#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৪০
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
সাবা নামের সেই স্টাইলিশ মেয়েটি কাবিরকে একরকম জড়িয়ে ধরেই টানতে টানতে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে লাগল। সাবা আধো-আধো ঢং করা কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
"কাবির বেবি! তুমি কোথায় ছিলে বলো তো? আমি সেই ২ আওয়ার্স আগে আসছি! হাউ কুড ইউ মেক মি ওয়েট সো লং?"
কাবির প্রতিবাদ তো করলই না, বরং আড়চোখে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তিথির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মুচঁকি হাসি দিল। তারপর সাবাকে নিয়ে গটগট করে অরণ্য কুটিরের ভেতরে চলে গেল। তিথির বুকের ভেতরটা অপমানে আর রাগে জ্বলে উঠল। সে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ঢুকে। কারো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি প্রমার রুমের দিকে চলে গেল।
প্রমা তখন কলেজে। তিথি রুমে ঢোকার আগে দেখল ড্রয়িংরুমে সাবার মা-বাবা আর ভাই বসে আছে। কাবিরের বাবা আলতাফ রহমানের বিশাল ব্যবসা। ময়মনসিংহের সদরে তাঁর কাঁচের শোপিস এবং নানাবিধ ঘর সাজানোর জিনিসের বিশাল কোম্পানি আছে। আলতাফ রহমান ও সারা ইয়াসমিন তিথির দিকে একবার তাকালেন ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মেহমানদের সাথে আলাপে মগ্ন হয়ে গেলেন।
আলতাফ রহমানের চাচাতো ভাই সাইমন রহমান। সাইমনের বাবা-মা অনেক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। সাইমন রহমান এখন সপরিবারে লন্ডনে থাকেন। তাঁর স্ত্রী আয়েশা আফরোজ বেশ মার্জিত নারী। তাঁদের বড় ছেলে সাবির (২৬), যে এখন সাইমন রহমানের কোম্পানির সিইও হিসেবে কাজ করছে। আর মেয়ে হলো এই সাবা (২২), যার পড়াশোনা শেষ।
ইতালিতে থাকার সময় কাবিরের সাথে সাবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দেখা হয়েছিল। সাবা বিভিন্ন অযুহাতে কাবিরের সাথে দেখা করতে যেত এবং একতরফাভাবে তাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
সাবা ড্রয়িংরুমে বসে নিজের সিল্কি চুলগুলো দুলিয়ে, ছোট হাতকাটা ড্রেসটা ঠিক করতে করতে বলল,
"আঙ্কেল, আমি কাবিরকে অনেক লাভ করি! আর আমি চাই ও এখন সব সময় আমার পাশে থাকুক। আই ওয়ান্ট হিম টু বি বাই মাই সাইড অল দ্য টাইম।"
সাইমন রহমান তাঁর ভাই আলতাফকে মিনতি করে বললেন,
"ভাইয়া, মেয়েটা যখন এত করে বলছে, থাকুক না কয়েকটা দিন কাবির ভাইয়ার সাথে। না করো না।"
সারা ইয়াসমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"আপনাদের কথা বুঝতে পেরেছি। বড় ভাই, যদি কাবির চায় তবে আমাদের সাবার এখানে থাকা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই।"
কাবির এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। সে একবার সাব্বির রহমানের দিকে তাকাল, যে একসময় ইতালিতে কাবিরকে খুব বড় একটা বিপদ থেকে উদ্ধার করে সাহায্য করেছিল। সাবিরের সেই উপকারের কথা মনে করে কাবির সাবার দিকে তাকিয়ে বলল—
"সাবির একটা সময় আমাকে অনেক বড় উপকার করেছিল,সাবা উইল স্টে হিয়ার উইথ আস।"
সাবির স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
"আই অ্যাম রিয়েলি গ্রেটফুল ভাইয়া! মাই সিস্টার ইজ ইন আ ব্যাড মেন্টাল স্টেট, প্লিজ টেক কেয়ার অব হার। বাবা, চলো এবার।"
সারা ইয়াসমিন আতিথেয়তায় কোনো কমতি রাখতে চাইলেন না। তিনি বললেন,
"আরে ভাই, খেয়ে যান। রান্না প্রায় শেষ।আজকের মেনুতে আছে সরষে ইলিশ, খাসির রেজালা, সাদা ভাত আর স্পেশাল কাঁচকলা দিয়ে ইলিশের ঝোল।"
অন্যদিকের তিথি প্রমার রুমে গিয়ে মাথায় প্রায় ২০ মিনিট ধরে পানি দিল। তার মাথাটা রাগে ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে পেটের ওপর হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
"এই শোন পিচ্চি! তুই যখন পেট থেকে বের হবি, তোর ওই রাক্ষস বাপকে একদম আব্বু ডাকবি না, বুঝছিস? আমাকে এখানে এনে উনার গার্লফ্রেন্ডের সাথে মিট করাচ্ছে? বলুক না যে আর ভালোবাসে না, এত ঢং করার কী দরকার!"
সে ব্যাগ থেকে কাবিরের দেওয়া আচারের প্যাকেটটা বের করে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল।
"কেন খাব ওনার আচার? লোক দেখানো কেয়ার করেন শুধু।"
তিথি প্রমাকে কল দিয়ে বলল,
"আমার মাথা খারাপ হওয়ার আগে তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।আর শুন আহনাফ ভাইয়া,রেনা আপু, সাদ্দাম ভাইয়া উনাদেরও আজ আসতে বলবি, আরেকটা কথা আসার সময় কয়েক বস্তা তেতুঁলের আচার নিয়ে আসবি।"
বলেই কলটা কেটে দিলো। প্রমা ক্যান্টিনে ছিলো দ্বিতীয় পিরিয়ড চলছে। তিথির কথা এখনও তার কানে বাজছে। মাথাটা ভনভন করছে তাই সে না পেরে সাদ্দামকে ফোন দিয়ে বলে,
"কী লেকচারার সাহেব, লেকচার দিতে দিতে তো আমাকেই ভুলে গেছের সেই এক মাস আগে কথা বলছিলেন। আর কোনো পাত্তা নেই। কাহিনী কী বলেন তো।"
সাদ্দাম দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
"প্রমা আব্বু আম্মু আমার বিয়ে ঠিক করেছে। "
কথায় প্রমার কানে যেতেই প্রমা হিরহির করে বলল,
"তাহলে এতো দিন কেন আশা দিয়ে রেখেছিলেন সাদ্দাম ভাই।আমি তো কখনও কিছু নিয়ে বিরক্ত করি নি আপনাকে, তাহলে কেন করলেন এমন! "
সাদ্দাম হু হা করে হেসে বলল,
"ওহ প্রমা তুমিও না, পিচ্চিই আছো। এখন বলো কোনো দরকারে কল দিয়েছো! আমার আবার ২টা থেকে লেকচার ক্লাস আছে।"
প্রমা নাক টানতে টানতে বলে,
"সামনে পাই আপনাকে এরপর বোঝাবো।"
সাদ্দাম হতাশ স্বরে বলে,
"এইবার বলবে পিচ্চি রানী আমাকে ক্লাসে যেতে হবে তো।"
প্রমা আহ্লাদি গলায় বলে,
"তিথি, আহনাফ ভাইয়া,রোনা আপু,আপনাকে আজকে মধ্যেই আসতে বলেছে। আসবেন তো!"
সাদ্দাম দুষ্ট হেসে বলে,
"হবু বউ বলেছে না এসে কী পারি। তবে পৌঁছাতে লেট হবে বিকেল পাঁচটা বেজে যেতে পারে। আচ্ছা রাখি। টেক কেয়ার।"
এরই মধ্যে তিথির শরীরটা বেশ ভারী লাগছে।রাইনা ডাইনীর যেতে না যেতেই আরেক পেত্নী এসে হাজির হয়েছে। জোহরের আজান দিতেই তিথি নিজেকে শান্ত করে জায়নামাজে দাঁড়াল।
খাবার টেবিলে সাবা কাবিরের পাতে বারবার খাবার তুলে দিচ্ছে।<
"কাবির,তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না।তুমি যদি না খাও, ইউ উইল গেট সিক!"
কাবির একবার ধমক দিতে গিয়েও সাবিরের উপকারের কথা মনে করে নিজেকে সামলে নিল। সে যান্ত্রিকভাবে বলল,
"সাবা, তুমি তোমার খাবার খাও। আই অ্যাম ইটিং।"
আলতাফ রহমান সারা ইয়াসমিনকে বললেন,
"সারা, তিথিকে খাবার দিয়ে আসো। মেয়েটা কী করছে দেখো গিয়ে।"
সারা ইয়াসমিন কাজের মেয়ে জোরিনাকে সাথে নিয়ে তিথির জন্য খাবার পাঠাতে রান্নাঘরে ঢুকলেন। তখন আয়েশা আফরোজ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
"ভাইয়া, ওই তিথি মেয়েটা আসলে কে?"
কাবির চুপ করে রইল। আলতাফ রহমান কাবিরের দিকে একপলক তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
"তিথি হলো আমাদের বাড়ির বড় বৌমা।"
কথাটা শোনামাত্র সাবা চিৎকার করে উঠল। সে হাতের চামচটা টেবিল ঠুকে দিয়ে বলল,
"কাবির! আমি যেটা শুনলাম ওইটা কি সত্যি?টেল মি, অর আই উইল কাট মাই রিস্ট!"
কাবির ঠান্ডা গলায় বলল,
"রিলেক্স, সাবা!"
সে সাবার হাত থেকে চামচটা কেড়ে নিয়ে নিচে রাখল। সাবা স্বভাবজাত ঢঙে কাবিরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,,,,,,
"আই লাভ ইউ সো মাচ কাবির! আই কান্ট লিভ উইদাউট ইউ!"
কাবির সাইমন রহমান আর সাবিরের অস্বস্তিকর চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে সাবার মাথায় হাত রাখল। তিথির ওপর নিজের অভিমান আর সাবিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা—সব মিলিয়ে সে বলে ফেলল,
"ডোন্ট ওরি সাবা। আই উইল অলওয়েজ বি উইথ ইউ।"
"সারাজীবন থাকবে তো?"
"হ্যাঁ, সারাজীবন থাকব।"
কাবিরের চোখ দুটো তখন রাগে আর জেদে লাল হয়ে আছে। দরজার আড়াল থেকে এই পুরো ঘটনাটা তিথি অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল। সে বুঝতে পারল, কাবির তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই পরিকল্পিতভাবে এখানে এনেছে। তিথির দুচোখ ফেটে জল এল, কিন্তু সে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলাল। তখনই সারা ইয়াসমিন তিথিকে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফেললেন।
"তিথি? তুই এখানে দাঁড়িয়ে কেন মা? নিচে আয়, চল সবাই মিলে একসাথে খাবি।"
সারা ইয়াসমিন তিথির হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে বসালেন। তিথির পরনে তখন নামাজের হিজাব, মুখটা খোলা থাকায় তার স্নিগ্ধ মায়াবী রূপটা যেন আরও বেশি ফুটে বের হচ্ছে। সাবির এতক্ষণ নিজের বোনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও, তিথিকে দেখা মাত্র সে যেন থমকে গেল! লন্ডনে সে কত শত আধুনিক মেয়ে দেখেছে তার হিসেব নেই, কিন্তু তিথির মতো এমন মায়াবতী মেয়ে সে আজ পর্যন্ত দেখেনি। তিথিকে সাবিরের ঠিক পাশের চেয়ারেই বসতে দেওয়া হলো।
"মা, এই যে ইনি হচ্ছেন তোর বাবার চাচাতো ভাই, তোর চাচা শ্বশুর। আর এই হলো তোর চাচি শাশুড়ি আর এ হলো সাবা তোর আপু ও হলো সাব্বির তোর ভাই।"
তিথি মনে মনে ভাবল, "দাঁড়াও লন্ডনী পেত্নী, তোমাকে আন্টি ডাক দিয়ে তোমার বয়স ১০ বছর বাড়িয়ে দিচ্ছি!"
সে সাবার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
"আসসালামু আলাইকুম আন্টি! কেমন আছেন? খাচ্ছেন না কেন? আম্মু, তুমি ওনাকে কিছু দিচ্ছ না কেন? আন্টি তো একদম শুকনো হয়ে যাচ্ছেন!"
তিথির মুখে আন্টি ডাক শুনে সাবার চেহারার রঙ মুহূর্তেই পাল্টে গেল। সারা ইয়াসমিন তিথির দুষ্টামি বুঝতে পেরে সাবার পাতে আরও এক পিস মাছ তুলে দিয়ে বললেন,
"হ্যাঁ রে তিথি ঠিকই বলেছে, সাবা তুমি তো কিছুই খাচ্ছ না!"
সারা ইয়াসমিন সাবার পাতে আরও এক পিস মাছ তুলে দিতেই সাবার রাগে গা রি রি করে উঠল। সে আয়েশা আফরোজের দিকে তাকিয়ে সাহায্য চাইল। আয়েশা আফরোজ আলতাফ রহমানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
"ভাইয়া, এই মেয়েটা কি সত্যি সত্যি কাবিরের বউ?"
আলতাফ রহমান বেশ গর্বের সাথে আর দৃঢ় গলায় উত্তর দিলেন,
"হ্যাঁ আয়েশা, ও যেমন আমার ছেলের বউ, তেমনি আমার নিজের মেয়ের মতো। ও-ই এই বাড়ির বড় বৌমা।"
আলতাফ রহমানের কথা শুনে সাবার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সাইমন রহমান মেয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে চোখের ইশারায় তাকে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি চাইলেন না কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক। কিন্তু সাবা তো দমবার পাত্রী নয়! সে ঢং করে গা এলিয়ে দিয়ে আঙ্কেল আলতাফ রহমানের দিকে তাকিয়ে নালিশ করার সুরে বলল,
"আঙ্কেল! প্লিজ টেল হার টু স্টপ! আমি আপনার ছেলের কাজিন,আর এই মেয়েটা আমায় বারবার আন্টি ডাকছে কেন? ও কি আমায় চেনে না? হাউ ননসেন্স শি ইজ!"
তিথি সাবার এই ইংলিশ নালিশ শুনে মনে মনে হাসল। সে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে আড়চোখে দেখল কাবির একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সাবার কথায় কাবির বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না, বরং তার চোখ যেন তিথির প্রতিটি নড়াচড়া মেপে নিচ্ছে।
তিথি খুব শান্ত গলায় বলল,
"আরে আন্টি, থুড়ি আপু আপনি রাগ করছেন কেন? আমাদের দেশে বড়দের সম্মান দিয়ে কথা বলাই নিয়ম। আপনি তো কাবির ভাইয়ার কাজিন,সেই হিসেবে তো আপনি আমার বড়ই হবেন, তাই না।তাছাড়া আপু ডাকা আর আন্টি ডাকা তো একই?"
মুখে ভাত চিবাতে চিবাতে বলল।তখনই তিথি পানির গ্লাসটা নিতে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সাব্বিরও একই গ্লাসে হাত দিল। সাবির তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য যেন সব ভুলে গেল। কাবিরের চোয়াল তখন রাগে শক্ত হয়ে এসেছে।সাব্বির আর তিথির হাতের ওপর হাত থাকাটা কাবির সহ্য করতে পারল না। সে নিজের হাতের গ্লাসটা ধপাস করে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। কাঁচের টেবিলটা যেন কেঁপে উঠল।
কাবির গম্ভীর অথচ তীক্ষ্ণ গলায় সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"সাব্বির, আই থিংক ইউ আর ফরগেটিং সামথিং। তিথি আমার স্ত্রী, আর আমার জিনিসের ওপর অন্য কারোর ছোঁয়া আমার একদম পছন্দ না। সো, হ্যান্ডস অফ!"
🔴কাবির আর তিথির মাঝে কী আবার কেউ আসবে? কাবির কী পারবে তিথিকে সাব্বিরের থাকে আড়াল করতে? সাবা কী সত্যি কাবিরকে তিথির কাছ থেকে সারাজীবনের জন্য কেড়ে নিয়ে নিবে!?
(চলবে...)