#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩১
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
সময় এখন বিকেল ৫টা। গ্রামের আকাশজুড়ে গোধূলির রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের পবিত্র সুর। মেম্বার বাড়ির সেই বিশাল উঠোন এখন জনশূন্য। কাবিরের কড়া নির্দেশে গ্রামের সাধারণ মানুষ যে যার মতো বাড়ি চলে গেছে। মেম্বার সাত্তার মিয়া, তার স্ত্রী আর তিন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
উঠোনের মাঝখানে একটি রাজকীয় চেয়ারে এক পা তুলে গম্ভীরভাবে বসে আছে কাবির। তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে রানা এবং অন্য তিন পুরুষ সদস্য। পাশে দুই মহিলা পুলিশ—ফাতেমা আর মিলি। তাদের চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন অপরাধীদের হাড় অব্দি খুঁড়ে দেখছে। কাবিরের সামনে পাটিতে বসে আছে রোজিনা বানু, জিম, তিথি আর সাইফ।
কিছুক্ষণ আগেই ক্ষেত থেকে খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে এসেছেন আমজাদ মিয়া। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
কাবির তার সানগ্লাসটা শার্টের কলারের সাথে ঝুলিয়ে রাখল। তারপর আমজাদ মিয়া আর রোজিনা বানুর দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"সত্যি করে বলুন, ওকে আপনারা কীভাবে পেয়েছেন? মিথ্যা বলার চেষ্টা করবেন না, মনে রাখবেন আপনারা কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।"
রোজিনা বানু বুক ফেটে আসা কান্না দমানোর চেষ্টা করছেন। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,
"স্যার, ও আমার জানের টুকরা নূর। ওরে আমি জন্ম দেই নাই সত্য, কিন্তু আমার বুকের দুধ না খাইয়াও ও আমার মাইয়া হইয়া উঠছে। ওরে যখন পাইছিলাম, ওর কপাল দিয়া ফিনকি দিয়া রক্ত পড়তাছিল।ওরে আমাগো থাইকা কাইড়া নিয়েন না!"
সাইফ আর তিথি দুজনেই তখন অঝোরে কাঁদছে। সাইফ তিথির বোরকা জাপটে ধরে চিৎকার করে বলছে,
"তোমরা আমার নূর আপারে নিয়া যাইও না! পুলিশ আঙ্কেল, তুমি পচা! তুমি খুব পচা!"
তিথির কান্নার শব্দে কাবিরের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে চেয়েও তার বিবিজানকে এই মুহূর্তে জড়িয়ে ধরতে পারছে না। সে খেয়াল করল, পাশে বসে থাকা জিম কথা বলছে না ঠিকই, কিন্তু নিকাবের আড়ালে তার চোখ স্থির হয়ে আছে রানার দিকে। রানার সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্ব আর শ্যামলা চেহারার মাঝে জিম যেন তার স্বপ্নের পুরুষের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছে। কাবির বিষয়টিকে লক্ষ করল, কিন্তু এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক অন্য কোথাও।
*******
কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। আজান শেষ হয়েছে। সে আমজাদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আজকের মতো আপনারা যেতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আগামীকাল সকালে আবার কথা হবে। কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করবেন না।"
কাবির মেম্বার সাহেব আর আমজাদ মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, "চলুন মেম্বার সাহেব, আমজাদ মিয়া মসজিদে যাই। জামায়াতের সময় হয়ে গেছে।"
যাওয়ার আগে কাবির রানাকে দায়িত্ব দিয়ে বলল, "রানা, তুমি এদের সবাইকে সাবধানে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসো। আর ফাতেমা ও মিলি, তোমরা রেস্ট নাও। কাল ভোরে ডিউটি শুরু হবে।"
রানা মাথা নিচু করে আদেশ পালন করল। তিথি একবার কাবিরের যাওয়ার পথের দিকে তাকাল।
~
মসজিদের ভেতর তখন এক পিনপতন নীরবতা। মাগরিবের জামায়াত শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ হলো। মুসল্লিরা একে একে বেরিয়ে গেলেও পেছনের কাতারে একা বসে আছেন কাবির। দুহাত তুলে সে তার রবের দরবারে মোনাজাত ধরেছে। যে দুচোখ সবসময় অপরাধীদের প্রতি অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করে, সেই চোখ আজ শ্রাবণের মেঘের মতো ঝরছে।
কাবিরের ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
"হে আরশের মালিক! তুমি তো জানো এই কতগুলো মাস আমি কীভাবে কাটিয়েছি। প্রতিটা রাতে যখন আমি চোখ বুজতাম, আমার তিথির সেই আর্তনাদ আমার কানে বাজত। আমি ওকে হারিয়ে ফেলেছিলাম মাবুদ, আমি ওকে রক্ষা করতে পারিনি। আজ যখন ওকে চোখের সামনে দেখলাম, ও আমায় চিনতে পারল না। এর চেয়ে বড় শাস্তি আমার জন্য আর কী হতে পারে?"
কাবিরের কান্নার বেগ বাড়তে লাগল। সে জায়নামাজে মাথা ঠুকে বলতে লাগল,
"মাবুদ, আমি ওর কাছে অপরাধী। কিন্তু ও তো নিষ্পাপ। ওইটুকু মেয়ের স্মৃতি তুমি কেড়ে নিলে? ও যে আমাকে পুলিশ সাহেব বলে ডাকল, ওই ডাকটা আমার কলিজায় তীরের মতো বিঁধেছে। তুমি আমার জানটাকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। আমি আর কিচ্ছু চাই না আল্লাহ, শুধু আমার তিথিকে আমার চেনা তিথি বানিয়ে দাও।"
নামাজ শেষে কাবির যখন মসজিদ থেকে বের হলো, তখন তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে আছে। বাইরে আমজাদ মিয়া আর মেম্বার সাহেব অপেক্ষা করছিলেন। কাবির নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
~~~~~
মসজিদের কাছেই পাহাড়ের ঢালে একটা ছোট টং দোকান। দোকানটি চালায় এক বয়স্ক গারো ব্যক্তি। বাঁশ আর ছনের তৈরি দোকানটি হলুদ বাল্বের আলোয় অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কাবির, মেম্বার সাহেব আর আমজাদ মিয়া সেই দোকানের সামনের কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলেন।
গারো দোকানদার হাসিমুখে তিনটা মাটির ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা আদা চা সামনে দিয়ে গেল। কাবির চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। পাহাড়ের ওপার থেকে শীতল বাতাস বয়ে আসছে।
কাবির আমজাদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
"আমজাদ সাহেব, নূরকে আপনারা ঠিক কোন অবস্থায় পেয়েছিলেন? ভয় পাবেন না, আমি শুধু জানতে চাই ওর চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হয়েছিল কি না।"
"স্যার, হালুয়াঘাট বর্ডারের কাছাকাছি ঝোপের মধ্যে ওরে পাইছিলাম। কপালটা ফাইট্যা হাড্ডি দেখা যাইতাছিল। সারা গায়ে কাঁটাছেঁড়ার দাগ। মনে হইতাছিল কেউ ওরে পাহাড় থেইকা ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দিছে। অনেক মাস ধইরা জ্ঞান আছিল না স্যার। আমরা গরিব মানুষ, যা আছিল সব বেইচ্যা ডাক্তার দেখাইছি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি মা আমার সব ভুইল্যা গেছে।"
কাবির চায়ের ভাঁড়টা শক্ত করে ধরল। তার বুকের ভেতর ক্ষোভ আর ঘৃণা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে বুঝতে পারছে, তিথিকে শুধু হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি, তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল ওই গড অফ ইতালি।
মেম্বার সাহেব বললেন, "স্যার, এই আমজাদ মিয়ার মতো দয়ালু মানুষ এই সমাজে নাই। নিজেরা না খাইয়া নূররে খাওয়াইছে। ওনারা ভাবছিল নূররে হয়তো কেউ রাইখা গেছে, তাই ওনারা পালক নিছে।"
"আপনার এই ঋণের কোনো প্রতিদান হয় না আমজাদ সাহেব। নূর এখন আপনাদের মেয়ে হতে পারে, কিন্তু ওর অতীত অন্য কোথাও। আপনাকে আমার সবটুকু সাহায্য করতে হবে।"
★
রাত তখন সাতটা। পাহাড়ি এলাকায় রাত মানেই নিস্তব্ধতার রাজত্ব। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর হিমশীতল হাওয়া। গ্রামের মানুষ সাধারণত এশার নামাজের পরেই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, যাতে ফজরের আগে উঠতে পারে।
আমজাদ মিয়ার জরাজীর্ণ বাড়িতে পৌঁছে কাবির স্তম্ভিত হয়ে গেল। মাটির দেয়াল, উপরে পুরনো টিন—আর এই ভাঙাচোরা ঘরেই তার রাজকন্যে গত কয়েক মাস কাটিয়েছে? কাবিরের কলিজায় যেন কেউ মোচড় দিয়ে ধরল। সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখল রানা এখনো সেখানে। জিমের সাথে কী একটা বিষয়ে রানা খুব নিচু স্বরে কথা বলছে। রানার জিমের সামনে কেমন যেন একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করছে। জিমও নিকাবের আড়ালে মাথা নিচু করে মিটিমিটি হাসছে।
আমজাদ মিয়ার খাটের একপাশে চট করে জায়গা করে দিয়ে বললেন,
"আসেন বাজান, এইখানে বসেন। গরিবের ঘর, আপনার মেলা কষ্ট হইতাছে।"
ঘরের ভেতরে একটি খাটে আমজাদ মিয়া আর কাবির বসলেন। আর ঠিক মাঝখানে একটা বড় সুতির পর্দার ওপাশে অন্য খাটে শুয়ে ছিল তিথি আর সাইফ। পর্দাটা পাতলা হওয়ায় ওপাশে কী হচ্ছে, কাবিরের কাছে তা একদম স্পষ্ট। সে দেখতে পাচ্ছে তার তিথিকে।
কাবির ভেতরে আসতেই রানা অপ্রস্তুত হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কাবির মুচকি হেসে সেটা এড়িয়ে গেল। সে আমজাদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল,
"আমজাদ সাহেব, আপনার বড় মেয়ে জিম তো মাশাআল্লাহ খুব বুদ্ধিমতী। আমার এই অফিসারের (রানাকে দেখিয়ে) জন্য আপনাদের ঘরের মেয়েটাকে চাইলে কেমন হয়? রানা যেমন সৎ, তেমনি দায়িত্বশীল।"
বিয়ে আর রানার নাম শুনে সাইফ ঘুমের ঘোরে ছিল, সে চট করে লাফ দিয়ে উঠে বসল। রোজিনা বেগম বারান্দার এক কোণে বসে সুপারি কাটছিলেন। কাবিরকে ঘরের ভেতরে আসতে দেখে তিনি তড়িঘড়ি করে মাথার ওড়না টেনে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
তিথি খুব ক্লান্ত। সে সাইফকে জাপটে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কাবিরের গলার আওয়াজ পেয়ে সে উঠে বসল। তার পরনে একটা পুরনো সালোয়ার কামিজ, বুকের ওড়নাটা এলোমেলো হয়ে আছে। অসুস্থতার পর চুলগুলো কেটে ছোট করে দেওয়া হয়েছিল, সেই অবাধ্য ছোট ছোট চুলগুলো এখন তার কপালে আর চোখের ওপর এসে পড়ছে।
তিথি খুব বিরক্ত। বারবার তার হাত দিয়ে চুলগুলো সরাতে ইচ্ছে করছে না। সে ঠোঁট উল্টে গাল ফুলিয়ে একটা জোরে ফু দিল, যাতে বাতাসের ঝাপটায় কপাল থেকে চুলগুলো সরে যায়। তার বিরক্তিভরা মুখ আর ওই ফু দেওয়ার ভঙ্গিটা ছিল বড্ড কিউট। অন্ধকারে পর্দার আড়ালে তিথির এই ছেলেমানুষি দেখে কাবির আর গম্ভীর থাকতে পারল না। সে হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল।
কাবিরের এই আকস্মিক হাসি দেখে আমজাদ মিয়া, রোজিনা বেগম আর রানা সবাই একদম থতমত খেয়ে গেল। এমনকি হিজাব পরা জিমও অবাক হয়ে কাবিরের দিকে তাকাল।
কাবির হাসতে হাসতেই তিথির দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, "আমার পাগলী বিবিজান! স্মৃতি হারালেও তোমার এই ছোট্ট ছোট্ট পাগলামিগুলো একদম আগের মতোই আছে।"
তিথি পর্দার ওপাশ থেকে কাবিরের হাসির শব্দ শুনে আরও বিরক্ত হয়ে মুখটা বেজার করে বসে রইল। সে বুঝতে পারছে না এই পুলিশ অফিসার তাকে দেখে হাসছে কেন। তার খুব ইচ্ছে করছে পর্দাটা সরিয়ে মানুষটাকে কড়া করে দু-কথা শুনিয়ে দিতে।
(চলবে...)