#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৪৯
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
বাগানের সেই মিষ্টি মুহূর্ত শেষ হতেই চারপাশটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে ছেয়ে গেল। দূর থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই কাবির আর তিথি বাগানের দোলনা ছেড়ে বাড়ির ভেতর চলে এল। দুজন একসাথে পবিত্র হয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিল। নামাজ শেষে কাবির আর দেরি করল না। তিথির পরনের সেই বেগুনি শাড়ি আর সাজগোজের ওপর বোরকা, হিজাব, নেকাব পরিয়ে নিল, যাতে বাইরের কারও নজর ওর বিবিজানের ওপর না পড়ে। তারপর সাবধানে তিথিকে নিয়ে এসে বসাল হোন্ডা সিভিকের ফ্রন্ট সিটে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কাবির সোজা রওনা হলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
অন্যান্য দিন গাড়িতে বসলে তিথি চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু আজ যেন ওর মুডটা একদম অন্যরকম। গাড়ির এসি-র হালকা বাতাসে চুলের বেলি ফুলের সুবাস পুরো কেবিনে ছড়িয়ে পড়েছে। তিথি সিটে আরাম করে বসে অনর্গল কথা বলেই চলেছে, আর কাবির একহাতে স্টিয়ারিং ধরে মুচকি মুচকি হেসে ওর প্রতিটা কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছে।
তিথি জানালার কাঁচটা সামান্য নামিয়ে দিয়ে বলল,
"আচ্ছা শুনছেন? হসপিটালে গিয়ে ডাক্তার যদি বলে আমাদের বাবুটা দেখতে একদম আপনার মতো রাগী রাগী হয়েছে, আমি কিন্তু ওখানেই ওকে রেখে চলে আসব, বলে দিলাম!" 🤣
কাবির গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে তিথির দিকে এক পলক তাকিয়ে ডেভিল হাসি দিয়ে বলল,
"আরে! বাপের মতো ড্যাশিং আর সিংহ না হলে কি চলে বিবিজান? আর তুমি রেখে চলে আসলে আমি তো আছিই। তখন আমি আর আমার লিটল লায়ন মিলে তোমাকে চব্বিশ ঘণ্টা জ্বালিয়ে মারব।"
"এহ্! কত শখ! আপনার সাথে তো কথাই বলা যায় না।"
"আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, আপনি যখন প্রথম প্রথম আমাকে দেখতেন, তখন মনে মনে কী ভাবতেন? সত্যি করে বলবেন কিন্তু!"
"সত্যি বলব? প্রথম যখন ওই ডাগর ডাগর চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকাতে, আমার মনে হতো এই পিচ্চি মেয়েটা এত তেজ দেখায় কেন? মন চাইত এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে খাঁচায় বন্দি করে রাখি। আর এখন দেখো, সত্যি সত্যিই
বন্দি করে ফেলেছি।" 😉
"উফ, আপনি একটা আস্ত অসভ্য! সারাদিন শুধু কোল তুলে নেওয়ার চিন্তা। আচ্ছা, হসপিটাল থেকে ফেরার পথে আমাকে কিন্তু ওই বড় সাইজের স্পেশাল হাওয়াই মিঠাই কিনে দিতে হবে। আর হ্যাঁ, ফুচকাও খাব!"
কাবির এবার চোখ বড় বড় করে বলল,
"কীহ! একদিকে ঠান্ডা লেগে আমার হাঁচি থামছে না, আর তুমি খাবে ফুচকা আর হাওয়াই মিঠাই? ডাক্তার যদি বলে তবে ওসব হবে তার আগে না!"
"বউয়ের আবদার মেটানো তো বরের দায়িত্ব, নাকি? না দিলে কিন্তু আমি আবার ওই বাথটাবের মতো আপনার সাদা টাউজার ধরে টান দেব, তখন বুঝবেন!" 🤣😂
তিথির মুখে বাথরুমের চরম লজ্জার কাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দিতেই কাবির এবার সত্যি সত্যিই থতমত খেয়ে গেল। ও ব্রেক চেপে গাড়ির স্পিড একটু কমিয়ে দিয়ে কপালে হাত দিয়ে বলল,
"বাপরে! বিবিজান, তুমি তো দিন দিন আমার চেয়েও বড় ডেঞ্জারাস হয়ে উঠছ! ঠিক আছে বাবা, ফুচকা, হাওয়াই মিঠাই যা চাও সব দেব, তাও দয়া করে রাস্তায় আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করো না!" 😭🤣
কাবিরের অমন ভয়ার্ত চেহারা দেখে তিথি গাড়ির ভেতর খিলখিল করে হেসে উঠল। ও কাবিরের বাম হাতটা টেনে নিয়ে নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরল।
ক্যাবিনের দরজা ঠেলে কাবির আর তিথি ভেতরে ঢুকতেই মৃদু হেসে স্বাগত জানালেন গাইনোকোলজিস্ট ডাক্তার রাহা। ২৮ বছর বয়সী ড. রাহা বেশ চটপটে, আধুনিক আর অভিজ্ঞ একজন চিকিৎসক। তিথিকে সাবধানে আল্ট্রাসোনোগ্রাফির বেডে শুইয়ে দিয়ে কাবির পাশে এসে দাঁড়াল। ড. রাহা তিথির পেটে ঠান্ডা জেল লাগিয়ে মনিটরের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণের নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওনার মুখে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। মনিটরের স্ক্রিনের দিকে ইশারা করে ড. রাহা বলতে লাগলেন,
"মি. কাবির, একটু ভালো করে লক্ষ্য করুন। আপনাদের বেবির গ্রোথ প্রোফাইল একবারে আইডিয়াল প্যারামিটারে আছে। ফিটাল হার্ট রেট এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের পরিমাণ একদম পারফেক্ট। আর সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ হলো ইউ আর গোয়িং টু বি প্যারেন্টস অব টুইন্স! হ্যাঁ, আপনাদের জমজ সন্তান হতে চলেছে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফির রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওদের হাত-পা এবং প্রতিটি অর্গানের ডেভেলপমেন্ট চমৎকার। দুইটা বাচ্চারই পজিশন খুব ভালো আছে।"
জমজ বাচ্চার কথা শুনে কাবির আর তিথি একে অপরের দিকে তাকিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাসল। তিথির চোখে তখন খুশির জল টলমল করছে।
ড. রাহা জেলটুকু মুছে তিথিকে উঠে বসতে সাহায্য করলেন। এরপর প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে কাবিরের দিকে তাকিয়ে একটু রসিকতার সুরে বললেন,
"তা মি. কাবির, আপনাকে দেখে তো বেশ জেন্টলম্যান মনে হয়! তাহলে এইটুকু আঠারো বছর বয়সের একটা মেয়ের সাথে এমনটা কীভাবে করলেন বলুন তো? বেচারি নিজেই তো এখনো বাচ্চার মতো সরল, আর ওর পেটে এখন দুটো জমজ বাচ্চা! একটু তো ছাড় দিতে পারতেন!" 😌
কাবির একটুও লজ্জিত না হয়ে, একেবারে নির্লজ্জের মতো একটা বাঁকা হাসি দিল। ও তিথির কোমরে হাত জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে ড. রাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কী করব বলুন ডক্টর? ঘরে যদি এমন ডানাকাটা পরী ও রূপসী বউ থাকে, তবে কোনো পুরুষের পক্ষেই নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখা পসিবল না। সো, আই জাস্ট কুড নট রেজিস্ট মাইসেলফ!" 😉
কাবিরের মুখ থেকে এমন নির্লজ্জ জবাব শুনে তিথি পুরো লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। ও কাবিরের চিমটি কেটে ফিসফিসিয়ে বলল,
"এই চুপ করুন তো আপনি! বড্ড বেশি কথা বলেন। প্লিজ, আপনি একটু থামবেন? ডাক্তার আপু, আপনি ওনার কথা শুনবেন না। ওনাকে বাদ দিয়ে প্লিজ আমাকে আমার বেবিদের আল্ট্রাসোনোর ছবিটা দেখতে দিন না।"
তিথির এমন নিষ্পাপ আর সরল আবদার দেখে ড. রাহা মন খুলে হেসে উঠলেন। ওনার তিথির এই সরলতা বড্ড ভালো লেগে গেল। তিনি কাবিরের দিকে তাকিয়ে বেশ আন্তরিক গলায় বললেন,
"আপনি সত্যিই অনেক লাকি মি. কাবির। এত সুন্দর, কিউট আর ভালো মনের একটা মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে কে না চায় বলুন? তিথির যত্ন নেবেন, ও ভীষণ স্পেশাল।"
তিথি আল্ট্রাসোনোর ছবিটা হাতে নিয়ে ভীষণ মায়া ভরা কণ্ঠে বলল,
“ডাক্তার আপু, আমার না খুব খুব ফুচকা, চকলেট, আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে!”👉👈🥹
তিথির ওমন ইনোসেন্টনেস উপেক্ষা করে ড. রাহা বললেন,
“নো তিথি, এইটা পসিবল না তোমার বেবি হেলদি আছে তার মানে এই না তুমি যে কোনো খাবার খেতে পারবে!”
পরক্ষণেই আবার বললেন,
“হ্যাঁ, খেতে পারো। তবে শুধু চকলেট ও আইসক্রিম তবে লিমিট মতো খেতে পারবে। আর মি. কাবির আপনাকে তিথির ডেইলি খাবারের রুটিন লিখে দিচ্ছি। আপনি অবশ্যই এজ এ হাসবেন্ড হিসেবে বিষয়টা খেয়াল রাখবেন।”
কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে বলল,
“অবভিয়াসলি ডক্টর, আমি কড়া নজরে রাখব ওকে।”
হসপিটাল থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসতেই তিথির খুশি আর ধরে না। ও সিটে বসে হাত-পা নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। তিথির এমন বাচ্চাদের মতো কাণ্ডকারখানা দেখে কাবির গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
"কী ব্যাপার বিবিজান? এত যে হাত-পা নাড়ছ, খুশির কারণটা কী? টুইন বেবিদের খবর পেয়ে নাকি আইসক্রিম খাওয়ার পারমিশন পেয়ে?"
তিথি মাথা নেড়ে চুলে জড়ানো বেলি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে বলল,
"হ্যাঁএএ! আমার বেবি হবে, ভাবা যায়? ওরা বড় হয়ে আমার সাথে খেলবে, আমার সাথে কথা বলবে! আচ্ছা, একটা কথা বলুন না... বেবি কীভাবে হয়? আর... তখন কি খুব কষ্ট হয়?" 🥺
তিথির এমন আচমকা আর নিষ্পাপ প্রশ্ন শুনে কাবির হাসবে নাকি কাঁদবে, তা বুঝতে পারল না। ও স্টিয়ারিংয়ে এক হাত চাপড়ে জোরে হেসে উঠে
বলল,
"আরে বিবিজান! আমি কীভাবে জানব বলো তো? আমি কি কখনো বেবি জন্ম দিয়েছি নাকি, হ্যাঁ?"
তিথি একটু ভেবে বলল,
"তাও তো ঠিক! আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই। আমি না হয় আগামীকাল আম্মুকে জিজ্ঞেস করে নেব।"
আম্মুর নাম শুনতেই কাবির পুরো থতমত খেয়ে গেল। শাশুড়ি আম্মুকে মেয়ে যদি এই প্রশ্ন করে, তবে ওনারা জামাই হিসেবে কাবিরের ওপর দিয়ে কী ঝড় বইয়ে দেবেন, তা ভেবেই ওর কপালে ঘাম ছুটে গেল।
"না! একদম না! কোনো দরকার নেই আম্মুকে জিজ্ঞেস করার। আমি তোমাকে নিজেই সব জেনেশুনে বলব যে বেবি কীভাবে হয় আর জন্ম নেয়। তুমি এই কথা ভুলেও অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করবে না, ওকে?" 😉
তিথি সরল মনে মাথা দুলিয়ে বলল,
"ঠিক আছে, আমাকে কালকের মধ্যেই জানিয়ে বলবেন। কারণ আমার বেবিরা যদি ভেতরে কষ্ট পায়, আমি তো সহ্য করতে পারব না!"
কাবির মনে মনে এক ডেভিল হাসি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "ঠিক আছে বিবিজান, বেবি কীভাবে জন্ম দিতে হয়, সেই প্রসেসটাই তো নাকি? আচ্ছা আচ্ছা, আমি তোমাকে প্র্যাক্টিক্যালি সব বুঝিয়ে বলব, নো টেনশন!" 🌚🔥
~~
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাবির গাড়ি এনে থামাল চরপাড়া রোডের বেশ জনপ্রিয় একটি স্পট "বিগ বার্গার অ্যান্ড ইগলু সিলেক্টা আইসক্রিম পার্লার"-এর সামনে। ৭৭/জি, ২/১ বাঘমারা, চরপাড়া মোড়, ময়মনসিংহ সদরের এই চেনা পার্লারে তিথির জন্য ও ভেতরে গিয়ে এক্কেবারে রাজকীয় আর বিলাসবহুল একটা লাক্সারি টেবিল বুক করল।
চারপাশের সুন্দর পরিবেশ আর আলোঝলমলে পার্লার দেখে তিথি তো খুশিতে আটখানা! ও এখন পেট ভরে আইসক্রিম আর চকলেট খাবে। ও নিজের বড় হয়ে যাওয়া পেটের ওপর দুই হাত রেখে দুলতে দুলতে, খুশিতে নাচতে নাচতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই ওনাদের অর্ডারের জন্য এক ওয়েটার মেনু কার্ড হাতে এগিয়ে এসে অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে কাবিরকে বলল,
"স্যার, আপনার আর আপনার আম্মুর জন্য কী অর্ডার করতে পারি?"
আম্মু শব্দটা শোনা মাত্রই কাবিরের মুখটা রাগে আর বিরক্তিতে কালো হয়ে গেল। তিথিকে দেখতে ছোটখাটো আর কিউট বলে এই ওয়েটার ওকে কাবিরের মা ভেবে বসেছে! কাবির চোখ দুটো ছোট করে এক্কেবারে কড়া ভাবে ধমকের সুরে বলল,
"ওয়াট? আম্মু? শি ইজ মাই ওয়াইফ! উনি আমার স্ত্রী! অন্ধ নাকি তুমি?" 😡🔥
ওয়েটার তো কাবিরের ওই সিংহের মতো ধমক খেয়ে ভয়ে কেঁপেই অস্থির! সে আমতা আমতা করে মাফ চাইতে লাগল। এদিকে তিথি কাবিরের ওই রাগ আর ওয়েটারের অবস্থা দেখে খিলখিল করে হেসে দিল। ও কাবিরের দিকে তাকিয়ে আদুরে আর দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
"সত্যিই... একদম পারফেক্ট জামাই জান আমার! রাগ ওনার নাকের ডগায় থাকে।" 🥹😝
কাবির ওয়েটারকে তাড়িয়ে দিয়ে তিথিকে বলল,
"তোমার পছন্দমতো সব আইসক্রিম আর চকলেটের অর্ডার দাও বিবিজান।"
ব্যাস! পারমিশন পেতেই তিথি মেনু কার্ড হাতে নিয়ে প্রায় ১০০ আইটেমের চকলেট আর আইসক্রিমের এক বিশাল লম্বা লিস্ট বের করে ফেলল! ও একটার পর একটা ফ্লেভারের নাম বলতে লাগল, আর কাবির কপালে হাত দিয়ে ভাবল আজকে তিথির পেটের বারোটা বাজাই বোধহয় নিশ্চিত!
কাবির ওই ওয়েটারের ওপর তখনো বড্ড ফোসফোস করছিল। ও ওয়েটারের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
"আই ডোন্ট নো হোয়াট আই উইল ডু! জাস্ট গেট আউট ফ্রম হেয়ার অ্যান্ড ডোন্ট এভার কাম ইন ফ্রন্ট অব মি এগেইন, ওকে?" 😡🔥
ওয়েটার ভয় পেয়ে 'জি স্যার, সরি স্যার' বলতে বলতে এক্কেবারে পেছন ফিরে দৌড় দিল। ওদিকে তিথি তো পরম শান্তিতে একবার চকলেটে কামড় দিচ্ছে, আর একবার চামচ দিয়ে আইসক্রিম তুলে মুখে পুরছে! ওর মুখ-চোখে এখন জান্নাতি সুখের ভাব।
আইসক্রিম আর চকলেট খেতে খেতে তিথির ঠোঁটের কোণে আর গালে বেশ কিছুটা চকলেট লেগে গেল। কাবির নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে লম্পট আর নেশাতুর দৃষ্টিতে তিথির ওই চকলেট লেগে থাকা ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। কাবিরকে ওইভাবে গিলে খাওয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিথি চামচটা কাবিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে মাসুম গলায় বলল,
"এই স্বামী, খাবেন? নেন খান, ওভাবে হা করে তাকিয়ে আছেন কেন?"
কাবির ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা ডেভিল স্মাইল ফুটিয়ে তুলল। ও মৃদু ফিসফিসানি গলায় বলল,
"আমি যেখান থেকে খুশি, সেখান থেকে খেতে পারব তো বিবিজান?"
তিথি তো আশপাশের সব চকলেট আর আইসক্রিমের বাটিগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবল কাবির হয়তো বাটির কোনো একটা চকলেটের কথা বলছে। ও সরল মনে মাথা নাড়িয়ে বলল,
"হ্যাঁ, পারবেন। এতগুলো তো আছে, আপনার যেটা খুশি খান!"
ব্যাস! পারমিশন পেতেই কাবির আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ও টেবিলের ওপর মৃদু ঝুঁকে এসে তিথির কোনো ওজর-আপত্তির সুযোগ না দিয়ে, ওর ঠোঁটের বামে আর চার পাশে লেগে থাকা সবটুকু চকলেট নিজের ঠোঁট দিয়ে চুষে এক্কেবারে পরিষ্কার করে ফেলল!
তিথি তো হঠাৎ এই কাণ্ডে পুরো স্তব্ধ! ওর সব হাসি বন্ধ হয়ে গেল, চোখ বড় বড় করে কাবিরের দিকে তাকিয়ে রইল। ও একটু পর নিজের হিজাবের আঁচলটা টেনে নিয়ে লাজুক আর অভিমানী গলায় বলল,
"আপ... আপনি এটা কী করলেন?"
কাবির নিজের ঠোঁট চেটে একটা তৃপ্তির হাসি ফেলে বলল,
"
চকলেট খেলাম বিবিজান! টেস্টটা কিন্তু এক্কেবারে অসম ছিল! এমন ফ্লেভারের চকলেট আমি লাইফে আগে কখনো টেস্ট করি নাই।" 😉🔥
তিথি লজ্জার তীব্রতায় আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না, ও নিচু স্বরে বলল,
"আপনি এটা মোটেও ঠিক করলেন না! সবসময় শুধু অসভ্যতামি।"
তিথি চকলেটটা টেবিলের ওপর রেখে আবার নতুন করে আইসক্রিম খেতে শুরু করল। তবে মুখে যাই বলুক না কেন, কাবির একটু আগে যে কাজটা করেছে, তা ওর মোটেও ভালো লাগেনি। লোকাল একটা আইসক্রিম পার্লারে বসে সবার সামনে হঠাৎ এভাবে চুমু খাওয়ার কোনো মানে হয়? ওর মনের ভেতরের লজ্জা আর ধকধকানি ভাবটা এখনো পুরোপুরি কেটে উঠতে পারছে না।
দেখতে দেখতে তিথি মনের সুখে কয়েক বাটি আইসক্রিম শেষ করে ফেলল। কাবির সেই কখন থেকে তিথির শরীরের একদম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, এখনো এক চুলও নড়েনি। ওর সেই তীব্র নেশাতুর চোখ দুটো একইভাব তিথির দিকেই নিবদ্ধ। কাবিরকে এভাবে একটানা তাকিয়ে থাকতে দেখে তিথি যখনই কাবিরের মুখের দিকে চেয়ে একটু ধমক দিতে গেল, ঠিক তখনই ঘটল অঘটন! মায়াবী চোখের সেই ইশারায় তিথির হাত কেঁপে উঠল আর আইসক্রিমের পুরো বাটিটা উপুড় হয়ে ওর বোরকার ওপর পড়ে গেল! 🫠
পছন্দের আইসক্রিমটা ওভাবে বোরকার ওপর পড়ে যেতেই তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ও বাচ্চাদের মতো মুখ কুঁচকে ‘ভেঁওওও’ করে কান্না জুড়ে দিল। পার্লারের দু-চারজন মানুষও ওদিকে তাকাতে লাগল। কাবির তো তিথির এই হুট করে কেঁদে ওঠায় পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ও চটপট নিচু হয়ে চিন্তিত গলায় বলে উঠল,
"হোয়াট ইজ দ্য প্রবলেম বিবিজান? হোয়াই আর ইউ ক্রাইং?"
তিথি ওড়না দিয়ে চোখ মুছে ফোসফোস করতে করতে অভিমানী গলায় বলল,
"সব আপনার দোষ! আপনি আমার দিকে ওভাবে লম্পটের মতো তাকিয়ে ছিলেন, তাই আইসক্রিমটা লজ্জা পেয়ে আমার বোরকার ওপর পড়ে গিয়েছে! এখন আমি কী করব?"
তিথির মুখ থেকে এমন অদ্ভুত আর নিষ্পাপ যুক্তি শুনে কাবির নিজের হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ও তিথির আরও কাছে এসে মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
"ওহ হো তিথি! হোয়াটস দ্য বিগ ডিল? ডোন্ট ক্রাই সোনা! আই উইল বাই ইউ মোর বোরকাস, নো প্রবলেম!" 😉
সাথে চোখের কোণে দুষ্টুমি ফুটিয়ে যোগ করল,
"মন খারাপ করো না, বোরকার সাথে আজ আরও এক বাক্স আইসক্রিম আর চকলেট নিয়ে নাও না হয়।"
তিথি মুখ বাঁকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
"এগুলো দিয়ে এখন কী করব আমি?"
"কেন বিবিজান, বাসায় গিয়ে আরাম করে খাবে!"
"হ্যাঁ খাব, তবে আপনাকে একটাও দেব না, সব আমি একাই শেষ করব!" 😝
পার্লারের বোরকা নোংরা হওয়ায় তিথি আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে চাইল না। ও কোনোমতে নিজের হিজাব-নিকাবটা টেনেটুনে ঠিক করে ঠিকঠাক পরে নিল। তারপর চকলেটের প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে হনহন করে পার্লার থেকে বের হয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
_______
চরপাড়া মোড় থেকে গাড়িটা একটু এগোতেই কাবিরের নজরে পড়ল ময়মনসিংহের বেশ নামকরা একটা বোরকার শোরুম “বোরকা বাজার"। ওখানেই গাড়িটা পার্ক করে কাবির তিথিকে নিয়ে নামল। শোরুমের সামনে তখন অনেক মানুষের ভিড় আর কোলাহল। এত মানুষ দেখে তিথি কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। ও আর দেরি না করে এক ঝটকায় কাবিরের শক্ত, চওড়া হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
তিথির এই হুট করে ভয় পেয়ে ওর হাত শক্ত করে ধরা আর ওর শরীরের ওম বুকে মিশে যাওয়া দেখে কাবির মনে মনে অনেক খুশি হলো। ও তিথিকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে শোরুমের ভেতরে ঢুকল।
ভেতরের একটা অংশ বেশ ফাঁকা ছিল, তবে দোকানটিতে প্রায় চারজন সেলসগার্ল কাজ করছিল। তারা সবাই বেশ জমকালো সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ এমন একজন সুঠাম দেহের হ্যান্ডসাম পুরুষ দেখে মেয়েগুলো চটপট ওনাদের দিকে এগিয়ে এল। কাবিরের রাজকীয় ভাব দেখে একজন মেয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল,
"স্যার, আপনাদের জন্য কী করতে পারি?"
কাবির তিথির বোরকার আইসক্রিমের দাগটার দিকে এক পলক তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
"শো হার দ্য বেস্ট বোরকা অ্যান্ড আবায়া ডিজাইনস ইন ইওর শপ। মেক ইট ফাস্ট, উই ডোন্ট হ্যাভ মাচ টাইম!"
সেলসগার্ল মেয়েটি কাবিরের গলার গাম্ভীর্যের কথাগুলো শুনে হালকা কেঁপে উঠে বলল,
"আচ্ছা স্যার দিচ্ছি, আপনি প্লিজ এই সোফাটায় বসুন।"
কাবির সোফায় বসতেই বাকি তিন-চারটে মেয়ে কাজকাম ফেলে কাবিরের উন্মুক্ত চওড়া বুকের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। ওদের ওমন হাভাতের মতো চাউনি দেখে তিথির রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো! বোরকা পছন্দ করা তো দূরের কথা, ওর ইচ্ছে করছিল মেয়েগুলোর চোখগুলো উপড়ে নিতে।
তিথি নিজের রাগটা কোনোমতে কন্ট্রোল করে কাবিরের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
"এই শুনছেন? চলুন, এখান থেকে চলে যাই। অন্য কোনো দোকানে যাব, এখানে ভালো বোরকা নেই!"
ঠিক তখনই একজন সেলসগার্ল একটা কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে কাবিরের দিকে এগিয়ে এল। সে একটু হেসে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"আমাদের দোকানে সব পুরুষ কাস্টমার এই দোকানে আসলে আমরা পানি খেতে দিই স্যার, এটাই আমাদের নিয়ম। স্যার, এই যে পানিটা খেয়ে নিন একটু।"
মেয়েটার এমন গায়ে পড়া স্বভাব আর কাবিরকে পানি সাধা দেখে তিথি এবার পুরো ত্যাঁড়াবেঁকা হয়ে গেল! ও কাবিরের সামনে এসে এক হাত দিয়ে মেয়েটাকে থামিয়ে দিয়ে রাগে ফোঁস করে উঠে বলল,
"কীহ! আমার স্বামী অন্য কোনো মেয়ের হাতের পানি খাবে, আর সেটা আমি পাশে বসে বসে দেখব? ইম্পসিবল! একদম ইম্পসিবল!" 😡🔥
তিথি আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। ও সবার সামনেই কাবিরকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একদম ওর বুকের সাথে লেপ্টে গেল। কাবিরের শার্ট খামচে ধরে আদুরে অথচ কড়া গলায় বলল,
"ডার্লিং... চলো! এখান থেকে আমরা কিচ্ছু কিনব না!"
তারপর কাবিরের কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ভয়ার্ত গলায় বলল,
"সামিজান, আমার মনে হচ্ছে ওরা আপনাকে কোনো পানি পড়া খাইয়ে বশে নিতে চাইছে! দয়া করে আপনার পায়ে ধরি, ওই পানি একদম খাইবেন না প্লিজ!" 😭😂
তিথির এই কিউট জেলাসি আর থিওরি শুনে কাবির মনে মনে হেসে পুরো শেষ! ও তিথির কোমরে হাত দিয়ে ওকে নিজের সাথে আরও চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
"আচ্ছা বিবিজান, পানি না খেলে বিনিময়ে আমাকে কী দেবে বলো তো?"
তিথি মুখ ফুলিয়ে বলল,
"আপনি যা খুশি তাই নিয়েন, তাও ওই পানি খাবেন না!"
#চলবে…