#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৪৪ (বর্ধিতাংশ)
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
সাব্বিরের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে জানে তার বোন সাবা কতটা জেদি আর বেপরোয়া হতে পারে। সে পাগলের মতো করিডোর দিয়ে দৌড়াতে লাগল। সাবার রুমের সামনে গিয়ে কয়েকবার জোরালো নক করতেই দরজাটা হালকা করে খুলে গেল—হয়তো তাড়াহুড়ো করে সাবা দরজা ঠিকমতো লক করতে ভুলে গিয়েছিল।
সাব্বির কোনো অনুমতি না নিয়েই ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভেতরের দৃশ্য দেখে তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। ড্রাগের নেশায় কাবির তখন প্রায় অচেতন। তার গায়ের সেই লাল শার্টের বোতামগুলো খোলা, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে। সে অস্ফুট স্বরে শুধু "তিথি... বিবিজান..." বলে বিড়বিড় করছে।
সাবা তার খুব কাছে বসে কাবিরের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছিল।সাব্বিরের উপস্থিতিতে সাবা চমকে উঠে দাঁড়াল। সাব্বির সাবার দিকে আগুনের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সাবা আমতা আমতা করে বলল,
— "ভাইয়া! প্লিজ রাগ করো না। আমি... আমি ওকে অনেক লাভ করি । তুমি তো জানো আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। প্লিজ ভাইয়া, তুমি এটা করো না..."
সাব্বির আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল সাবার গালে। সাবার মুখটা একপাশে ঘুরে গেল। সাব্বির দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠে বলল,
— "থাম সাবা! এই নোংরামি তুই কোথা থেকে শিখলি? একটা বিবাহিত পুরুষ, যার স্ত্রী গর্ভবতী, তার সাথে তুই এই জঘন্য কাজ করতে যাচ্ছিস? এই শিক্ষা পেয়েছিস আমাদের পরিবার থেকে?"
সাবা গালে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কিন্তু তার চোখে অনুশোচনার বদলে ছিল একরোখা জেদ। সে চিৎকার করে বলল,
— "না থামব না! তুমিও তো ওই তিথিকে ভালোবাসো ভাইয়া, অস্বীকার করতে পারবে? নিজের মনের দিকে তাকিয়ে দেখো, তুমিও চাও ওকে নিজের করে পেতে!"
সাব্বির পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাবার কথাগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধল। সাবা সুযোগ বুঝে সাব্বিরের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে শয়তানি বুদ্ধি দিতে শুরু করল,
— "ভাইয়া, তুমি অনেক ভালো মানুষ, তাই হয়তো নিজেকে সামলে রেখেছ। কিন্তু একবার ভেবে দেখো, কাবির যদি এখন আমার হয়ে যায়, তবে তিথি একা হয়ে পড়বে। তখন তিথিকে আগলে নেওয়ার সুযোগ তোমার হবে। আমি কাবিরকে চাই, আর তুমি তিথিকে নিয়ে নাও। আমাদের দুজনেরই জেদ পূরণ হবে। প্লিজ ভাইয়া, জাস্ট একবার ভেবে দেখো!"
সাব্বিরের মাথায় শয়তানী চিন্তাভাবনা খেলে গেল। তার মনের এক কোণে থাকা সেই সুপ্ত ইচ্ছাটা সাবার কথায় হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
রাতটা এভাবেই কেটে গেল। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে তিথির চোখের পাতা এক হয়নি, কিন্তু কাবির আর ফিরে আসেনি। সকাল ৮টা বাজতেই রিসোর্টের সবাই ব্রেকফাস্টিং করার জন্য জড়ো হতে লাগল। প্রমা তিথিকে ডাকতে ওর রুমে গিয়ে দেখে তিথি বিধস্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে।
তিথি আধো-ঘুমে চোখ মেলতেই প্রমা জিজ্ঞেস করল,
"কিরে, তোর বর কই? ভাইয়া কি এখনো আসেনি?"
"না তো!”
“ কিহ….।ভাইয়াটা আবার কোথায় গেল।”
“আমি ভাবলাম ভাইয়াদের রুমেই আছে। মানুষটা গেল কোথায় আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুই ভাইয়াদের বল না খুঁজে দেখতে।"
প্রমা তিথিকে জোর করে নাস্তা করিয়ে নিল। নাস্তা শেষ করে এবার ফেরার পালা। তিথি, রোনা, প্রমা আর জিম করিডোর দিয়ে হাঁটছে। সবাই গল্প করলেও তিথির মন পড়ে আছে কাবিরের কাছে। তার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
"উনি এখনো এলেন না কেন? কোথাও কোনো বিপদ হলো না তো?"
তিথি আনমনে বাগানের দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ ছোট ভাই সাইফ দৌড়ে এসে একটা চিরকুট তিথির হাতে দিয়ে বলল,
"আপু, একা ভাইয়া তোমাকে এটা দিতে বলেছে।"
চিরকুটে লেখা— "পেছনের বাগানটায় এসো।"
তিথির মনে কৌতূহল আর ভয় দুটোই দানা বাঁধল। সে পা টিপে টিপে বাগানের একদম নির্জন কোণটায় গিয়ে যা দেখল, তাতে তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। মুহূর্তেই মাথাটা ঘুরে উঠল তার। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল এবং সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
দুপুর ১২টা। তিথি এখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে। কাবির পাশে বসে আছে, তার চোখেমুখে অপরাধবোধ আর দুশ্চিন্তার ছাপ। বাকিরা চলে গেলেও প্রমা একনাগাড়ে কাবিরকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
"ভাইয়া, তুমি এত কেয়ারলেস কীভাবে হলে? তিথির আজ এই অবস্থার জন্য তুমিই দায়ী।ওর যদি আজ কিছু হয়ে যেতো তখন।”
"থাম, প্রমা! আমার নিজেরও কোনো সেন্স ছিল না। আমি একটা অন্য রুমে ছিলাম, কীভাবে কী হলো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।"
"তুমিতো এমন নও ভাইয়া! তাহলে এমনটা হলো কীভাবে?"
কাবির কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, "ওই ড্রিংকটা খাওয়ার পর থেকেই কেমন জানি লাগছিল। আমার আর কিছু মনে নেই। কিন্তু ড্রিংকটা তো তিথিই পাঠিয়েছিল! তবে এমন কেন হলো?"
এমন সময় তিথির জ্ঞান ফিরে এল। পাশে কাবিরকে দেখে সে শিউরে উঠল। তিথি প্রমাকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলল,
"প্রমা, ওনাকে বল এখান থেকে চলে যেতে। আমি ওনার মুখ দেখতে চাই না।"
"বিবিজান! তুমি এভাবে কেন বলছ? আমি কী করেছি?"
"প্রমা, তুই ওনাকে যেতে বল প্লিজ! আর আমাকে আমার বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা কর।"
"তিথি প্লিজ কথা বলো! আমি কি কোনো ভুল করেছি?"
"ভাইয়া, তুমি এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও এখান থেকে!"
তিথির রাগে মুখ লাল হয়ে গেছে। গায়ে একটা সাদা ওজি গাউন পরা, পেটের অংশটা এখন আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, যা ওকে ভীষণ অসহায় আর মায়াবী করে তুলেছে। কাবির তিথির কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ধরা গলায় বলল,
"আমি জানি না আমি কী ভুল করেছি, বাট আই উইল ফিক্স এভরিথিং অ্যান্ড কাম ব্যাক টু ইউ, বিবিজান!
কাবির ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই তিথি প্রমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলল। কান্নার তোড়ে তার কথা আটকে আসছিল,
"প্রমা, আমি কি আর সুন্দর নেই? আমি কি সত্যিই খুব খারাপ দেখতে হয়ে গেছি? উনি কি আমায় আর পছন্দ করেন না? তবে কেন উনি এমন করলেন?"
কাবির দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনল। তার মনে খটকা লাগল,তিথি কেন তাকে নিয়ে এমন ভাবছে? যে ড্রিংক তিথি দিয়েছে বলে সে জানত, সেই ড্রিংক খেয়েই তার সব ওলটপালট হয়ে গেল। অথচ তিথি এখন তার সাথে কথা বলছে না। কাবির বুঝতে পারল,একটা ফাঁদে সে বাজেভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
হাসপাতালে তখন এক থমথমে পরিস্থিতি। কাবির দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তিথির কান্নার শব্দ শুনছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত হলো সাবা আর সাব্বির। সাবা এসেই আদিখ্যেতা শুরু করে দিল।
সাবা কাবিরের হাত ধরার চেষ্টা করে চড়া গলায় বলল,
"কাবির বেবি! তুমি কোথায় ছিলে বলো তো? আমি যে তোমাকে না দেখে একদম থাকতে পারি না!"
সাবার এই নির্লজ্জ কথাগুলো তীরের মতো তিথির কানে বিঁধল। সাব্বিরও পাশ থেকে যোগ দিল। সে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
"হ্যাঁ কাবির ভাইয়া, তিথি এখন কেমন আছে? আমাদের আসতে একটু দেরি হওয়ার জন্য আমরা দুঃখিত।”
কাবির নিজের রাগ সামলিয়ে শান্ত মুখে একটা রহস্যময় জোরজনক হাসি ফুটিয়ে তুলল। সাবার দিকে তাকিয়ে সে ধরা গলায় বলল,
"হ্যাঁ সাবা, আমিও তোমার কাছেই যেতাম। আসলে একটা বিশেষ দরকার ছিল তোমার সাথে।”
#চলবে...