#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৪৮
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
ব্যাস! কাবির আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে তিথির ফর্সা হাতটা টেনে নিয়ে তাতে গভীর একটা চুমু খেল। তারপর তিথিকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে রেখে রুম থেকে বের হয়ে গেল। ঠিক পরের মুহূর্তেই মারুফ আহমেদ আর তানিয়া মিথুর সহায়তায় ঘরের ভেতর একের পর এক বিশাল বড় বড় লাক্সারি বক্স আর শপিং ব্যাগ ঢুকতে লাগল। পুরো ঘর যেন নিমেষেই একটা রাজকীয় শপিং মল হয়ে উঠল!
তিথি তো হা হয়ে বিছানায় বসে রইল। কাবির একে একে বক্সগুলো খুলে তিথির সামনে মেলে ধরতে লাগল।
আড়ং থেকে আনা সেই ৫০০টি চোখ ধাঁধানো সিল্ক, কাতান আর জামদানী শাড়ি, যা দেখে যে কোনো মেয়ের চোখ চড়কগাছ হয়ে যাবে!
টকটকে লাল আর গাঢ় মেরুন রঙের প্রায় ৫০ ডজন কাঁচের চুড়ি।এক বা দুই পিস নয়, পুরো ১০০টি কসমেটিকস ও লিপস্টিকের কালেকশন।
মন শান্ত করার মতো চমৎকার সব ইসলামিক বইয়ের স্তূপ।
আর সুবাস ছড়ানো চার ছড়া তাজা বেলি ফুলের মালা ও লাল গোলাপের তোড়া।
তিথি পুরো স্তব্ধ হয়ে শাড়ি আর চুড়ির পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। ও কিছু বলার আগেই কাবির সব শপিংয়ের মাঝখান থেকে একটা ছোট মখমলের লাল বক্স বের করল। বক্সটা খুলতেই ভেতরের নিখুঁত ডায়মন্ডের তৈরি 'K' লেটারের লকেটটা জ্বলজ্বল করে উঠল।
কাবির তিথির একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর ঘাড়ের ঘন কালো চুলগুলো একহাতে একপাশে সরিয়ে দিয়ে পরম যত্নে লকেটটা তিথির ফর্সা গলায় পরিয়ে দিল। ডায়মন্ডের সেই উজ্জ্বলতা তিথির গলার ত্বকে মিশে যেতেই কাবির আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঝুঁকে পড়ে তিথির নরম, ফর্সা গলায় গভীর আর তীব্র একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল।
তিথি শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কাবির তিথিকে পেছন থেকে শক্ত করে নিজের চওড়া বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আজ থেকে তোমার গলার এই লকেটটা যেমন আমার দেওয়া এই চেইনের সাথে আজীবন আটকে থাকবে, ঠিক তেমনি তুমিও আজ থেকে এই কাবির রহমান কায়নাতের নামের বেড়াজালে সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে গেলে। এই লকেটটা কেবল একটা জিনিস, কিন্তু তুমি হলে আমার একমাত্র সম্পত্তি! আমার সবচেয়ে দামী প্রোপার্টি।"
তিথি আয়নায় নিজের গলায় ঝুলতে থাকা 'K' লেটারের লকেটটা আর পেছনে দাঁড়িয়ে কাবিরের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো খুশিতে আর এক বুক তৃপ্তিতে আবার ভিজে উঠল।
কিন্তু হঠাৎ করেই ওর নজর গেল আড়ংয়ের সেই জমকালো ৫০০টি শাড়ির ওপর। তিথি শাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা আলতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজের বড় হয়ে যাওয়া পেটের ওপর হাত রেখে একটু মন খারাপের সুরে বলল,
"গিফটগুলো পেয়ে আমার সত্যিই অনেক ভালো লেগেছে। কিন্তু... আমার না এখন খুব শাড়ি পরতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই অবস্থায় শাড়ি পরলে কি আমাকে আদেও ভালো দেখাবে? কেমন যেন লাগবে না?"
কাবির তিথির এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর মন খারাপের কথা শুনে খাটের ওপর বসল। সে তিথির আরও কাছে ঝুঁকে এসে, ওর কোমরে হাত জড়িয়ে ধরে চোখের কোণে একটা চরম দুষ্টু ডেভিল হাসি ফুটিয়ে তুলল। একদম ফিসফিস করে বলল,
"কী যে বলো না বিবিজান! তুমি যাই পরো না কেন, তাতেই তোমাকে পুরো হুরপরীর মতো লাগে। আর... তুমি যদি কিছু না পরে আমার সামনে থাকো, তখন তোমাকে আরও কোটি গুণ বেশি ভালো লাগে!"
কাবিরের মুখ থেকে এমন ভরদুপুরে একেবারে লাগামহীন কথা শুনে তিথি পুরো থতমত খেয়ে গেল। লজ্জায় ওর কান-মুখ টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। ও চট করে কাবিরের চওড়া বুকে একটা জোরে কিল বসিয়ে দিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
"চুপ! একদম চুপ করুন আপনি! আপনি দিন দিন বড্ড বেশি বাজে আর অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন। যান, আমি আপনার দেওয়া এই শাড়ি-টাড়ি কিচ্ছু নেব না, সব ফেরত নিয়ে যান!"
কাবির তিথির সেই লাল হয়ে যাওয়া কিউট মুখটার দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে উঠল। সে কিল খাওয়া জায়গাটা এক হাত দিয়ে বুলাতে বুলাতে বলল,
"আরে! রাগ করছ কেন সোনা? আমি তো জাস্ট সত্যি কথাটা বললাম। তা এগুলো নেবে না কেন?"
"এমনি! আমি... আমি আপনার সামনে এই শাড়িগুলো ট্রায়াল দিতে পারব না। আপনি সামনে থাকলে আমি চেঞ্জই করব না!"
কাবির তিথির এই চরম লজ্জা পাওয়ার কারণটা বুঝতে পেরে এক চোখ বন্ধ করে বাঁকা হাসল। সে খাটে হেলান দিয়ে হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে বেশ আয়েশ করে বলল,
"ওহহ! আচ্ছা... এই ব্যাপার বিবিজান? বরের সামনে শাড়ি পরতে লজ্জা পাচ্ছ? নো প্রবলেম, তুমি চেঞ্জ করো, আমি জাস্ট চোখ বন্ধ করে রাখার অভিনয় করব!" 😉
তিথি এবার একটা বালিশ তুলে কাবিরের মুখের ওপর চেপে ধরল। রুমে তিথির সাথে কিছুক্ষণ দুষ্টুমি করার পর কাবির মুচকি হেসে খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। তোয়ালেটা দিয়ে মাথাটা আর একবার মুছে সে রুম থেকে বের হয়ে গেল ড্রইংরুমের দিকে। তিথিকে শাড়ি ট্রায়াল দেওয়ার একটু একা সময় দেওয়াও দরকার, আবার নিজের প্ল্যানমাফিক একটা বড় চাল চালাও দরকার।
—---
ড্রইংরুমে মারুফ আহমেদ তখন কেদারায় বসে একটা পত্রিকা পড়ছিলেন আর পাশে তানিয়া মিথু বসে ছিলেন। কাবিরকে আসতে দেখে মারুফ আহমেদ পত্রিকাটা একপাশে রেখে হাসিমুখে
বললেন,
"কী বাবা কাবির? তিথির শরীর-টোরীর কন্ডিশন এখন কেমন দেখছ?"
কাবির সোফায় বসে বেশ ভদ্র ছেলের মতো গলা খাকারি দিয়ে বলল,
"জি আব্বু, ও এখন ঠিক আছে। তবে আমি আসলে একটা দরকারি কথা বলতে আসলাম।"
তানিয়া মিথু কৌতূহল নিয়ে বললেন, "কী কথা বাবা? বলো।"
"আসলে আব্বু, সেদিন আমার আব্বু বলছিলেন, ইদানীং আপনাকে খুব মিস করছেন। তো আব্বু আমাকে বলছিলেন, আপনারা যদি ওনাদের বাড়ি গিয়ে ওনাদের সাথে কয়েকটা দিন থেকে আসেন, তবে ওনার খুব ভালো লাগবে। পুরোনো বন্ধুরা একসাথে একটু সময় কাটাতে পারবেন। আমি তো এখন কয়েক সপ্তাহ একদম ফ্রি আছি, তিথির খেয়াল আমি একাই রাখতে পারব। আপনারা দুজন বরং আজই কয়েক দিনের জন্য ওখান থেকে ঘুরে আসুন, আপনাদেরও একটু রিফ্রেশমেন্ট হবে।"
কাবিরের মুখে এই চমৎকার প্রস্তাব শুনে মারুফ আহমেদ আর তানিয়া মিথু প্রথমে একটু চমকে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তানিয়া মিথু স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। ওনার অভিজ্ঞ মন এক নিমেষে বুঝে গেল যে, ওনাদের এই চালাক জামাই আসলে আলতাফ ভাইয়ের বাহানা দিয়ে ওনাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে, যাতে নিজের রূপবতী বউয়ের সাথে একান্তে পুরো বাড়ি ফাঁকা রেখে সময় কাটাতে পারে!
মারুফ আহমেদ চট করে কাশির ভান করে বললেন,
"ওহহ! হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছ কাবির। আলতাফ তো সেদিনও আমাকে ফোন করে খুব করে বলছিল তোমাদের বাড়ি যেতে। আমার তো এই ঝামেলার কারণে মনেই ছিল না! খুব ভালো একটা বুদ্ধি দিয়েছ বাবা।"
তানিয়া মিথু এবার কাবিরের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বললেন,
"তা যা বলেছ বাবা। আমরা থাকলে তিথি তো লজ্জায় তোমার ধারেরকাছেও ঘেঁষবে না, সারাদিন মুখ ভার করে থাকবে। ঠিক আছে, কাবির বাবা যখন এত সুন্দর করে বলছে, তাহলে আমরা আজ বিকেলেই আলতাফ ভাইদের ওখান থেকে ঘুরে আসি। কদিন থাকা যাবে তোমাদের ওখানে। কিন্তু আমার মেয়েটার খেয়াল ঠিকঠাক রেখো তো বাবা, ও কিন্তু এখন একা চলতে পারে না।"
কাবির তো মনে মনে পুরো খুশিতে আটখানা! শাশুড়ি আম্মু যে ওনার মনের কথা এত সহজে ধরে ফেলেছেন, সেজন্য সে ওনার বুদ্ধির মনে মনে একশোটা প্রশংসা করে ফেলল। সে মুখে এক টুকরো মার্জিত হাসি ফুটিয়ে বলল,
"জি আম্মু, কোনো সমস্যা নেই। আপনারা একদম নিশ্চিন্তে ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দিন। তিথির আর আমাদের অনাগত বাচ্চার পুরো দায়িত্ব এই কাবির রহমান কায়নাতের।"
"আচ্ছা বাবা, আমরা তাহলে তৈরি হয়ে নিই।"
তানিয়া মিথু আর মারুফ আহমেদ দ্রুত নিজেদের কিছু জামাকাপড় একটা ছোট ব্যাগে গুছিয়ে নিলেন। কাবির নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওনাদের বিদায় জানিয়ে সদর দরজাটা টেনে ভেতর থেকে লক করে দিল। ব্যাস! পুরো বাড়িটা এখন এক নিমেষে একদম নিঝুম, নিস্তব্ধ আর শান্ত হয়ে গেল।
~~~
ড্রইংরুমে একা দাঁড়িয়ে কাবির দরজার লকটার ওপর হাত রাখল। ওর ঠোঁটের কোণে তখন সেই চিরচেনা, ভয়ঙ্কর সুন্দর ডেভিল স্মাইলটা আবার ফিরে এসেছে। পুরো বাড়ি ফাঁকা, আর ওপাশে ঘরের ভেতর ওর অভিমানী বিবিজান শাড়ি নিয়ে একা একা যুদ্ধ করছে।
তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজটা আর একবার পরখ করে নিল। কাবিরের দেওয়া সেই উপহারের পাহাড় থেকে ও বেছে নিয়েছে চমৎকার এক বেগুনি রঙের কাঞ্জিভরাম সিল্ক শাড়ি। শাড়ির মসৃণ সিল্ক ওর ফর্সা শরীরে আগুনের মতো জ্বলছে। গর্ভাবস্থার কারণে তিথির শরীর এখন কিছুটা ভারী, কিন্তু শাড়িটা ওর শরীরের প্রতিটা বাঁকে যেন শিল্পের মতো মিশে গেছে। পেটের ওপর দিয়ে শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে টেনেছে যে ওর মায়াবী মাতৃত্বের আভা আরও ফুটে উঠেছে।
তিথি ওর ঠোঁটে মাখল টকটকে লাল রঙের লিপস্টিক। ওর মুখটা যেন শরতের বিকেলের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখের কোণে হালকা কাজল আর সবশেষে ও ওর ঘন কালো চুলের খোঁপার চারপাশ দিয়ে জড়িয়ে নিল তাজা বেলি ফুলের শুভ্র মালা। বেলির তীব্র সুবাস পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ে এক মাতাল করা পরিবেশ সৃষ্টি করল। গলায় সেই 'K' লেটারের ডায়মন্ড লকেটটা চিকচিক করছে।
তিথি আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেই নিজের রূপে মুগ্ধ হয়ে গেল। আজ ও নিজেকে সাজিয়েছে কেবল ওর ওই অসভ্য সিংহটার জন্য।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এক জোড়া পায়ের শব্দ শোনা গেল। কোনো কথা নেই, কেবল এক তীব্র পৌরুষালী সুবাস তিথির নাকে আছড়ে পড়ল। তিথি বুঝল, শিকারি তার গুহায় প্রবেশ করেছে।
কাবিরের চোখের সেই তীক্ষ্ণ চাউনিতে কোনো রাগ নেই, আছে কেবল এক সমুদ্র তৃষ্ণা আর মোহ।
কাবির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তিথির আপাদমস্তক অবলোকন করল। ওর চোখের মণিটা তিথির লাল ঠোঁট আর বেলি ফুলের ওপর গিয়ে স্থির হলো। কাবির ধীরপায়ে এগোতে এগোতে একদম শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল,
"ড্যাম! বিবিজান... তুমি কি আজ কসম খেয়েছ যে এই কাবির রহমান কায়নাতকে হার্ট অ্যাটাক করিয়েই ছাড়বে? এই রূপ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে তো আগুনের সামনে মোমবাতি রাখা!" 🌚🔥
তিথি আয়নার প্রতিবিম্বে কাবিরের ওই নেশাতুর চাউনি আর সুঠাম শরীরটা দেখে শিউরে উঠল। ও ধীরপায়ে পেছনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। কাবিরের একদম কাছাকাছি আসতেই ও লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। কাবিরের খালি বুকের উত্তাপ ওর নাকে লাগছে। তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ও মাথা নিচু করে নিজের দাঁত দিয়ে নিচের লাল টকটকে ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। লজ্জায় ওর পুরো গাল আর কান থেকে যেন গরম ভাপ বেরোচ্ছে।
তিথির এই ঠোঁট কামড়ে ধরার দৃশ্যটা কাবিরের সহ্য সীমার বাইরে চলে গেল। ও এক ঝটকায় তিথির কোমরে নিজের শক্ত হাতটা জড়িয়ে ওকে একদম নিজের গায়ের সাথে মিশিয়ে নিল। তিথির নরম পেটটা কাবিরের শক্ত দেহের সাথে মিশে গেল।
কাবির তিথির চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"এইভাবে ঠোঁট কামড়ে ধরো না বিবিজান। তুমি জানো না, তোমার এই একটা ছোট্ট ইশারা আমার ভেতরের পশুটাকে কতটা মরিয়া করে তোলে? তুমি যত লজ্জা পাচ্ছ, আমার নেশা তত বাড়ছে।”
কাবিরের এমন লাগামছাড়া শুনে তিথি নিজের মুখটা ওর চওড়া বুক থেকে সরাল। ও একটু আগের সেই লজ্জা আর ভাব ধরে রাখতে পারল না। কাবিরের খালি গায়ের দিকে তাকিয়ে তিথি হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে ফেলল।
তিথির এই হুট করে হেসে ফেলার একটা বড় কারণ ছিল। কাবির এতক্ষণ ওপরে খালি গায়ে রোমান্টিক ডায়লগ মারছিল ঠিকই, কিন্তু ওর নিচের দিকে নজর যেতেই তিথির হাসির বাঁধ ভেঙে গেছে। কারণ, কাবিরের পরনে তখন মারুফ আহমেদের সেই কালো রঙের সুতি লুঙ্গি, আর ও একহাতে ড্রইংরুমের সোফা থেকে তুলে আনা তানিয়া মিথুর ধুয়ে রাখা অফ-হোয়াইট কালারের একটা শার্ট কোনোমতে ধরে রেখেছে! ওপরে রোমান্টিক নায়ক আর নিচে খাঁটি বাঙালি জামাইয়ের এই জগাখিচুড়ি রূপ দেখে তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারেনি।
তিথির সেই মুক্তোঝরা, প্রাণখোলা হাসি দেখে শার্টটা একপাশে ছুড়ে ফেলে কাবির তিথির ওই হাসিমুখের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। ওর মনে হলো, এই হাসির জন্য ও পুরো দুনিয়াটাকেও বাজি ধরতে রাজি।
কাবির নিজের লুঙ্গির কোঁচাটা একহাতে একটু ঠিক করে, অন্যহাতে তিথির গালটা আলতো করে ছুঁয়ে একদম কাতর গলায় বলল,
"ইশ বিবিজান! তুমি কি সত্যিই আজ আমায় মেরে ফেলবে? তোমার এই হাসির ধার যে ওই শ্যুটারদের বুলেটের চেয়েও মারাত্মক, তা কি তুমি জানো? এই রোগা শরীরে এত ধার কোত্থেকে আসলো, হ্যাঁ?"
তিথি হাসি থামিয়ে কাবিরের বুকে আলতো করে চাপ দিয়ে বলল,
"যান, আগে অসভ্যর মতো খালি গায়ে না থেকে জামাটা পরুন তো!"
"জামা পরার চেয়ে তোমাকে একটু প্রকৃতির মাঝে নিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি।"
বলেই কাবির তিথির কোনো ওজর-আপত্তি শুনল না। ও তিথির ওই বেলি ফুলের মালায় সাজানো নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে, আলতো পায়ে তিথিকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ওদের বাড়ির পেছনের ছোট বাগানটার দিকে হেঁটে গেল। বিকেলের মিষ্টি রোদ আর বেলি ফুলের সুবাসে তখন চারপাশটা যেন ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
***********
বাগানের এক কোণে থাকা পুরোনো কাঠের দোলনাটায় তিথিকে সাবধানে বসিয়ে দিল কাবির। বেগুনি সিল্ক শাড়ির আঁচলটা বাতাসে হালকা উড়ছে, আর চুলের বেলি ফুলের সুবাস দোলনার চারপাশের বাতাসকে মাতাল করে তুলেছে। কাবির দোলনার পেছনে দাঁড়িয়ে একদম হালকা হাতে আলতো করে দোল দিতে লাগল।
দোলনাটা যখনই পেছনের দিকে আসছে, কাবির সুযোগ বুঝে ঝুঁকে পড়ে তিথির ফর্সা খোলা ঘাড়ে নিজের তপ্ত ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিচ্ছে। বেলি ফুলের তীব্র সুবাস আর কাবিরের ঠোঁটের সেই অতর্কিত উষ্ণ ছোঁয়ায় তিথি প্রতিবার শিউরে উঠছে। ওর পুরো শরীরে এক অদ্ভুত অবশ করা অনুভূতি খেলে যাচ্ছে। সে দোলনার হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে শাসনের সুরে বলল,
"এই! আপনি এমন করছেন কেন বলুন তো? আম্মু-আব্বু যদি হুট করে চলে আসে আর এই অবস্থায় দেখে ফেলে, তাহলে কী ভাববে?"
কাবির ঠোঁটের কোণে সেই চেনা ডেভিল স্মাইল ফুটিয়ে দোলনাটা আলতো করে থামাল। তারপর তিথির একদম মুখোমুখি এসে ওর দুই হাত জড়িয়ে ধরে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
"আম্মু-আব্বু এখন চাইলেও আসতে পারবে না বিবিজান। ওনাদের তো আমি আমাদের নিজেদের বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি!" 😉
তিথি চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকাল,
"কীহ! বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন মানে? কেন এমন করতে গেলেন?"
"কেন আবার?"
কাবির তিথির কোমরে হাত গলিয়ে ওকে নিজের দিকে একটু টেনে নিয়ে একদম নিচু গলায় বলল,
"কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি, ওনারা এই বাড়িতে থাকলে তুমি লজ্জায় আমার ধারেকাছেও ঘেঁষতে না। আর আমার তো তোমার সাথে মন ভরে রোমান্স করার জন্য পুরো বাড়িটা ফাঁকা দরকার ছিল!" 🔥
কাবিরের মুখে এমন সত্যি কথা শুনে তিথি লজ্জায় পুরো লাল হয়ে গেল। ও কাবিরের বুকে নিজের নরম হাত দিয়ে একটা ধাক্কা মেরে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
"ইশ! কী সব নির্লজ্জের মতো কথা বলেন আপনি! শুনতে বড্ড বাজে শোনায়।"
কাবির তিথির লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে শব্দ করে হেসে উঠল। তারপর তিথির পাশে দোলনাটায় গা ঘেঁষে বসল। চারপাশের শান্ত পরিবেশটার দিকে তাকিয়ে কাবির তিথির কাঁধে নিজের হাতটা রাখল। তিথিদের বাড়ির এই পুরোনো আবহাওয়াটা ওর মন কেড়ে নিয়েছে। সে তিথিকে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা বিবিজান, তোমাদের এই বাড়িটা কত বছরের পুরোনো বলো তো?"
তিথি কাবিরের কাঁধে নিজের মাথাটা রেখে শান্ত গলায় বলল,
"খুব বেশি পুরোনো না। আমার যখন জন্ম হয়েছিল, ঠিক তখনকার তৈরি এই বাড়িটা।"
তিথির কথা শুনে কাবির পুরো বাড়িটার দিকে আর একবার চোখ বুলাল। এই দোতলা কাঠের বাড়িটা সত্যিই এক অপূর্ব শিল্পের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, একটা নির্জন আর শান্ত এলাকায় বাড়িটার অবস্থান। চারপাশে মানুষের আনাগোনা বা হৈচৈ একদমই নেই বললেই চলে, যার কারণে এক অদ্ভুত নীরবতা জড়িয়ে আছে পুরো এলাকাটায়।
পুরো বাড়িটাই মজবুত সেগুন আর শাল কাঠের তৈরি। দেয়ালগুলোর গায়ে দারুণ সব কাঠের কারুকাজ করা, যেখানে লতা-পাতা এবং নান্দনিক ফুলের নকশা খোদাই করা রয়েছে। সেই কাঠের দেয়াল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে সবুজ মানিপ্ল্যান্ট আর বুনো লতার দল। বাড়ির চারপাশটা ঘিরে আছে ঘন সবুজ ঘাস আর হরেক রকমের ফুলের গাছ, যা বাড়িটাকে এক সবুজ চাদরে ঢেকে রেখেছে। এই নির্জন, শান্ত আর সবুজ ঘেরা কাঠের বাড়িটার বারান্দায় দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোনো এক রূপকথার জগতে চলে এসেছে কেউ।
—-------
বিকেলের মৃদু হাওয়া আর বেলি ফুলের তীব্র সুবাসের মাঝে দোলনাটা হালকা দুলছিল। কাবির তিথির ফর্সা হাতটা নিজের বড় হাতের মুঠোয় নিয়ে আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে গভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা বিবিজান, একটা কথা বলো তো। তুমি প্রথম সন্তান হিসেবে কী চাও? ছেলে নাকি একটা মিষ্টি মেয়ে?"
তিথি কাবিরের এমন প্রশ্নে একটু চমকে গেল। ও নিজের বড় হয়ে যাওয়া পেটের ওপর আলতো করে হাত রেখে খানিকটা ভাবল। তারপর লাজুক হেসে কাবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমার না মেয়ে খুব পছন্দ। একদম পুতুলের মতো একটা মেয়ে হবে, যাকে আমি প্রতিদিন নিজের হাতে সুন্দর সুন্দর জামা আর মাথায় বেলি ফুলের মালা পরিয়ে সাজিয়ে দেব।"
তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে কাবির মুগ্ধ হয়ে গেল। সে তিথির আরও কাছে ঘেঁষে এসে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"আর আমার কিন্তু একটা হুবহু তোমার মতো জেদি আর কিউট মেয়ে চাই, বিবিজান। তবে... যদি ছেলে হয়, তাহলেও কোনো আফসোস নেই। সে এক্কেবারে তার বাপের মতো ড্যাশিং আর সিংহ হবে। কিন্তু যাই হোক না কেন, আমি চাই আমাদের প্রথম সন্তানটা যেন একটা রাজকন্যাই হয়।"
তিথি কাবিরের এই সুন্দর ভাবনার কথা শুনে মিষ্টি করে হাসতে যাবে, ঠিক তখনই কাবির কোনো সুযোগ দিল না। সে তিথির হাসির রেশটুকু মিলিয়ে যাওয়ার আগেই এক ঝটকায় ওর চিবুকটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। কোনো কথা না বাড়িয়ে, আকস্মিকভাবে তিথির সেই টকটকে লাল লিপস্টিক মাখা নরম ঠোঁটজোড়ার ওপর নিজের অধর চেপে ধরল। 🤭🔥
আচমকা আর তীব্র গভীর চুম্বনে তিথি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর হাত দুটো কাবিরের চওড়া বুকটা খামচে ধরল। কাবির পরম আবেশে, তিথির ওষ্ঠাধরের সমস্ত মাদকতা শুষে নিল। বেশ কিছুক্ষণ পর কাবির যখন তিথির ঠোঁট দুটো মুক্ত করে দিল, তিথি তখন জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। লজ্জায় ওর ফর্সা গাল, কান আর ঘাড় একেবারে লাল টমেটোর মতো হয়ে গেছে। ও দুই হাতে মুখ ঢেকে কাবিরের বুকে মাথা লুকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"উফ! আপনি একটা আস্ত নির্লজ্জ! যখন তখন যা ইচ্ছে তাই শুরু করে দেন। বাগানে আছি, সে খেয়ালও নেই আপনার?"
কাবির তিথির এমন কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল। ও তিথিকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে হাত বুলাতে লাগল। কিছুটা সময় পর, পরিবেশটা যখন আবার শান্ত হলো, কাবির তিথির মাথায় চিবুক ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা বিবিজান, একটা সত্যি কথা বলবে? তোমার কাছে আমি প্রথম প্রথম কেমন মানুষ ছিলাম? আর এখন স্বামী হিসেবে আমি আসলে কেমন?"
তিথি কাবিরের বুক থেকে মাথা তুলে ওর চোখের দিকে তাকাল। কাবিরের মুখে এমন সিরিয়াস প্রশ্ন শুনে ওর মনে দুষ্টুমি বুদ্ধি চাড়া দিয়ে উঠল। ও ঠোঁট উল্টে, বেশ রসিকতা করে বলল,
"প্রথম প্রথম? ওরে বাবা! প্রথমে তো আপনি আমার কাছে একটা আস্ত জল্লাদ, খবিশ আর হিটলার ছিলেন! সারাদিন ওই রাগী মুখ করে থাকতেন আর কথায় কথায় এমনভাবে চোখ রাঙাতেন যে আমার মনে হতো এই বুঝি বাঘে আমায় গিলে খেল! খিটখিটে একটা বুড়ো সিংহ ছিলেন আপনি।" 🤣
কাবির চোখ ছোট ছোট করে তিথির দিকে তাকাল,
"কীহ! আমি খবিশ আর বুড়ো সিংহ ছিলাম?"
তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই কাবিরের সেই তীক্ষ্ণ আর গভীর চোখের দিকে তাকাতেই ওর ভেতরের সব দুষ্টুমি উবে গেল। ও নিজের নরম হাত দুটো কাবিরের ফর্সা আর শক্ত গালের ওপর রাখল। মায়াবী আর শ্রদ্ধাপূর্ণ চোখে কাবিরের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
"এগুলো তো জাস্ট মজা করছিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে... স্বামী হিসেবে আপনাকে পেয়ে আমি কতটা খুশি আর কতটা ভাগ্যবতী, তা হয়তো আমি মুখে বলে কখনো শেষ করতে পারব না। বাইরে আপনি যতই রাগী আর কঠোর অফিসার হোন না কেন, আমার কাছে আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয়। আপনার এই রূপ, আপনার এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, আর আমার প্রতি আপনার এই লাগামছাড়া, পাগলাটে ভালোবাসা—আমাকে প্রতিদিন নতুন করে আপনার প্রেমে পড়তে বাধ্য করে। আমি সত্যিই অনেক গর্বিত যে আপনি আমার স্বামী।" ❤️
তিথির মুখ থেকে এমন নিখুঁত আর এতো সুন্দর প্রশংসা শুনে কাবিরের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত সুখে তোলপাড় হয়ে গেল। ওর চোখ দুটো নেশাতুর দেখাল। সে তিথির কোমরটা দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ওকে একদম নিজের গায়ের সাথে লেপ্টে নিল। তিথির কপালে নিজের ঠোঁট ঠেকিয়ে আবেগঘন গলায় বলল,
— "রিমেম্বার ওনলি ওয়ান থিং বিবিজান! ইউ আর মাই প্রোপার্টি, ওনলি মাই প্রাইভেট প্রোপার্টি! তোমার এই ফর্সা রূপ, এই উথাল-পাথাল করা শরীর আর এই প্রতিটা উষ্ণ নিশ্বাস—সবকিছুর ওপর একমাত্র এই অসভ্য সিংহটার! আই ওয়ান্ট টু টেস্ট এভরি ইঞ্চি অব ইওর বডি টুনাট! সো, জাস্ট সারেন্ডার ইওরসেলফ টু মি অ্যান্ড লেট মি লাভ ইউ ডার্কলি!" 🌚
#চলবে…