#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩৬
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
রাত ১২টা। ধোবাউড়ার শান্ত নিস্তব্ধতায় সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। তিথির ঘরের বড় বিছানায় একপাশে মা তানিয়া মিথু আর অন্যপাশে প্রমা গভীর ঘুমে। মাঝখানে তিথি শুয়ে ছটফট করছে, কিন্তু চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। আজ আর তিথির পাশে কাবিরের শোওয়া হলো না। সাত মাস পর নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায় শুয়েও তিথির কেমন জানি খালি খালি লাগছে।
হঠাৎ করেই তিথির মাথায় সূক্ষ্ম একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল। স্মৃতি ফিরে পাওয়ার ধকল আর সারাদিনের উত্তেজনায় শরীরটা বেশ ক্লান্ত, কিন্তু মনটা পড়ে আছে অন্য কোথাও। তার বারবার মনে পড়ছে কাবিরের কথা।কাবিরের তাকে আগলে রাখা থেকে শুরু করে আজ হাসপাতালের সেই অস্থির চাহনি সবকিছু যেন চোখের সামনে ভাসছে। স্মৃতি ফেরার পর থেকে এখন পর্যন্ত কাবিরের সাথে তার মন খুলে একটা কথাও বলা হয়নি।
তিথি ভাবল, "মানুষটা আমার জন্য কত কী করল, অথচ আমি তারে ঠিকমতো একটা ধন্যবাদও দিলাম না। উল্টো পাহাড়ে কত ঝগড়া করছি!"
মাথার ব্যথাটা যেন কাবিরকে দেখার তৃষ্ণায় আরও বেড়ে গেল। তিথি বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে কাবিরের সাথে দেখা করাটা খুব দরকার। সে খুব সাবধানে, শব্দ না করে বিছানা থেকে নামল। মা আর প্রমা যেন টের না পায়, সেভাবে পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে চাঁদের আলোয় উঠানটা রুপালি হয়ে আছে। তিথি জানে, কাবির নিশ্চয়ই ড্রয়িংরুমের সোফায় বা বারান্দায় একা বসে আছে। সে মাথায় ওড়নাটা টেনে নিয়ে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করছে—ভয় নয়, বরং এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর কৃতজ্ঞতা কাজ করছে। কাবিরকে সামনাসামনি দেখলে সে কী বলবে, তা ভেবেই তিথির হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে।
রাত তখন গভীর, চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। তিথি পা টিপে টিপে কাবিরের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল। সে ভাবল ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখবে কাবির ঘুমিয়েছে কি না। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই চমকে গেল।
কাবির তখন কেবল গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। পরনে তার শুধু কালো রঙের একটা ট্রাউজার। সুঠাম চওড়া পিঠ আর উন্মুক্ত বুক বেয়ে পানির অবাধ্য ফোঁটাগুলো টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে। তিথিকে হুট করে ঘরে দেখে কাবির মোটেও অপ্রস্তুত হলো না, বরং তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক অদ্ভুত মায়াবী হাসি। সে দ্রুত এগিয়ে এসে তিথির পেছনে দরজাটা আটকে দিল।
~~~
দরজা লাগানোর শব্দে তিথি থমকে গেল। তার বুকটা
হাতুড়ি পিটানোর মতো ওঠানামা করছে। আমতা আমতা করে সে বলল,
"আ-আপনি দরজা লাগাইলেন ক্যান? আমি তো... আমি তো চইলা যাইতেছিলাম!"
কাবির ভেজা চুলগুলো ঝাকুনি দিয়ে তিথির একদম কোল ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে সাবান আর পানির একটা শীতল সতেজ ঘ্রাণ নাকে লাগছে তিথির। সে লজ্জায় আর ভয়ে নিজের ওড়নাটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে কুঁকড়ে গেল।
"এত রাতে আমার ঘরে বিবিজান কী খুঁজতে এসেছে শুনি? আমাকে?"
"না তো! আমি... আমি ওই পুলিশ সাহেবরে খুঁজতেছিলাম। উনারে তো কোথাও দেহি না।"
কাবির হো হো করে হেসে উঠল। তারপর তিথির কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"ওহ! সেই পুলিশ সাহেব? সে তো এখন পানিহাতার পাহাড়ে ডিউটি করছে। এখানে তো শুধু তোমার এই স্বামীটা আছে। আর কিছু খুঁজছো না?"
"আর কী... কী খুঁজব?"
কাবির আর উত্তর দিল না। সে তিথিকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। হঠাৎ এই আক্রমণে তিথি অপ্রস্তুত হয়ে কাবিরের গলা জড়িয়ে ধরল। কাঁধ থেকে পাতলা ওড়নাটা কখন যে নিচে খসে পড়েছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। কাবির তাকে কোলে নিয়েই সরাসরি বিছানায় নিয়ে গেল।
সে তিথিকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। ঘরের এক কোণে জ্বলতে থাকা মৃদু ল্যাম্পশেডের আলোয় তিথির মুখটা আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। কাবির তার চিবুকটা আলতো করে ধরে চোখের দিকে তাকাল।
"জানো তিথি, এই সাতটা মাস প্রতিটা রাতে আমি শুধু তোমার ওই হাসিমুখটা কল্পনা করেছি। মনে হতো, তুমি পাশে নেই মানে আমার নিশ্বাস নেওয়ার বাতাসটুকুও নেই। তোমাকে কতটা মিস করেছি, তা বলে বোঝানো যাবে না।"
"আমিও কি কম মিস করছি? আপনারে পাহাড়ে কত বকা দিছি। অথচ আপনি আমারে সবসময় আগলাইয়া রাখছিলেন। থ্যাংক ইউ পুলিশ সাহেব!"
"শুধু থ্যাংক ইউতে কাজ হবে না বিবিজান। সাত মাসের পাওনা তো অনেক জমে গেছে।"
কাবির আর সময় দিল না। সে ধীরলয়ে ঝুঁকে এসে তিথির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। দীর্ঘ কতগুলো মাসের অবসান ঘটিয়ে তাদের ঠোঁট জোড়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। সেই গভীর চুম্বনে মিশে ছিল সাত মাসের বিরহ, হাহাকার আর একে অপরকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি। তিথি চোখ বুজে কাবিরের চুলে আঙুল চালিয়ে তাকে আরও নিবিড় করে নিজের কাছে টেনে নিল। ঘরের বাইরের পৃথিবীটা যেন তখন থমকে গেছে, কেবল এই নিভৃত ঘরটিতেই পূর্ণতা পাচ্ছিল এক পবিত্র ভালোবাসার গল্প।
*******
গভীর চুম্বনের রেশ কাটতে না কাটতেই এক অদ্ভুত অস্বস্তি দানা বাঁধল তিথির শরীরে। কাবিরের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে পড়ল। তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কাবির কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিথি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বাথরুমের দিকে দৌড় দিল।
ভেতর থেকে তিথির বমি করার শব্দ ভেসে আসছে। কাবির থতমত খেয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। স্মৃতি ফিরে পাওয়ার ধকল আর সারাদিনের উত্তেজনার পর এই হঠাৎ অসুস্থতা কাবিরকে অস্থির করে তুলল। সে দ্রুত বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"তিথি! কী হয়েছে তোমার? দরজা খোলো!"
ভেতর থেকে শুধু তিথির হাঁপানোর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। তার চোখের নিচে ক্লান্তির কালি, কপালটা ঘামছে। সে দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ধুঁকছিল। কাবির দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে দুই হাতে জাপটে ধরল।
"কী হলো হঠাৎ? শরীর বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি আন্টি আর প্রমাকে ডাকব?"
"না না! কাউরে ডাকবেন না। এইটা নতুন কিছু না। গত কয়েক দিন ধইরা মাঝে মাঝেই আমার এমন লাগে। আমি ভাবছিলাম পাহাড়ি এলাকার আয়রন পানি আর ভিটামিনের অভাব হইতাছে বোধহয়, তাই আমি কারোরে কিছু কই নাই। কিছু খাইতে গেলেই বুকটা কেমন জানি ঘুইলা ওঠে।"
তিথির কথা শুনে কাবিরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। দিন কয়েক ধরে এমন হচ্ছে? কাবিরের মস্তিষ্কে মুহূর্তেই একটা সন্দেহ আর ভয় বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে আর দেরি না করে দ্রুত ফোনটা হাতে নিল। রাত কয়টা বাজে সেদিকে খেয়াল না করেই সে তাদের পরিচিত গাইনোকোলজিস্ট ডাক্তার রাহাকে কল করল।
ডাক্তার রাহা ওপাশে ফোন ধরতেই কাবির সংক্ষেপে তিথির গত কয়েক মাসের শারীরিক অবস্থা এবং বর্তমান লক্ষণগুলোর কথা খুলে বলল। সব শুনে ডাক্তার রাহা ওপাশে থেকে শান্ত কিন্তু নিশ্চিত গলায় বললে,
"কাবির, তুমি হয়তো বুঝতে পারছ না, কিন্তু তিথির এই সিম্পটমগুলো খুব সাধারণ একটা বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওর কয়েক দিন ধরে বমি ভাব আর খাবারের অরুচি—সবকিছু মিলিয়ে আমার ধারণা তিথি প্রেগন্যান্ট।"
কথাটা শোনামাত্র কাবিরের হাতের ফোনটা যেন তপ্ত কয়লা হয়ে গেল। তার সারা শরীর মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল না, বরং এক নিদারুণ শীতলতায় পাথর হয়ে গেল সে। খুশির বদলে তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক ভয়াবহ আতঙ্ক আর অবিশ্বাস। সাত মাস তিথি তার কাছে ছিল না, সে অন্য এক পরিবারে নূর হয়ে কাটিয়েছিল। এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এমন সংবাদ সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।
সে স্তব্ধ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা তিথির দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে কোনো ভালোবাসা নেই, বরং আছে একরাশ সংশয়। তিথি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। কাবিরের এমন পাথরের মতো শীতল আর কঠোর অবস্থা দেখে সে খুব ভয় পেয়ে গেল।
"কী হইছে? কথা কন না ক্যান? ডাক্তার কি খারাপ কিছু কইছে? আমার কি বড় কোনো অসুখ হইছে?"
কাবির চোখে এক কঠোর চাউনিতে তিথির দিকে তাকাল। সে এগিয়ে এসে তিথির পাশে বসল না, বরং কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। তার ঠোঁট কাঁপছে রাগে নাকি অপমানে, তা বোঝা দায়।
"ডাক্তার বলছে তুমি মা হতে চলেছ তিথি। কিন্তু..."
কাবির কথাটি শেষ করল না। তার মনে পড়ে গেল সেই সাত মাসের কথা। তিথির স্মৃতি ছিল না, সে কার সাথে ছিল, কীভাবে ছিল—এই সব দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। তিথি যখন খুশিতে নিজের পেটের ওপর হাত রাখল, কাবির তখন নিজের কপাল চেপে ধরে ঘরের দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তিথি বুঝতে পারল না কেন কাবির এমন আচরণ করছে। সে এগিয়ে গিয়ে কাবিরের হাত ধরতে চাইল, কিন্তু কাবির আলতো করে হাতটা সরিয়ে দিল।
"আজ রাতটা শেষ হতে দাও তিথি। আমার মাথা কাজ করছে না। আমি এটা মেনে নিতে পারছি না।"
সেই রাত তারা এক ঘরে কাটালো কিন্তু একসাথে না। তিথির চোখের জল এবার আর বাধা মানল না। যে সংবাদে আনন্দের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই সংবাদ আজ তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিল।
(চলবে...)