#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩৫
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
রাত ৮টা। ময়মনসিংহের হাসপাতালের সেই নিরিবিলি করিডোরে এখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরে বইছে এক প্রবল আবেগের ঝড়। সাতটি দীর্ঘ মাস পর আজ সবাই এখানে জড়ো হয়েছে তাদের কলিজার টুকরোকে ফিরে পাওয়ার আশায়।
করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন কাবিরের মা সারা ইয়াসমিন এবং বাবা আলতাফ রহমান। সারা ইয়াসমিন জায়নামাজ থেকে উঠে এসেছেন, তার হাতে এখনো তসবিহ। পাশে দাঁড়িয়ে আছে কাবিরের মেঝ বোন প্রিয়া আর ছোট বোন প্রমা। প্রিয়ার স্বামী ইমরান কোলে করে তাদের ছোট্ট বাচ্চাটাকে নিয়ে পায়চারি করছে। অন্যদিকে তিথির বাবা মারুফ সাহেব আর মা তানিয়া বেগম যেন একেকটা জীবন্ত লাশ থেকে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। তাদের চোখের জল আজ আর থামছে না।
কাবির করিডোরের এক দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা পাঞ্জাবিতে তখনো পাহাড়ি ধুলো আর তিথির স্পর্শের ঘ্রাণ লেগে আছে। তার চেহারা বিধ্বস্ত, চুলগুলো এলোমেলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
"বাবা, আমি জানতাম ও ফিরে আসবে। আজ সাত মাস পর ওর গায়ের ঘ্রাণ পেয়ে আমার মনে হচ্ছে আমি নিজেও নতুন করে জন্ম নিলাম।"
আলতাফ রহমান ছেলের কাঁধে হাত রেখে ধরা গলায় বললেন,
"আল্লাহ বড় দয়ালুরে বাবা। তুই হার মানিসনি বলেই আজ আমাদের বাড়িটা আবার আলো হয়ে ফিরছে।"
তানিয়া মিথু ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন,
"আমার মেয়েটার ভেতরে কী অবস্থায় আছে কে জানে! ও যখন ফোনটা দেখেই জ্ঞান হারাল, আমার কলিজাটা তখনই শুকিয়ে গিয়েছিল।"
ঠিক সেই সময় ফিমেল ডাক্তার কাবিরকে ইশারায় কেবিনের বাইরে আসার জন্য ডাকলেন। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ডাক্তার বেশ গম্ভীর মুখে কাবিরের সাথে কথা বলতে শুরু করলেন।
"মিস্টার কাবির, তিথির স্মৃতি ফিরে আসাটা একটা মিরাকল। কিন্তু আপনাকে একটা ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। ওর ব্রেইন টিস্যুগুলো এখনো খুব নাজুক অবস্থায় আছে। ওর মাথার ওপর কোনো ধরনের টেনশন বা মানসিক চাপ দেওয়া একদম নিষেধ। কোনো নেতিবাচক খবর বা অতিরিক্ত উত্তেজনা ওর জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ওকে সব সময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করবেন।"
কাবির মাথা নেড়ে সায় দিল। সে জানে, এই সাত মাসে তিথি যা হারিয়েছে বা তারা যা সহ্য করেছে, তা নিয়ে এখন কোনো আলাপ করা যাবে না।
কাবিরের মা সারা ইয়াসমিন এবং বাবা আলতাফ রহমান তিথিকে জড়িয়ে ধরে পরম আদরে বিদায় দিলেন। কাবিরের মেঝ বোন প্রিয়া আর দুলাভাই ইমরানও সেখানে উপস্থিত ছিল। ইমরানের কোলে তাদের মাত্র কয়েক মাস বয়সী ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটি। তিথি যাওয়ার আগে পরম মমতায় সেই ছোট্ট বাবুটার কপালে একটা চুমু খেল।
সারা ইয়াসমিন বললেন,
"মা তিথি, খুব সাবধানে থাকবি। আর কোনোদিন যেন আমাদের এভাবে কাঁদাস না।"
কাবিরের বাবা-মা এবং প্রিয়ার পরিবার তাদের ময়মনসিংহের সদরের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
অন্যদিকে ঠিক হলো তিথি তার বাবা-মায়ের সাথে ধোবাউড়ায় তাদের সেই প্রিয় কাঠের বাড়িতে ফিরবে। কাবির নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে তাদের নিয়ে যাবে, আর সাথে যাবে কাবিরের ছোট বোন প্রমা।
গাড়ি যখন ধোবাউড়ার মেঠো পথ ধরে ছুটছে, তখন পেছনের সিটে প্রমা তিথিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসল।
"তিথি, তোকে যে কতদিন পর এইভাবে কাছে পেলাম! তোকে আর কোনোদিন আমি হারাতে দিবোনা বোন।"
তিথি প্রমার বুকে মাথা রেখে ফিক করে হেসে দিল। সে সেই পাহাড়ের ঢঙে উত্তর দিল,
"হ! আমি যদি আবার হারাইয়া যাই, তবে তোরে নিয়া হারাইমু। একা হারাইলে তো বিরিয়ানি খাওয়ার সঙ্গী পামু না!"
প্রমা চোখ বড় বড় করে তিথির মুখের দিকে তাকাল।
তিথির কথা বলার ধরন দেখে সে কিছুটা অবাক।
"তিথি, তুই এইভাবে গ্রামীণ ভাষায় কথা বলছিস কেন? তুই না সব সময় শুদ্ধ করে গুছিয়ে কথা বলতিস?"
"আরে ওইডাও তো আমার মাতৃভাষা! কয়টা দিন যে আমজাদ আব্বা আর জিম আপার লগে ছিলাম, ওই ভাষাই তো আমার মুখে বইসা গেছে। কেন, তুই পারস না?"
"তুই পারিসও বটে! হারাইয়া গিয়া একেবারে গাঁয়ের মেয়ে হইয়া গেছিস। তোর মুখে আঞ্চলিক কথা শুনতে কিন্তু মন্দ লাগছে না!"
গাড়ির সামনের সিটে বসে কাবির লুকিং গ্লাসে বোন আর স্ত্রীর এই খুনসুটি দেখছিল। তার ঠোঁটের কোণে তখন তৃপ্তির হাসি। দীর্ঘ সাত মাস পর তার পৃথিবীটা আবার পূর্ণ হয়েছে। মারুফ সাহেব আর তানিয়া বেগম পাশে বসে মেয়ে আর প্রমার কথা শুনে চোখের জল মুছলেন।তবে এই জল কষ্টের নয়, পরম আনন্দের।
গাড়ি যখন ধোবাউড়ার সেই পরিচিত কাঠের বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন সন্ধ্যার ছায়া নামতে শুরু করেছে। তিথি গাড়ি থেকে নেমে তার প্রিয় বাড়ির দিকে তাকিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিল। হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণে চারদিকটা ম ম করছে।
~~~
রাতের ডিনার শেষে তিথির মা তানিয়া বেগম তাকে পরম মমতায় লোকমা তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন। তিথি তখন তার নূর জীবনের গল্পে মশগুল। পাশে বসা প্রমা, কাবির আর তার বাবা মারুফ সাহেব সবাই যেন তিথির একেকটা কথা গিলছে। তিথি জিম আর আমজাদ আব্বার আদরের কথা বলতে বলতে হুট করেই সাইফের এক মজার ঘটনা মনে করে হাসিতে ফেটে পড়ল।
"হোনো আব্বু-আম্মু ,আমজাদ আব্বা তো একদিন বাজার থেইকা অনেক শখ কইরা একটা বিশাল বড় লাউ আনছিল। সাইফ পোলাটা লাউ খাইতে খুব ভালোবাসে তো, তাই আব্বা তার লাইগাই আনছিল। জিম আপা সেই লাউ কাইটা কুটা কইরা রান্নাঘরে কেবল রাইখা গেছে।"
সবাই উৎসুক হয়ে শুনছে। তিথি হাসতে হাসতে বলতে শুরু করল,
"সাইফ আবার হুলো বিড়ালরে যমের মতো ভয় পায়। ও দেখল রান্নাঘরে বড় একটা বিড়াল ঢুইকা মিউ মিউ করতাছে। সাইফ ভাবল বিড়াল বোধহয় তার সাধের লাউ খায়া ফেলব। ও করল কি, বিড়ালরে ভয় দেখাইতে গিয়া রান্নাঘরের দরজায় থাকা একটা আস্ত ঝাড়ু নিয়া বিড়ালরে লক্ষ্য কইরা মারল এক থ্রো!"
প্রমা: "তারপর? লাউ বাঁচাতে পেরেছে?"
"আরে লাউ তো দূরে থাক! সাইফের হাতের টিপ তো মাশাল্লাহ—এমুন টিপ যে বিড়াল এক লাফে জানলা দিয়া ভাগল, আর ওই আস্ত ঝাড়ু গিয়া পড়ল জিম আপার গরম ভাতের ডেকচির ওপর! ভাতের ডেকচি তো উল্টাইলই, সাথে জিম আপার সাধের মাটির চুলাটাও অর্ধেক ভাইঙা গেল।"
"জিম আপা চিৎকার দিয়া রান্নাঘরে আইসা দেখে সাইফ চুলা থেইকা ছিটকে আসা ছাইয়ের ওপর বইসা হাউমাউ কইরা কানতাছে আর চিল্লাইতাছে—আপা, বিড়াল আমারে ঝাড়ু মারছে! বিড়াল আমারে ঝাড়ু মারছে! আমজাদ আব্বা দৌড়াইয়া আইসা দেখে ছাইয়ের বন্যায় সাইফ একাকার আর বিড়ালের দোষ দিয়া নিজেরে বাঁচানোর চেষ্টা করতাছে। সাইফ কয় কি জানো? আব্বা, বিড়ালটা নিশ্চয়ই জিনের বাদশা আছিল, ও হাত দিয়া ঝাড়ু ধইরা আমার দিকে ছুড়া মারছে!'
তিথির কথা শুনে ঘরের সবাই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল। বাবা মারুফ সাহেব হাসতে হাসতে চশমা খুলে চোখ মুছলেন। তানিয়া বেগম তিথির কপালে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
"পাগলি আমার! ওইটুক বাচ্চার নামে এমন বদনাম দিস না।"
"আরে আম্মু, বদনাম না তো! সাইফ তো ওইদিন রাতে ভাতের অভাবে শুধু ওই ঝাড়ুর বারি খাওয়া লাউ ভর্তা খাইছে আর ডুকরাইয়া কানছে। বলতেছিল—আব্বা, বিড়ালের হাতে ছোঁয়া ঝাড়ুর বাড়ি খাওয়া লাউ খাইলে কি আমার পেটে বিলাইয়ের বাচ্চা হইবো?"
ঘরের ভেতরে হাসির রোল পড়ে গেল। প্রমা তো বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। কাবির দরজায় হেলান দিয়ে তার প্রাণপ্রিয় তিথির এই হাসিখুশি রূপটা দেখছিল। তার মনে হলো, সাত মাসের সব হাহাকার যেন এই হাসির শব্দে বাতাসের মতো উবে যাচ্ছে।
(চলবে...)