ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৩৭তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৩৭

#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

🍁

আজ জিমের বিয়ে, তাই সকাল সকালই সবাইকে রওয়ানা দিতে হবে পানিহাতা গ্রামের উদ্দেশ্যে। তিথি আজ নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছে। সে এখন অনেক বেশি সচেতন। গায়ের ওপর কালো রঙের একটি সুন্দর বোরকা, মাথায় হিজাব আর মুখে নিকাব টেনে সে নিজেকে আবৃত করে নিয়েছে। পর্দার আড়ালে তার সেই মায়াবী চোখ দুটো আজ ভিজে আছে অভিমানে।

উঠানে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কাবিরের পরনে আজ একটি গাঢ় লাল রঙের পাঞ্জাবি। লাল রঙে তাকে সব সময়ই ভীষণ সুদর্শন লাগে, কিন্তু আজ তার চেহারায় সেই চেনা স্নিগ্ধতা নেই, বরং রয়েছে সেই গম্ভীর ভাব। তিথি কয়েকবার কাবিরের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করল, তার চোখের দিকে তাকানোর তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষা করল, কিন্তু কাবির একবারের জন্যও তিথির দিকে ফিরে তাকালো না। তার এই পাথরের মতো শীতল আচরণ তিথির বুকে তীরের মতো বিঁধছে।

গাড়ি প্রথমে ধোবাউড়া থেকে ময়মনসিংহ সদরে গেল। সেখান থেকে আলতাফ রহমান এবং সারা ইয়াসমিনকে তুলে নিয়ে সবাই রওয়ানা দিল পানিহাতা গ্রামের দিকে। পুরোটা পথ তিথি গাড়ির জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। নিকাবের আড়ালে তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। যে মানুষটা একদিন তাকে এক মুহূর্ত না দেখলে পাগল হয়ে যেত, আজ সে পাশে বসে থেকেও কত দূরে

পানিহাতা গ্রামে পৌঁছানোর পর জিমের বাড়িতে আনন্দের ধুম পড়ে গেছে। আমজাদ মিয়া আর জিম তিথিকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। কিন্তু তিথি আজ আর আগের সেই চঞ্চল নূর নেই। সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। কাবিরের অবহেলা তাকে এতটাই আঘাত করেছে যে সে জেদ ধরে ফেলেছে, কাবির যদি তাকে না খুঁজে, তবে সেও কাবিরের সামনে যাবে না।

সারাদিন তিথি কাবিরের ছায়া থেকেও দূরে রইল। সে হয় প্রমার সাথে বিয়ের সাহায্য করছে, না হয় ছোট সাইফকে নিয়ে বাগানে বসে গল্প করছে। সাইফ তার নূর আপাকে পেয়ে খুশিতে আটখানা, কিন্তু তিথির মনটা পড়ে আছে সেই মানুষটার কাছে, যে আজ লাল পাঞ্জাবি পরে সবার মধ্যমণি হয়ে থাকলেও তিথির কাছে আজ অচেনা মানুষ

প্রমা তিথির বিষণ্ণতা বুঝতে পেরে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

"তিথি, কী হইছে তোর? ভাইয়ার সাথে কি আবার ঝগড়া করছিস? ও তো তোর দিকে তাকাইতাছেই না।"

"তাকাইব কেমনে প্রমা? উনার তো এখন আমারে দেইখা ঘেন্না লাগে। মানুষটা যে এত তাড়াতাড়ি পর হইয়া যাইব, আমি ভাবি নাই।"

তিথির গলায় অভিমানের সুর স্পষ্ট। সে মনে মনে ঠিক করেছে, কাবির নিজে থেকে এসে কথা না বলা পর্যন্ত সে এক পা-ও আগাবে না। ওদিকে কাবিরও নিজের মনের ভেতরের সেই বিষাক্ত সন্দেহ আর যন্ত্রণার সাথে যুদ্ধ করছে, যার ফলে সে তার প্রিয়তমার চোখের জলটুকুও দেখতে পাচ্ছে না। আনন্দের এই বিয়ের বাড়িতে দুই হৃদয়ের মাঝে তখন এক গভীর নিঃশব্দ আর্তনাদ বয়ে চলছে।

🦋

বিয়ের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা আর ভোজ শেষে এবার বিদায়ের পালা। এক বুক আনন্দ আর কিছুটা বিষণ্ণতা নিয়ে জিম এখন রানার জীবনসঙ্গিনী। ঠিক হয়েছে, ময়মনসিংহ পুলিশ স্টেশনের পাশেই কাবির যে অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া নিয়েছিল, সেখানে রানা আর জিম তাদের নতুন সংসার শুরু করবে। বিদায় বেলায় ছোট সাইফ যেন আকাশ ভেঙে কান্না শুরু করল। তিথিকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকবে না। তার এক কথা সেও বড় আপার সাথে শহরে যাবে।

সাইফের জেদ দেখে তিথি সিদ্ধান্ত নিল সাইফকে সে নিজের সাথেই নিয়ে যাবে। ছোট ভাইটার কান্না সে সইতে পারছিল না। এদিকে আমজাদ মিয়া আর রোজিনা বেগম আজ যেন নির্বাক হয়ে গেছেন। তাদের ঘরের দুই কলিজার টুকরো—জিম আর তিথি একসাথে বিদায় নিচ্ছে। রোজিনা বেগম আঁচলে চোখ মুছে বারবার তিথিকে জড়িয়ে ধরছেন। আমজাদ মিয়া বাড়ির কোণে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। এই পরিবেশটা তিথির সহ্য হচ্ছিল না। সে তার নিজের বুকের ভেতর পাহাড় সমান অভিমান চেপে রেখে সবাইকে হাসানোর চেষ্টা শুরু করল। নিকাবটা একটু ঠিক করে নিয়ে সে আমজাদ মিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল,

"আরে আব্বা! আপনি এমন শুরু করছেন কেন? আমি কি চিরতরে হারাইয়া যাইতেছি? জিম আপার লগে ঝগড়া করার মানুষ নাই দেইখা বুঝি বেশি মায়া লাগতাছে? চিন্তা করবেন না, জিম আপারে রানা ভাই এমুন জ্বালাতন জ্বালাইবো যে ও নিজেই আপনার কাছে দৌড়াইয়া আইবো।"

জিম কাঁদো কাঁদো মুখে তিথির দিকে তাকালো। তিথি এবার সাইফকে কোলে টেনে নিয়ে আমজাদ মিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।

"আর এই যে আপনার রাজপুত্র সাইফ, ওরে আমি নিয়া যাইতাছি। কয়দিন পর দেখবেন ওরে ছাড়াই আপনাদের শান্তি লাগতাছে। তখন ফোন দিয়া বলবেন মা তিথি, সাইফরে আর ফেরত পাঠাইও না!"

তিথির এই কথায় উপস্থিত সবাই একটু হেসে উঠল। এমনকি রোজিনা বেগমও চোখের জল মুছে মুচকি হাসলেন। তিথি হাসিমুখে সবার কাছ থেকে বিদায় নিল, জিমকে সান্ত্বনা দিল। কিন্তু তার নিজের হাসিটা ছিল শুধুই মেকি।

সবার বিদায় শেষ করে সবাই যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছে, তিথি আড়চোখে দেখল কাবির তখনো দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই লাল পাঞ্জাবি পরা মানুষটা সবার সাথে কথা বলছে, জিমকে দোয়া দিচ্ছে, কিন্তু তিথির দিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিথি সাইফের হাত শক্ত করে ধরে গাড়িতে উঠে বসল।

সে মনে মনে ভাবল,

"সবার মুখে হাসি ফুটাইতে পারলাম, কিন্তু আপনার মন থেইকা ওই পাথরটা সরাইতে পারলাম না। আপনি কি সত্যিই আমারে পর কইরা দিলেন?"

**********

গাড়ি ছুটছে ময়মনসিংহের পথে। পেছনের সিটে তিথি, সাইফ আর প্রমা বসে আছে। সামনের সিটে বসে আছেন তিথির বাবা মারুফ আহমেদ এবং কাবিরের বাবা আলতাফ রহমান। দুই বেয়াই গল্পে মশগুল থাকলেও পেছনের সিট থেকে তিথির অবিরাম হাসাহাসি আর বকবক সবার কানে আসছিল

তিথি নিজের মনের ভেতরের ক্ষত লুকাতে আজ যেন একটু বেশিই চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সে সাইফকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর জিম-রানার ভবিষ্যৎ নিয়ে কাল্পনিক সব গল্প বানিয়ে সবাইকে হাসিয়ে মারছে।

"আব্বা,আংকেল, শোনো! রানা ভাই তো পুলিশ মানুষ, বাসায় গিয়াও বোধহয় জিম আপারে ড্রিল করাইবো। সকাল বেলা ঘুম থেইকা ডাইকা বলবে—জিম! এটেনশন! জলদি নাস্তা বানাও! আর জিম আপা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলবে—ইয়েস স্যার, দুই মিনিটে পরোটা রেডি করতাছি!"

তিথির কথা শুনে মারুফ সাহেব আর আলতাফ সাহেব হোহো করে হেসে উঠলেন। প্রমা হাসতে হাসতে তিথির গায়ে গড়িয়ে পড়ে বলল

"তিথি, তুই পারিসও বটে! রানা ভাইয়াকে তো তুই একেবারে যম বানাইয়া দিলি।"

"আরে, রান্নার সময় যদি লবণে কম হয়, রানা ভাই নির্ঘাত জিম আপারে হাতকড়া পরাইয়া থানায় নিয়া যাইবো। জিম আপা তখন কানতে কানতে বলবে আমি নিরপরাধ, আমারে ছাইড়া দেন!"

হাসির রোল পড়ে গেল পুরো গাড়িতে। সাইফ তিথির কোল জাপটে ধরে হাসছে। কিন্তু হাসতে হাসতেই হুট করে তিথির কথা থেমে গেল। তার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে বনবন করে ঘুরে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে অন্ধকার নেমে এল। সে প্রমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিতে দিতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

প্রমা প্রথমে ভেবেছিল তিথি হয়তো হাসতে হাসতে ঢলে পড়েছে। কিন্তু তিথির শরীরটা যখন নিথর হয়ে তার ওপর আছড়ে পড়ল, প্রমা আঁতকে উঠে চিৎকার দিল।

"তিথি! তিথি কী হয়েছে তোর? কথা বলছিস না কেন? আব্বু,আংকেল! তিথি তো কেমন করতেছে!"

প্রমার চিৎকারে মারুফ সাহেব আর আলতাফ সাহেব চমকে পেছন ফিরে তাকালেন। তারা দেখলেন তিথির মুখটা নীল হয়ে গেছে, চোখ দুটো বোজা। মারুফ সাহেব মেয়ের এমন অবস্থা দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি গাড়ি থামাতে বলে পাগলের মতো তিথির নাম ধরে ডাকতে লাগলেন।

ছোট সাইফ কিছু বুঝতে না পেরে তিথির হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিতে লাগল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

"নূর আপা! ও নূর আপা, উঠো না! তুমি কি আমার লগে রাগ করছো? আমি আর শহরে যামু না, আমারে নামাইয়া দাও! তুমি এমন কইরা ঘুমাও কেন?"

মারুফ সাহেব তিথির দিকে তাকাতেই কেঁপে উঠে। কাবিরের গাড়িটা কিছুটা সামনে ছিল, প্রমার ফোন পেয়ে কাবির যখন গাড়ি থামিয়ে পেছনের গাড়ির দিকে দৌড়ে এল, তার বুকের ভেতরটা তখন অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল। পাথরের মতো জমে থাকা কাবির যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

----

----

----

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোর।তিথিকে ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাওয়ার পর সবার প্রাণ যেন বেরিয়ে যাওয়ার মতো উপক্রম। কাবির দেয়ালের এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার লাল পাঞ্জাবিটা আজ যেন রক্তের মতো দেখাচ্ছে। মনে মনে সে এক ভয়াবহ দোটানায় জ্বলছে।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার রাহা কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখে এক চিলতে হাসি। সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন,

"ভয়ের কিছু নেই। আসলে ধকল আর জার্নির কারণে প্রেসার কমে গিয়েছিল। আর এই অবস্থায় একটু সেনসিটিভ থাকাটাই স্বাভাবিক। আপনারা খুশি হতে পারেন, তিথি মা হতে চলেছে।"

কথাটা শোনামাত্র মারুফ সাহেব আর তানিয়া বেগম একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। সারা ইয়াসমিন খুশিতে আলতাফ সাহেবকে বললেন,

"শুনেছেন? আমাদের বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে!"

জিম আর প্রমা তো খুশিতে কেঁদেই ফেলল। তারা সবাই এক এক করে ভেতরে গিয়ে তিথির পাশে বসল

কাবির তখনও দরজার বাইরে স্থির। তার কানে ডাক্তার রাহার কথাগুলো যেন বিষের মতো বিঁধছে। সে কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারছে না। তার মনে বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তিথি যখন তার কাছে ছিল না, তখন কী হয়েছিল? এই অবিশ্বাসের বিষ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।

তিথি বেডে শুয়ে সবার আনন্দ দেখছিল। কিন্তু তার চোখ দুটো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে খুঁজছিল। সে দেখল কাবির ভেতরে ঢুকছে না। তিথি নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে বসল এবং সবার সামনেই ক্ষীণ স্বরে ডাকে,

"আপনি ভেতরে আসবেন না? সবাই তো কত খুশি, আপনি কি খুশি হন নাই?"

সবাই তখন কাবিরের দিকে তাকাল। কাবিরের মা সারা ইয়াসমিন বললেন,

"বাবা কাবির, তোর কী হয়েছে? তুই কি শুনতে পাসনি? তুই বাবা হতে চলছিস!"

কাবির এবার ধীরপায়ে ভেতরে এল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সে তিথির বিছানার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সবার উপস্থিতিকে তোয়াক্কা না করেই সে অত্যন্ত শীতল আর কঠোর কণ্ঠে বলল,

"খুশি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমি হতে পারছি না। তিথি, তুমি যে সন্তানের কথা বলছো, আমি এই বাচ্চা মানি না। এই বাচ্চার দায়ভার আমি নেব না।"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। তানিয়া বেগম আর মারুফ সাহেব শকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। প্রমা অবিশ্বাসের চোখে তার ভাইয়ের দিকে তাকাল। তিথির মনে হলো কেউ যেন তার কলিজাটা জ্যান্ত ছিঁড়ে ফেলেছে। সে কাঁপাকাঁপা হাত দিয়ে নিজের পেটটা আঁকড়ে ধরল।

"আপনি... আপনি এইটা কী বলতেছেন? আপনার নিজের রক্তের ওপর আপনার বিশ্বাস নাই? সাত মাস আমি কার লগে ছিলাম, কারে আব্বা-আম্মা ডাকছি, তা কি আপনার দেখা বাকি আছে?"

"সাত মাস অনেক লম্বা সময় তিথি! আমার মস্তিষ্ক অনেক কিছু বলে যা আমার মন মানতে চায় না। আমি এই অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে পারবো না।"

মারুফ সাহেব এবার গর্জে উঠলেন,

"কাবির! মুখ সামলে কথা বলো। আমার মেয়ে পবিত্র, তার চরিত্রের ওপর কথা বললে আমি সহ্য করবো না।"

কাবির আর কোনো কথা না বলে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল এক বিধ্বস্ত তিথি আর একরাশ স্তব্ধ মানুষ। যে আনন্দ নিয়ে সকাল হয়েছিল, সেই রাত নামার আগেই তিথির পৃথিবীটা এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

🦋

ভোরের আলো ফোটার আগেই ধোবাউড়ার আকাশটা মেঘলা হয়ে এল। সারা রাত তিথির চোখের পাতা এক হয়নি। সে বিছানার এক কোণে কুঁকড়ে পড়ে ছিল, আর কাবির ছিল ঘরের অন্য প্রান্তে জানালার কাছে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। যে মানুষটা কাল রাত পর্যন্ত তিথির নিশ্বাসের শব্দেও ব্যাকুল হতো, আজ সে যেন এক অচেনা মানুষ।

সকাল হতেই কাবির কাউকে কিছু না বলে, এমনকি তিথিকে একটি বার না জানিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দে তিথি জানালার কাছে দৌড়ে এল, কিন্তু দেখল শুধু ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা চলে যাচ্ছে। কাবির একবার পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করল না।

তিথির বুকটা ফেটে কান্না এল। সে দেয়াল ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

"মানুষটা কি আমাকে একটুও বিশ্বাস করতে পারল না? সাত মাস আমি পাহাড়ের কোলে স্মৃতিহীন অবস্থায় কাদের বাবা-মা ডেকেছি, সেটা কি উনার চোখে পড়ল না? শুধু সন্দেহটাই বড় হয়ে গেল? যাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখলাম, সেই মানুষটা আজ আমাকে অপবিত্র ভেবে চলে গেল?"

তানিয়া মিথু রুমে ঢুকে মেয়েকে মেঝেতে বসে কাঁদতে দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দ্রুত গিয়ে তিথিকে জড়িয়ে ধরলেন।

"কী হয়েছে মা? কাঁদছিস কেন? কাবির কোথায়?"

তিথি মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্না যেন থামছেই না। এই কান্নায় যতটা শারীরিক কষ্ট, তার চেয়েও বেশি ছিল মানসিক অপমান।

~

সকাল গড়িয়ে দুপুর। প্রমা কলেজের কাজে বেরিয়ে গেছে। তিথি নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। সে বারান্দার টবে থাকা গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে, শুকনো পাতা ছিঁড়ে ফেলছে। আজ যেন গাছগুলোর দিকে তাকিয়েও তার কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সে নিজেও একটা উপড়ানো গাছের মতো, যার শিকড় আজ ছিঁড়ে গেছে। মা রান্নাঘরে কাজ করছেন, তিথিও সেখানে গিয়ে হাতে হাতে সাহায্য করছে। কাজ না করলে তার মস্তিষ্ক যেন বিষাক্ত সব চিন্তায় নীল হয়ে যাচ্ছে।

দুপুরের খাবারের টেবিলে মারুফ সাহেব, তানিয়া মিথু আর তিথি, সাইফ একসাথে বসেছেন। মারুফ সাহেব মেয়ের শুকিয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে খুবই কষ্ট পেলেন। তিনি খাওয়া থামিয়ে কোমল স্বরে বললেন,

"মা রে, মানুষের জীবনে ঝড় আসে তাকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং তাকে আরও শক্ত করার জন্য। আমি ভাবছিলাম, তুই যদি চাস তবে আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষাটা দিতে পারিস। মাঝখানে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, কিন্তু এখন আবার শুরু করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কী বলিস মা, দিবি তো পরীক্ষাটা?"

তিথি ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে রইল। নোনা জল গড়িয়ে ভাতের ওপর পড়ল। সে হাত দিয়ে চোখের জল মুছে শান্ত গলায় বলল,

"হ্যাঁ বাবা, আমি পরীক্ষা দেব। যে মানুষটা আমাকে বিশ্বাস করতে পারে না, তার ওপর নির্ভর করে আমি আমার জীবন নষ্ট করতে পারি না। আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে বাবা। আমার জন্য টেস্ট পেপার আর বইয়ের ব্যবস্থা করো, আমি কাল থেকেই পড়া শুরু করব।"

তানিয়া মিথু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আর্দ্র গলায় বললেন,

"হ্যাঁ মা, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। আমার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে। এই সাত মাস তোকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। অনেক তো হলো অন্যের জন্য চোখের জল ফেলা, এবার নিজের জন্য বাঁচতে শেখ। আমরা তো আছি তোর সাথে।"

তিথি মুখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। কিন্তু মনের গহীনে এক গভীর হাহাকার রয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল,

"আমি নিজেকে তৈরি করব দেখে নিয়েন মি.কাবির। একদিন আপনি ঠিকই আপনার ভুল বুঝবেন, কিন্তু সেদিন হয়তো এই তিথিকে আর আগের মতো খুঁজে পাবেন না।"

-

-

-

সন্ধ্যা ঘনিয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলো। প্রহর কাটছে কিন্তু কাবিরের একটা ফোন বা মেসেজ কিছুই এলো না। মাগরিবের আজান শুনে তিথি ধীরপায়ে ওযু করে জায়নামাজে গিয়ে দাঁড়ালো। মোনাজাতের সময় তার দুচোখ বেয়ে লোনা জল গড়িয়ে জায়নামাজ ভিজে যাচ্ছিল। সে দুই হাত তুলে পরম করুণাময়ের কাছে ফিসফিস করে বলতে লাগল,

"হে আল্লাহ, আপনি তো অন্তর্যামী। আপনি জানেন আমি পবিত্র, আমার মনে কোনো পাপ নেই। আপনি আমার স্বামীকেও জানেন। তার মনে যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে, সেটা ভেঙে দিন। আমি তাকে খুব ভালোবাসি আল্লাহ। আমার অনাগত সন্তানের জন্য হলেও আপনি তাকে সঠিক পথ দেখান। আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই যে কাবিরকে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন আল্লাহ।"

নামাজ শেষ করে জায়নামাজ ভাজ করে সে ঘরে ঢুকল। দেখল প্রমার সাথে রোনা ঢোকলো। কাবিরের কলেজ ফ্রেন্ড। রোনার বিয়ে হয়েছে আহনাফের সাথে, তারা এখন বেশ সুখী দম্পতি। রোনা তিথিকে দেখেই একগাল হেসে উঠে দাঁড়াল।

"কী তিথি! আমার আগেই তো দেখছি বাজি মেরে দিলে! তা আমাদের কাবির কোথায়? আজও কি তোমার মতো এই পিচ্চিটাকে ছেড়ে সে কাজে ব্যস্ত?"

তিথির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। রোনা জানে না যে কাবির তাকে ডিউটির জন্য নয়, বরং অবিশ্বাসের টানে ছেড়ে গেছে। তিথি নিজের কষ্ট আড়াল করে ম্লান হেসে বলল,

"উনি একটু ব্যস্ত আছেন আপু। তুমি বসো, আমি আসছি।"

"তিথি, তুই কি কিছু খেয়েছিস আজ? মুখটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শরীরটা কি বেশি খারাপ লাগছে?"

"হ্যাঁ তিথি, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে। একদমই ভালো দেখাচ্ছে না তোমাকে।"

এমন সময় তানিয়া বেগমের সাথে ঘরে ঢুকলেন কাবিরের মা সারা ইয়াসমিন। উনার হাতে এক বাটি গরম স্যুপ আর এক প্লেট নুডলস। সারা ইয়াসমিন তিথির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কাবিরের এই রহস্যময় আচরণের জন্য তিনিও মনে মনে খুব লজ্জিত।

"মা রে, কারো ওপর রাগ করে নিজের শরীর নষ্ট করতে নেই। নে, এই স্যুপটা আর নুডলসটুকু খেয়ে নে তো। আমি নিজ হাতে তোকে খাইয়ে দিচ্ছি।"

তিথির চোখের কোণে পানি জমে উঠল। কাবির তাকে অবহেলা করে দূরে সরিয়ে দিলেও, তার মা তাকে নিজের মেয়ের মতোই আগলে রাখছেন। তিথি মনে মনে ভাবল,

"ভাগ্য আমার সাথে অনেক নিঠুর খেলা খেলছে, কিন্তু এই মায়াগুলোই হয়তো আমাকে বেঁচে থাকার শক্তি দিচ্ছে।"

--------

রাত তখন দশটা। কাবির তার চেম্বারের ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনে রাখা ফাইলগুলোর স্তূপ এখন তার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছে। মনের ভেতরের সন্দেহের বিষ আর সাত মাসের বিচ্ছেদের হাহাকার তাকে এক মুহূর্ত স্থির থাকতে দিচ্ছে না।

হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। তিথি নামটা দেখে কাবিরের বুকটা ধক করে উঠল। সে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল, কিন্তু পাথরের মতো চুপ করে রইল। ওপাশ থেকে তিথির সেই অতি চেনা মায়াবী কণ্ঠ ভেসে এল।

"আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন পুলিশ সাহেব?"

কাবির কোনো উত্তর দিল না। তার এই নীরবতা তিথির বুকে তীরের মতো বিঁধলেও সে দমে গেল না। তিথি ওপাশ থেকে গুনগুন করে গেয়ে উঠল তাদের প্রিয় সেই গান,

"ও… যত বলি ভুলে যেতে, মন কথা শোনে না।

চোখেরই আকাশে সেই, বৃষ্টি যে থামে না।

তুমি চির সুখী হবে, কান্না মোছ তবে,

অভিমানিনী…

ভাঙ্গা স্বপ্ন ডেকে যায়, মনে পড়ে যায়,

প্রেমের কাহিনী…"

গানের প্রতিটি কলি নিস্তব্ধ থানায় কাবিরের কানে আছড়ে পড়ছে। গান শেষ হলে তিথি ধরা গলায় বলল,

"এখনো কি কথা বলবেন না? আমি কি এতটাই পর হয়ে গেছি যে আমার গানের সুরও আপনার কানে পৌঁছায় না?"

"খেয়েছো?

"কথার ক্ষুধা ভাতে মিটলে আর আপনার জন্য এভাবে অপেক্ষা করতে হতো না পুলিশ সাহেব। আপনার একেকটা কথা তো আমার পেটের ক্ষুধার চেয়েও বেশি জ্বালা দেয়।"

কাবির মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তিথির গলার অভিমান তাকে বুঝিয়ে দিল সে কতটা কষ্টে আছে। কাবির নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

"হেয়ালি না করে যা বলছি তার উত্তর দাও। খেয়েছো কি না?"

"আমি তো খেয়েছি, কিন্তু আপনি কি থানার ওসিসির সাথে ঝগড়া করে না খেয়ে বসে আছেন?"

কাবির একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না। সে ফোনটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে এমন এক কথা বলল যা পৃথিবীর কোনো স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে আশা করে না।

"তিথি, মজা করো না। আমি ভাবছিলাম... ওই বাচ্চাটা কি নষ্ট করা যায় না?"

মুহূর্তের মধ্যে তিথির পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইল, তারপর তীব্র অভিমানে ফেটে পড়ল।

"নষ্ট তো আপনি ওইদিনই করে দিয়েছেন পুলিশ সাহেব, যেদিন আমাকে অবিশ্বাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু আমার পেটের এই বাচ্চাটা নষ্ট করার অধিকার আপনার নেই। কারণ আপনার কাছে যেটা সন্দেহের বীজ মনে হচ্ছে, আমার কাছে সেটা আমার পবিত্রতার শেষ সম্বল। আপনি যদি এই বাচ্চাকে স্বীকার করতে না পারেন, তবে জেনে রাখুন আপনার এই তিথিকেও আর কোনোদিন খুঁজে পাবেন না। আমার মরা মুখ দেখার শখ থাকলে কাল সকালেই চলে আইসেন।"

তিথির এই তীব্র কথাগুলো শুনে কাবিরের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, সন্দেহের বশে সে কত বড় একটা মরণাঘাত করে ফেলেছে। তিথি ফোনটা কেটে দিল। ফোনের ওপাশে কেবল শূন্যতা, আর এপাশে কাবিরের চোখে প্রথমবার অপরাধবোধের নোনা জল টলটল করে উঠল।

বিঃদ্রঃ কাবির কী তিথিকে মেনে নিবে নাকি তারা একে অপর থেকে আলাদা হয়ে যাবে??

(চলবে....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন