#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩০
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
বিবিজান শব্দটা যেন শান্ত পুকুরের জলে বিশাল এক পাথর ছোঁড়ার মতো আঘাত করল। তিথি স্থির হয়ে বসে আছে। তার চোখের মণি দুটো কাঁপছে। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকাতেই তিথির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। এক অদ্ভুত চেনা অনুভূতি, অথচ মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে স্মৃতির দরজাটা এখনো তালাবদ্ধ।
কাবির পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার পা নড়ছে না। কতগুলো মাসের অনিদ্রা আর দুশ্চিন্তার ছাপ তার চেহারায় স্পষ্ট। সেই সযত্নে কামানো গাল দুটো এখন ছোট ছোট চাপ দাড়ি আর গোঁফে ঢাকা, যা তাকে আরও বেশি গম্ভীর আর পরিপক্ক দেখাচ্ছে। চুলের স্টাইলটা আগের মতো পরিপাটি নেই, কপালে এসে দু-একটা চুল অবাধ্য হয়ে লুটিয়ে পড়ছে। কিন্তু ওই চোখ দুটো? ওতে যেন হাজার বছরের তৃষ্ণা আর এক সমুদ্র ভালোবাসা টলমল করছে। কাবিরের চাউনিতে এমন এক আকুতি ছিল, যা দেখে তিথির মনে হলো—এই লোকটার জন্য সে তার জান দিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কেন?
কাবির এক কদম বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই সাইফ দৌড়ে এসে তিথি আর কাবিরের মাঝখানে দাঁড়াল। সাইফের আগমনে তিথি যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল। সে তড়িঘড়ি করে মাটি থেকে হিজাব পড়ে নিয়ে নিকাবটা তুলে মুখে পরে নিল। তার হাত কাঁপছিল। সে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে, কিন্তু মনের ভেতর থেকে কেউ যেন বারবার বলছে পালিয়ে যেও না।
সাইফ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বড়দের মতো বলতে লাগল,
"ও নূর আপা! তুমি দেখি একদম হুরপরী সাজা শুরু করছো! আমি ভাবলাম পুকুর পাড়ে ভূত ধরলো নাকি তোমারে? আম্মা তো এদিকে কানতে কানতে নদী বানায়া ফেলতাছে যে তার নূর মাইয়া হারায়া গেল!"
তিথি নিকাবের আড়ালে মৃদু হাসল। সাইফের এই চপলতা তাকে সবসময় আনন্দ দেয়। সে নিচু স্বরে বলল, "ধুর পাগল! হারাইতাম ক্যান? এই তো এখানেই বইসা আছিলাম।"
তিথির এই হাসির শব্দটুকু কাবিরের কানে অমৃতের মতো শোনাল। কতদিন পর! কত রাত সে এই হাসির আওয়াজটা শোনার জন্য ছটফট করেছে। সে তৃষ্ণার্ত চোখে তিথির ঢাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তিথি এবার আর দাঁড়াল না। সে সাইফের হাত ধরে দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা দিল। কিন্তু কাবির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে তপ্ত স্বরে বলে উঠল,
"কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে বিবিজান? আমায় এত কষ্টে রেখে তুমি এখানে খুব খুশি আছো, তাই না?"
তিথির পায়ের গতি থমকে গেল। সে পেছন ফিরল না, কিন্তু তার শরীর কাঁপছে। সাইফ অবাক হয়ে একবার কাবিরকে দেখল, আরেকবার তিথিকে। তিথি সাহস সঞ্চয় করে বলল,
"আফনে কেডা? আমায় বিবিজান কইয়া ডাকতাছেন কেন? আমার নাম হইলো মেহজাবীন নূর। আফনে বোধহয় ভুল করতাছেন পুলিশ সাহেব।"
"ভুল? জানো তোমাকে চিনতে কাবির রহমান কায়নাতের কখনো ভুল হতে পারে না। তোমার ওই চোখের পলক পড়া দেখেও আমি বলে দিতে পারি তুমি আমার তিথি। তুমি আমাকে পুলিশ সাহেব বলছো? আমার নামটাও কি ভুলে গেলে?"
সাইফ এবার মাঝখানে নাক গলালো। সে কাবিরের ড্রেস আর ভাবসাব দেখে বেশ অবাক।
"এই যে পুলিশ আঙ্কেল! আপনি আমার নূর আপারে চেনেন কেমনে? আপনি কি সিনেমার হিরো নাকি? আপার নাম তো নূর, আপনি তিথি তিথি করতাছেন কেন? আর বিবিজান মানে কী? আপা কি আপনার বউ নাকি?"
সাইফের বাচ্চা মানুষের মুখের সোজা প্রশ্নে কাবির এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে জানত না তিথি এখানে নূর পরিচয়ে আছে। সে এক দৃষ্টিতে তিথির দিকে তাকিয়ে রইল, যেন চোখের পলক ফেললেই সে আবার মিলিয়ে যাবে।
তিথি সাইফের হাত শক্ত করে ধরে টানল। সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। তার মনে হচ্ছে এখনই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। সে দ্রুত পায়ে মেম্বার বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। কাবির শুধু শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল তার বিবিজানের চলে যাওয়ার পথের দিকে।
পিছন থেকে সাইফ দৌড়াতে দৌড়াতে আবার কাবিরের দিকে একবার তাকিয়ে ভেঙচি কেটে বলল,
"যাউক গা! আমার আপা আপনার বিবি-টিবি না। ভুল জায়গায় আইছেন পুলিশ আঙ্কেল!"
কাবির একা দাঁড়িয়ে রইল হিজল তলায়। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল,
"তুমি ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি তিথি। তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমি জাহান্নাম ভয়াবহ পর্যন্ত যেতে রাজি আছি।"
~~~~
মেম্বার বাড়ির উঠানের একপাশে গ্রামের নারীদের লম্বা লাইন, অন্যপাশে পুলিশের কড়া পাহারা। দুইজন মহিলা পুলিশ সদস্য প্রতিটি নারীর নিকাব সরিয়ে মুখ পরীক্ষা করছেন এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তাদের সাথে আছেন রানা এবং আরও দুইজন পুরুষ গাইড। কাবির কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ নজরে সবটা পর্যবেক্ষণ করছে।
তিথি লাইনের একেবারে শেষে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে রোজিনা বানু, আর সবার আগে জিম। জিম আজ একদম চুপচাপ। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে।
লাইনের তদারকি করতে থাকা দীর্ঘকায়, শ্যামবর্ণের অফিসার রানাকে দেখে জিমের কেমন জানি লাগছে। সে বারবার নিজেকে শাসন করছে, "ইস্তাগফার পড় জিম, নজরের হেফাজত কর। এইডা ফিতনা!" সে মনে মনে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ছে আর ওড়না দিয়ে মুখ আরও ভালো করে ঢাকার চেষ্টা করছে, কিন্তু অবচেতন মনেই রানার গম্ভীর ব্যক্তিত্ব তাকে ভাবিয়ে তুলছে।
*****
অন্যদিকে, উঠানের এক কোণে সাইফ তার লাটিম নিয়ে মহাবিপদে পড়েছে। যতবারই সুতো প্যাঁচিয়ে ছুঁড়ছে, লাটিমটা ঘুরছে না। কাবির দূর থেকে বিষয়টা খেয়াল করছিল। সে ধীর পায়ে সাইফের কাছে গিয়ে বসল।
"কী হলো ছোট মিয়া? লাটিম কি তোমার কথা শুনছে না?"
"ধুর! এইটা পচা লাটিম। ঘুরেই না!"
"দেখি দাও তো, পুলিশ আঙ্কেল পারে কি না।"
কাবির নিপুণ হাতে সুতোটা প্যাঁচিয়ে এক ঝটকায় মাটিতে লাটিমটা ছাড়ল। বনবন করে ঘুরতে থাকা লাটিম দেখে সাইফের চোখ ছানাবড়া! সে খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।
"পুলিশ আঙ্কেল, আপনি তো জাদুর লাটিম ঘুরাইলেন! আপনি একদম আমার নূর আপার মতো।"
কাবির লাটিমটা হাতের তালুতে তুলে নিয়ে সাইফের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, "তাই? তোমার নূর আপাও বুঝি লাটিম ঘুরাতে পারে?"
সাইফ খিলখিল করে হেসে বলল, "না না! মানে আপা তো লাটিম পারে না, তবে আপার হাসিখুশি ভাবটা আপনার মতো। জানেন পুলিশ আঙ্কেল, নূর আপা যেদিন আমাদের বাড়িতে আসছিল, সেদিন অনেক অসুস্থ ছিল। কথা কইতে পারে না, খালি ঘুমাইতো। কপাল দিয়া রক্ত পড়ত। আমার আব্বা মেলা কষ্ট কইরা কামাইয়ের টাকা দিয়া ডাক্তার দেহাইয়া আপারে সুস্থ করছে।"
কাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে সাইফকে আরও কাছে টেনে নিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা সাইফ, তোমার আপা কি সব কথা মনে করতে পারে? সে কি বলে সে কোত্থেকে এসেছে?"
"না তো! আপা তো কিছু মনে করতে পারে না।"
ঠিক তখনই মহিলা পুলিশরা লাইনের শেষের দিকে পৌঁছাল। তিথির পালা আসতেই তার হার্টবিট যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মহিলা পুলিশ সদস্য তিথির নিকাব সরাতে বলতেই তিথি থরথর করে কাঁপতে লাগল।
রোজিনা বানু পাশ থেকে আর্তস্বরে বলে উঠলেন,
"ও বাজান, আমার মাইয়াটা বড় পর্দানশীন। ওর মুখটা কি খোলা লাগবেই?"
রানা এগিয়ে বলল,
"জি মা, এটা সরকারি আদেশ। কারো কোনো ছাড় নেই।"
কাবির তখন সাইফের সাথে কথা থামিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার সমস্ত মনোযোগ এখন লাইনের শেষের ওই কালো বোরকা পরা মানবীটির দিকে। তিথি কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের নিকাবটা সরাল। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল।
মহিলা পুলিশ সদস্য তিথির চেহারা দেখে রানার দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। রানা সাথে সাথে কাবিরকে সিগন্যাল দিল। কাবির আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে ধীর পায়ে তিথির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সূর্যের আলো তিথির ফর্সা মুখে পড়তেই কাবির দেখতে পেল
সেই প্রিয় মুখ, সেই পরিচিত মায়া। কিন্তু তিথির চোখে তখন এক আকাশ ভয় আর অচেনা চাহনি।
(চলবে...)