#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৪৩(দ্বিতীয়াংশ)
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
শুরু হলো ইতিহাসের সেই অদ্ভুত ইংরেজি কথোপকথন। তিথি গম্ভীর মুখে শুরু করল,
— "সো মিস সাবা, হোয়াই আর ইউ হাবি পেছনে? আই মিন হোয়াই ইউ অলওয়েজ রানিং আফটার মাই হাজব্যান্ড?"
সাবা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, "হোয়াট আর ইউ সেইং? হাবি পেছনে? ইটস গ্রামাটিক্যালি রং!"
তিথি এবার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলল, "লিসেন, ইউ আর অ্যান ইলিটারেট পারসন ইন ফ্রন্ট অফ মি। ডোন্ট থ্রেট মি ননসেন্স পিপল!"
সাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "হু ইজ ইলিটারেট? ইউ আর ইনসাল্টিং মি!"
তিথি এবার তুরুপের তাস চালল। সে সাবা মুখটা বাঁকিয়ে বলল, "রিয়েলি? ওকে, নাউ ইউ প্রোনাউন্স দিস ওয়ার্ড... 'নিউমোনোআল্ট্রামাইক্রোস্কোপিকসিলিকোভলকানোকোনিওসিস'
সাবা হা করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ কপালে উঠে গেল। সে তোতলামি করে বলল, "হোয়াট... হোয়াট ইজ দিস? এন-ও-এম-ও... এটা কিসের ইংরেজি? ওহ গড, আই এম ক্রাইং!" 😭
তিথি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "এটা পৃথিবীর দীর্ঘতম ইংরেজি শব্দগুলোর একটা। লন্ডনে কি শুধু বাতাসই খেয়েছেন? এটা উচ্চারণ করতে না পারলে আপনার ইংরেজি জ্ঞান তো জিরো! এবার বাজি হারার জন্য রেডি হোন, মিস লন্ডনের টপার!"
পুরো টেবিল জুড়ে তখন হাসির রোল পড়ে গেল। জিম আর প্রমা তো হাসতে হাসতে টেবিলের ওপর লুটিয়ে পড়ল। সাবার ফর্সা মুখটা তখন অপমানে লাল থেকে বেগুনি হয়ে গেছে।
সাদ্দাম করুণ চোখে তাকিয়ে বলল,
— "জানি দোস্ত! কিন্তু কী করব বল? আমার ফ্যামিলি সবাই গ্রামে থাকে। আমি প্রমাকে বিয়ে করে কোথায় রাখব? সারাদিন আমি ভার্সিটি নিয়ে থাকি। প্রমার মতো একটা মেয়েকে রাখার মতো সামর্থ্য বা সময় কোনোটাই কি এখন আমার আছে?"
সাদ্দামের অসহায়ত্বের কথা শুনে কাবির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। টেবিলের ওপর রাখা সাদ্দামের কাঁপা হাতটার ওপর নিজের শক্ত হাত রাখল কাবির। তার চোখে তখন বন্ধুর জন্য মায়া আর প্রমার বড় ভাই হিসেবে একরাশ নির্ভরতা।
— "সাদ্দাম, তুই সামর্থ্যের কথা বলছিস? আরে সামর্থ্য তো আল্লাহ দেন। আর প্রমার মতো মেয়েকে রাখার জন্য বড় প্রাসাদের চেয়ে বড় একটা হৃদয়ের বেশি প্রয়োজন, যেটা তোর আছে। তুই সারাদিন ভার্সিটিতে থাকবি, কষ্ট করবি—সেটা ও জানে এবং জেনেই তোকে ভালোবেসেছে।"
— "তোর ফ্যামিলি গ্রামে থাকে তো কী হয়েছে? তুই প্রমাকে বিয়ে করে আমাদের বাসাতেই থাকবি, দরকার হলে আমি তোদের জন্য সব ব্যবস্থা করব। আমি তো তোদের সাপোর্টেই আছি দোস্ত। তুই শুধু একবার সাহস করে আম্মু-আব্বুর সাথে কথা বল। তাঁরা তোকে অনেক পছন্দ করেন। আর প্রমার বড় ভাই হিসেবে আমি কথা দিচ্ছি, তোদের পথে আমি কোনোদিন দেয়াল হয়ে দাঁড়াবো না, বরং ছায়া হয়ে থাকব।"
সাদ্দামের চোখ দুটো তখন ভিজে উঠেছে। কাবিরের মতো একজন কঠোর মানুষের মুখে এমন নরম কথা শুনে সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কাবির মুচকি হেসে বলল,
— "প্রমা আমার আদরের বোন, আর তুই আমার জানের দোস্ত। তোদের দুজনের হাত এক করে দিতে পারলে আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হবে না। কালই তুই আম্মু আব্বুর সাথে আলাদা করে কথা বলবি, বাকিটা আমি সামলে নেব।"
সিলভার ক্যাসেল রিসোর্টের ডিনার শেষে সবাই যখন খোলা চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তখন সাবার মুখটা অপমানে ছোট হয়ে আছে। সে তার ভাই সাব্বিরের হাত ধরে ফিসফিস করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— "ভাইয়া, দেখলে ওই অসভ্য মেয়েটা অদ্ভুত সব ইংরেজি বলে আমাকে সবার সামনে ইনসাল্ট করল! ও নির্ঘাত চিটিং করেছে।"
"কী হয়েছে সাবা, খুলে বল তো? এভাবে কাঁদলে আমি বুঝব কীভাবে?"
"ও আমাকে না বুঝে কীসব ইংরেজি বলে গালি দিল! আমার মনে হয় ও আমাকে অপমান করেছে।"
"মটেও না! আমি তো শুধু দেখিয়ে দিলাম যে এই তিথিও পড়াশোনা জানে। লন্ডনে গিয়ে ইংরেজি ভুলে গেছেন বুঝি সাবা আপু?"
আহনাফ হাসতে হাসতে কাবিরকে জিজ্ঞেস করল, "কিরে কাবির, তিথিকে কি আর পড়াবি না?"
কাবির কিছু বলার আগেই তিথি স্মার্টলি উত্তর দিল, "শুনুন আহনাফ ভাই, মেয়েরা পড়াশোনা করে একটা ভালো স্বামী পাওয়ার জন্য। আমি তো পৃথিবীর সেরা স্বামীটা পেয়েই গিয়েছি, এখন আর পড়াশোনা দিয়ে কী করব?"
ছোট ভাই সাইফ তিথির কথায় সায় দিয়ে বলল, "ঠিক কইছো আপু! আমারও পড়বার ভাল লাগে না, বই খুললেই ঘুম পায়।"
কাবির সাইফের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল, "না, তিথির ওপর পড়াশোনার কোনো চাপ নেই। আমার বিবিজান আর আমার অনাগত সন্তানকে সুস্থ রাখাই এখন প্রধান কাজ। পড়াশোনা আপাতত অফ থাকবে।"
সাদ্দাম বলল, "যাক, তিথি তাহলে আর টেনশন করো না।"
কাবির হাসল, "আরে না! বেবি হওয়ার পর ও আবার পড়াশোনা শুরু করবে। ও অনেক মেধাবী।"
সাবা এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, "ও মাই গড! তিথি, তুমি কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছ শুনি?"
তিথি শান্তভাবে বলল, "ক্লাস টেন-এ পড়েছি। পরীক্ষার আগে কিছু সমস্যার জন্য এক্সাম দিতে পারিনি।"
সাবা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল, "হা হা! এই ইলিটারেট মেয়েটা কিনা আমার সাথে পাল্লা দেয়? ওহ কাবির, তুমি এই অশিক্ষিত মেয়েটাকে কীভাবে টলারেট করো?"
কাবির এবার সাবার দিকে আগুনের মতো দৃষ্টিতে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,
"সাবা, সেটা তোমাকে না ভাবলেও চলবে। আমার স্ত্রী আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং জ্ঞানী। ওকে নিয়ে বাজে কথা বলার সাহস আর দেখাবে না।মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস!"
সাবা রাগে ফুসফুস করে চলে গেল।
রিসোর্টের এক নির্জন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তিথি আর কাবির। তিথি কালো বোরকায় আর কাবির কালো শার্ট-প্যান্টে যেন এক দুর্দান্ত জুটি।তিথি কাবিরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে একটা কবিতা বলল,
**“যদি শোনো আমি আর নেই,
আসবে কি প্রতিদিন একটা গোলাপ হাতে?
নাকি ভুলে যাবে—আমিও কখনো ছিলাম এই পৃথিবীর বুকে?
কখনো কি তুলবে তোমার দুটি হাত খোদার দরবারে,
চাইবে কি আমাদের আবার দেখা হোক,
পরকালে ওই আখিরাতে?
নাকি ভুলে যাবে—আমিও কখনো ছিলাম এই পৃথিবীর বুকে?”**
কাবির পেছন থেকে তিথিকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
— "তোমার কবিতাটা অনেক সুন্দর হয়েছে, মাই নাইট কুইন। শোনো বিবিজান, তুমি সবসময় আমার চোখের সামনে থাকবে। আমি ওই সাব্বিরকে একদম সহ্য করতে পারছি না।"
তিথি একটু হেসে বলল, "ওহ তাই নাকি? সাবাকে বুঝি খুব সহ্য করতে পারেন?"
কাবির বিরক্ত হয়ে বলল, "উফ! ওর কথা বলো না তো, জাস্ট ডিসগাস্টিং!"
তিথি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল কাবির কীভাবে সাব্বিরকে হেল্প করেছিল। কাবির লন্ডনের সেই মিশনের কথা বলল যেখানে সে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল এবং সাব্বির তাকে বাঁচিয়েছিল।
তিথি আঁতকে উঠে কাবিরের শার্ট খামচে ধরল, "কোথায় গুলি লেগেছে? খুব কষ্ট হয়েছে না?"
কাবির তিথিকে জ্বালাতে বলল, "হুমম! তবে সাবা তখন আমার খুব যত্ন করেছিল। ও মানুষ হিসেবে ভালো।"
তিথি অভিমানে দূরে সরে যেতে চাইল, কিন্তু কাবির তাকে জাপটে ধরে গাঢ় গলায় বলল, "না বিবিজান! আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। তুমি আমার সেই প্রাণ যাকে ছাড়া আমি মৃত। ইউ আর মাই এভরিথিং, তিথি!"
তিথি মুগ্ধ হয়ে বলল, "এত সুন্দর করে কথা বলেন আপনি, আমি তো আবার প্রেমে পড়ে গেলাম!"
রাত তখন ১১টা। ময়মনসিংহের সিলভার রিসোর্টে লাউড মিউজিকে পার্টি চলছে। রোনা, জিম আর তিথি, প্রমারা একটা রুমে বসে গল্প করছে। তিথি জিমকে জিজ্ঞেস করল,
"আপু, গায়রে মাহরামের সাথে মেলামেশার শাস্তি কী?"
জিম গুরুত্ব দিয়ে বলল, "ইসলামে পর্দা ফরজ। গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনে থাকা বা অযথা মেলামেশা কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা.) বলেছেন, যারা পর্দা করে না, তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।"
নির্জনে অবস্থান নিয়ে হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"কোনো পুরুষ যেন কোনো (গায়রে মাহরাম) নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে; অন্যথায় সেখানে তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে।"
— [তিরমিজি: ২১৬৫]
অন্যদিকে দৃষ্টির সংযম নিয়ে হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,
"হে আলী! একবার দৃষ্টি পড়ার পর পুনরায় দৃষ্টিপাত করো না। প্রথম দৃষ্টিটি তোমার জন্য ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টিটি (গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে) তোমার জন্য নয়।"
— [আবু দাউদ: ২১৪৯]
তিথি মনেমনে প্রতিজ্ঞা করলো সে আর কোনোভাবেই নিজ ইচ্ছায় কোনো নন মাহরাম পুরুষের সাথে কথা বলবে না ও কাছেও যাবে না।
এদিকে পার্টির ভিড়ে কাবির লাল রঙের শার্ট পরে বের হয়েছে। সাবা কৌশলে একজন ওয়েটারের মাধ্যমে কাবিরকে একটি ড্রিংকস পাঠাল। ওয়েটার বলল, "স্যার, তিথি ম্যাম আপনাকে এটা খেতে বলেছে।"
কাবির তিথির নাম শুনে সন্দেহ না করেই ড্রিংকসটা খেয়ে নিল। আহনাফ পাশে এসে ঠাট্টা করে বলল,
"মামা, তোর বউ তোকে কত ভালোবাসে দেখ!"
ড্রিংকসটা খাওয়ার পর থেকেই কাবিরের মাথা ঘুরতে লাগল। সাবার মেশানো ড্রাগ কাজ করতে শুরু করেছে। সাবা কাবিরকে জাপটে ধরে তার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। রানা এসে সাহায্য করতে চাইলে সাবা কৌশলে ভুল রুম নম্বর বলে কাবিরকে নিজের রুমে নিয়ে গেল।
ওদিকে তিথি রুমে পায়চারি করছে। কাবির এখনো ফিরছে না দেখে তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সাব্বিরও তার বোনকে খুঁজে পাচ্ছে না। সে তিথির দরজায় নক করল।
তিথি দরজা না খুলেই কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ভাইয়া, উনি এখনো ফেরেনি! প্লিজ ওকে খুঁজে দিন।"
সাব্বির নিজের মনেই শিউরে উঠল। সে ভাবল, "আমি এই মেয়েটাকে ভালোবাসলেও ওর ক্ষতি করতে পারব না। সাবা কোথায়? ও কি তবে কাবিরের সাথে... ওহ গড! এটা হতে দেওয়া যাবে না। আই মাস্ট সেভ দেম বিফোর ইটস টু লেট।"
(চলবে...)