ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৩৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৩৩

#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

দুপুর ১টা বেজে ৩০ মিনিট। আমজাদ মিয়ার বাড়ির সামনের মেঠো পথে তিনটি গাড়ি এসে থামল। কোনো পুলিশের সাইরেন বাজল না। শান্ত স্নিগ্ধ দুপুরে কেবল ধুলো উড়িয়ে মেহমানরা এসে নামলেন।

সবার আগে গাড়ি থেকে নামলেন রানা। তার শ্যামলা গায়ের রঙে হালকা সাদা সুতির পাঞ্জাবিটা দারুণ মানিয়েছে। পাঞ্জাবির হাতাগুলো কবজি পর্যন্ত বোতাম লাগানো, কাটিংটা একদম মার্জিত। রানাকে আজ অন্যদিনের চেয়েও অনেক বেশি সাবলীল আর শান্ত দেখাচ্ছে। তার ঠিক পেছনেই নামলেন সিনিয়র অফিসার তামিম। তিনি আজ পাঞ্জাবির ওপর একটি নেভি ব্লু কটি পরেছেন, মুখে সেই রসিক হাসি।

কিন্তু সবার নজর কেড়ে নিলেন কাবির। তার সেই ধারালো চোখের চাহনি আজ একদম উন্মুক্ত। পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। গলার দুই পাশ দিয়ে একটি সাদা রংয়ের বড় চাদর ভাঁজ করে ঝোলানো। চাদরটি তার সৌন্দর্যকল যেন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কাবিরের চুলগুলো আজ জেল দিয়ে সেট করা নয়, বরং অবাধ্যের মতো কপালে এসে লুটিয়ে আছে—ঠিক যেমনটা তিথি পছন্দ করত।

আমজাদ মিয়া আর মেম্বার সাত্তার মিয়া গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেহমানদের এমন রাজকীয় আর মার্জিত বেশ দেখে আমজাদ মিয়ার বুকটা গর্বে ভরে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে সালাম করতে নিলেন, কাবির দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।

"আরে আমজাদ সাহেব! এসব কী করছেন? আপনি মুরুব্বি মানুষ, আজ আমরা আপনার মেহমান।"

"আহেন বাজান, আহেন। আপনারা আমার ঘরে পা রাখছেন, এইডাই আমার মেলা ভাগ্য।"

রোজিনা বানু আগে থেকেই সব গুছিয়ে রেখেছিলেন। ঘরের ভেতরে পাটি বিছানো হয়েছে, তার ওপর নকশা করা নতুন চাদর। মেহমানরা ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই সুঘ্রাণে ম-ম করে উঠল চারপাশ।

রান্নার আয়োজন দেখে তামিম অফিসার একটু অবাকই হলেন। তিনি হেসে বললেন,

"আমজাদ মিয়া, আমরা তো আসছিলাম শুধু কথা বলতে। আপনি তো দেখি ভোজের আয়োজন করে ফেলেছেন!"

"স্যার, আপনারা বড় মানুষ। আমার মতো গরিবের ঘরে আইছেন, এই সামন্য ডাল-ভাত যদি না খান তবে আমার মেলা কষ্ট হইবো।"

কাবির ধীর পায়ে ঘরের এক কোণে বসল। তার চোখ তখন পর্দার আড়ালে কাউকে খুঁজছে। কাবির আমজাদ মিয়ার সাদামাটা জীবন আর আজকের এই বিশাল আয়োজনের পেছনের ত্যাগটা বুঝতে পারল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা তার শেষ সম্বলটুকু খরচ করে আজ মেহমানদারির আয়োজন করেছেন। কাবির আমজাদ মিয়ার হাত ধরে খুব নরম স্বরে বলল,

"আমজাদ সাহেব, আপনার মনের বিশালতা আমি বুঝতে পারছি। আপনি জিম আর নূরের জন্য যা করেছেন, তার কোনো মূল্য হয় না। চলুন, আর দেরি না করে মূল কথা শুরু করি। বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর একবার একে অপরকে দেখা এবং কথা বলা জরুরি। এটা সুন্নাত। রানা আর জিমকে পর্দার আড়ালে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হোক।"

কাবিরের কথায় আমজাদ মিয়া আশ্বস্ত হলেন। জিমকে পর্দার ওপাশে ডাকা হলো। রানা খুব বিনয়ের সাথে সেখানে গেল। দুজনের মাঝে কেবল একটি পাতলা পর্দা, কিন্তু সেই আড়ালটুকু যেন এক পৃথিবী লজ্জা আর সম্মানে ঘেরা। রানা খুব নিচু স্বরে জিমকে তার দায়িত্ব আর আগামীর জীবনের কথা বলতে শুরু করল।

রানা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। ঠিক তখনই ঘর থেকে সাইফের খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। সাইফ তখনো সেই পুই শাকের লাল রঙের বিচি নাকে-মুখে মেখে ঘুরছে। সে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে কাবিরের কাছে এসে দাঁড়াল।

"ও পুলিশ আঙ্কেল! দেখেন দেহি আমারে কেমন লাগতাছে? নূর আপা আমারে সং বানাইয়া দিছে!"

কাবির সাইফের সেই লাল মাখা মুখ দেখে হেসে বলল,

"তোমার নূর আপাকে কি তুমিও লাল রঙ মাখিয়ে দিয়েছ?"

"হ! নূর আপা আর জিম আপা দুইজনই লাল লাল পরী হইয়া বইসা আছে। জিম আপা তো অহন খালি কান্দে আর মিটিমিটি হাসে।"

“তোমার নূর আপা কোথায়, সাইফ?"

“নূর আাপা, আমাগো সিরিকরেট জায়গা পাহাড়ে বইসা আরাসে দুলনায় দোল খাইতাছে।"

কাবিরের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। কাবির ধীর পায়ে পাহাড়ের সেই নির্জন পথের দিকে পা বাড়াল। পায়ের নিচে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ হচ্ছে। যত সে এগোচ্ছে, তিথির সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর তত স্পষ্ট হচ্ছে।

****জানিনা আমি, জানো কি তুমি, কিভাবে প্রেমেতে পড়েছি আমি।

সাদা কালোয় প্রেম প্রথম প্রথম, ঠোঁটের কোণে হাসি লাজুক নরম.....।*****

ঝোপের আড়াল থেকে কাবির এক পলক তিথিকে দেখল। লাল পোশাকে দোলনায় দুলতে থাকা তিথিকে দেখে কাবিরের মনে হলো, সে যেন তার হারিয়ে যাওয়া জান্নাতকে ফিরে পেয়েছে। কাবিরের বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে আর আড়ালে থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে সে দোলনার দিকে এগিয়ে গেল।

তিথি তখনও চোখ বুজে গেয়ে যাচ্ছে।

****বোকা আমি, নাকি বোকা এই মন,

হৃদয় জড়ালে আমায় কখন।****

হঠাৎ তার মনে হলো আশেপাশে কেউ একজন আছে। সে দ্রুত চোখ খুলল। সামনে সাদা পাঞ্জাবি পরা, সাদা চাদর জড়ানো সেই মানুষটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিথি চমকে দোলনা থেকে নামতে চাইল, কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে সে পড়ে যেতেই কাবির দ্রুত গতিতে এগিয়ে গিয়ে তাকে জাপটে ধরল।

এক মুহূর্তের জন্য দুজনের নিঃশ্বাস থমকে গেল। তিথির টলটলে চোখ জোড়া কাবিরের চোখের গভীরে স্থির হয়ে রইল। কাবির খুব কাছে থেকে তার বিবিজানের গায়ের সেই চিরচেনা ঘ্রাণ পেল।

তিথি হঠাৎ করেই হুশ ফিরে পেল। কাবিরের বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সে ছটফট করতে লাগল। তার কানে জিমের সেই সতর্কবাণী বাজছে,

"বিয়ের আগে কোনো পরপুরুষের স্পর্শ হারাম।"

তিথি হড়বড় করে বলে উঠল, "ছাড়েন আমারে! আপনে পরপুরুষ, আমারে ছুইছেন কেন?!"

তিথি পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই কাবির খুব নরম আর অনুনয়ভরা গলায় বলল,

"প্লিজ তিথি—মানে নূর, যেও না। বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করিনি। তুমি পড়ে যাচ্ছিলে তাই ধরেছি। আর কয়েকটা মিনিট থাকো না? এই পাহাড়ি নির্জনতায় তোমার গানটা আমার খুব ভালো লেগেছে।"

কাবিরের চোখের সেই করুণ আকুতি দেখে তিথি কেমন জানি দমে গেল। এই মানুষটার চোখে অদ্ভুত এক মায়া আছে, যা তাকে ভয় পেতে দিচ্ছে না। তিথি কিছুটা দ্বিধা নিয়ে আবার দোলনার একপাশে বসল। কাবির আলতো করে দোলনাটা দুলিয়ে দিতে লাগল। চারদিকে দুপুরের শান্ত নীরবতা, মাঝে মাঝে দু-একটা বুনো পাখির ডাক।

হঠাৎ কাবির নিচু স্বরে গুনগুন করে গেয়ে উঠল—

"Ho gayi jaane jahan

Teri aadat si mujhe

Dekho mein jab tujh ko do

Tab mera din ye dhale..

Deewana kar raha hai (Deewana..)

Tera roop sunehra

Musalsal kal raha hai (Musalsal..)

Mujhko ab yeh sehra

Bata ab jaaye toh jaaye kahan.."

তিথি অবাক হয়ে কাবিরের দিকে তাকাল। মানুষটা এত সুন্দর গাইতে পারে? তার মনে হলো এই সুরটা সে আগেও কোথাও শুনেছে। দোলনার দুলুনি আর কাবিরের কণ্ঠস্বর মিলে এক মায়াবী রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি করল। কাবির দোলনা দোলাতে দোলাতে খুব আবেগ নিয়ে বলতে শুরু করল,

"জানো নূর, তোমাকে দেখলে আমার ঠিক একজনের কথা মনে পড়ে। সেও তোমার মতোই দোলনায় দুলতে ভালোবাসত। একদম তোমার মতোই তার গায়ের রং, তোমার মতোই ছিলো। সে ছিল আমার অস্তিত্বের বড় একটা অংশ।"

"কে সে? আপনার আপন কেউ?"

"হ্যাঁ, সে আমার স্ত্রীর মতো ছিল। যখন সে হাসত, মনে হতো পুরো পৃথিবীতে আলো জ্বলে উঠেছে। সে যখন তোমার মতো এভাবে ঠোঁট উল্টে অভিমান করত, তখন আমার সব রাগ জল হয়ে যেত। তুমি যেমন আজ ওই লাল পোশাকে পরি হয়ে আছো, সেও লাল রঙ খুব পছন্দ করত।"

"আপনার সেই মানুষটা এখন কই?"

কাবির স্থির দৃষ্টিতে তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

"সে হারিয়ে গেছে। একটা ঝড়ে সে আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। কিন্তু আজ তোমাকে এভাবে দেখে আমার মনে হচ্ছে, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটা ঠিক আমার সামনেই বসে আছে।"

তিথি লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিল। কাবিরের কথাগুলো তার কাছে রূপকথার মতো লাগছে। সে বুঝতে পারছে না কেন এই অপরিচিত মানুষটার কথা শুনে তার চোখে জল চলে আসছে। দোলনার দুলুনিতে দুজন যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গেল, যেখানে কোনো সমাজ নেই, কোনো স্মৃতি নেই—আছে শুধু এক না বলা গভীর টান।

*****

যখন কাবির আবেগের চোটে দোলনায় জোরে একটা ধাক্কা দিল। তিথি ভয়ে ওমা বলে চিৎকার করে এক লাফে নিচে নেমে এলো। তার রাগী চোখের চাহনিতে কাবির যেন ভস্ম হয়ে যাবে!

"থামেন কইতাছি, একদম থামেন!"

"আরে নূর, আমি তো তোমাকে খুশি করতে চাইছিলাম।"

"খুশি করবেন না কি আমারে পাহাড় থাইকা ফালাইয়া মারবেন?"

"বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ব্যথা দিতে চাইনি।"

"ব্যথা দেন নাই তো কি রসগোল্লা খাওয়াইছেন, আমার কলিজা তো গলায় আইসা আটকাছে!"

"তুমি রাগলে কিন্তু হুবহু আমার সেই তিথির মতোই কথা বলো।"

"আবার ওই এক কথা, আপনার ওই স্ত্রীর লগে কি আমার সাত জন্মের শত্রুতা আছে?"

"আমি তো শুধু মিলটা দেখছিলাম, তোমাকে ছোট করছি না।"

"রাখেন আপনার দেখা, পুলিশের চোখ তো সবসময় চোরই খুঁজে পায়!"

"তুমি মিছেই রাগ করছো নূর, আমি তো তোমাকে শ্রদ্ধা করি।"

"শ্রদ্ধা না ছাই, আপনে তো দেখি একটা আঠালো আর তিতা লোক!"

"আমি তিতা হলেও তোমার জন্য মিষ্টি হতে রাজি আছি।"

"উফ! আপনের নির্লজ্জতা দেইখা তো আমার পিত্তি জ্বইলা গেল!"

"রাগ করলে তোমাকে আরও বেশি সুন্দর লাগে, নূর।"

"চুপ করেন! অহনই এখান থাইকা বিদেয় হন, নাইলে ডাল দিয়া পিটাইয়া আপনার পুলিশগিরি ছুটাইয়া দিমু!"

তিথি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বাড়ির দিকে দৌড় দিল। পেছনে কাবির বারবার "নূর, শোনো!" বলে ডাকলেও সে একবারও পেছন ফিরল না।

তিথি মনে মনে গজগজ করতে লাগল,

"আজব তো! এই পুলিশটারে দেইখা আমার মাথা পুরাই আউলাইয়া গেছে! এর ছায়া মাড়ানোও গুনাহ!"

সে এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। আর ওদিকে পাহাড়ের নির্জন দোলনাটার পাশে একা দাঁড়িয়ে কাবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দীর্ঘ সাত মাস পর তিথির সাথে এই সময় কাটাতে পেরে কাবিরের মনের সব কষ্ট যেন ধুয়ে মুছে গেল। তার তিথি ঠিক আগের মতোই আছে।

কাবির খুশিতে মনের ঘরে গুনগুন করে গান ধরে দিল—

"Main tera hi deewana hun

Teri baaten kabhi main bhul na paaun

Tu hi mera dil hai

Tu hi meri jaaaan

Tu hi mera dil hai

Tu hi meri jaaaan...

oh yaara...

kyun khafa ho mujhse

oh yaraa...

kyun juda ho mujhse

oh yaara...

Mera pyar hai tujhse

oh jaaanaaaaa......"

কাবির জানে, এই রাগ-অভিমানের শেষে একদিন তিথি ঠিকই তার বুকে ফিরে আসবে।

(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন