সকালের আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর।হালকা সোনালি রোদ ম্যানশনের বিশাল বাগানের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে। ঠান্ডা বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চারপাশে।এত শান্ত একটা সকাল দেখে কেউই বুঝতে পারবে না—এই পরিবারের জীবনে কত ঝড় বয়ে গেছে।নাস্তার টেবিলে আজ যথারীতি সবাই উপস্থিত।রাশেদ চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছেন।ইমতিয়াজ চৌধুরী কফির মগ হাতে বসে আছেন।সাফওয়ান এক হাতে পরোটা আর অন্য হাতে ফোন নিয়ে ব্যস্ত।রিয়ান বিরক্ত মুখে চা খাচ্ছে।নাদিয়া চুপচাপ বসে আছে।আর সাইফা নিচে নামছে ধীর পায়ে।আজকে তার মনটাও অদ্ভুত হালকা।গত রাতের লং ড্রাইভের কথা বারবার মনে পড়ছে।আর তার সাথে সাইফের সেই কথাগুলোও...মেয়েটার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।ঠিক তখনই—ম্যানশনের প্রধান দরজা খুলে গেল।সবাই একসাথে তাকাল।পরের মুহূর্তেই একটা চেনা কণ্ঠ ভেসে এলো।
— "Guys surpriseeee!"সাইফা চমকে উঠল।রিয়ানও ভ্রু কুঁচকাল।সাফওয়ান প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—নোভা তার পাশে এলিসা আর তাদের সঙ্গে দুইজন মার্জিত মহিলা।নোভার এর মা—নাহার জাহান।এলিসা এর মা—এভেলিনা ইসলাম।পুরো ডাইনিং হল কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।নোভা দুহাত ছড়িয়ে বলল
— "কি হলো? কেউ খুশি না?"সাফওয়ান হঠাৎ লাফিয়ে উঠল।
— "আরে ভূত এসে পড়েছে রে!"নোভা সাফোয়ানের সাথে মারপিঠ করতে জেতে নিছিল।এলিসা এসে নোভাকে আটকায় আর বলে
— "আসতে না আসতে তদের মারপিঠ শুরু করে দিলি।"মুহূর্তেই হাসিতে ভরে উঠল পুরো পরিবেশ।সাইফা অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছে।
— "তোমরা... এখানে?"নোভা এলিসার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সাইফার কাছে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— "ভাবি! তোমাকে খুব বেশি মিস করছিলাম!"সাইফা হেসে ফেলল।
— "কখন আসলে?"এলিসা মুচকি হেসে বলল
— "গত রাতে।"
— "গত রাতে?!"সাইফা বিস্ময়ে চোখ বড় করল।ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ।
— "হ্যাঁ।"সবাই তাকাল। সবাই একসাথে পেছনে তাকাল। সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে সাইফ। আজ তাকে অন্য দিনের তুলনায় আরও আলাদা লাগছে—একটা অদ্ভুত শান্ত অথচ প্রভাবশালী উপস্থিতি যেন পুরো ঘরটা দখল করে নিচ্ছে।তার পরনে ব্রাউন টি-শার্ট, যা শরীরের গড়নের সাথে একদম নিখুঁতভাবে মানিয়ে গেছে। নিচে কালো ট্রাউজার—সিম্পল হলেও তার স্টাইলকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। এক হাতে ধরা কফির মগ, আর অন্য হাতটা হালকা ঢিলে ভঙ্গিতে পাশে রাখা।চুলগুলো একটু এলোমেলো, যেন সদ্য গুছিয়ে না নিয়েই বেরিয়েছে। মুখে কোনো অতিরিক্ত ভাব নেই—না হাসি, না রাগ—শুধু এক ধরনের স্থিরতা, যেটা দেখে বোঝা যায় সে নিজের জগতে পুরো নিয়ন্ত্রণে আছে।তার চোখ দুটো নিচের দিকে তাকানো, কিন্তু সেই দৃষ্টির ভেতরে একটা গভীরতা আছে—যেন আশেপাশের সবকিছু সে এক মুহূর্তেই পড়ে ফেলতে পারে, আবার ইচ্ছা করেই কিছু লুকিয়েও রাখে।নোভা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল
— "আমাদের দেখে কে সবার আগে ধরে ফেলছিল জানো?"সাইফ ভ্রু তুলল।
— "আমি কি ধরেছিলাম? তোমরাই তো নিজে ধরা দিয়েছিলে।"এলিসা হেসে ফেলল
— "মিথ্যা বলো না ভাইয়া।"তখনই সবাই জানতে পারল—নোভা, এলিসা আর তাদের মায়েরা গত রাতেই ঢাকায় এসেছে।আর সাইফ ঘটনাটা জেনে গিয়েছিল।কিন্তু নোভা আর এলিসা তাকে অনুরোধ করেছিল
— "প্লিজ, কাউকে বলো না। আমরা সবাইকে surprise দিতে চাই।"সাইফও কথা রেখেছিল।কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—সাইফাও কিছু জানত না।-সে অবাক হয়ে বলল
— "তুমি জানো আর আমায় বলোনি?"সাইফ কফিতে চুমুক দিয়ে শান্তভাবে বলল
— "Surprise নষ্ট করতে ইচ্ছে করেনি।"সাইফা চোখ ছোট করল।
— "আপনি অনেক খারাপ।"
— "জানি।"এই উত্তর শুনে নোভা, এলিসা,সাফোয়ান, রিয়ান সবাই হেসে উঠল।
বিকেলের আকাশে তখন হালকা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।সূর্যের আলো একটু নরম হয়ে এসেছে।বাগানের গাছগুলোয় বাতাস লাগছে মৃদু মৃদু।পুরো পরিবার বাগানে বসে গল্প করছে।অনেকদিন পর সবাই একসাথে।নুসরাত জাহান পুরনো দিনের গল্প বলছেন।রুমানা ইসলাম মাঝে মাঝে যোগ দিচ্ছেন।রাশেদ চৌধুরীর মুখেও আজ দীর্ঘদিন পর প্রশান্তির ছাপ।দূরে দাঁড়িয়ে সাইফ সব দেখছিল।তার চোখে এক ধরনের শান্তি।কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।ঠিক তখনই তার ফোন কেঁপে উঠল।স্ক্রিনে কোনো নাম নেই।শুধু একটি Unknown Number।কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ঠান্ডা কণ্ঠ
— "সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে।"সাইফের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
— "কে?"ওপাশে হালকা হাসি শোনা গেল।
— "খেলা আবার শুরু হয়েছে, মিস্টার সাইফ চৌধুরী।"কল কেটে গেল।বাগানে তখনও সবাই হাসছে।কেউ কিছু জানে না।শুধু সাইফ জানে—ঝড় আবার ফিরছে।
চলবে...
[Sorry honey late a chapter deoar jnno]