#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট২৮
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
সোমবার সকাল। পানিহাতা গ্রামের মেম্বারের উঠানে রান্না করা হচ্ছে, কয়েকটা বড় বড় ডেকচিতে বিরিয়ানি আর মাংসের সুঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে। ঠিক তখনই গ্রামের মেঠো পথে ধুলোর মধ্যে দিয়ে। কালো রঙের দুটি পাজেরো গাড়ি মেম্বার বাড়ির গেটে এসে থামল।
কাবিরের পরনে কালো রঙের শার্ট, চোখে সানগ্লাস ।
হাতের দামি ঘড়িটা রোদে চিকচিক করছে। তার গাম্ভীর্য আর তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে মেম্বার বাড়ির ভলান্টিয়াররা পর্যন্ত তটস্থ হয়ে গেল। রানা সহ আরও চারজন অফিসার তাদের সিভিল ড্রেসে থাকলেও তাদের মধ্যে এক ঠান্ডা ভাব তাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে।এরা সাধারণ পুলিশ নয়, বরং প্রশাসনের এক বিশেষ গোয়েন্দা সেকশন এর তুখোড় টিম। এদের কাজই হলো দেশের হাই-প্রোফাইল নিখোঁজ মামলা এবং আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধ নিয়ে কাজ করা। আর এই টিমের নেতৃত্বে আছেন স্বয়ং কাবির।
কাবির গাড়ি থেকে নেমেই এক গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল। অদ্ভুত এক অনুভূতি! পা রাখতেই তার বুকের বাম পাশটা কেমন হু হু করে উঠল। সে জানে না কেন, তবে তার অবচেতন মন চিৎকার করে বলছে সে এখানেই আছে।
তখনই মেম্বার সাহেব হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন।
"আহেন স্যার, আহেন! আফনাদের জন্যই তো সব আয়োজন। গ্রামডা একবার ঘুরে দেখবেন তো?"
কাবির শান্ত স্বরে বলল, "আগে একটু বসার ব্যবস্থা করুন মেম্বার সাহেব। আমরা এখানকার পরিস্থিতি আগে বুঝতে চাই।"
অন্যদিকে, মেম্বার বাড়ির রান্নাঘরের এক কোণে রোজিনা বানু আর জিম ব্যস্ত হাতে কাজ করছেন। জিম দুই হাতে মুরগি কাটছে আর রোজিনা বানু বড় হাঁড়িতে মশলা কষাচ্ছেন। সাইফ উঠানের এক কোণে একটা লাঠি নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে।
তিথি একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। রোজিনা বানু তাকে কোনো কাজই করতে দিচ্ছেন না।
"নূর মা, তুই ভেতরে গিয়া বোস। আজ মেলা মানুষ আইবো শহর থেইকা, মেলা পুরুষ মানুষের আনাগোনা। তুই সামনে আইস না মা।"
তিথির মন মানছে না। তার ভেতরটা কেমন ছটফট করছে, যেন কোনো অদৃশ্য টান তাকে বাইরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
জিম আর রোজিনা বানুর চোখ ফাঁকি দিয়ে তিথি আস্তে করে রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে এল। তার পরনে কালো বোরকা, কিন্তু নিকাবটা তখনো মুখে তোলা হয়নি। সে উঠানের এক পাশ দিয়ে আসতেই গেটের কাছে জটলা দেখে থমকে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে কাবির।
তিথির বুকটা হঠাৎ করেই ধক করে উঠল। এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ তার মাথার ভেতর খেলে গেল। লোকটার চওড়া পিঠ, তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি সবই কেন যেন বড্ড চেনা! তিথির মনে হলো কেউ যেন তার কলিজাটা খামচে ধরেছে। এক মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে উঠল, অথচ কেন এমন হচ্ছে সে জানে না ।
~~~~
কাবির মেম্বারের সাথে কথা বলছিল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বারবার আশেপাশে ঘুরে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার নজর পড়ল মেঠো পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক কালো বোরকা পরিহিত তরুণীর ওপর। মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ওই দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি।
কাবিরের মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে কি ভুল দেখছে? না কি তার কল্পনা?
"শান্ত হও কাবির। এভাবে তাকালে মানুষ সন্দেহ করবে। এই গ্রামে এমন বোরকা পরা অনেক মেয়ে আছে।"
তিথি নিজের অনুভূতির তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে দ্রুত নিজেকে আড়াল করল। সে মেম্বার সাহেবের পুকুর পাড়ের দিকে লম্বা কদমে হাঁটতে লাগল। তার মনে হচ্ছে ওখানে গেলে হয়তো বুক ফেটে আসা এই কান্নাটা থামবে।
মেম্বার সাহেব কাবিরকে তার বৈঠকখানায় নিয়ে বসালেন।
"স্যার, আপনার টিমরে বলেন একটু বিশ্রাম নিতে। আমি সব দেখতাছি।"
কাবির চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেম্বারের দিকে তাকাল।
"মেম্বার সাহেব, আমাদের আতিথেয়তার চেয়েও বড় একটা উদ্দেশ্য আছে। আমরা শুনেছি আপনার গ্রামে ইদানীং কিছু নতুন লোক আশ্রয় নিয়েছে। বিশেষ করে এমন কেউ, যার পরিচয় রহস্যজনক।"
মেম্বার সাহেবের ভয়ে কপালে সূক্ষ্ম এক বিন্দু ঘাম জমে উঠল। তিনি হেসে বললেন,
"আরে না স্যার! এইখানে সব পরিচিত মানুষ। ওই দু-একজন আত্মীয়র বাসায় আইছে, এই আর কি!"
"আপনার গ্রামে বা আত্মীয়দের তালিকায় কি এমন কোনো মেয়ে আছে। যারা কিছুদিন হলো এই গ্রামে এসেছে বা অতিথি ।"
মেম্বার সাহেব কিছুটা আমতা আমতা করতে লাগলেন। কাবির তখন অনুভব করল, বাতাসের গন্ধে একটা পরিচিত ঘ্রাণ মিশে আছে—যেটা কেবল তার বিবিজানের গা থেকেই আসত। সে জানে,তিথি খুব কাছেই, কিন্তু কোথায় সে।
কাবির উঠে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে পুকুর পাড়ের দিকে তাকাল। দূরে সেই কালো বোরকা পড়া মেয়েটি তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
"মেম্বার সাহেব, চলুন একটু পুকুর পাড়টা ঘুরে দেখি। শরবতের ব্যবস্থা ওখানেই না হয় করবেন।"
(চলবে...)