#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৩৯
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
আজ কাবির অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। তিথিদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে তিথিকে কাবির তাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে বলে ঠিক করল। ছোট সাইফও নাছোড়বান্দা, সেও সাথে যাবে। অগত্যা তাকেও গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো। তবে কাবিরের মনে অন্য কোনো পরিকল্পনা কাজ করছিল। সে গাড়ি চালিয়ে সরাসরি জিম আর রানার নতুন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল।
গাড়িতে বসে তিথি যখন দেখল কাবির পরিচিত রাস্তা ছেড়ে অন্য পথে যাচ্ছে, তখন তার মনে খটকা লাগল। সে ভ্রু কুঁচকে কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কি ব্যাপার? আপনি এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন কেন? আমাকে কি পাচার করে দিবেন নাকি?"
কাবির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে একটু বাঁকা হাসল। আয়নায় নিজের চুলগুলো একবার ঠিক করে নিয়ে সে রসিকতা করে বলল,
"হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। তোমাকে পাচার করে দিয়ে এবার একটা নতুন ডানাকাটা পরী নিয়ে আসবো।"
তিথি এই কথা শুনে রাগে ফোঁস করে উঠল। অভিমানে তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল।
"কি বললেন? পরী নিয়ে আসবেন? এহ্, কত শখ! মুরুব্বির কথা শোন একবার। কদিন পরেই বাচ্চার বাপ হবেন, আর এখন নতুন করে বিয়ে করার শখ জেগেছে?"
"কেন নয়? আর মুরুব্বি কাকে বলছো শুনি। আমি যথেষ্ট ইয়াং।আর ইসলামে চারটা বিয়ে করা তো সুন্নাত। আমি না হয় নিয়ম মেনেই আরেকটা..."
তিথি আর সহ্য করতে পারল না। সে চিৎকার করে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছনের সিট থেকে চিপস চিবোতে চিবোতে সাইফ বলে উঠল,
"হুম, পুলিশ আঙ্কেল! তুমি যদি আপাকে ছেড়ে দাও তবে দিও। আমি আপাকে আমার কাছেই রাখবো। আমার আপা অনেক সুন্দর।"
কাবির আয়নায় সাইফের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
"শালা! তুমি তো দেখছি বেশ বেড়েছ। আমার সামনেই আমার বউকে ভাগিয়ে নেওয়ার ফন্দি করছ?"
"তুমি শুধু আপাকে কষ্ট দাও, তাই কইলাম।"
কাবির এবার গাড়ি থামিয়ে জিমদের বাসার নিচে নামল। তিথি জেদ করে গাড়ি থেকে নামল না। কাবির সাইফকে কোলে করে উপরে জিমদের ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। জিমকে ডেকে সে চুপিচুপি বলল যে সাইফ এখন থেকে তাদের কাছেই থাকবে। ওর পড়াশোনা যেন ঠিকমতো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলল। বিদায়বেলায় জিমের হাতে কিছু টাকাও দিয়ে আসল কাবির।
কাবির ফিরে এল। তার পরনে ছিলো আজ ফরমাল ড্রেসআপ কালো রংয়ের শার্ট আর প্যান্ট। শার্টের ওপরের তিনটা বোতাম খোলা থাকায় তাকে বেশ সুদর্শন লাগছিল। কপালে অবাধ্য কয়েকটা চুল বারবার নেমে আসছিল যা সে বারবার হাত দিয়ে সরাচ্ছিল। তিথি দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিল। মনে মনে নিজেকে শক্ত হতে বলল যেন এই পাষাণ লোকটির প্রেমে সে আর না পড়ে।
কাবির গাড়িতে উঠে একটা বড় ব্যাগ তিথির কোলের ওপর রাখল। তিথি ব্যাগ খুলে দেখল সেখানে আমের, তেঁতুলের আর বড়ইয়ের হরেক রকমের আচার। আচারের সুবাসে তিথির জিভে জল চলে এল, কিন্তু সে মুখ গোমড়া করেই বসে রইল।
"কেউ কি রাগ করেছে নাকি? কেমন যেন পোড়া পোড়া স্মেল পাচ্ছি!"
"ইয়ে... বয়েই গেছে আমার রাগ করতে । কার উপর রাগ করবো? যে মানুষটা নিজের ছাড়া কারও কথা ভাবে না, তার জন্য?"
"তাই বুঝি? তাহলে আমি যে ভাবলাম আজ আমার বিবিজানের সাথে পুরোটা সময় কাটাবো..."
তিথি চুপ করে রইল। কাবির গাড়ি স্টার্ট দিয়ে আবার দুষ্টুমি শুরু করল।
"
হুম, যদি না চাও তবে সমস্যা নেই। তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আমি সেই সুন্দরী লেডিটার সাথে ডেটে যাবো, যে কদিন আগে পুলিশ স্টেশনে এসে আমাকে প্রপোজ করেছিল।"
তিথি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ভেউ ভেউ করে কেঁদে দিল।
"আপনি খুব... খুব খারাপ! ভীষণ পচা! আপনি কি আমায় একটুও ভালোবাসেন না? আমি বুঝি আর সুন্দর দেখতে নেই, তাই না?"
কাবির তৎক্ষণাৎ গাড়ি রাস্তার একপাশে থামিয়ে দিল। তিথির কান্না দেখে তার মনটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। সে এক হাতে তিথির হাতটা শক্ত করে ধরে অন্য হাতে তার চোখের জল মুছে দিল।
"ডোন্ট ক্রাই মাই সুইট বিবিজান। আই উইল বি উইথ ইউ ফরএভার অ্যান্ড অলওয়েজ। আই এম জাস্ট কিডিং ইউ, সুইটহার্ট!"
কাবির তিথির নরম তুলতুলে হাতটা তার গালে সাথে লাগিয়ে ছোট্ট করে চুমু খেল। তিথির রাগ অভিমান নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। সে বোরকার দিয়ে নিজের বাম হাতটা পেটের উপর বুলাতে থাকে।
বেলা তখন বারোটা। গাড়ি এসে থামল কাবিরের নিজের বাড়ির সামনে। কাবির গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে গিয়ে তিথির জন্য দরজা খুলে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক স্টাইলিশ মেয়ে, যে দেখতে ভীষণ সুন্দরী, ছুটে এসে কাবিরকে দেখেই চিৎকার করে উঠল,
"ওহ্ কাবির জান! তুমি এসেছ! আই মিস ইউ সো মাচ,বেবি।"
বলেই মেয়েটি তিথিকে অবাক করে দিয়ে কাবিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তিথি পাথরের মতো স্থির হয়ে গাড়িতে বসে রইল। তার চোখের সামনে এ কী দৃশ্য! তবে কী সত্যি কাবির তাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বেছে নিবে!
(চলবে...)