নোভা,এলিসা,রিদিতা জাহান আর এভেলিনা ইসলাম ঢাকায় আসার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে।সময়টা খুব বেশি না হলেও এই এক মাসে চৌধুরী ম্যানশনের পরিবেশ যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশাল সাদা ম্যানশনটার প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা বারান্দা, প্রতিটা ঘর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত লাগে। কারও হাসির শব্দ, কারও ঝগড়া, কারও গান—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন আবার সত্যিকারের একটা পরিবারে ভরে উঠেছে।সকালের আবহাওয়াটাও আজ বেশ সুন্দর। রাতের হালকা বৃষ্টির কারণে বাগানের ঘাসগুলো ভেজা। গোলাপের পাপড়িতে ছোট ছোট পানির ফোঁটা জমে আছে। দূরে ফোয়ারার পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বাতাসে কফি আর ভেজা মাটির মিশ্র গন্ধ।এমন সময় নিজের ঘরে বসে স্কেচবুকে কিছু আঁকছিল সাইফা।তার পরনে ছিল হালকা বেবি-পিঙ্ক ওভারসাইজ টি-শার্ট আর সাদা পায়জামা। লম্বা চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। পাশে রাখা ব্লুটুথ স্পিকারে আস্তে আস্তে গান বাজছে।
হঠাৎ সে নিজেই গুনগুন করে গাইতে শুরু করল—
"Mama I'm in love with a criminal..."
গান গাইতে গাইতে সে পেন্সিল দিয়ে একটা মুখ আঁকছিল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো...সে খেয়ালই করেনি কখন দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সাইফ।আজ তার পরনে ছিল অফ-হোয়াইট লিনেন শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। নিচে ডার্ক নেভি ট্রাউজার। এক হাতে কফির মগ। অন্য হাতটা পকেটে।
দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে।তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
— "ক্রিমিনাল এসে গেছে।"
সাইফা চমকে উঠে প্রায় পেন্সিল ফেলে দিল।
— "আল্লাহ! তুমি মানুষ না ভূত?"
— "ভূত হলে এত সুন্দর হইতাম না।"
— "আত্মবিশ্বাস দেখছো?"
— "সত্য কথা বলছি।"
সাইফা চোখ উল্টে আবার স্কেচবুকের দিকে তাকাল।কিন্তু পরের মুহূর্তেই সাইফ সেটা টেনে নিল।
— "এই!"
— "দেখি।"
পাতা উল্টাতেই তার চোখে পড়ল...আঁকা মানুষটা দেখতে আশ্চর্যজনকভাবে তার মতো।সাইফ ভ্রু তুলল।
— "ওহ।"
— "ওহ মানে?"
— "কিছু না।"
— "দাও।"
— "না।"
— "সাইফ!"
— "তোমার taste খারাপ না।"
সাইফার গাল লাল হয়ে গেল।বিরক্ত হওয়ার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে সে নিজেই লজ্জা পাচ্ছিল।ঠিক তখনই নিচ থেকে সাফওয়ানের চিৎকার ভেসে এল।
— "ভাইইইই!"
দুজনেই তাকাল।
— "কি হইছে?"
— "ব্যবসা বাঁচাও!"
— "আগুন লাগছে?"
— "আগুন না...client।"
সাইফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আমি আসতেছি।"
নিচে নেমে আসতেই ডাইনিং এরিয়ায় প্রায় সবাইকে দেখা গেল।রিয়ান সোফায় বসে ফোন ঘাঁটছে।তার পরনে ছিল গ্রে হুডি আর ব্ল্যাক জিন্স।মুখ দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সমস্যা তার একার।নোভা আজ খুব খুশি।
কারণ গত এক মাসে সে নিজের fashion designing portfolio প্রায় শেষ করে ফেলেছে।তার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাপড়ের sample, sketch, colour palette।
সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল
— "আমি আগামী সপ্তাহে application submit করব।"
রিদিতা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— "তুই পারবি।"
নোভা এর চোখ চকচক করে উঠল।
ওইদিকে এলিসা-ও এখন নিয়মিত সাইফ আর সাফোয়ান-এর সাথে পরিবারের business-এ যাওয়া শুরু করেছে।আগে সে এসব বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না।কিন্তু এখন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছে।সাফোয়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল
— "Elisa আপু আসার পর আমার চাকরি চলে যাবে।"
— "কেন?"
— "কারণ উনি আমার চেয়ে বেশি intelligent।"
— "এইটা নতুন তথ্য না।"
পুরো টেবিল হেসে উঠল।এই হাসির মাঝেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল সাইফ।আজ তাকে অস্বাভাবিক রকম handsome লাগছিল।
অফ-হোয়াইট শার্টের উপর সকালের আলো পড়ে তাকে আরও পরিণত দেখাচ্ছিল।গভীর বাদামী চোখ দুটো শান্ত।কিন্তু যারা তাকে ভালো করে চেনে তারা জানে...এই শান্তির নিচে সবসময় কিছু না কিছু লুকিয়ে থাকে।সাইফার চোখ অজান্তেই কয়েক সেকেন্ড তার দিকে আটকে গেল।সেটা অবশ্য সাফওয়ানের চোখ এড়াল না।
— "ভাবি আবার শুরু করল।"
— "চুপ কর।"
— "আমি কিছুই বলি নাই।"
— "তুই জন্মের পর থেকেই সমস্যা।"
কিন্তু ঠিক একই সময়ে...ঢাকার অন্যপ্রান্তে...একটা অন্ধকার অফিসরুমে বসে ছিল আরেকজন।দেয়ালের বিশাল কাঁচের জানালার বাইরে ধূসর শহর।টেবিলের উপর ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ফাইল।আর মাঝখানে রাখা একটা ছবি।চৌধুরী পরিবারের ছবি।ছবিটার উপর ধীরে ধীরে আঙুল বুলাল সে।
আরমান।
উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট দুই।গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা।চুলগুলো পেছনে আঁচড়ানো।
চোখে ঠান্ডা একটা ভয়ংকর স্থিরতা।ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
— "মামারা এখনও বুঝতে পারল না আমি ফিরে এসেছি।"
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা মাথা নিচু করে বলল
— "Shadow Order প্রস্তুত।"
— "ভালো।"
— "পরবর্তী নির্দেশ?"
আরমান আবার ছবিটার দিকে তাকাল।তার দৃষ্টি এবার গিয়ে থামল সাইফের মুখে।
তারপর সাইফার উপর।
একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
— "ওদের সুখটা আর বেশিদিন থাকবে না।"
রুমের আলোয় তার চোখ দুটো ভয়ংকরভাবে চকচক করে উঠল।এদিকে চৌধুরী ম্যানশনে কেউই জানে না...এক মাসের এই শান্ত সময়টা আসলে ঝড়ের আগের নীরবতা।আর খুব শীঘ্রই...তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।