ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছায়ার নজরে

মধ্যরাতের আহ্বান

লেখক: তাহমিনা

ফোনের রিংটোনটা পুরো রুমজুড়ে বেজে উঠতেই সাইফ কিছুটা বিরক্ত মুখে মাথা তুলে তাকাল। গানটা বাজতেই সাইফা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।এতক্ষণের অভিমান, লজ্জা, রাগ—সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ করেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

— "এইটা আবার কেমন রিংটোন?"সাইফ একবার ফোনের দিকে, আরেকবার সাইফার দিকে তাকিয়ে কপালে হাত চাপড়াল।

— "ধুর! এই মাদারফাকার ফোন দেওয়ার আর সময় পেল না!"ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার।রাফি Calling...ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।বহুদিনের বন্ধু। কলেজ লাইফ থেকে একসাথে পথচলা। প্রায় ভাইয়ের মতোই সম্পর্ক।সে দ্রুত কল রিসিভ করল।

— "হ্যালো।"ওপাশ থেকে ভেসে এল ক্লান্ত কিন্তু পরিচিত কণ্ঠ।

— "ওই হারামজাদা! শেষ পর্যন্ত ফোন ধরলি?"সাইফ মুচকি হেসে বলল,

— "স্টেশনে নেমেছিস?"

— "হ্যাঁ রে। আধঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। তোদের বাসার রাস্তা ঠিকমতো মনে নাই। তুই আসবি, নাকি আমি এখানেই মরে ভুত হয়ে যাব?"

— "দাঁড়া দশ মিনিট, আমি বের হচ্ছি।"

— "দ্রুত আয়। আর হ্যাঁ... তোকে একটা জরুরি কথা বলার আছে।"সাইফের হাসিটা একটু মিলিয়ে গেল।

— "সব ঠিক আছে তো?"

— "সামনাসামনি বলব।"কলটা কেটে গেল।কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে রইল সাইফ।তারপর ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।সাইফা এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল।সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— "কি হয়েছে?"সাইফ তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— "আমার দ্বিতীয় বউ এসেছে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে নিতে যেতে হবে।"এই কথাটা শুনেই সাইফার মুখটা একটু মলিন আর তার সাথে একটু রেগেও গেলো ।আজকের রাতটা সে ভেবেছিল শুধু তাদের দুজনের হবে।কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু বদলে গেল।সাইফ কোনো কথা না বলে বাথরুমের দিকে চলে গেল।রুমজুড়ে আবার নেমে এল নীরবতা।বাইরে তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে।জানালার কাঁচে পানির ফোঁটাগুলো একটার পর একটা গড়িয়ে পড়ছে।সাইফা ধীরে ধীরে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসে পড়ল।হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।তার নিজেরও বুঝতে বাকি রইল না—সে অভিমান করেছে।খুব ছোট্ট একটা অভিমান।কিন্তু সেই অভিমানটা তার পুরো মুখজুড়ে স্পষ্ট।প্রায় পনেরো মিনিট পরে বাথরুমের দরজা খুলে গেল।ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল সাইফ।আজ তার পরনে গাঢ় ধূসর রঙের একটি ফুলহাতা শার্ট আর কালো ট্রাউজার।ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে প্রথমেই তাকাল বিছানার দিকে।সেখানে সাইফাকে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।কোনো শব্দ করল না।একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তবুও সাইফা মুখ ঘুরিয়ে রাখল।যেন সামনে কেউ নেই।সাইফ আলতো করে তার থুতনিতে হাত রাখল।

— "এই যে..."কোনো উত্তর নেই যে?আমার পাখি কি রাগ করেছে?"এবারও নীরবতা।সাইফ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।তারপর খুব যত্ন করে মুখের ওপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল।আলতো করে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল।নরম স্বরে বলল,— "এভাবে মুখ ফুলিয়ে রাখলে তোমাকে আরও বেশি আদুরে লাগে জানো?"সাইফা এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।চোখ দুটো কেমন যেন ভেজা ভেজা।

— "যাও..."

— "কোথায়?"

— "তোমার বউয়ের কাছে।"

— "আরে পাগল ওইটা আমার বন্ধু"কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে নিচু গলায় বলল,

— "ওও... তাহলে যাও তোমার বন্ধু কাছে "

—" তুমি কি চাও আমি না যাই?"

—"আমি তা বলিনি।"

— "তাহলে?"

— "জানি না..."সাইফ হেসে ফেলল।তারপর খুব ধীরে বলল,

— "তুমি আমার পৃথিবী, কিন্তু যে মানুষটা অপেক্ষা করছে—সে আমার সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের সঙ্গী। আজ তাকে একা রেখে আসা মানে নিজের কাছেই হেরে যাওয়া।"সাইফা কিছু বলল না।সে শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।সাইফ আবার বলল,— "আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসব।"

— "সত্যি?"

— "সত্যি।"

— "মিথ্যা বলবা না তো?"

— "তোমার চোখে তাকিয়ে মিথ্যা বলা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়।"এই কথাটা শুনে অবশেষে সাইফার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।সেই হাসিটাই যেন সাইফের কাছে পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।হঠাৎ করেই সে নিচু হয়ে সাইফাকে কোলে তুলে নিল।কিছুক্ষণ পর সাইফ আলমারি খুলে নিজের একটি সাদা ওভারসাইজ শার্ট বের করল।

শার্টটা আলতো করে সাইফার হাতে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

— "এটা পরে নাও"

সাইফা একবার শার্টটার দিকে, আরেকবার সাইফের দিকে তাকাল। কিছু না বলেই শার্টটা পরে নিল। শার্টটা এতটাই বড় ছিল যে তার হাঁটুর অনেকটা নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে। হাতাগুলোও আঙুল ঢেকে ফেলেছে।সাইফ কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

— "আমার শার্টে তোমাকে বেশ মানায়।"

কথাটা শুনে সাইফা মুখ ফিরিয়ে নিল।

—"তাহলে শার্টটা আর ফেরত দিচ্ছি না।"

সাইফ হালকা হেসে তার কাছে এগিয়ে এল।

— "আরে! কি করতেছো?"

— "আমার অভিমানী রানিকে তার রুমে পৌঁছে দিচ্ছি।"

— "আমি নিজেই যেতে পারব।"

— "জানি। কিন্তু আমি নিয়ে যেতে চাই।"কথা বলতে বলতে সে ধীরে ধীরে তার রুম থেকে বের হলো।সাইফের রুমের পাশেই তার অভিমানী রানির রুম। সাইফের রুম পেরিয়ে সাইফার রুমে চলে এল।রুমের দরজা খুলে খুব যত্ন করে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল।তারপর কম্বলটা টেনে দিয়ে বলল,

— "রাত অনেক হয়েছে। আর বাইরে বৃষ্টিও বাড়ছে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত দরজা খুলবে না।"

— "হুম..."সাইফ তার কপালে আবারও একটা চুমু খেল।

—"যদি আমার ঘুম না আসে?"

— "তাহলে আমার কথা ভাবো।"

সাইফা লজ্জা পেয়ে কম্বলের ভিতরে লুকিয়ে পরলো।

— "যাও এখান থেকে।"

হেসে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সাইফ।দরজার কাছে গিয়ে আবার একবার ফিরে তাকাল।দেখল, সাইফা কম্বলের ভিতর থেকে চোরের মতো করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।তারপর খুব আস্তে দরজাটা বন্ধ করে নিচে নেমে এল সে।গ্যারেজে ঢুকে গাড়ির দরজা খুলল।বাইরে তখনও অবিরাম বৃষ্টি।ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই গভীর গর্জনে কেঁপে উঠল পুরো গ্যারেজ।গেট খুলে গাড়িটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল চৌধুরী ম্যানশন থেকে।ভেজা রাস্তা, অন্ধকার রাত আর ঝিরঝিরে বৃষ্টিকে সঙ্গী করে সাইফ ছুটে চলল স্টেশনের উদ্দেশ্যে।আর দোতলার জানালার পর্দার আড়াল থেকে একজোড়া অভিমানী চোখ নীরবে সেই গাড়িটাকে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যেতে দেখল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে মধ্যরাতের আহ্বান শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন