#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩৪
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
পর্দার ওপাশে জিম আর এপাশে রানা। মাঝখানের পাতলা কাপড়টা যেন এক সুউচ্চ দেয়াল, আবার এক পবিত্র সেতুবন্ধনও। রানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে খুব ধীরস্থির কণ্ঠে কথা বলা শুরু করল।
"দেখুন জিম, আমি জানি আপনার জন্য সবকিছু খুব হুট করে হচ্ছে। তবে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব আপনাকে সুখে রাখার। আমার কোনো দাবিদাওয়া নেই, শুধু আপনার দোয়া আর সঙ্গ চাই।"
জিম মাথা নিচু করে ওড়নার খুঁট আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
"আব্বাজান যারে পছন্দ করছে, তারে নিয়া আমার কোনো কথা নাই। নূর তো সবসময় কইতো নেককার জামাই পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আল্লায় আমার কপালে আপনারে রাখছে, শুকরিয়া।"
"আমি নূর... থুড়ি, তিথি ম্যামের কাছেও কৃতজ্ঞ। আপনার মতো একজনের কথা তো উনার মাধ্যমেই প্রথম জানতে পেরেছিলাম।"
“তিথি কী সত্যই স্যারের বউ নাকি..!"
“হ্যাঁ জিম, গত গত ছয় মাস ধরে উনার সাথে আমি তিথি ম্যামকে খুঁজেছি। আর আপনাকে এই পথেই পেয়ে গেলাম আজ। আচ্ছা, আমি আপনাকে তুমি বলতে ডাকতে পারি?"
জিম লজ্জা মিশ্রত কন্ঠে বলল,
“হুম।"
অন্যদিকে বাইরের ঘরে আমজাদ মিয়া, মেম্বার আর তামিম অফিসারের মধ্যে আলোচনার সুর বেশ জমে উঠেছে। মেম্বার সাহেব পান চিবাতে চিবাতে বললেন,
"আমজাদ ভাই, শুভ কাজে দেরি করা ঠিক না। দিনকাল যেমুন পড়ছে, পোলাও ভালো আবার আপনার মাইয়ারও পছন্দ হইছে। দেরি কইরা লাভ কী?"
"হ্যাঁ আমজাদ সাহেব। আমরা চাচ্ছি এই সপ্তাহেই কাজটা সেরে ফেলতে। শুক্রবার তো জুম্মার দিন, খুব বরকতময়। কী বলেন আপনারা?"
আমজাদ মিয়া কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,
"স্যার, আয়োজন তো মেলা কিছু। আমি গরিব মানুষ, এক সপ্তাহের মধ্যে কি সব কুলানো যাইবো?"
তামিম: "আরে আমজাদ সাহেব, আয়োজনের চিন্তা আপনি করবেন কেন? আমরা তো আছি। রানার অভিভাবক হিসেবে আমরাই সব তদারকি করব। আপনার শুধু দোয়া থাকলেই হবে।"
"হ আমজাদ ভাই, অফিসার সাহেব যখন কইতাছেন, তখন রাজি হইয়া যান। এই শুক্রবারেই বিয়ার কাম সাইরা ফেলি চলেন।"
আমজাদ মিয়া রোজিনা বেগমের দিকে একবার তাকালেন। রোজিনা বেগম পর্দার আড়াল থেকে ইশারায় সম্মতি দিলেন। আমজাদ মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"ঠিক আছে স্যার। আল্লায় যা করে ভালোর লাইগাই করে। এই শুক্রবারেই বিয়া হইবো।"
পুরো বাড়িতে আনন্দের একটা ঢেউ খেলে গেল। সাইফ বিরিয়ানির লোভে উঠানেই নাচতে শুরু করে দিয়েছে। ওদিকে তিথি পাহাড় থেকে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে রান্নাঘরে ঢুকে জিমকে জড়িয়ে ধরল।
"আপা! খবর শুনছো? এই শুক্রবারেই তোমার বিয়া।"
"আরে নূর, আস্তে ক! মেহমানরা ঘরে বইসা আছে, হুনলে কী মনে করবো? তুই কি সারাজীবন এমন বাচালই থাকবি?"
"চুপ কেন থাকুম? তোমার বিয়াতে আমি নীল রঙের শাড়ি পরুম আর মেলা মেকআপ নিমু। দেখিস, আমারে দেইখা ওই পুলিশ সাহেবের মুখটা কেমন হাঁ হইয়া থাকে!"
তিথির কথায় জিম আর রোজিনা বেগম হেসেই কুটিপাটি। কারো মনেই আজ কোনো মেঘ নেই, শুধু একরাশ খুশির আলো। কিন্তু এই খুশির আড়ালে কাবির তখনো উঠানে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—শুক্রবারের দিনটা শুধু রানার জন্য নয়, হয়তো তার তিথিকে তার জীবনে পাকাপাকিভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ হবে এটি।
*********
পরের দিন বৃহস্পতিবার। আগামীকাল জিমের বিয়ে, তাই আমজাদ মিয়ার বাড়িতে আজ দম ফেলার সময় নেই। কাবির আজ সকাল থেকেই রান্নার তদারকি আর রানার বিয়ের কেনাকাটার উছিলায় অন্তত দশবার এই বাড়িতে পা রেখেছে। প্রতিবারই তার চোখ দুটো চাতক পাখির মতো নূর ওরফে তিথিকে খুঁজেছে। কিন্তু তিথি যেন লুকোচুরি খেলায় মেতেছে।কাবির বারান্দায় এলে সে রান্নাঘরে ঢোকে, আবার কাবির উঠানে এলে সে ভেতরের ঘরে খিল দেয়। দোলনার সেই ঝগড়ার পর সে মনে মনে ঠিক করেছে, পুলিশ সাহেব এর সামনে সে আর যাবেই না।
~
বিকাল ৪টা। রোদের তেজ কমে পাহাড়ের গায়ে সোনাঝরা রঙ লেগেছে। তিথি ভাবল, সবাই যখন জিমের মেহেদি আর রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত, তখন চুপিচুপি একটু দোলনা থেকে ঘুরে আসা যাক। সে সাইফকে ফিসফিস করে ডেকে নিয়ে পাহাড়ের সেই নির্জন জায়গায় চলে গেল। সাইফ দোলনায় জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে আর তিথি বাতাসে উড়তে উড়তে হাসছে।
ঠিক তখনই গাছের আড়াল থেকে কাবির ধীর পায়ে বেরিয়ে এল। তাকে দেখামাত্রই তিথির হাসিমাখা মুখটা পাথরের মতো জমে গেল। সে দ্রুত ওড়না দিয়ে মুখ টেনে ঢেকে ফেলল এবং দোলনা থেকে নেমে উল্টো দিকে হাঁটা দিল।
"নূর, দাঁড়াও! পালিয়ে যেও না। আজ আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি।"
তিথি থামল ঠিকই, কিন্তু মুখ ফেরাল না। ওড়নার আড়াল থেকেই গজগজ করে বলল,
"আপনারে দেখলেই আমার বিপদ আহে। আমারে কেন জ্বালাইতাছেন? যান এখান থাইকা!"
"আজ আমি তোমাকে জ্বালাতে নয়, একটা স্বপ্ন সত্যি করতে এসেছি। নূর, আজ আমি তোমার মা-বাবার সাথে তোমার কথা বলিয়ে দেব।"
কথাটা শুনে তিথি যেন বজ্রাহত হলো। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার অবিশ্বাসী চোখ দুটো কাবিরের মুখের ওপর স্থির হলো। কাবির পকেট থেকে ফোন বের করে একটি নম্বর ডায়াল করে ভিডিও কল দিল। ওপাশে ফোন রিসিভ হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল দুজন মানুষের মুখ। তারা হলেন তিথির আসল বাবা মারুফ সাহেব এবং মা তানিয়া বেগম।
তিথি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে রইল। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে তানিয়া বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
"মা! আমার তিথি মা! তুই কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি রে মা? সাতটা মাস আমরা এক মুহূর্তের জন্য চোখে পাতা এক করতে পারিনি!"
তিথি কোনো কথা বলতে পারছে না। সে শুধু অপলক তাকিয়ে আছে। মারুফ সাহেব চশমা মুছে ধরা গলায় বললেন,
"মা মনি, আমি তোর বাবা। তুই ভয় পাস না মা, আমরা খুব তাড়াতাড়ি তোকে নিতে আসব। তুই কেমন আছিস মা?"
তিথির বুকটা হু হু করে উঠল। সে আমতা আমতা করে শুধু দুটো বাক্য বলতে পারল,
"আপনারা আমারে চিনেন? আমি কি সত্যি আপনাদের মেয়ে?"
এই কথা শুনে ওপাশে তানিয়া বেগম ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিথি তার স্মৃতির অন্ধকার অলিগলিতে হাতড়াতে শুরু করল। এই চেহারাগুলো কি পরিচিত? কেন তার বুকের ভেতরটা এমন ছিঁড়ে যাচ্ছে? হঠাৎ করেই তার মাথার ভেতরে হাজারটা হাতুড়ির ঘা পড়তে শুরু করল। পুরনো কোনো দৃশ্য, কোনো কণ্ঠস্বর যেন অন্ধকার দেয়াল ভেঙে হুড়মুড় করে
বেরিয়ে আসতে চাইছে।
"মাথা... আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে! আমি আর পারছি না!"
সে দুই হাতে মাথা চেপে ধরল। ব্যথায় তার কপাল কুঁচকে নীল হয়ে গেল। ফোনের ওপাশ থেকে মা-বাবার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু তিথি তখন যন্ত্রণার এক অতল সাগরে ডুবছে। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল এবং সে কাবিরের বুকের ওপর ঢলে পড়ল।
"তিথি! তিথি চোখ খোলো! রানা! রানা জলদি এদিকে আসো!"
কাবিরের চিৎকারে রানা দৌড়ে এল। কাবির কাঁপানো স্বরে বলল,
"অতিরিক্ত মানসিক চাপে ওর ব্রেইন শকে চলে গেছে। আমাদের এখনই ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। রানা, জলদি যাও, জিমকে বলে নূরের বোরকা, হিজাব আর নিকাব নিয়ে আসো।"
বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। সাইফ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিথির হাত ধরল। রোজিনা বেগম বুক চাপড়ে বলতে লাগলেন,
"আমার মেয়েটার কী হইলো গো! ও পুলিশ বাজান, আমার নূররে ফিরাইয়া আনেন!"
কাবির অত্যন্ত সাবধানের সাথে তিথিকে পাঁজাকোলা করে জিপে তুলল। সে আমজাদ মিয়া আর রোজিনা বেগমকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
"আপনারা একদম ভেঙে পড়বেন না। আমি ওকে ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। আমি কথা দিচ্ছি, কাল জুম্মার নামাজের আগেই আমি নূরকে সুস্থ অবস্থায় সশরীরে আপনাদের এই বাড়িতে হাজির করব। জিমের বিয়ে ঠিক সময়েই হবে।"
কাবির কাউকে সাথে নিল না। একাই জিপের ড্রাইভিং সিটে বসল।সে ঝড়ের গতিতে জিপ ছুটিয়ে দিল ময়মনসিংহের পথে। পেছনের সিটে জ্ঞানহীন তিথি শুয়ে আছে, আর কাবিরের চোখে তখন জল আর প্রতিশোধের আগুন একসাথে জ্বলছে। তার তিথিকে সে আর হারাবে না, কোনোমতেই না।
(চলবে...)