#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট২৯
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
কাবির পুকুর পাড়ের দিকে পা বাড়াল। তবে তার হাঁটাচলায় এক ধরণের অস্থিরতা। পেছনে মেম্বার সাত্তার মিয়া ঘামতে ঘামতে আসছিলেন, কিন্তু মাঝপথে বাগড়া পড়ল।
ময়মনসিংহের সদর দফতর থেকে ঠিক সেই মুহূর্তেই ১০ জনের আরও একটি বিশাল টিম মেম্বার বাড়িতে প্রবেশ করল। এই টিমের নেতৃত্বে আছেন সিনিয়র অফিসার তামিম। বয়স বছর চল্লিশের কোঠায়, বেশ রাশভারী মানুষ। তবে তামিম সাহেব এখানে তিথির কেসে আসেননি। তিনি এসেছেন হালুয়াঘাট সীমান্তের মাদক পাচার আর ইন্ডিয়া থেকে অবৈধ মালামাল আসার একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তল্লাশি চালাতে।
তামিম সাহেবকে দেখেই মেম্বার সাত্তার মিয়ার কলিজা শুকিয়ে গেল। তিনি কাবিরকে ছেড়ে দ্রুত তামিম সাহেবের দিকে এগিয়ে গেলেন।
"আরে স্যার! আফনেরাও আইয়া পড়ছেন? আহেন আহেন, বসেন। মাদক নিয়া তনতন্য কইরা খুঁজেন স্যার, আমার গ্রামে ঐসব কারবার চলবো না!"
কাবির এই সুযোগটাই নিল। সে মেম্বার আর তামিমের
থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ধীর পায়ে একাই পুকুর পাড়ের দিকে পা বাড়াল। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, ওই হিজল গাছের নিচেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা লুকিয়ে আছে।
******
অন্যদিকে, রান্নার ধোঁয়ায় চোখমুখ লাল করে জিম আর রোজিনা বানু কাজ করে যাচ্ছে। আজ মেম্বার বাড়ি থেকে তাদের বড় এক হাঁড়ি বিরিয়ানি দেওয়ার কথা। অভাবের সংসারে আজ সবাই মিলে একটু ভালো কিছু খেতে পারবে, এই আনন্দেই জিম যেন দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করছে। রোজিনা বানু হঠাৎ খেয়াল করলেন নূর (তিথি) আশেপাশে নেই। তিনি তড়িঘড়ি করে সাইফকে ডাকলেন।
"ও সাইফ! বাবা দেখে তো তোর নূর আপা কই গেল? ঘরের ভেতরে থাকতে কইলাম, মাইয়াডারে দেহি না কেন?"
সাইফ তখন তার লাটিম নিয়ে মহাব্যস্ত। মায়ের ডাক শুনে সে লাটিমটা পকেটে পুরে বলল,
"আইচ্ছা আম্মা, যাইতাছি। আপা নিশ্চয়ই পুকুর পাড়ে গিয়া বইসা রইছে। ওইখানেই তো ওনার যত শখ!"
পুকুর পাড়ের বিশাল এক হিজল গাছের তলায় শান বাঁধানো ঘাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে তিথি। গায়ে সেই পুরনো কালো বোরকা, কিন্তু মাথা থেকে হিজাবটা নিচে পড়ে আছে আর নিকাবটা পাশে মাটির ওপর অবহেলায় পড়ে আছে। তার লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। তিথি তার ফর্সা পা দুটো পুকুরের পানিতে দুলিয়ে দুলিয়ে খেলা করছে। হাতে থাকা ছোট ছোট নুড়ি পাথরগুলো সে আনমনে পানির ওপর ছুঁড়ে মারছে।
তার চোখের সামনে বারবার সেই চশমা পরা মানুষটার অবয়ব ভেসে উঠছে। সে এক দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠল,
"পরে না মনে কী যে নাম তার...
আবারও যাবো ভুলে দিনটা..."
তার স্মৃতিতে কোনো চেহারা নেই, কোনো নাম নেই, আছে শুধু এক গভীর শূন্যতা। স্বপ্নের সেই অচেনা ব্যক্তিটি যেন এই কণ্ঠস্বরের আড়ালে লুকানো। তিথি পাথরের টুকরোটা পানিতে ছুঁড়ে দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "কে আপনি? কেন আপনারে দেখলে আমার মনে হয় আপনিই আমার সব?"
কাবির যখন গাছের আড়াল থেকে ঘাটের দিকে তাকাল, তার পৃথিবীটা যেন থমকে দাঁড়াল। সামনে বসে থাকা মেয়েটির পিঠ তার দিকে ফেরানো। কালো বোরকা ছাপিয়ে তার ফর্সা পায়ের গোড়ালি পানিতে চিকচিক করছে। কাবিরের দুচোখ ভিজে এল। সে যেন নিজের নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।
ঠিক তখন সাইফ দূর থেকে চিৎকার করে উঠল,
"ও নূর আপা! আম্মা তোমারে ডাকতাছে! তুমি এইখানে বইসা পা ভিজাইতাছো?"
সাইফের চিৎকারে তিথি চমকে পেছন ফিরল। ঘাসের ওপর পড়ে থাকা হিজাব নিকাবটা তোলার জন্য সে যেই না হাত বাড়াল, অমনি তার নজর পড়ল কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাবিরের ওপর।
কাবির তার রোদচশমাটা হাত থেকে ফেলে দিল। তিথির টলটলে চোখের দিকে তাকিয়ে সে কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করল,
"বিবিজান..."
(চলবে...)