#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৪৭
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
কাবির গোসল সেরে মারুফ আহমেদের সুতি লুঙ্গি আর একটা সাদা গেঞ্জি পরে ড্রইংরুমে এসে বসল ঠিক বাঙালি জামাইদের মতো। ড্রানিং টেবিলের একদিকে তিথির বাবা মারুফ আহমেদ, অন্যদিকে শাশুড়ি তানিয়া মিথু আর মাঝখানে মুখ ভার করে বসে আছে অভিমানী তিথি।
খাবারের বাটিগুলো সাজাতে সাজাতে তানিয়া মিথু যেই কাবিরের পাতে গরম ভাত বেড়ে দিতে যাবেন, ঠিক তখনই,
"হাচিঁহ্! হাচিঁহ্! আক্ষুউউ!" 🤧
একটানা তিন-চারটা বিকট শব্দে হাঁচি দিয়ে উঠল কাবির। কাবিরের অমন হাঁচি দেখে মারুফ আহমেদ নিজের চশমাটা নাক থেকে ঠিক করলেন। আর তিথি নিজের ভাতের লোকমাটা মুখে তুলতে গিয়েও থেমে গেল। সে কাবিরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই বাবার দিকে তাকিয়ে হাসি চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
"দেখলে তো আব্বু? চোরের দশ দিন, তো সাধুর একদিন! আমাকে জোর করে ঠান্ডা পানিতে গোসল করাতে গিয়ে নিজের কেমন ঠান্ডাটা লাগিয়ে বসে আছেন! একদম উচিত শিক্ষা হয়েছে।"
তিথির মুখে এমন খোলামেলা খোঁচা শুনে তানিয়া মিথু আর মারুফ আহমেদ দুজনেই একে অপরের দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন। তিথি হঠাৎ খেয়াল করল সে মা-বাবার সামনেই কাবিরের সাথে বাথরুমের সিক্রেট শেয়ার করে ফেলেছে! লজ্জায় ওর কান-মুখ আবার লাল হয়ে গেল। সে চট করে মাথা নিচু করে ভাতে মন দিল।
কাবির অবশ্য এসব লজ্জার ধার ধারে না। সে নিজের লাল হয়ে যাওয়া নাকটা গেঞ্জির হাতা দিয়ে হালকা মুছে মারুফ আহমেদের দিকে তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
"আরে না আংকেল, ওসব কিছু না। বরের তো বউয়ের জন্য একটু-আধটু কষ্ট করাই যায়। তিথির রাগ ভাঙানোর জন্য এই কাবির রহমান কায়নাত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতেও রাজি!" 😉
মারুফ আহমেদ জামাইয়ের এমন স্পষ্টবাদী রসিকতায় হাহা করে হেসে উঠলেন। তিনি কাবিরের পিঠ চাপড়ে বলে,
"তা যা বলেছ বাবা! তা কাবির, তুমি খাচ্ছ না কেন? একটু বেশি করে মাংস নাও। আর মিথু, খাওয়া শেষ হলে কাবিরকে আদা-লেবু দিয়ে এক কাপ কড়া করে চা বানিয়ে দিও তো, ছেলেটার যেভাবে ঠান্ডা লেগেছে, রাতে আবার জ্বর না চলে আসে।"
তানিয়া মিথু তরকারির বাটিটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন,
"হ্যাঁ, দেব তো অবশ্যই। কিন্তু তোমার আদরের মেয়েকে আগে কিছু বলো! ও তো আজকাল কথাই শুনতে চায় না, ভীষণ পাজি হয়েছে। ওর পেটের ভেতর যে আল্লাহর রহমতে একটা ছোট্ট প্রাণ দিন দিন বড় হচ্ছে, সেই খেয়াল কি ওর আছে? এই অবস্থায় কেউ এত খামখেয়ালী করে?"
"আহ মিথু! মেয়েটা তো এখনও ছোট। ওকে একটু আদর করে, বুঝিয়ে বলতে হবে তো। হুট করে বকা দিলে কি আর শোনে?"
"হ্যাঁ, সেই আদর দিতে গিয়েই তো মাথায় উঠেছে!"
তানিয়া মিথু রাগ দেখিয়ে তিথির পাতে আরও এক চামচ ডাল ঢেলে দিয়ে বললেন,
"এই তিথি, তুই খাচ্ছিস না কেন? সকাল থেকে তো পেটে কিচ্ছু পড়েনি, নে জলদি মুখ খোল।"
তিথি ভাতের লোকমাটা মুখের কাছে নিতেই হঠাৎ
ওর পেটের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কড়া মসলার গন্ধটা নাকে আসতেই ও মুখ চেপে ধরল। ওর ফর্সা মুখটা এক নিমেষে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
"না আম্মু... উফ, আমি আর খেতে পারছি না। আমার ভীষণ বমি পাচ্ছে!"
বলেই তিথি টেবিল থেকে উঠে এক দৌড়ে বেসিনের দিকে চলে গেল। তানিয়া মিথুও "আরে মা শুন" বলে মেয়ের পেছনে ছুটলেন। খাবারের টেবিলে মারুফ আহমেদ আর কাবির একা হয়ে গেল। মারুফ আহমেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাবিরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন,
"বাবা কাবির, তুমি তো বললে এবার অফিস থেকে কয়েক সপ্তাহের জন্য একদম ফ্রি আছ, একটা বড় ছুটির ব্যবস্থা করেছ?"
কাবির গ্লাস থেকে জল খেয়ে বলল, "জি আংকেল, একদম ফ্রি। আগামী কয়েক সপ্তাহ আমার পুরো সময়টাই ফ্যামিলির জন্য।"
"তাহলে এক কাজ করো বাবা, আজ বিকেলেই তিথিকে নিয়ে ময়মনসিংহের সরকারি মেডিকেল কলেজ হসপিটাল থেকে একটা প্রোপার চেকআপ করিয়ে নিয়ে এসো। বাচ্চাটা এখন কেমন আছে, তিথির শরীরের কন্ডিশন কেমন-সব জানা দরকার। এই সময়টাতে একটুও অবহেলা করা ঠিক হবে না।"
কাবির মারুফ আহমেদের চোখের দিকে তাকিয়ে পরম শ্রদ্ধায় মাথা নাড়ল। ওর ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর গলায় বলল,
"হ্যাঁ আঙ্কেল... আই মিন, আব্বু! আমি আজকেই ওকে নিয়ে যাব। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।"
"বাহ বাবা! তোমার মুখে এই আব্বু ডাকটা শুনতে আমার যে কতটা ভালো লাগল, তা আমি বোঝাতে পারব না। আজ থেকে আমাকে এইভাবেই আব্বু বলে ডাকবে, কেমন?"
কাবির হাসল। শ্বশুর আর শাশুড়ির এই ভালোবাসা আর আপ্যায়নে ওর বুকের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে গেল।
~~~~
অন্যদিকের রুমে তিথি তখন বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে বিছানায় এসে বসেছিল। ওর মনটা তখনো কিছুক্ষণ আগের বাথরুমের সেই অদ্ভুত, হাসির আর লজ্জার মুহূর্তটাতে আটকে ছিল। ও মনে মনে ভাবছিল, এই অসভ্য সিংহটাকে ও বাথরুমে কেমন নাজেহাল করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উল্টো নিজেই ফেঁসে গিয়েছিল!
[ফ্ল্যাশব্যাক]
বাথরুমের ভেতর তখন শাওয়ারের ঠাণ্ডা জল কলকল শব্দে ঝরে পড়ছে। তিথির বড় হয়ে যাওয়া পেট আর ওর শরীরের নাজুক অবস্থার কথা চিন্তা করে কাবির এবার আর কোনো জোর জবরদস্তি করল না। সে তিথিকে আলতো করে একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর বসিয়ে দিল। এরপর শ্যাম্পুর বোতলটা নিয়ে নিজের হাত দুটো দিয়ে তিথির ঘন কালো চুলে আলতো করে ফেনা তুলতে লাগল।
কাবিরের আঙুলের নরম ছোঁয়া তিথির মাথার ত্বকে এক অদ্ভুত আরাম দিচ্ছিল। তিথি এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেও, হঠাৎ করেই চোখ মেলে আয়নায় কাবিরের দিকে তাকাল। সিক্স-ফিট হাইটের রাগী সিংহটা কেমন বাধ্য ছেলের মতো মনোযোগ দিয়ে ওর চুলে শ্যাম্পু করে দিচ্ছে! এই রূপটা দেখে তিথি একমনে পলকহীন চোখে কাবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কাবির তিথির ওই চোর চাউনি দেখে ফেলল। সে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে চোখ টিপে বলল,
"কী ব্যাপার বিবিজান? এভাবে একমনে বরের দিকে তাকিয়ে আছ কেন? একটু সাবধানে দেখ, বড্ড হ্যান্ডসাম তো! তোমার ওই ডাগর ডাগর চোখের কড়া নজর লেগে গেলে তো আমি শেষ!"
তিথি চট করে ধরা পড়ে গিয়ে মুখটা ভেংচে বলল,
"ওহ তাই নাকি! নিজের রূপের বড় দেমাগ, তাই না? আমার চোখের পাওয়ার এত সস্তা আর খারাপ না যে আপনার মতো একটা অসভ্য সিংহকে দেখতে যাব!"
"ওহ, তাই নাকি বিবিজান? এতই যখন চোখের দেমাগ, তাহলে একটু শাস্তি পাওয়া দরকার!"
বলেই কাবির কোনো সুযোগ না দিয়ে তিথির মাথায় মগ ভর্তি জল ঢেলে শ্যাম্পু ধুয়ে দিল, আর আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ওড়না সুদ্ধ ওকে বাথরুমের বড় বাথটাবের ভেতরের হালকা গরম জলের মধ্যে ফেলে দিল! তিথি আচমকা বাথটাবে পড়ে গিয়ে পুরো ভিজে একসা হয়ে গেল।
এদিকে কাবির তখন শার্টের বোতাম খুলে আগেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। ওর শরীরে তখন কোনো গেঞ্জি ছিল না, পুরো গা খালি আর পরনে ছিল কেবল একটা সাদা টাউজার। উন্মুক্ত চওড়া বুক নিয়ে কাবির যখন বাথটাবের পাশে ঝুঁকে তিথিকে তুলতে গেল, তিথিও মনে মনে এক চরম দুষ্টুমির ফন্দি আঁটল।
তিথি বাথটাবের জলে বসে হাত দিয়ে জল ছিটিয়ে কাবিরকে এক্কেবারে ভিজিয়ে দিল। কাবির নিজের চওড়া বুকটা টানটান করে বাথটাবের ওপরে বসে পড়ল। তিথির একদম কাছে এসে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
"তুমিই তো আমাকে জল ছিটিয়ে পুরো ভিজিয়ে দিলে, জলপরী! আমার এই তপ্ত শরীরে তোমার হাত থেকে ছিটকে আসা জলের ছোঁয়া বড্ড মারাত্মক লাগছে।"
"এহ্! কী আমার ডায়লগ মারছেন ওনার! আচ্ছা, কলিজার খাসি... একটু কাছে আসুন তো, কানের কাছে একটা সিক্রেট কথা বলব।"
কাবির ভাবল তিথি হয়তো সত্যিই কোনো রোমান্টিক কথা বলবে। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজের কানটা তিথির ঠোঁটের কাছে এগিয়ে নিয়ে গেল।
তিথি সুযোগ বুঝে কাবিরের কানটা হালকা করে কামড়ে দিয়ে ওকে এক ধাক্কায় বাথটাবের জলের মধ্যে ফেলে দিল! কাবির ধপাস করে বাথটাবে পড়ে গিয়ে তিথির মুখোমুখি বসল। তিথি মুখ বেঁকিয়ে বলল,
"এহ্, শুনুন! আপনি না একদম রোমান্স করতে জানেন না, বুঝলেন? ওই সিনেমা-নাটকের ডিপজলের মতো শুধু ভিলেনগিরি আর গুন্ডামি করতে পারেন, রোমান্স আপনার দ্বারা হবে না!"
"ওহ, তাই নাকি বিবিজান?"
কাবির এবার বাথটাবের জলের মধ্যেই তিথির কোমর জড়িয়ে ধরে একদম কাছাকাছি চলে এল। ওদের দুজনের নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। কাবির ডার্ক লাইনে ফিসফিস করে বলল,
"এই যে তুমি আর আমি এক বাথটাবে এত কাছাকাছি বসে আছি... এই যে আমার মতো একজন হ্যান্ডসাম পুরুষ তোমার এত সামনে খালি গায়ে বসে আছে, তোমার কি মনে কিচ্ছু করতে চাইছে না?"
তিথি কাবিরের ওই উন্মুক্ত দেহের দিকে ধারালো চোখে তাকিয়ে জোরে একটা শুকনো ঢোক গিলল। ওর বুকের ভেতর তখন ধকধক করছে। সে নিজের থতমত ভাব আড়াল করে বলল,
"না... না! আমার আবার কী করতে মনে চাইবে? আমি কি পাগল নাকি যে আপনার সাথে এসব কিসব করতে যাব? একদম দূর হোন!"
কাবির একটা ডেভিল হাসি দিয়ে বলল,
"ওহ, তুমি পাগল নও? তাহলে এসো, আমিই তোমাকে একটু পাগল করে রোমান্স করা শেখাই!"
তিথি এবার বিপদ বুজে বাথটাব থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু জলের কারণে বাথটাবের মেঝেটা ছিল বড্ড পিছল। তিথি নিজের ভারসাম্য সামলাতে না পেরে পিছলে পড়ে যেতেই, বাঁচার তাগিদে সামনে থাকা কাবিরের একমাত্র সম্বল পরনের সেই ভেজা সাদা টাউজারটা খপ করে ধরে সজোরে নিচের দিকে একটা টান মারাল!
ব্যস! জলের ওজনে আর তিথির শক্ত টানে কাবিরের সাদা টাউজারটা এক ঝটকায় কোমর থেকে বেশ কিছুটা নিচে নেমে গেল!
কাবির রহমান কায়নাত এবার বাথরুমের ছাদ ফাটানো আহাজারি শুরু করে দিল। সে দুই হাত দিয়ে নিজের কোমর চেপে ধরে একদম কান্নার সুরে বলতে লাগল,
"আল্লাহ গো! কে কোথায় আছ, আমাকে বাঁচাও! শাশুড়ি আম্মু দেখে যান, আপনার মেয়ে আমার ইজ্জত পুরো লুটে নিল! আজ আমার সতীত্ব আর রইল না গো! শেষমেষ একটা মেয়ের কাছে আমার সাদা টাউজার টান খেয়ে ইজ্জতের ফালুদা হয়ে গেল!" 😭
এদিকে তিথি এই কাণ্ড দেখে লজ্জায় আর অপমানে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে বাথটাবের ভেতরেই বসে পড়ল। লজ্জার তীব্রতায় ওর পুরো ফর্সা গাটা যেন টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। ও চিৎকার করে বলল,
"উফফ! চুপ করুন অসভ্য সিংহ একটা! কেউ শুনলে কী ভাববে? আপনি একটা আস্ত পাগল!"
*******
বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাথরুমের সেই চরম মজার আর লজ্জার কাহিনী ভাবতে ভাবতে তিথি একা একাই খিলখিল করে হাসছিল। ও ভাবছিল, ড্যাশিং আর সাহসী সিংহটা ওর কাছে কেমন ভেজা বিড়ালের মতো আহাজারি করছিল!
ঠিক তখনই কাবির নিজের দুটো নাক ঘষতে ঘষতে আর 'উফ-উফ' করে নাক টানতে টানতে ঘরের ভেতর ঢুকল। ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে ওর। কাবিরকে ওইভাবে ঢুকতে দেখে তিথি জোর করে নিজের ভেতরের হাসি চাপা দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, রাস্তা পার হয়ে মসজিদ থেকে আসরের আজানের মধুর ধ্বনি ভেসে এল,
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার..."
আজানের শব্দ কানে আসতেই তিথি সব হাসি-তামাশা বন্ধ করে একদম শান্ত হয়ে গেল। ও মাথার ওপর নীল রঙের ওড়নাটা সুন্দর করে টেনে মাথা ঢেকে নিল। আজানের প্রতিটা বাক্য তিথি মন দিয়ে শুনছিল আর খুব সুন্দরভাবে আজানের জবাব দিচ্ছিল। মুয়াজ্জিন যখনই বলছিলেন "হাইয়া আলাস সালাহ", তিথি তখনই নিঃশব্দে বলছিল "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"।
আজান শেষ হতেই তিথি দুটো হাত তুলে খুব মৃদু আর মধুর সুরে আজানের পরের দোয়া পড়তে লাগল,
"আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কায়িমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল অসীলাতা ওয়াল ফযীলাহ, ওয়াবআছহু মাকামাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়াআত্তাহ।"
হাদিস শরিফে আছে;- হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আজান শোনার পর এই দোয়া পড়বে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত (সুপারিশ) ওয়াজিব হয়ে যাবে।"
— [বুখারী শরিফ: ৬১৪]
তিথি দোয়া শেষ করে যখনই হাত মুখে মুছল, কাবির পেছন থেকে এসে ওকে ভীষণ নরমভাবে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে মুখ গুঁজল। ঠাণ্ডা নাকের স্পর্শ লাগতেই তিথি ঝিমিয়ে উঠল। ও কাবিরের হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল
"এইসব বাপের বাড়ি এসেও শুরু করবেন না! আগে বলুন, আজকে কয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েছেন?"
কাবির স্বভাব মতো মাথা চুলকে ফিসফিসানি গলায় বলল,
"এক ওয়াক্তও না, বিবিজান। আজকে খুব ঝামেলা ছিল তো..."
"কীহ! এক ওয়াক্ত নামাজও পড়েননি? যান, আগে এখনই গিয়ে আসরের নামাজ পড়ে আসুন। পরের কথা পরে হবে। যদি নামাজ না পড়ে আসেন, তাহলে এখন থেকে আপনার সাথে আমার আর কোনো কথা নেই!"
তিথির নামাজ না পড়ার কড়া হুমকি শুনে সে আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। একদম বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে ওজু করার উদ্দেশ্যে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
_______
আসরের নামাজ শেষ করে তিথি জায়নামাজেই বসে রইল। ওজু করে পবিত্র হয়ে আসরের নামাজ পড়ে আসার পর কাবিরের চেহারায় এখন এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। সে আর কোনো দুষ্টুমি না করে একদম শান্ত ছেলের মতো এসে জায়নামাজের ওপর বসা তিথির কোলের ওপর নিজের মাথাটা রেখে শুয়ে পড়ল। তিথি পরম মমতায় কাবিরের ঘন চুলে নিজের নরম আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিল।
কাবির চোখ বন্ধ করে তিথির কোলের ওমে এক জান্নাতি শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল। তিথি তখন মৃদু আর অত্যন্ত মধুর সুরে কুরআন মাজিদ থেকে সূরা আন-নাবা তিলাওয়াত করতে শুরু করল। সুরের মূর্ছনায় পুরো ঘর যেন এক পবিত্র আলোয় ভরে উঠল।
সূরা আন-নাবার ফজিলত: হাদিস ও ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, সূরা আন-নাবা তিলাওয়াত করার অনেক ফজিলত রয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত সূরা আন-নাবা পাঠ করবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে ঠাণ্ডা ও সুশীতল পানীয় দ্বারা আপ্যায়িত করবেন। এ ছাড়া এই সূরা নিয়মিত তিলাওয়াত করলে মনের ভয়ভীতি দূর হয় এবং আল্লাহর প্রতি একিন বাড়ে।
তিথির মুখের সেই মায়াবী তিলাওয়াত শুনতে শুনতে কাবিরের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিথি তিলাওয়াত শেষ করে আলতো করে কুরআন শরিফটি পাশে রাখাল।
তারপর সে নিচের দিকে ঝুঁকে কোলের ওপর শুয়ে থাকা কাবিরের ফর্সা কপালে গভীর ও দীর্ঘ একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। তিথির ঠোঁটের সেই ওম কাবিরের পুরো শরীরে এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তিথি আস্তে করে কাবিরের কানের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল। ওর গরম নিশ্বাস কাবিরের কানে লাগতেই অত্যন্ত আকুল আর ফিসফিসানি গলায় বলল,
"আপনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন, স্বামিজান? আপনার এই পাগলামিগুলো দেখলে মাঝে মাঝে আমার খুব ভয় হয়। নিজেকে বড্ড বেশি ভাগ্যবতী মনে হয়।"
কাবির চোখ মেলে তিথির দিকে তাকাল। ওর সেই তীক্ষ্ণ চোখে এখন কোনো ডেভিল স্মাইল নেই, আছে শুধু তিথির জন্য এক বুক উথাল-পাথাল ভালোবাসা।
তিথির মুখের সেই জান ডাকটা শোনার পর কাবিরের বুকের ভেতর যেন আনন্দের এক তীব্র ঝড় বয়ে গেল। সে তিথির কোলের ওপর থেকেই চট করে ওর কোমরে দুই হাত জড়িয়ে ধরল। নিজের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো তিথির মায়াবী চোখের ওপর স্থির করে আকুল গলায় বলল,
"আর একবার ডাকো না, বিবিজান! আর একবার জাস্ট ওই নামে ডাকো।"
তিথি চট করে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে লাজুক হেসে বলল,
"উঁহু, পারব না। একবারে বেশি বলা যাবে না।"
"আরে বলো না! তুমি আর একবার ডাকলে তোমার জন্য একটা না, এক গাড়ি সারপ্রাইজ গিফট আছে!"
কাবির চোখ টিপে লোভ দেখানোর ভঙ্গিতে বলল।
"না, আমার বড্ড লজ্জা লাগে। আমি পারব না।"
তিথি দুই হাতে নিজের লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো আড়াল করার চেষ্টা করল।
কাবির তিথির হাত দুটো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে ওর একদম কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে বলল,
"বলো না বিবিজান, তোমার এই বরের জন্য এক সেকেন্ডের জন্য লজ্জাটা ভুলে আর একবার জাস্ট ভালোবেসে ডাকো!"
কাবিরের এমন আকুলতা আর গভীর চাউনির সামনে তিথি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও পুরো কেপে উঠে, আধো-আধো আর কাঁপাকাঁপা গলায় কাবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে ডাকল,
"জা... জান্!"
(চলবে…)