল, "আমিও কমু! আমি এই সপ্তাহে একজনকে 'জাযাকিল্লাহু খইরন' বলা শিখাইছি!"
সাইফের কথা বলার ঢং আর ছোট মুখে বড় কথা শুনে মজলিসের সবাই হোহো করে হেসে উঠল। পুরো ঘরে এক নির্মল আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল।
সবাই যখন হাসাহাসি আর নিজেদের গল্পে মশগুল, তখন তিথি (নূর) খুব নিচু স্বরে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কণ্ঠ এতটাই নিচু ছিল যে কারো কানেই পৌঁছাল না। যখন মজলিসের হইচই একটু কমল, তখন তিথি বেশ সাহস সঞ্চয় করে একটু জোরেই বলল,
"আমি... আমি এই সপ্তাহে অনেক আস্তে আস্তে কথা কওয়া শিখছি। আমার জিম আপা কইছে, পরপুরুষের সামনে গলার আওয়াজ নিচু রাখাটাও একটা আমল। আমি সেটাই পালন করবার চেষ্টা করতাছি।"
তিথির এই কথা শুনে ইমাম সাহেবের স্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন। জিম গর্বে নূরের দিকে তাকিয়ে হাসল। ইমাম সাহেবের স্ত্রী বললেন,
"মা-শা-আল্লাহ! মা, তুমি খুব বড় একটা সুন্নাত আর পর্দার আদব আয়ত্ত করেছ। কণ্ঠস্বরের পর্দা বজায় রাখা মুমিন নারীর ভূষণ।"
মজলিস শেষে সবাই যখন মোনাজাতের জন্য হাত তুলল, তিথি অনুভব করল তার মনের সব অস্থিরতা ধুয়ে মুছে গেছে।
মজলিস শেষ করে সবাই যখন জুতো পরে বাড়ির পথ ধরবে, তখনই মেম্বরের বউ হন্তদন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"ও মা-বোনেরা, একটু খাড়ান! একটা জরুরি কথা আছে। আগামী সোমবার আপনাদের সবার দাওয়াত আমার বাড়িতে। শহর থেইকা বিশেষ মেহমান আইবো আমাগো বাড়িত। আপনারা সবাই আইসা একটু রান্নাবাড়ায় সাহায্য কইরেন আর তালিমও হইবো ঐদিন। কেউ কিন্তু না করবেন না!"
রোজিনা বানু আর জিম মাথা নেড়ে দাওয়াত কবুল করলেন। তিথি কেবল দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত কু ডাকছে, যেন সোমবারের ওই দিনটি তার জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
______________
অন্য দিকে, ময়মনসিংহের অরণ্য কুটিরে নিজের ঘরের অন্ধকার কোণে বসে ল্যাপটপের নীল আলোয় নিমগ্ন হয়ে আছে কাবির।স্ক্রিনে একের পর এক ম্যাপ আর নিখোঁজ ডায়েরির ফাইল ওপেন হচ্ছে। কিবোর্ডে তার আঙ্গুলগুলো চললেও মনটা পড়ে আছে সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতিতে।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে তার বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্টের রানার নাম ভেসে উঠছে। কাবির দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল।
"স্যার,একটা ইম্পর্ট্যান্ট আপডেট আছে। হালুয়াঘাটের বর্ডার এলাকার পানিহাতা গ্রামে হঠাৎ এক রহস্যময়ী মেয়ের দেখা পাওয়া গেছে। গ্রামবাসী তাকে আগে কখনো দেখেনি। যতটুকু জানতে পেরেছি, মেয়েটি এক গরিব পরিবারের সাথে থাকছে। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে মেয়ে ম্যাডাম হতে পারে।"
কাবির সোজা হয়ে বসল।অ্যাসিস্ট্যান্ট আরও বলল,
"আমি হালুয়াঘাটের মেম্বরের বাড়িতে কথা বলে রেখেছি স্যার। আগামী সোমবার মেম্বরের বাড়িতে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ময়মনসিংহ শহর থেকে অফিসাররা যাচ্ছে এর উসিলা দিয়ে আমরা গ্রামটা ভালো করে তদারকি করতে পারব। আমরা পাঁচজন ফোর্স নিয়ে রেডি হচ্ছি, স্যার আপনিও কি আমাদের সাথে যাবেন?"
কাবির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখল আকাশের চাঁদটা আজ বড্ড ম্লান।
"সোমবার... ঠিক আছে। আমি নিজেই যাব। পানিহাতা গ্রামের প্রতিটি কোণ যেন আমার নজরে থাকে। যদি ও আমার তিথি হয়, তবে এই পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি ওকে ওখান থেকে উদ্ধার করে আনব।"
(চলবে...)