ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৫১তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট_৫১

#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

​কাবিরের সেই বরফশীতল আর হাড় কাঁপানো কণ্ঠস্বর শুনে তিথির বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝেও ওর গলার ওই কঠোরতা তিথির মেরুদণ্ড দিয়ে এক তীব্র ভয়ের স্রোত বইয়ে দিল। তিথি কাঁপাকাঁপা গলায় ওনার ভেজা শার্টের হাতাটা খপ করে চেপে ধরে বলল,

​"আপনি একা বাইরে থাকবেন না, প্লিজ! চলুন আমরা দুজনেই ঘরের ভেতরে যাই। আমার বড্ড ভয় করছে!" 😭

​কাবির তিথির দিকে এবার একচুলও তাকাল না। ও এক ঝটকায় নিজের হাতটা তিথির বাঁধন থেকে মুক্ত করে নিল। ওর চোয়াল তখন রাগে আর টানটান উত্তেজনায় শক্ত হয়ে উঠেছে।

​"আই সেইড গো ইনসাইড, তিথি! রাইট নাউ! নিজের আর পেটের বাচ্চার সুরক্ষার কথা ভাবো, দরজা লক করো!" 🤬🔥

​কাবিরের এই ভয়ঙ্কর রূপ তিথি আগে কখনো দেখেনি। ও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। ভেজা বেগুনি শাড়িটা কোনোমতে সামলে, কান্না ভেজা চোখে ও এক ছুটে বাগানের কাদা পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে ধপাস করে দরজাটা আটকে দিল। ভেতর থেকে খিল তুলে দিয়ে ও দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। ওর সারা শরীর তখন ভয়ে আর ঠাণ্ডা বাতাসে থরথর করে কাঁপছে।

​~

~

​ওদিকে তিথি ভেতরে যাওয়া মাত্রই কাবির ধীরপায়ে বৃষ্টির মাঝে হেঁটে কাদার ওপর লুটিয়ে থাকা সেই রক্তাক্ত লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় লোকটার মুখের ওপর বৃষ্টির পানি পড়তেই কাবির চমকে উঠল। কাবিরের চোখের মণি দুটো এক নিমেষে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। এ তো অন্য কেউ নয়, এ হলো আন্ডারকাভার ইন্টেলিজেন্স টিমের অন্যতম সেরা অফিসার কামিল! যাকে কাবির স্বয়ং আন্তর্জাতিক চোরাচালান আর মাফিয়া নেটওয়ার্কের ওপর নজর রাখার জন্য মিলানে পাঠিয়েছিলেন।

​কাবির এক হাঁটু গেড়ে কাদার মাঝে বসে কামিল রক্তাক্ত কলারটা টেনে নিজের দিকে তুলল। কাবিরের হাত অলরেডি নিজের কোমরের পেছনে থাকা কাস্টমাইজড গ্লক পিস্তলের সেফটি লকের ওপর চলে গেছে। কাবির অত্যন্ত নিচু, ক্ষুরধার আর রুদ্ধশ্বাস গলায় জিজ্ঞেস করল,

​"কামিল! ওপেন ইওর আইজ! কী হয়েছে? বাংলাদেশের বর্ডারে কারা এট্যাক করেছে? আর ওপাশে এক্সিডেন্টটা কাদের গাড়ি?"

​কামিল কোনোমতে নিজের রক্তাক্ত চোখ দুটো একটু মেলল। ওর মুখ দিয়ে গলগল করে তাজা রক্ত বের হয়ে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। ও কাবিরের শার্টটা খামচে ধরে বড্ড দুর্বল আর গোঙানির গলায় বলল,

​"স্যার... গড...গড অফ ইতালির শুটাররা বর্ডার পার হয়ে গেছে! ওরা... ওরা বুঝতে পেরেছে আপনিই ওদের পুরো চেইনটা ট্র্যাক করছেন। ওরা ময়মনসিংহে আপনার এই সেফ হাউজের অ্যাড্রেস পেয়ে গেছে স্যার! ওপাশে যে গাড়িটা এক্সিডেন্ট করেছে, ওটা ওদেরই একটা ব্যাকআপ গাড়ি ছিল। কিন্তু মেইন শুটাররা অলরেডি চারপাশ থেকে আপনার এই বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে! ওরা আপনার তিথিকে..." 💥😱

​কামিল আর কথা শেষ করতে পারল না। কামিলের হাতটা কাবিরের শার্ট থেকে আলতো করে খসে মাটিতে পড়ে গেল। কাবিরের চোখ দুটো চিরতরে স্থির হয়ে গেল। দেশের জন্য আরও একটা তাজা প্রাণ উৎসর্গ হয়ে গেল এই অন্ধকারের মাঝে।

​কাবির এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। কাবিরের ভেতরের সেই দয়া-মায়াহীন, পৈশাচিক সাইকো অফিসার সত্তাটা এবার এক্কেবারে জেগে উঠেছে। বৃষ্টির পানি কাবিরের মুখ বেয়ে নামছে, কিন্তু ওর ভেতরের আগুন নেভাতে পারছে না। যে মাফিয়ারা কাবিরের কলিজার টুকরো, ওনার তিথির দিকে নজর দেওয়ার সাহস করেছে... তাদের জন্য আজ এই চড়পাড়া এক জ্যান্ত নরক হতে চলেছে!

​কাবির নিজের কোমর থেকে সেই চকচকে ব্ল্যাক গ্লক পিস্তলটা বের করে ক্লিক শব্দে লোড করল। ওনার ঠোঁটের কোণে তখন এক পৈশাচিক, কোল্ড ডেভিল হাসি। ও বাগানের চারপাশের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় ফিসফিসিয়ে বলল,

​"বাঘের ডেরায় ঢুকে তোরা আমার বাঘিনীর গায়ে হাত দেওয়ার প্ল্যান করেছিস? ওয়েলকাম টু আওয়ার পার্সোনাল হেল, মিস্টার মাফিয়া! আজ রাতে তোদের কাউকেই আমি জ্যান্ত বর্ডার পার হতে দেব না, কসম!" 💀🔥

​ঠিক তখনই বাগানের দেয়াল টপকে তিন-চারটে কালো জ্যাকেট পরা লম্বা চওড়া ইতালিয়ান শুটার হাতে সাইলেন্সার লাগানো সাব-মেশিনগান নিয়ে ময়দানে নামল! ওনাদের চোখের ক্রুর চাউনি আর বন্দুকের নল সোজাসুজি তাক করা আইপিএস অফিসার কাবিরের বুকের দিকে।

​কাবির এক হাতে পিস্তলটা গার্ড পজিশনে রেখে অন্যহাতে ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল।

​ওপাশ থেকে অত্যন্ত ভারী, গম্ভীর আর ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

​"আইপিএস অফিসার কাবির রহমান কায়নাত! আমি গড অফ ইতালি বলছি। তোমার ঘরের বাইরে যে শুটাররা দাঁড়িয়ে আছে, ওরা শুধু আমার একটা ইশারা পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু আমি তোমার সাথে একটা ডিল করতে চাই।"

​কাবির নিজের চোয়াল শক্ত করে, বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়েই অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,

​"কীসের ডিল?"

​"আমার একমাত্র ছেলে লুকা নিখোঁজ! ও আসলে কিডন্যাপড হয়েছে। ইতালির রাইভাল গ্যাংরা ওকে কিডন্যাপ করে ওর মাধ্যমে একটা বিশাল, দামি ড্রাগ আর কোকেনের চালান বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। কিন্তু বর্ডার পার হওয়ার পর এই এলাকার কিছু লোকাল গুন্ডা লুকাকে ওই কোটি কোটি টাকার ড্রাগসহ ধরে নিয়ে কোথাও গায়েব করে দিয়েছে! তুমি যদি তোমার পুলিশি পাওয়ার আর সোর্স ব্যবহার করে আমার ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় খুঁজে এনে দিতে পারো... তবে বিনিময়ে আমি কথা দিচ্ছি, আমি আর আমার শুটাররা আজ রাতেই এদেশ ছেড়ে চলে যাব। আমি তোমাকে আর তোমার তিথিকে চিরতরে ছেড়ে দেব, তোমাদের লাইফে আর কোনোদিন কোনো ডিস্টার্ব করব না! দিস ইজ আ ডিল, অফিসার।"

​কাবির কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ভাবল। এই মুহূর্তে তিথি আর ওর পেটের বাচ্চার নিরাপত্তা ওর কাছে সবচেয়ে বড়। কাবিরের চোখ দুটো অন্ধকারে চিতার মতো জ্বলে উঠল। ও বলল,

​"ডিল ডান, গড অফ ইতালি! তোমার শুটারদের এখনই পিছু হটতে বলো। তোমার ছেলেকে আমি নরক থেকে হলেও টেনে বের করব!"

​ডিল হওয়ার সাথে সাথেই বাগানের দেয়ালের ওপাশে থাকা কালো জ্যাকেট পরা শুটাররা মুহূর্তের মধ্যে কুয়াশা আর বৃষ্টির মাঝে মিলিয়ে গেল।

​কিন্তু ওদিকে ঘরের ভেতরে তখন এক মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটে গেছে। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিথি জানলা দিয়ে বাগানের ওই রক্তাক্ত লাশ, মাফিয়া শুটারদের বন্দুক আর স্বামির ওই ভয়ঙ্কর সাইকো রূপ দেখে তীব্র ভয়ে আর আতঙ্কে এক্কেবারে জমে গিয়েছিল। এমনিতেই ও প্রেগন্যান্ট, তার ওপর এই মারাত্মক মানসিক চাপ ও সহ্য করতে পারল না। কাবির যখন ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল, ঠিক তখনই তিথি ওর সামনেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল!

​"তিথি!!!"

​কাবির এক চিৎকার দিয়ে ওকে কোলে তুলে নিল। ডাক্তার ডেকে তিথির প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। ডাক্তার বললেন, ও তীব্র ভয়ের কারণে ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে, তবে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি। তিথি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন কাবিরের ফোন আবার বেজে উঠল। হেড অফিস থেকে ওকে ইমিডিয়েটলি তলব করা হয়েছে। দেশের সুরক্ষার স্বার্থে এই ইন্টারন্যাশনাল মাফিয়ার ছেলেকে খোঁজার মিশনে ওকে এখনই নামতে হবে। তিথির এই অবস্থায় ওকে ফেলে যাওয়া কাবিরের জন্য এক মস্ত বড় অগ্নিপরীক্ষা, কিন্তু ও একজন আইপিএস অফিসার! ও তিথির কপালে একটা দীর্ঘ, তপ্ত চুমু খেয়ে মনে মনে বলল,

​"আমি তোমার সব ভয়ের কারণ চিরতরে শেষ করতে

যাচ্ছি বিবিজান। আমায় ক্ষমা করো।"

​কাবির সোজা চলে গেল পুলিশ স্টেশনে। সেখানে ওনার আন্ডারের সমস্ত অফিসার আর কনস্টেবলদের নিয়ে এক জরুরি মিটিং করলেন। মিশন ব্রিফিং শেষ করে কাবির ওখানকার অফিসারদের কাছ থেকে অফিশিয়ালি বিদায় নিলেন। পুরো ডিপার্টমেন্ট ওনাকে স্যালুট জানিয়ে বিদায় দিল।

​মাফিয়ার ছেলে লুকাকে খোঁজার এই মিশনে নামার জন্য কাবির ওর চেনা টেরিটরি ময়মনসিংহ থেকে স্পেশাল ফোর্স আর রানা সহ ঝড়ের গতিতে রওনা হলেন ঢাকার এক কুখ্যাত এবং গহীন বস্তির উদ্দেশ্যে।

​দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ তিনটি মাস! এই তিনটি মাস তিথির লাইফে যেন এক একটা যুগের মতো কেটেছে। কাবির সেই যে মিশন নিয়ে ঢাকা চলে গেল, ওনার আর কোনো খোঁজ নেই। কোনো ফোন নেই, কোনো মেসেজ নেই। তিথি দিন-রাত শুধু ওনার ফেরার পথ চেয়ে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। ওনার মা-বাবা আর তিথির নিজের মা-বাবা ওকে আগলে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কাবিরের অভাব কি আর অন্য কেউ পূরণ করতে পারে।

​আজ ময়মনসিংহের এই শান্ত বাড়িটায় অবশেষে খুশির আলো ফুটে উঠল। সব কষ্ট আর বিরহের অবসান ঘটিয়ে তিথির কোল আলো করে জন্ম নিল দুটো ফুটফুটে যমজ ছেলে বাবু! হ্যাঁ, ওদের কোল জুড়ে এসেছে দুটো এক্কেবারে ছোট ছোট লিটল লায়ন।

​তিথি বিছানায় শুয়ে ক্লান্ত, মলিন এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি নিয়ে নিজের দুটো কলিজার টুকরো ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরো ঘর জুড়ে তখন বাচ্চাদের কান্নার মিষ্টি আওয়াজ। বাড়ির সবাই যখন বাচ্চা দুটোকে কোলে নিয়ে দেখছিল, তখন প্রমা একেবারে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল,

​"ওরে আল্লাহ তিথি ভাবি! দেখ দেখ! এই দুটো বাবু তো এক্কেবারে হুবহু ভাইয়ার মতো হয়েছে! এই কচি বয়সেই কেমন যেন রাগী রাগী চাউনি আর নাক-মুখ পুরো ভাইয়ার কার্বন কপি!" 😍

​তিথি নিজের যমজ ছেলেদের দিকে তাকাল। সত্যিই তো, ওদের ছোট ছোট চোখ আর চেহারার কাটিং একেবাটে কাবিরের মতো। তিথির চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ও মনে মনে বলল,

​"আপনার দুটো প্রতিচ্ছবিকে আমি এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি স্বামি। কিন্তু তুমি কোথায় হারিয়ে গেলেন? আপনার এই ছেলেদের বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য হলেও আপনি জলদি ফিরে আসুন, আমার অসভ্য সিংহ!" 😭❤️

★

​ওদিকে বস্তির গহীন গলিতে তখন আইপিএস অফিসার কাবির রহমান কায়নাত নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মাফিয়ার ছেলেকে উদ্ধার করার জন্য এক রোমহর্ষক যুদ্ধ লড়ে চলেছে। ঢাকার সেই কুখ্যাত, অন্ধকার আর গহীন বস্তির মিশনটা একেবারে সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক মাফিয়া গড অফ ইতালির ছেলে লুকাকে খুঁজে পেতে আইপিএস অফিসার কাবিরকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা নিতে হয়েছিল। বস্তির মেইন ডন আর ওর গুন্ডাবাহিনী লুকাকে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রাগ টর্চার সেলে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, যাতে ওই কোটি কোটি টাকার ড্রাগের চালানটা ওরা নিজেরা হজম করতে পারে।

​কাবির ওনার স্পেশাল ফোর্স নিয়ে মাঝরাতে এক্কেবারে অতর্কিত হামলা চালান সেই আস্তায়। শুরু হয় দু-পক্ষের মাঝে এক তুমুল, রোমহর্ষক আর রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ! চারপাশ থেকে যখন বুলেটের বৃষ্টি হচ্ছিল, কাবির নিজের গ্লক পিস্তল হাতে একাই শত্রুদের ডিফেন্স ভেঙে ভেতরে ঢুকে যান। ওনার নিখুঁত নিশানা আর বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাকে বস্তির গুন্ডাবাহিনী এক এক করে লাশে পরিণত হয়। অবশেষে মেইন ডনের পায়ে গুলি করে, ওর কলার ধরে টেনে এক্কেবারে রক্তাক্ত আর আধমরা করে কাবির লুকার লোকেশন বের করেন। বাঙ্কারের তালা ভেঙে লুকাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে ইন্টারপোলের সেফ জোনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মিশন ১০০% সাকসেসফুল আর উইন!

​কিন্তু এই টানা অপারেশনে কাবিরের নিজের অবস্থা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ওনার অফিশিয়াল ইউনিফর্ম জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, গায়ে ছোপ ছোপ রক্ত আর কাদার দাগ, চোখের নিচে কালচে কালি, আর চেহারায় মারাত্মক ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু ওনার মনে তখন একটাই চিন্তা ওনার তিথি! ওর দুটো লিটল লায়ন!

​ঢাকায় পৌঁছেই কাবির এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে আইজিপি স্যার ও বাকি অফিসারদের সাথে হেড অফিসের কনফারেন্স রুমে এক জরুরি ক্লোজিং মিটিং শেষ করলেন। মিটিং শেষ করেই ওনার বিধ্বস্ত শরীরটা নিয়ে ওনার স্পেশাল এসইউভি গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন সোজা ময়মনসিংহের হাসপাতালের উদ্দেশ্যে, যেখানে ওর তিথি আর ওনার যমজ ছেলেরা ভর্তি আছে।

​হাসপাতালের কেবিনের বাইরে তখন কাবিরের মা-বাবা, প্রমা, প্রিয়া আর তিথির মা-বাবা পুরো পরিবার অপেক্ষা করছিলেন। আচমকা করিডোর কাঁপিয়ে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। সবাই তাকিয়ে দেখে আইপিএস কাবির একেবারে বিধ্বস্ত, ধুলোবালি আর রক্তমাখা পোশাকে হেঁটে আসছেন। কাবিরকে এই অবস্থায় দেখে সবাই এক্কেবারে আশ্চর্য আর স্তব্ধ হয়ে গেল! ওর মা-বাবা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কাবির ওনাদের সান্ত্বনা দিয়ে ধীরপায়ে তিথির কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন।

​কেবিনের ভেতর বেডে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল তিথি। ওর আসার শব্দ পেয়ে তিথি দরজার দিকে তাকাতেই কাবিরের ওই বিধ্বস্ত আর ক্লান্ত চেহারাটা ওর চোখে পড়ল। বুকের ভেতরটা তিথির জন্য এক নিমেষে হু হু করে উঠলেও, গত তিন মাসের জমে থাকা পাহাড়সম অভিমান আর কষ্ট ওকে কঠোর করে তুলল। তিথি এক ঝটকায় কাবিরের দিক থেকে নিজের মুখটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল ও এক ফোঁটাও কাবিরের দিকে তাকাবে না!

​ঠিক ওই মুহূর্তেই বিছানায় শুয়ে থাকা ওদের সেই ফুটফুটে দুটো যমজ ছেলে বাবু একসাথে কুঁইকুঁই করে মস্ত বড় এক কান্নার আওয়াজ তুলে উঠল। যেন ওরাও ওদের পাপার এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে কেঁদে উঠেছে।

​কাবির তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্লান্ত, গভীর ভালোবাসার হাসি ফুটিয়ে ধীরপায়ে তিথির একদম কাছে এগিয়ে এলেন। ও বিছানায় বসে তিথির একদম গায়ের সাথে লেপ্টে গিয়ে ওর কানের কাছে নিজের তপ্ত মুখটা নিয়ে বড্ড ফিসফিসিয়ে, নেশাতুর গলায় বললেন,

​"অভিমান আর রাগ করে কোনো লাভ নেই বিবিজান। এই কাবির রহমান কায়নাত নিজের মিশন কমপ্লিট করে এখন একেবারে ফ্রি। এখন আর কোনো মাফিয়া, কোনো মিশন আমায় তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। তুমি চাইলেও আমায় আর ছেড়ে যেতে পারবে না।" 😏🔥

​তিথি কাবিরের গায়ের সেই চেনা পুরুষালি ওম আর নিশ্বাসের বাতাস পেয়ে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল। ও বড্ড জেদি আর রাগী গলায় মুখ ঘুরিয়েই বলল,

​"আপনি চলে যান এখান থেকে!"

​"কোথায় যাব, হ্যাঁ?"

​"জানি না!"

​কাবির এবার ওর দুটো বাবুর দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসে তিথির কানের লতিতে নিজের ওষ্ঠাধর আলতো করে ছুঁইয়ে নিচু গলায় বললেন,

​"দেখেছ বিবিজান? তুমি ওদের বাবাকে চলে যেতে বলছ, ওরা সেটা একদম সহ্য করতে পারছে না। ওদের বাবাকে চলে যেতে বলছ বলেই তো ওরা ওমন চিৎকার করে কান্না করছে!" 😉

​তিথি তাও নিজের রাগ না কমিয়ে গাল ফুলিয়ে বলল,

​"জানি না!"

​কাবির এবার তিথির কানের লতিতে হালকা একটু কামড় বসিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন,

​"তখন তো বড্ড লাজুক সেজে থাকতে বিবিজান। এখন তো এই কোল আলো করে দুটো লিটল লায়ন চলে এসেছে... এখন তো নিশ্চয়ই খুব ভালো করেই জানো যে বাচ্চা কীভাবে হয়, হ্যাঁ?" 🌚

​ল্যাম্পপোস্টের আলোর চেয়েও কাবিরের চোখের চাউনি তখন গভীর। তিথি কাবিরের এই চরম নির্লজ্জ আর রোমান্টিক কথা শুনে এক্কেবারে থতমত খেয়ে গেল। ওর ফর্সা মুখটা লজ্জায় মুহূর্তের মধ্যে একেবারে লাল টমেটো হয়ে উঠল। ও কাবিরের বুকে এক আলতো ধাক্কা দিয়ে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফিসফিসিয়ে বলল,

​"ইশশশ! আপনি না... আপনি বড্ড বেশি নির্লজ্জ!" 🫣

​কাপড়ের আঁচলটা ও নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। কাবির বড্ড জোড়ে হেসে উঠলেন। কাবিরের হাসির শব্দে কেবিনের থমথমে ভাবটা এক নিমেষে কেটে গেল। ও তিথির কপালে একটা গভীর ভালোবাসার চুমু খেয়ে তিথিকে বললেন,

​"অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে বিবিজান, এবার তুমি একটু শান্তিতে ঘুমাও।"

​তিথি কাবিরের কথায় আস্তে আস্তে চোখ দুটো বুজে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কাবির বড্ড সাবধানে নিজের দুই হাত দিয়ে তার কলিজার টুকরো দুটো যমজ ছেলেকে একসাথে কোলের মাঝে তুলে নিলেন। বাবু দুটো তার বুকের ওম পেয়ে এক সেকেন্ডে কান্না থামিয়ে শান্ত হয়ে গেল। বাচ্চা দুটোকে দুই হাতে আগলে নিয়ে কাবির ধীরপায়ে কেবিনের বাইরে চলে এলেন।

​হাসপাতাল থেকে ফেরার পর কেটে গেছে আরও কয়েকটা মাস। আজ কাবিরের মেঝবোন প্রিয়া আর ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আসছে তাদের নতুন সদস্য অর্থাৎ কাবির আর তিথির যমজ ছেলেদের দেখতে। বাড়ির রান্নাঘর থেকে আসছে ভুনা মাংস আর পোলাওয়ের মন মাতানো ঘ্রাণ। বাড়ির সবাই কাজে ব্যস্ত, কেউ ড্রয়িংরুম সাজাচ্ছে, কেউ বা ডাইনিং টেবিল গোছাচ্ছে।

*******

​এদিকে তিথির কোলে থাকা দুই ছোট সদস্য কাশিফ রহমান দ্বীন আর তানভীর রহমান তামিম। হঠাৎ করেই শুরু করল চিৎকার করে কান্না। তিথি ওদের হাজার চেষ্টা করেও থামাতে পারছে না। ওরা কান্নায় লাল হয়ে যাচ্ছে, অথচ তিথি ওদের সামলাতে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

​ঠিক সেই সময় ঘরে ঢুকল কাবির। পরনে ওনার সিভিল পোশাক, হাতে একরাশ দাপ্তরিক ফাইল। ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনেই কাবির সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে গেল। ও তিথির কাছে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে পজেসিভ আর আবদারী গলায় বলল,

​"এই তিথি, কাশিফকে আর তানভীরকে আমার বুকে দাও তো! আমি নিই ওদের।"

​তিথি ওদের সামলাতে সামলাতে কিছুটা বিরক্তি আর দুষ্টুমি মিশিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ও কাবিরের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল,

​"কেন? ওদের খাওয়াবেন নাকি, আপনি?”

​"কী খাওয়াব?"

​"কেন? আপনার ডু/ডু খাওয়াবেন নাকি?"🧨😂

​তিথির এই কথা শুনে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত থাকা বাড়ির সবাই কাবিরের বাবা-মা, তিথির মা-বাবা, প্রমা, প্রিয়া সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল! পুরো বাড়িতে পিনপতন নীরবতা! কাবির যে তিথির কাছ থেকে এমন সপাটে এবং পাবলিকলি এমন বোল্ড উত্তর পাবে, তা ও নিজেও কল্পনা করেনি। ওনার মুখটা লজ্জায় আর অবাক হয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল।

​পরের এক সেকেন্ডের মাঝেই পুরো বাড়িটা ভেঙে পড়ল অট্টহাসিতে! প্রিয়া আর প্রমা তো পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল। কাবিরের মা সারা ইয়াসমিন আচল দিয়ে মুখ চেপে হাসছেন, আর তিথির মা তানিয়া মিথু লজ্জায় তিথিকে ধমক দেওয়ার বদলে নিজেই হেসে অস্থির।

​কাবির নিলর্জ্জ ভঙ্গিতে ফাইলটা টেবিলে ছুড়ে ফেলে মুখে চেনা ডেভিল হাসিটা মুখে ফুটিয়ে বলল,

​"বিবিজান, তুমি দিন দিন বড্ড বেশি পেকে যাচ্ছ কিন্তু!"

​সবাই হাসতে হাসতেই যে যার কাজে চলে গেল। কাবির তিথির কাছে গিয়ে ওর কপালে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

​"আজ রাতে কিন্তু তোমার এই দুষ্টুমির শাস্তি আছে, মনে থাকে যেন!"

​#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন