এদিকে ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই কাইফের ফোনে কল এসেছিল।কলটা করেছিলেন মাহবুদ জামান।কাইফ ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল তার দাদুর গম্ভীর কণ্ঠ।
---"আজ দুপুরের লাঞ্চ বাড়িতেই করবে।"
"তোমার সাথে একটা জরুরি কথা আছে।"
কাইফ স্বভাবসুলভ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল।
---"ঠিক আছে।"
তারপর আর কোনো প্রশ্ন করেনি।কারণ সে জানে—মাহবুদ জামান যখন জরুরি বলেন, তখন সেটা সত্যিই জরুরি হয়।ফলস্বরূপ দুপুরের দিকে সে সরাসরি জামান ম্যানশন-এ চলে আসে।গাড়ি ম্যানশনের সামনে থামতেই কয়েকজন স্টাফ এগিয়ে এলো।
কাইফ গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে প্রবেশ করল।ম্যানশনের বিশাল দরজা পেরোতেই একজন মেড দ্রুত সামনে এসে দাঁড়াল।
---"স্যার।"
সে সম্মান নিয়ে কাইফের ব্লেজারটি গ্রহণ করল।কাইফ ব্লেজার খুলে তার হাতে দিল।
মেড বলল,
---"সবাই ডাইনিং টেবিলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।"
কাইফ ভ্রু কুঁচকাল।
---"নিনি চলে গেছে?"
নিনি।অর্থাৎ তার আপন ছোট বোন আরিয়ানা জামান।সকালে স্বামী আফনান আর ছোট্ট মেয়ে আরিয়াকে—যাকে সবাই আদর করে আরু বলে ডাকে—নিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার কথা ছিল।মেড মাথা নাড়ল।
---"জি স্যার।"
"সকালের দিকেই চলে গেছেন।"
কাইফ আর কিছু বলল না।মেডও নিজের কাজে চলে গেল।কাইফ ধীর পায়ে ডাইনিং হলের দিকে এগিয়ে গেল।আর ভিতরে ঢুকতেই তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।কারণ সেখানে উপস্থিত প্রায় পুরো পরিবার।ডাইনিং টেবিলের শীর্ষে বসে আছেন মাহবুদ জামান।তার পাশে দাদিমা।অন্য পাশে তার চাচা, চাচি, ফুপিরা।সাবিহা জামান, সামিহা, ফারহিন, সাইফ।আরমান।ইসরাত।এমনকি মাহিরাও উপস্থিত।
দৃশ্যটা দেখে কাইফ বুঝল—বিষয়টা সাধারণ কিছু নয়।নইলে দুপুরের লাঞ্চে পুরো পরিবার একসাথে বসার ঘটনা খুব একটা ঘটে না।কারণ বাড়ির কর্তারা অফিসে থাকেন আর আরমান স্কুলে।ইসরাত ও নিজে ব্যস্ত থাকে ওর পড়াশোনা নিয়ে।সে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছে।সে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।কিন্তু কারো মুখ দেখে বিশেষ কিছু বোঝা গেল না।সবার মুখেই যেন অপেক্ষার ছাপ।আর সেটাই তার কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল।
"কি এমন কথা?"
"যার জন্য সবাইকে একসাথে ডাকা হয়েছে?"
তবে সে প্রশ্ন করল না।কারণ তার স্বভাবই এমন।প্রয়োজন না হলে কথা বলে না।সে নিজের নির্দিষ্ট চেয়ারের দিকে এগিয়ে গেল।এই বাড়িতে প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা চেয়ার নির্ধারিত।বছরের পর বছর ধরে একই নিয়ম চলে আসছে।আর সেই নিয়ম তৈরি করেছিলেন পরিবারের প্রধান—মাহবুদ জামান।কোন চেয়ারে কে বসবে, সেটা পরিবর্তন করার অধিকার কারও নেই।
কাইফও নিজের নির্ধারিত চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল।চেয়ারটা ছিল মাহবুদ জামানের ডান পাশ থেকে কয়েক সিট পরে।যেখানে সে ছোটবেলা থেকেই বসে আসছে।বসার পর টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নিল।এক চুমুক পানি খেল।তারপর স্থির দৃষ্টিতে দাদুর দিকে তাকাল।
---"বলো।"
মাত্র এক শব্দ।কিন্তু সেই এক শব্দেই যেন পুরো টেবিলের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল।কারণ সবাই জানে—কাইফ প্রশ্ন করেছে।অর্থাৎ সে সরাসরি মূল কথায় যেতে চায়।আর এখন সবার অপেক্ষা—মাহবুদ জামান ঠিক কী এমন বিষয় নিয়ে পুরো পরিবারকে একত্র করেছেন।
ডাইনিং টেবিলজুড়ে অদ্ভুত এক নীরবতা ছড়িয়ে ছিল।সাধারণত এত বড় পরিবার একসাথে বসলে কোথাও না কোথাও হাসাহাসি, কথাবার্তা বা ছোটখাটো খুনসুটি চলতেই থাকে।কিন্তু আজ যেন তার কিছুই নেই।পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকমের ভারী।
আর সেই ভারী পরিবেশটাই কাইফের নজর এড়াল না।সে চুপচাপ বসে একবার টেবিলের সবাইকে পর্যবেক্ষণ করল।ইসরাত আর আরমানের মুখে স্পষ্ট কৌতূহল।তারা বারবার একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।মনে হচ্ছে দুজনেই ভাবছে—
"আসলে ব্যাপারটা কি?"
কারণ তাদের কাউকেই আগে কিছু জানানো হয়নি।মাহিরার অবস্থাও একই।সে-ও বুঝতে পারছে না তাকে কেন ডাকা হয়েছে।তাই সেও বেশ আগ্রহ নিয়ে চারপাশের মুখগুলো দেখছে।কিন্তু টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে থাকা কয়েকজনের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।সাবিহা জামান,রুবাইয়া,সামিহা,ফারহিন।এমনকি সাইফও অস্বাভাবিক চুপচাপ।তাদের কারও মুখে কৌতূহল নেই।বরং আছে অস্বস্তি।চাপা দুশ্চিন্তা।আর সেই দুশ্চিন্তার কারণ একটাই।লাইব্রেরি রুম।কয়েকদিন আগে ওই রুমের ভেতরে হওয়া সেই আলোচনাটা।যে আলোচনার কথা এখনো কাইফ জানে না।কিন্তু মাহবুদ জামান জানেন।আর আজ সম্ভবত তিনি সেটাই বলবেন।শুধু সেই চিন্তাতেই কয়েকজনের গলা শুকিয়ে আসছে।কারণ তারা সবাই কাইফকে চেনে।খুব ভালো করেই চেনে।কাইফ সাধারণ মানুষের মতো রাগ দেখায় না।সে চিৎকার করে না।টেবিল চাপড়ায় না।জিনিসপত্র ভাঙচুরও করে না।
কিন্তু যখন সে সত্যিকারের ক্ষুব্ধ হয়—তখন তার নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।কিন্তু আজ এই মুহূর্তে সে যে কথাটা শুনতে চলেছে তার প্রতিক্রিয়া কাইফ দেখাবেই দেখাবে।আর সেটাই সবাইকে আরও অস্বস্তিতে ফেলছে।সাবিহা জামান অজান্তেই পানির গ্লাসে হাত দিলেন।ফারহিন নিচু হয়ে বসে আছে।সামিহা কয়েকবার ঠোঁট ভিজিয়ে নিল।মাহবুদ জামানও আজ অস্বাভাবিকভাবে চুপ।যেন তিনি ঠিক শব্দগুলো সাজিয়ে নিচ্ছেন।কাইফ সেটা লক্ষ্য করল।তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
সে অপেক্ষা করতে পারে।কিন্তু উদ্দেশ্যহীন নীরবতা তার পছন্দ নয়।কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল।কেউ কিছু বলল না।শেষমেশ কাইফ নিজেই আবার মুখ খুলল।তার গলা আগের মতোই স্থির।শান্ত।কিন্তু সেই শান্ত স্বরেও অদৃশ্য চাপ ছিল।
---"দাদু।"
মাহবুদ জামান মুখ তুললেন।কাইফ তার দিকে তাকিয়েই বলল,
---"বলো।"
একটু থেমে আবার বলল,
---"কি বলবে?"
পুরো ডাইনিং হল আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এমন নিস্তব্ধতা, যেখানে দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
আর টেবিলে বসে থাকা কয়েকজনের বুকের ধুকপুকানিও যেন ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
কারণ তারা জানে—মাহবুদ জামান এখন যা বলবেন...তার পরের প্রতিক্রিয়াটাই হয়তো আজকের দুপুরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে চলেছে।
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে বসে থাকা সবাই অপেক্ষা করছিল মাহবুদ জামান কবে মূল কথায় আসবেন।কিন্তু যারা তাকে চেনে, তারা জানে—এই মানুষটা জীবনে খুব কমই সরাসরি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন।
বিশেষ করে যখন বিষয়টা পরিবার, সম্পর্ক বা অনুভূতির সঙ্গে জড়িত।
আর কাইফ?সে তো তারই নাতি।একই রক্ত।একই জেদ।একই একগুঁয়েমি।তাই মাহবুদ জামান যদি ত্যাড়া হন, তাহলে কাইফও কম যায় না।দাদু-নাতির এই স্বভাব পুরো পরিবার বহুবার দেখেছে।কাইফ অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু মাহবুদ জামান সোজা কথায় না গিয়ে ধীরে ধীরে পানির গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন।
তারপর গম্ভীর দৃষ্টিতে কাইফের দিকে তাকালেন।
---"কাইফ..."
"নারীর জেদকে কখনো হালকাভাবে নিও না।"
কথাটা শুনে কাইফের ভ্রু কুঁচকে গেল।সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।মনে মনে ভাবল,
---"এটাই কি সেই জরুরি কথা?"
"পুরো পরিবারকে ডেকে আনার মতো?"
কিন্তু সে কিছু বলল না।কারণ মাহবুদ জামান এখনো শেষ করেননি।ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা বাকিরাও চুপচাপ শুনছে।বিশেষ করে সাবিহা, রুবাইয়া, সামিহা আর ফারহিন।তাদের বুকের ভেতর অস্বস্তি ক্রমশ বাড়ছে।
কারণ তারা অনুভব করতে পারছে—এই কথাগুলো কোনো সাধারণ উপদেশ নয়।মাহবুদ জামান ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন,
---"কারণ সেই জেদ যখন অভিমানে রূপ নেয়..."
"তখন একজন নারী নিজের সবচেয়ে প্রিয় শখটাও ছেড়ে দিতে দু'বার ভাবে না।"
"যে জিনিসটা একসময় তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় ছিল..."
"যার জন্য সে হাসত..."-"যার জন্য লড়ত..."
"যার জন্য শত কষ্ট সহ্য করত..."
"সেই জিনিসটাকেও সে একদিন নির্দ্বিধায় পিছনে ফেলে চলে যেতে পারে।"
পুরো টেবিল নিস্তব্ধ।কেউ একটি শব্দও বলছে না।মাহবুদ জামানের কণ্ঠ আগের চেয়ে আরও গভীর হয়ে উঠল।
---"আর তার চোখের ভালোবাসা..."
"অথবা হৃদয়ের ভালোবাসা..."
"একবার যদি ঘৃণায় পরিণত হয়..."
"তবে শত চেষ্টা..."
"হাজার অনুতাপ..."
"লক্ষ ক্ষমা প্রার্থনাও সেই জায়গাটা ফিরিয়ে আনতে পারে না।"
তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
---"পৃথিবীর কোনো ক্ষমতা..."
"কোনো প্রভাব..."
"কোনো অর্থ..."
"কোনো শক্তি..."
"সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।"
"কারণ একজন নারীর ভালোবাসা যখন মারা যায়..."
"তখন সেটা শব্দ করে মরে না।"
"নীরবে মরে।"
"আর সেই নীরব মৃত্যুর পর তার হৃদয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়..."
"সেখানে আর কেউ জায়গা পায় না।"
কথাগুলো শেষ করে মাহবুদ জামান চুপ করে গেলেন।আর পুরো ডাইনিং হল যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।ইসরাত, আরমান আর মাহিরা এখনো বুঝতে পারছে না কথাগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী।তারা শুধু বিস্মিত হয়ে শুনছে।কিন্তু টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে থাকা কয়েকজনের অবস্থা ভিন্ন।
তাদের বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেছে।
কারণ তারা জানে—এই কথাগুলো কেবল শুরু।আর মাহবুদ জামান যখন এভাবে শুরু করেন...তখন তার পরের কথাগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝড় তোলে।এদিকে কাইফ চুপচাপ দাদুর দিকে তাকিয়ে আছে।তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।কিন্তু চোখের গভীরে স্পষ্ট প্রশ্ন।
সে এখনো বুঝতে পারছে না—এই কথাগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কটা ঠিক কোথায়।তবুও তার অভিজ্ঞতা বলছে—মাহবুদ জামান কখনো উদ্দেশ্য ছাড়া কথা বলেন না।আর সেই কারণেই সে এবার সামান্য সামনে ঝুঁকে বসল।তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল দাদুর উপর।কারণ সে বুঝতে পারছে—মূল কথাটা এখনো বলা হয়নি।
মাহবুদ জামানের শেষ কথাগুলো শোনার পরও কাইফ কয়েক সেকেন্ড কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে তার দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল।পুরো ডাইনিং হল নিস্তব্ধ।কেউ একটা শব্দও করছে না।কারণ সবাই বুঝতে পারছে—ঝড় আসছে।আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বসে আছে কাইফ জুরাইন জামান।অবশেষে সে গম্ভীর স্বরে বলল,
---"দাদু।"
"যেটা বলতে চাও, সরাসরি বলো।"
তার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক ছিল।কিন্তু যারা তাকে ছোটবেলা থেকে চেনে, তারা জানে—এই স্বর যত শান্ত হয়, পরিস্থিতি তত বিপজ্জনক হয়।মাহবুদ জামানও সেটা জানেন।তবুও তিনি একটুও পিছিয়ে গেলেন না।বরং সোজা হয়ে বসে বললেন,
---"আমি চাই সময় থাকতে তুমি নিজেকে শুধরে নাও।"
"হারাম রিলেশন ভুলে হালাল রিলেশনটা নিয়ে ভাবো।"
কথাটা শুনে কাইফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়ে গেল।
---"মানে?"
এবার মাহবুদ জামান একদম স্পষ্ট ভাষায় বললেন,
---"মানে আমি ঠিক করেছি..."
"আজ এলজিরা ফাইজান ইশরাক—"
তিনি ইচ্ছে করেই পুরো নামটা উচ্চারণ করলেন।
---"তোমার বিবাহিতা স্ত্রী—"
"এই জামান ম্যানশনে আসবে।"
"নিজের অধিকার নিয়ে।"
ধপ!
কাইফের হাতে ধরা পানির গ্লাসটা এত জোরে টেবিলে রাখা হলো যে ভেতরের পানি ছলকে উঠল।পুরো ডাইনিং হল কেঁপে উঠল।ইসরাত চমকে উঠল।আরমান বিস্ফারিত চোখে কাইফের দিকে তাকাল।মাহিরার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
আর টেবিলের অন্য প্রান্তে বসে থাকা বাকিদের বুক ধক করে উঠল।কারণ তারা ঠিক এই প্রতিক্রিয়াটারই অপেক্ষায় ছিল।
কাইফ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তার চোখ দুটো এখন ভয়ংকরভাবে স্থির।এমন স্থিরতা, যা তাকে চেনা মানুষদেরও অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
---"What?"
একটা মাত্র শব্দ।কিন্তু সেই শব্দের মধ্যে চাপা রাগ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে ঘরের বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে উঠল।সে এবার সম্পূর্ণ সোজা হয়ে বসল।তার দৃষ্টি সরাসরি মাহবুদ জামানের উপর স্থির।
---"দাদু..."
"তুমি কি বললে?"
মাহবুদ জামান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না।
---"আমি যা বলেছি তুমি যা শুনেছ, সেটাই বলেছি।"
কাইফের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেল।তার ডান হাতের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল।
---"আমার অনুমতি ছাড়া?"
"আমার সাথে আলোচনা ছাড়া?"
"তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছ?"
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বরফশীতল হয়ে গেল।এবার আরমান অবচেতনভাবেই গিলে ফেলল।ইসরাতও বুঝতে পারছে—পরিস্থিতি ভালো দিকে যাচ্ছে না।আর মাহিরা?
তার মুখের রঙ প্রায় উধাও।কাইফ এবার হালকা ঝুঁকে সামনে এল।তার গলা উঁচু নয়।
কিন্তু সেই নিচু স্বরটাই আরও ভয়ংকর।
---"কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?"
"পরিবার?"
"নাকি শুধু তুমি?"
তার চোখে এখন স্পষ্ট রাগ।সেই রাগ যা সে খুব কমই প্রকাশ করে।কিন্তু একবার প্রকাশ পেলে সবাই দূরে সরে দাঁড়ায়।ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা কেউই কথা বলার সাহস পেল না।কারণ সবাই জানে—কাইফ এখন সত্যিই রেগে গেছে।আর এই আলোচনাটা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা সহজ হবে না।
পুরো ডাইনিং হল তখন এমন নিস্তব্ধ যে কারও শ্বাস নেওয়ার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।কাইফের প্রশ্নের পর মাহবুদ জামান একটুও বিচলিত হলেন না।বরং আগের মতোই স্থির দৃষ্টিতে নাতির দিকে তাকিয়ে বললেন,
---"তোমার কি মনে হয় আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে?"
"এই পরিবারের প্রধান এখনো আমি, কাইফ।"
"আর কোনো সিদ্ধান্ত যদি আমি নিই, তাহলে সেটা কাউকে জিজ্ঞাসা করে নিই না।"
কথাগুলো শেষ হতেই কাইফের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল।তার বুক ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে।যারা তাকে ভালো করে চেনে, তারা বুঝে গেল—সে এখন নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।আর সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ।কারণ কাইফ সাধারণত রাগ প্রকাশ করে না।সে রাগ চেপে রাখে।আর যখন সেই নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরে...তখন পরিস্থিতি ভালো থাকে না।
এক মুহূর্তের জন্য তার মাথায় ভেসে উঠল এলজির মুখ।তারপর দাদুর কথা।তারপর পুরো বিষয়টা।আর পরের মুহূর্তেই—
ধাম!
টেবিলের উপর রাখা পানির জগটা তার হাতের আঘাতে দূরে গিয়ে পড়ল।কাঁচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দে পুরো হল কেঁপে উঠল।
ইসরাত চমকে উঠল।আরমান অবচেতনভাবে সোজা হয়ে বসল।মাহিরা ভয়ে নিঃশব্দে পিছিয়ে গেল।কিন্তু কাইফ থামল না।তার হাতের কাছে থাকা আরেকটা গ্লাস তুলে ছুঁড়ে ফেলল।
ধপ!
তারপর টেবিলের উপর রাখা একটি ফলের বাটিও মেঝেতে গিয়ে পড়ল।চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ফলগুলো।কেউ তাকে থামানোর সাহস পেল না।কারণ তার চোখ দুটো এখন ভয়ংকরভাবে লালচে হয়ে উঠেছে।আর তার সেই নীরব ক্রোধ ঘরের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছে।সাবিহা জামান অজান্তেই মুঠো করে ধরলেন নিজের ওড়না।ফারহিন নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।সামিহা ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিল।তারা জানত কাইফ রেগে যাবে।কিন্তু এতটা?তবুও আশ্চর্যের বিষয়—মাহবুদ জামান নিজের জায়গা থেকে এক চুলও নড়লেন না।তিনি শুধু নীরবে নিজের নাতিকে দেখছিলেন।যেন বহু আগেই এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।অবশেষে কাইফ দুই হাত টেবিলের উপর রেখে মাথা নিচু করল।সে স্পষ্টই নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।তার আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে।কয়েক সেকেন্ড পর সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।তার কণ্ঠ এবার নিচু।
অস্বাভাবিক নিচু।আর সেই কারণেই আরও ভয়ংকর।
---"দাদু..."
"তুমি আমার ধৈর্য পরীক্ষা করছ।"
ডাইনিং হল আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ সবাই জানে—কাইফের এই স্বর মানে সে এখনো নিজেকে ধরে রেখেছে।কিন্তু আর কতক্ষণ ধরে রাখতে পারবে...সেই উত্তর কারও জানা নেই।
তোমার গল্পের ধারাবাহিকতায় এভাবে যেতে পারে—
কাইফের শেষ কথার পর পুরো ডাইনিং হল আবার নীরব হয়ে গেল।ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো এখনো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।কেউ নড়ছে না।কেউ কথা বলছে না।
এমন সময় মাহবুদ জামান হেলান দিয়ে বসলেন।তার চোখে ভয় নেই।রাগও নেই।
শুধু অদ্ভুত এক স্থিরতা।তারপর তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
---"তুমি কি দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছ?"
কথাটা শুনে কাইফের মাথা উঠল।
তার চোখ সরাসরি দাদুর চোখে গিয়ে আটকাল।ঘরের তাপমাত্রা যেন মুহূর্তেই কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল।
---"What did you say?"
মাহবুদ জামান একই স্বরে বললেন,
---"আমি জিজ্ঞাসা করেছি তুমি কি দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছ?"
"যে ছেলে শত শত মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে..."
"যে ছেলে কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট সামলাতে পারে..."
"যে ছেলে বিপদের সময় সবাইকে নেতৃত্ব দেয়..."
"সে নিজের বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছে?"
কাইফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
---"ভয়?"
সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল না।কারণ সে কখনো সবার সামনে হাসে না।কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি আরও ধারালো হয়ে উঠল।
---"আমাকে দেখে তোমার ভীতু মনে হয়?"
মাহবুদ জামান উত্তর দিলেন,
---"তাহলে প্রমাণ করো।"
"কারণ আমার চোখে তুমি এখন একজন যোদ্ধা না।"
"একজন পলাতক।"
ধপ!
আরমানের হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।ইসরাত অবিশ্বাস নিয়ে দাদুর দিকে তাকাল।
মাহিরা পর্যন্ত হতবাক।এই কথাগুলো কেউ কাইফকে বলে না।বলতে সাহসও করে না।
কিন্তু মাহবুদ জামান বলে ফেললেন।কাইফ ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।তার উচ্চতা আর উপস্থিতি মুহূর্তেই পুরো ঘরের উপর ছায়া ফেলে দিল।সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
---"আমি কোনো কিছু থেকে পালাই না।"
"আর কাউকে ভয়ও পাই না।"
মাহবুদ জামান সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
---"তাহলে এলজিকে কেন দূরে সরিয়ে রাখছ?"
এক মুহূর্তে পুরো হল আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কাইফ কোনো উত্তর দিল না।শুধু স্থির চোখে দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল।আর পরিবারের বাকিরা বুঝতে পারল—আজকের আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।বরং আসল সংঘর্ষটা এখন শুরু হতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে এলজি পায়েলদের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেছে।বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই পরিচিত উষ্ণ পরিবেশটা তাকে স্বস্তি দিল।গত কয়েকদিনে বাড়িটা যেন তার কাছেও অনেকটা নিজের বাড়ির মতো হয়ে গেছে।ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসে পড়ল।ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন প্রিয়া সরদার।তিনি এলজির মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে সামনে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিলেন।
---"কি রে মা, এমন ক্লান্ত লাগছে কেন?"
"নাও, আগে পানি খাও।"
এলজি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে গ্লাসটা নিল।এক নিঃশ্বাসে অর্ধেকটা পানি খেয়ে ফেলল।প্রিয়া আবার জিজ্ঞেস করলেন,
---"পায়েল কোথায়?"
"তোদের তো একসাথেই ফেরার কথা ছিল।"
এলজি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল,
---"আন্টি, ও অয়ন ভাইয়ার সাথে আসবে।"
"ওর একটু দরকার ছিল।"
প্রিয়া মাথা নাড়লেন।তার মুখে সেই পরিচিত মমতাময়ী হাসি।
---"আচ্ছা, তাহলে তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।"
"তারপর নিচে এসে কিছু খেয়ে নিস।"
"মুখটা একদম শুকিয়ে আছে।"
এলজি হেসে সম্মতি জানাল।তারপর ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসতেই হঠাৎ তার বাবার কথা মনে পড়ল।সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাতে নিয়ে কল দিল।দুইবার রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো।এলজির মুখে সঙ্গে সঙ্গে কোমল হাসি ফুটে উঠল।
---"আসসালামু আলাইকুম, বাবা।"
ওপাশ থেকে জাকির জাহানের স্নেহভরা কণ্ঠ ভেসে এলো।
---"ওয়ালাইকুমুস সালাম, মামণি।"
"কেমন আছো?"
এলজি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
---"আমি ভালো আছি।"
"কিন্তু আগে এটা বলো—"
"উনি যে ইংলিশের প্রফেসর না, বরং Business Administration-এর প্রফেসর..."
"তুমি সেটা জানতে?"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর ওপাশ থেকে হালকা হাসির শব্দ ভেসে এলো।
---"হুম।"
এলজি সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় সোজা হয়ে বসল।
---"তুমি জানতে?"
"তাহলে আমাকে আগে বলনি কেন?"
জাকির সাহেব এবার খোলাখুলিই হেসে ফেললেন।
---"আগে বলে দিলে আর সারপ্রাইজ থাকত?"
"তোমার মুখের এক্সপ্রেশনটা তো আমি দেখতেই পেতাম না।"
এলজি মুখ ফুলিয়ে বলল,
---"বাবা!"
"তুমি খুব খারাপ।"
"আমাকে ইচ্ছা করে ফাঁদে ফেলেছ।"
"আজকে আমার যে অবস্থা হয়েছে—"
ওপাশ থেকে আবার হাসির শব্দ এলো।
---"নিজের স্বামীকে প্রফেসর হিসেবে পেয়ে কেমন লাগছে?"
কথাটা শুনে এলজি সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকাল।
---"ফালতু।"
"একদম ফালতু।"
"আর উনি তো আমাকে মানেন না।"
"সো, আমি ওনারও কেউ না।"
কথাটা বলেই সে বালিশটা কোলে টেনে নিল।কণ্ঠে বিরক্তি থাকলেও কোথায় যেন একটা চাপা অভিমানও ছিল।ওপাশে জাকির জাহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।যেন মেয়ের কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করছেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
---"সব সম্পর্কের উত্তর প্রথম দিনেই পাওয়া যায় না, মামণি।"
"কিছু কিছু উত্তর সময় দেয়।"
এলজি বালিশের এক কোণা নিয়ে খেলতে খেলতে নিচু স্বরে বলল,
---"সময় দিতে দিতে বুড়ি হয়ে যাব আমি।"
ওপাশ থেকে আবার হাসির শব্দ ভেসে এলো।আর সেই হাসি শুনে এলজির মুখেও অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
কারণ পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকে—যাদের সাথে কথা বললেই মনটা একটু হালকা হয়ে যায়।আর জাকির জাহান ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল।তারপর জাকির জাহান হঠাৎ নরম স্বরে বললেন,
---"জানিস তো মা..."
"রোজ রাতে আমি তোর চুল বেঁধে দেওয়াটা খুব মিস করি।"
এলজি চুপ করে শুনছিল।জাকির সাহেব যেন স্মৃতির ভেতর ডুবে গেলেন।
---"তুই যখন বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তিস, তখন চুপচাপ চুলগুলো গুছিয়ে দিতাম।"
"সকালে ইউনিভার্সিটি কিংবা স্কুলে যাওয়ার আগে তোর স্নিকার্সের ফিতে বেঁধে দেওয়াটা মিস করি।"
"রান্নাঘরে গিয়ে দেখতাম ফ্রিজ খুলে কিছু না কিছু খুঁজছিস..."
"ওটাও মিস করি।"
তার গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো।
---"তোকে অনেক... অনেক মিস করি মা।"
এলজির বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।সে বিছানার কোণে বসে রইল।কিছু বলতে পারল না।কারণ সে জানে—তার বাবা কখনো সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন না।আর যখন করেন, তখন সেই কথাগুলো সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে লাগে।হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই জাকির সাহেব বলে উঠলেন,
---"ওহ!"
"তোকে তো আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি।"
এলজি ভ্রু কুঁচকাল।
---"কি কথা?"
---"কিছুক্ষণ পরে ফারহিন আর সাবিহা যাবে তোকে নিতে।"
---"রেডি হয়ে থাকিস।"
এলজি অবাক হয়ে বলল,
---"নিতে?"
"কোথায় যাব আমি?"
ওপাশ থেকে খুব শান্ত উত্তর এলো।
---"জামান ম্যানশন।"
"যেটা আমার পরে তোর শেষ ঠিকানা।"
কথাটা শুনে এলজি যেন সত্যিই আকাশ থেকে পড়ল।সে সোজা হয়ে বসল।
---"কি?!"
"বাবা, তুমি পাগল নাকি?"
---"ওদের ছেলে যেখানে আমাকে সহ্যই করতে পারে না..."
"সেখানে আমি গিয়ে থাকব?"
"তুমি বুঝতে পারছ কি হবে?"
"আমি যাব না।"
"একদমই যাব না।"
সে এবার বালিশটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
---"নিজের ভালো পাগলেও বোঝে।"
---"আর আমি তো পাগল না।"
ওপাশে জাকির জাহান মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
---"জানিস তো মা..."
"মেয়েদের জীবন বড়ই অদ্ভুত।"
এলজি চুপ হয়ে গেল।কারণ সে বুঝতে পারছে—এখন তার বাবা এমন কিছু বলতে যাচ্ছেন, যেটা হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।জাকির সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন।আকাশে বিকেলের আলো ক্রমশ নরম হয়ে আসছে।
---"দেখ..."
"ছোট থেকে আমরা বাবারা তোদের ভালোবেসে বড় করি।"
"খাইয়ে দাইয়ে বড় করি।"
"অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকি।"
"কাঁদলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।"
"হাসলে মনে হয় পৃথিবীটা জিতে ফেলেছি।"
তার কণ্ঠ আরও গভীর হয়ে উঠল।
---"তারপর তোরা একটু বড় হতে না হতেই..."
"কোনো একদিন বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে অন্য একটা ঘরে পাঠিয়ে দিতে হয়।"
"যে ঘরে নতুন মানুষ থাকবে।"
"নতুন সম্পর্ক থাকবে।"
"নতুন দায়িত্ব থাকবে।"
তিনি কয়েক সেকেন্ড থামলেন।তারপর নিচু স্বরে বললেন,
---"মায়েরা কাঁদে।"
"মেয়েরাও কাঁদে।"
"কিন্তু বাবারা?"
"বাবারা বেশিরভাগ সময় কাঁদেও না।"
"শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।"
"কারণ তারা জানে, যদি একবার ভেঙে পড়ে..."
"তাহলে তাদের মেয়েটাও ভেঙে পড়বে।"
এলজির চোখ ধীরে ধীরে ভিজে উঠল।জাকির সাহেব বলেই চললেন,
---"তুই জানিস না মা..."
"মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় একজন বাবার বুকের ভেতর ঠিক কি হয়।"
"কারণ সেই অনুভূতি শব্দে বোঝানো যায় না।"
"শুধু অনুভব করা যায়।"
"যেদিন তোর হাতটা ধরে প্রথম স্কুলে দিয়ে এসেছিলাম..."
"সেদিনও এতটা কষ্ট হয়নি।"
"কিন্তু যেদিন বুঝলাম একদিন তোকে অন্য একটা বাড়িতে পাঠাতে হবে..."
"সেদিন থেকেই মাঝে মাঝে বুকটা ভারী হয়ে যায়।"
ফোনের দুই প্রান্তেই কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো।একজন বাবা।আর তার আদরের মেয়ে।দুজনেই চুপ।কারণ কিছু অনুভূতি থাকে—যেগুলো কথার চেয়ে নীরবতাই বেশি সুন্দর করে প্রকাশ করে।
জাকির সাহেবের কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।এলজি বালিশটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে বলল,
---"মেয়েদের জীবন বড়ই জটিল, তাই না বাবা?"
ওপাশ থেকে জাকির সাহেব নরম স্বরে বললেন,
---"কেন এমন বলছিস মা?"
এলজি মৃদু হাসল।তবে সেই হাসির ভেতরে কোথাও একটা বেদনার ছোঁয়া ছিল।
---"ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আবদার করি..."
"অভিমান করি..."
"রাগ করি..."
"কত শত জেদ করি।"
"মনে হয় বাবা ছাড়া পুরো পৃথিবীটাই অসম্পূর্ণ।"
সে কিছুক্ষণ থামল।তারপর নিচু স্বরে বলল,
---"কিন্তু বড় হয়ে একদিন স্বামীর হাত ধরে সংসার করতে হয়।"
"ছোটবেলায় বাবা গার্ডিয়ান হয়..."
"বিয়ের পরে সেই জায়গায় স্বামী আসে।"
"ছোটবেলায় থাকি বাবার আমানত..."
"বিয়ের পরে হয়ে যাই স্বামীর আমানত।"
"বিয়ের আগে জীবনটা কত স্বাধীন, কত চিন্তামুক্ত মনে হয়।"
"আর বিয়ের পরে একই মানুষকে দায়িত্বশীল হতে হয়।"
তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো।
---"ছোটবেলায় নিজের ঘরকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হয়।"
"কিন্তু একদিন সেই ঘর ছেড়ে অন্য একটা ঘরকে নিজের বলতে শিখতে হয়।তখন নিজের পরিবার ছাড়াও অচেনা এক পরিবার কেও নিজের পরিবার বানাতে হয়,তাদের আপন করতে হয়।"
"ছোটবেলায় বাবা-মায়ের ছায়ায় থাকি।"
"বড় হয়ে অন্য একটা পরিবারের সুখ-দুঃখ নিজের করে নিতে হয়।"
"আগে নিজের মন খারাপ হলে বাবার কাছে ছুটে যেতাম।"
"পরে অন্য কারও কাঁধে ভরসা খুঁজতে হয়।"
"আগে নিজের জন্য বাঁচতাম।"
"একসময় অন্যদের জন্যও বাঁচতে শেখা লাগে।"
এলজি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
---"মেয়েরা হয়তো জন্মের পর থেকে একটা বাড়ির হয়..."
"কিন্তু বড় হওয়ার পর শেখে কিভাবে আরেকটা বাড়িরও হয়ে যেতে হয়।"
"আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় কি জানো বাবা?"
জাকির সাহেব চুপচাপ শুনছিলেন।
---"কি?"
এলজির চোখের কোণে জল চিকচিক করল।
---"মেয়েরা যত বড়ই হোক..."
"যত দায়িত্বই কাঁধে নিক..."
"যত শক্তই হয়ে উঠুক..."
"তবুও বাবার কাছে তারা সবসময় সেই ছোট্ট মেয়েটাই থেকে যায়।"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।তারপর জাকির জাহান ধীরে ধীরে বললেন,
---"হ্যাঁ মা।"
"এই কথাটা একদম সত্যি।"
"পৃথিবী তোর মধ্যে যত পরিবর্তনই দেখুক..."
"আমার চোখে তুই আজও সেই ছোট্ট মেয়েটা..."
"যে আমার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছিল।"
আর সেই মুহূর্তে বাবা-মেয়ের মাঝখানে হাজার মাইল দূরত্ব থাকলেও—তাদের হৃদয়ের দূরত্ব যেন একটুও ছিল না।এলজি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
---"আমি যাব বাবা।"
"তুমি চিন্তা করো না।"
কথাটা শুনে জাকির জাহানের বুকের উপর থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল।তিনি জানতেন মেয়েটা রাজি হবে না।অনেক বুঝাতে হবে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে রাজি হয়েছে।
---"আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক মা।"
"রেডি হয়ে থাকিস।"
"ওরা কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।"
"আচ্ছা বাবা।"
ফোন কেটে গেল।ফোনটা নামিয়ে রাখার পরও জাকির জাহান কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইলেন।তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা সোফার সাথে ঠেকালেন।মুখে এক চিলতে হাসি ফুটলেও চোখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ।নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন,
---"আমার এটাই ভেবে ভয় লাগে মা..."
"তুই আমায় ছাড়া বাঁচবি কি করে?"
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট্ট এলজির মুখ।যে রাতে ঘুমানোর আগে তার হাত ধরে থাকত।যে কোনো সমস্যায় প্রথমে বাবাকেই ডাকত।যে আজও কষ্ট পেলে বাবার কাছেই ছুটে আসে।জাকির সাহেবের বুকটা হালকা মোচড় দিয়ে উঠল।
---"তাই তোকে অপমানিত হতে হতে পারে জেনেও..."
"আমি তোকে সেখানে যেতে বাধ্য করছি।"
"কারণ আমি চাই..."
"আমি না থাকলেও তুই বাঁচতে শিখিস।"
"নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিস।"
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
---"তবে একটা ব্যাপার আমি জানি।"
"ওই বাড়িতে মাহিরা ছাড়া তোকে কেউ অপমান করবে না।"
"বরং সবাই মাথায় তুলে রাখবে।"
তার চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠল মাহবুদ জামান, সাবিহা, আরিয়ানা,আরমান, ইসরাতদের মুখ।তারা কেউই এলজির ক্ষতি চাইবে না।এই বিশ্বাস তার আছে।কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
---"এখন চিন্তার বিষয় একটাই..."
তিনি ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকালেন।
---"কাইফ।"
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবার বললেন,
---"তুই আর পাঁচটা ছেলের মতো না, বাবা।"
"তোর রাগও সাধারণ না।"
"তোর জেদও সাধারণ না।"
"আর তোর হৃদয়ের দেয়ালটাও খুব উঁচু।"
জাকির জাহান চোখ বন্ধ করলেন।
---"আল্লাহ..."
"আমার মেয়েটার জন্য বিষয়টা সহজ করে দিও।"
"আর ওদের দুজনকে সঠিক পথ দেখিও।"
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।কিন্তু একজন বাবার দোয়া নীরব থাকল না।সেটা নিঃশব্দে আকাশের দিকে উঠে গেল।তার একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য।
ডাইনিং হলের পরিবেশ তখনও থমথমে।মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো যেন কিছুক্ষণ আগের বিস্ফোরিত পরিস্থিতির সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে।কাইফের চোখে তখনও স্পষ্ট রাগ।আর সেই রাগের তীব্রতা দেখে ইসরাত, আরমান এমনকি মাহিরাও একদম চুপ হয়ে গেছে।ঠিক তখনই সাবিহা জামান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
তার মুখেও রাগ স্পষ্ট।তবে সেটা ছেলের উপর।
---"কাইফ, এসব কি?"
পুরো হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কারণ সবাই জানে—সাবিহা জামান খুব কম সময়ই কাইফকে ধমক দেন।
---"আমি কি তোমাকে বড়দের সামনে এমন আচরণ করতে শিখিয়েছি?"
কাইফ তৎক্ষণাৎ মাথা তুলল।তার চোখের দৃষ্টি এখনো কঠিন।
---"তোমাদের ইচ্ছেমতো আমি ওকে বিয়ে করেছি।"
"এখন আবার কেন ওকে জোর করে আমার কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছ?"
সাবিহা জামান বিন্দুমাত্র পিছিয়ে গেলেন না।
বরং আরও দৃঢ় গলায় বললেন,
---"জোর করে না।"
"আর ও এই বাড়িতে আমাদের মেয়ে হয়ে আসবে।"
"তোমার বউ হয়ে না।"
কথাটা শুনে কাইফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।কিন্তু সাবিহা থামলেন না।
---"তোমাকে জানানো আমাদের দায়িত্ব ছিল।"
"সেটা আমরা করেছি।"
"তুমি যেদিন নিজ থেকে ওকে মেনে নিতে রাজি হবে..."
"সেদিন না হয় অন্য কথা হবে।"
তারপর চারপাশে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বললেন,
"আর একটা কথা সবাই শুনে রাখো।"
"এলজির যদি এই বাড়িতে সামান্য পরিমাণে একটা ফুলের টোকাও কেউ লাগায়..."
"আমি কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলব না।"
কথাগুলো বলার সময় তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য মাহিরার উপর গিয়ে স্থির হলো।খুব অল্প সময়ের জন্য।কিন্তু সেই সময়টাই যথেষ্ট ছিল।মাহিরার মুখ শক্ত হয়ে গেল।তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠল।বুকের ভেতর রাগে আগুন জ্বলতে লাগল।কিন্তু সে কিছু বলল না।কারণ এই মুহূর্তে কিছু বলার সাহস তার নেই।সাবিহা জামান আর কোনো কথা না বলে ঘুরে দাঁড়ালেন।
---"আমি রেডি হতে যাচ্ছি।"
বলে তিনি সোজা ডাইনিং হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।তার কিছুক্ষণ পরই ফারহিন সাহেবও উঠে দাঁড়ালেন।
---"আমিও প্রস্তুত হই।"
তারপর তিনিও চলে গেলেন।তাদের চলে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর—
ধাম!
কাইফ সামনে থাকা বিশাল কাঁচের ফুলদানিটা তুলে সজোরে মেঝেতে আছড়ে মারল।মুহূর্তের মধ্যে সেটা শত টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে কয়েকজন মেড চমকে উঠল।একজন তো ভয়ে প্রায় কেঁপে উঠল।
কারণ তারা সবাই জানে—কাইফের রাগ কেমন হতে পারে।আর আজ তারা সেটা নিজের চোখে দেখছে।কাইফের বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।তার চোখে জমে আছে দমিয়ে রাখা ক্রোধ।এমন ক্রোধ, যা সে সাধারণত কাউকে দেখায় না।হঠাৎ সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।ঘুরে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।তার পদক্ষেপের শব্দ পুরো হলজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ধাপ।
ধাপ।
ধাপ।
কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করল না।কেউ কোনো কথা বলল না।কারণ সবাই জানে—এই মুহূর্তে কাইফকে থামানোর ক্ষমতা কারও নেই।কয়েক মুহূর্ত পর সে নিজের রুমের সামনে পৌঁছে গেল।তারপর—
ধাম!
এত জোরে দরজা বন্ধ হলো যে করিডোর পর্যন্ত কেঁপে উঠল।আর তারপর সবকিছু নিস্তব্ধ।কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা স্বস্তির ছিল না।
কারণ সবাই জানে—ওই রুমটা সাউন্ডপ্রুফ।
ভিতরে কি হচ্ছে...কিছু ভাঙছে কিনা...সে দেয়ালে ঘুষি মারছে কিনা...নাকি নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে...কেউ জানে না।কেউ শুনতেও পাচ্ছে না।শুধু নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।আর প্রত্যেকের মনে একই প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—এলজি জামান ম্যানশনে আসার পর এই ঝড়টা ঠিক কোথায় গিয়ে থামবে?
অন্যদিকে ডাইনিং হলের সেই উত্তপ্ত পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করলেও সবার মনে একই রকম অনুভূতি ছিল না।কাইফের রাগ, ভাঙচুর আর রুমে চলে যাওয়ার ঘটনার পরও একজনের মুখে হাসি লুকানোই যাচ্ছিল না।সে হলো ইসরাত রহমান।কাইফের রাগ নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।কারণ সে ছোটবেলা থেকেই জানে—কাইফ রেগে গেলে পুরো পৃথিবীর উপর রাগ ঝাড়তে পারে, কিন্তু রাগ কমে গেলে আবার আগের মতোই হয়ে যায়।
তাই তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা।
এলজি আসবে!এই একটাই ভাবনায় তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে।সে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
---"আল্লাহ! অবশেষে বাড়িটা একটু প্রাণ পাবে।"
আরমানের অবস্থা তো আরও খারাপ।খুশিতে সে কার্যত বসেই থাকতে পারছে না।
---"সত্যি আপু?"
"ভাবিপু সত্যিই আসবে?"
ইসরাত চোখ ঘুরিয়ে বলল,
---"এতক্ষণ কি আমরা নাটক করছিলাম নাকি?"
"অবশ্যই আসবে।"
কথাটা শুনে আরমানের মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
---"ইয়েস!"
বলেই সে সোফার চারপাশে এক চক্কর দিয়ে এল।ইসরাত হেসে ফেলল।
---"দেখে মনে হচ্ছে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে।"
আরমান নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
---"আমার ভাবিপু আসছে।"
"এটা কি কম নাকি?"
"এই বাড়িতে অন্তত একজন মানুষ থাকবে যে আমার কথা শুনবে।"
"নাহলে সবাই শুধু ধমক দেয়।"
ইসরাত এবার সত্যিই হেসে ফেলল।দূরে বসে থাকা দাদিমাও মুচকি হাসলেন।কিন্তু ঘরের সবাই যে এতটা খুশি, তা নয়।এক কোণে বসে থাকা মাহিরার মুখের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়।তার মুখ শক্ত হয়ে আছে।
চোয়াল চেপে রেখেছে।নখগুলো নিজের হাতের তালুতেই প্রায় বসিয়ে ফেলেছে।প্রতিটা কথাই তার কানে বিষের মতো লাগছে।এলজি আসবে।এই বাড়িতে থাকবে।সবাই তাকে আপন করে নেবে।
এই চিন্তাগুলোই যেন তার ভিতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছে।বিশেষ করে সাবিহা জামানের শেষ কথাগুলো।
"এলজির যদি এই বাড়িতে একটা ফুলের টোকাও লাগে..."
কথাটা বারবার তার মাথায় ঘুরছে।মাহিরার চোখে তখন অদ্ভুত এক ঝিলিক।রাগের।হিংসার।অসন্তোষের।সে মনে মনে দাঁত চেপে বলল,
---"না।"
"এভাবে হতে পারে না।"
"কাইফ শুধু আমার হবে।"
"হতেই হবে।"
বছরের পর বছর ধরে সে কাইফকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে।যদিও কাইফ কখনো তাকে সেই চোখে দেখেনি।যদিও প্রতিবারই সে দূরত্ব তৈরি করেছে।তবুও মাহিরা নিজের মনকে বোঝাতে পারেনি।বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আকর্ষণ আরও জেদে পরিণত হয়েছে।আর এখন?এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এলজি।মাহিরার চোখ ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে উঠল।ওই সিঁড়ির ওপারেই কাইফের রুম।
দরজাটা এখনো বন্ধ।সে কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে রইল।তারপর মনে মনে বলল,
---"যে করেই হোক..."
"আমি হারব না।"
"যে করেই হোক..."
"কাইফকে আমার করেই ছাড়ব।"
আর ঠিক সেই চিন্তার মধ্যেই তার চোখের গভীরে একরাশ জেদ জমাট বাঁধতে লাগল।
যে জেদ ভবিষ্যতে নতুন নতুন ঝড়ের জন্ম দিতে পারে।
অন্যদিকে সাবিহা জামান আর ফারহিন সাহেব এলজিকে নিয়ে জামান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।গাড়ির ভিতরে পুরো পথটাই এলজি অস্বাভাবিক চুপচাপ ছিল।সাবিহা দু-একবার কথা বলার চেষ্টা করলেও সে শুধু ছোট ছোট উত্তর দিয়েছে।কারণ তার মাথার ভেতর এই মুহূর্তে একটাই মানুষ ঘুরছে।কাইফ জুরাইন জামান।
আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর বিষয়—কাইফের রাগ।সারাটা পথ সে একটার পর একটা সম্ভাবনা ভেবেছে।
---"উনি কি আমাকে দেখে আরও রেগে যাবেন?"
"কথা বলবেন?"
"নাকি একদম উপেক্ষা করবেন?"
"আচ্ছা... উনি কি সত্যিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন?"
চিন্তাটা মাথায় আসতেই সে নিজেই অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।যদিও জানে কাইফ তাকে কিছু করবে না।তবুও মানুষটা যখন রেগে থাকে, তখন তাকে বোঝা সত্যিই কঠিন।এভাবেই ভাবতে ভাবতে কখন যে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেছনে পড়ে গেছে, এলজি খেয়ালই করেনি।সন্ধ্যা নেমে আসছে।আকাশজুড়ে কমলা, সোনালি আর হালকা বেগুনি রঙের মিশ্রণ।দূরে দূরে পাখির ঝাঁক নিজেদের বাসার দিকে ফিরে যাচ্ছে।দিনের শেষ আলোটা যেন পৃথিবীর গায়ে নরম করে লেগে আছে।ঠিক তখনই গাড়িটা ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে দিল।এলজি জানালার বাইরে তাকাল।আর পরের মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
বিশাল এক অলংকৃত লোহার গেট।গেটের মাঝখানে সোনালি নকশায় খোদাই করা—
"ZAMAN MANSION"
গেটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি দেখেই সম্মানের সাথে মাথা নত করল।তারপর ধীরে ধীরে বিশাল গেটটা খুলে গেল।গাড়ি ভিতরে প্রবেশ করল।আর এলজি নিঃশ্বাস আটকে চারপাশ দেখতে লাগল।গেট থেকে মূল ম্যানশন পর্যন্ত দীর্ঘ একটি রাস্তা চলে গেছে।রাস্তার দু'পাশে সারি সারি রাজকীয় খেজুর গাছ আর বিদেশি অলংকারিক বৃক্ষ।গাছগুলোর গোড়ায় বসানো নরম আলো সন্ধ্যার অন্ধকার নামার আগেই পুরো পরিবেশকে স্বপ্নময় করে তুলেছে।আরও সামনে এগোতেই দেখা গেল বিশাল ফুলের বাগান।এক পাশে গোলাপ।অন্য পাশে সাদা লিলি।কোথাও অর্কিড।কোথাও রঙিন টিউলিপ।মৃদু বাতাসে ফুলগুলোর সুবাস মিশে চারপাশকে আরও মোহময় করে তুলেছে।মাঝে মাঝে ছোট ছোট ফোয়ারা।
সেখান থেকে ছিটকে ওঠা পানির ফোঁটাগুলো আলোয় ঝিলমিল করছে।রাস্তার দুই পাশে পাথরের তৈরি নান্দনিক ভাস্কর্য।সবকিছু এত নিখুঁত যে এলজির মনে হলো সে যেন কোনো রাজপ্রাসাদের দিকে যাচ্ছে।
গাড়ি যত সামনে এগোচ্ছে—তার বিস্ময় তত বাড়ছে।অবশেষে গাড়িটা এসে থামল।
আর এবার এলজি পুরো ম্যানশনটা দেখতে পেল।তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
এটা কোনো বাড়ি নয়।এটা যেন আধুনিক যুগের রাজপ্রাসাদ।তিনতলা বিশাল স্থাপনা।
সাদা আর গাঢ় ধূসর পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি।সামনের উঁচু স্তম্ভগুলো পুরো ভবনটাকে আরও রাজকীয় করে তুলেছে।প্রতিটি জানালা, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি আলো যেন নিখুঁতভাবে সাজানো।এলজি কয়েক সেকেন্ড হা করে তাকিয়ে রইল।সে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
---"এটা... বাড়ি?"
সাবিহা জামান মুচকি হাসলেন।আর ফারহিন সাহেব হালকা হেসে মাথা নাড়লেন।গাড়ির দরজা খুলে এলজি নিচে নামল।তার চোখ এখনো ম্যানশনের উপর স্থির।বাগানের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া প্রশস্ত পাথরের পথটা সোজা মূল প্রবেশদ্বার পর্যন্ত গেছে।চারপাশে নরম আলো।দূরে ফোয়ারার শব্দ।উপরে সন্ধ্যার আকাশ।সব মিলিয়ে দৃশ্যটা অবিশ্বাস্য সুন্দর।কিন্তু ঠিক তখনই...কেন যেন এলজির মনে হলো কেউ তাকে দেখছে।খুব গভীরভাবে।খুব স্থিরভাবে।সে অজান্তেই মাথা তুলল।
আর পরের মুহূর্তেই তার বুক ধক করে উঠল।তৃতীয় তলার একটি বারান্দায় একজন দাঁড়িয়ে আছে।দূরত্ব অনেক।তবুও তাকে চিনতে ভুল হলো না।কালো পোশাক।
লম্বা অবয়ব।এক হাত বারান্দার রেলিংয়ে রাখা।আর সেই মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।শুধু এক জোড়া গভীর amber eyes।
যে চোখ দুটো শুরু থেকেই নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এলজির উপর স্থির ছিল।না পলক ফেলছে।না সরে যাচ্ছে।শুধু তাকিয়ে আছে।এমনভাবে যেন তার উপস্থিতির প্রতিটি ক্ষুদ্র পরিবর্তনও নজর এড়াচ্ছে না।এলজির গলা হঠাৎ শুকিয়ে গেল।সে অজান্তেই একটা শুকনো ঢোক গিলল।তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি একটু বেড়ে গেল।
কারণ সেই দৃষ্টি—রাগের কিনা...বিরক্তির কিনা...নাকি অন্য কিছুর...সে বুঝতে পারল না।শুধু বুঝল—কাইফ জুরাইন জামান জানে সে এসে গেছে।আর সেই উপলব্ধিটাই তার অজানা আশঙ্কাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
[বিশেষ কিছু কারণে আমার পক্ষে রোজ লেখা সম্ভব নয়।তাই আমি চেষ্টা করব যতটা পারি তাড়াতাড়ি দেওয়ার।আপনারা মাঝে মাঝে চেক করবেন পেয়ে যাবেন। ]