ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছায়ার নজরে

অপরিচিত সেই পরিচিত মুখ

লেখক: তাহমিনা

সকালের আলো একটু একটু করে হাসপাতালের কেবিনে ছড়িয়ে পড়ছে। রাতের বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু কাঁচের গায়ে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো যেন এখনো গত রাতের গল্প বলে যাচ্ছে। সাইফা তার অচেনা জগতে নাম বর্তমানে তার নাম তাহমিনা চৌধুরী অরোরা। অরোরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো বাইরে, কিন্তু মনটা যেন এখনো কোথাও আটকে আছে—একটা বিশাল সাদা ম্যানশনে, বৃষ্টিভেজা ছাদে, আর একজন মানুষের গভীর বাদামী চোখে।ডাক্তারদের কথাগুলো এখনো কানে বাজছে।

"কোমায় থাকা অনেক রোগী এমন একটা পৃথিবী তৈরি করে, যেটাকে তারা বাস্তব মনে করে..."

কিন্তু অরোরা যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, ততই একটা প্রশ্ন তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে

—"যদি সবই স্বপ্ন হয়... তাহলে আমি দুর্ঘটনার আগেই সেই মুখটা এঁকেছিলাম কীভাবে?"স্কেচবুকটা আবার খুলল সে।অসমাপ্ত সেই প্রতিকৃতি।চোখ দুটো যেন এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে।অদ্ভুত এক পরিচিতি।অদ্ভুত এক টান।ঠিক তখনই দরজায় নক পড়ল।রিয়ান ভেতরে ঢুকল। তার হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ আর কয়েকটা বই।

—"আপু... ডাক্তার বলছে, তুই যদি আজকের সব টেস্ট ভালো করিস, কয়েক দিনের মধ্যে বাসায় যেতে পারবি।"

অরোরা মৃদু হাসল।কিন্তু হাসিটা চোখ পর্যন্ত পৌঁছাল না।সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,

—"রিয়ান..."

—"হুম ?"

—"আমাদের... পরিচিত কারও নাম কি সাইফ ছিল?"

রিয়ান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে মাথা নাড়ল।"না তো।"

—"একটাও না?"

—"না আপু।"উত্তরটা শুনে অরোরার বুকের ভেতরটা আবার খালি হয়ে গেল।সে আর কিছু বলল না।সেদিন বিকেলে হাসপাতালের ছাদে যাওয়ার অনুমতি পেল অরোরা। রিয়ান তার পাশে হাঁটছে।দীর্ঘ এক বছর পরে প্রথমবার খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল সে।বাতাস মুখে লাগতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল।অদ্ভুত...এই বাতাস...এই গন্ধ...এই অনুভূতি...ঠিক যেন কোথাও আগে পেয়েছে।তার চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠল—একটা ছাদের দৃশ্য যেখানে প্রবল বৃষ্টি সে নিজে ভিজছে।আর পিছন থেকে একটা কণ্ঠ...

"তোমার criminal তোমার কাছেই আসছে, babe..."

অরোরা হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে।

—"আপু, কী হয়েছে?"

—"কিছু না..."

সে নিজেকেই বোঝাল।

"না... এগুলো বাস্তব না।" আজকের বিকালে দিন তার এমন ভাবেই কেটে গেলো। সন্ধ্যায় হাসপাতালের ক্যান্টিন থেকে ফেরার সময় করিডোরে ভিড় জমে গেছে।কারও পরিবারের একজন অসুস্থ হয়েছে।ডাক্তাররা দ্রুত ছুটে যাচ্ছেন।অরোরার আর রিয়ান একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।হঠাৎ...ভিড়ের মাঝখান দিয়ে একজন লম্বা যুবক দ্রুত হেঁটে গেল।পরনে ধূসর শার্ট।হাতে কিছু মেডিকেল রিপোর্ট।হাঁটার ভঙ্গিটা...কাঁধের গঠন...অজান্তেই অরোরার বুক ধক করে উঠল।লোকটা ঠিক তখনই মাথা ঘুরিয়ে একবার এদিকে তাকাল।গভীর বাদামী চোখ দুটো মাত্র এক সেকেন্ডটার জন্য অরোরার দিকে তাকালো।তারপর সে আবার ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।অরোরা স্থির হয়ে গেল।তার ঠোঁট কাঁপল।

—"ও লোকটা সাইফ না তো?"রিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

"কাকে ডাকলি?" অরোরা কোনো উত্তর দিলো না।কারন সে ছুটে গেল করিডোরের শেষ প্রান্তে।কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখল...কেউ নেই।শুধু লিফটের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।সে কয়েক সেকেন্ড দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।হৃদস্পন্দন এখনো অস্বাভাবিক দ্রুত।সে জানে না...সে কি একজন অপরিচিত মানুষকে দেখেছে...নাকি...নিজের স্বপ্নের মানুষটাকেই।দূরে কোথাও আবার মেঘ গর্জে উঠল।তারপর মেঘের গর্জনটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কিন্তু অরোরার বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন আরও বেড়ে গেল।

লিফটের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। লাল আলোটা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে—একটা তলা, দুইটা তলা, তিনটা তলা…অরোরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সেই আলোটার দিকে তাকিয়ে রইল।

কেন জানি মনে হচ্ছিল, এই দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে এমন কিছু চলে গেল, যেটা সে বহুদিন ধরে খুঁজছিল।

— “আপু…”

রিয়ান এবার একদম তার পাশে এসে দাঁড়াল। রিয়ালের কণ্ঠ শুনে অরোরা তার হুসে আসলো।

— “তুই ঠিক আছিস?”

অরোরা কোনো উত্তর দিল না।তার চোখ তখনো লিফটের দরজায়।রিয়ান তার কাঁধে হাত রাখল।

— “আপু, কী হয়েছে বল তো?”

অরোরা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।তার ঠোঁট কাঁপছে।

— “আমি… আমি ওনাকে চিনতাম।”

রিয়ান অবাক হয়ে তাকাল।

— “কাকে?”

অরোরা সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারল না।কীভাবে বোঝাবে?একজন মানুষকে সে মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেখেছে।তবু তার মনে হচ্ছে, সেই মানুষটার সঙ্গে তার পরিচয় অনেক বছরের।তার হাঁটার ভঙ্গি,কাঁধের গঠন,চোখের দৃষ্টি ইত্যাদি সব তার চিনা। এমনকি মাথা ঘুরিয়ে তাকানোর সেই এক মুহূর্তটাও যেন তার মনের কোনো গভীর জায়গায় আগে থেকেই লেখা ছিল।

— “জানি না…”

অরোরা খুব আস্তে বলল।

— “কিন্তু ওনাকে দেখেই আমার মনে হলো… আমি ওনাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।”

রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— “তোর ওই স্বপ্নের মানুষটা নাকি?”

অরোরা চমকে রিয়ানের দিকে তাকাল।

— “তুই কীভাবে বুঝলি?”

— “তুই তো আমাকে বলেছিস।”

রিয়ান একটু থেমে আবার বলল,

— “যে মানুষটাকে তুই স্বপ্নে দেখিস… যার মুখ তুই এঁকেছিস…”

অরোরা ধীরে মাথা নাড়ল।

— “হ্যাঁ।”

তার চোখ আবার লিফটের দিকে চলে গেল।

— “ওর চোখ ঠিক ওই ছবিটার মতো ছিল।”

রিয়ান এবার কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ল।

— “কিন্তু আপু, ডাক্তার তো বলেছে, কোমার সময় তোর মস্তিষ্ক অনেক কিছু তৈরি করতে পারে।”

— “জানি।”

— “তাহলে হয়তো…”

— “কাকতালীয়?”

অরোরা কথাটা শেষ করে নিজেই মৃদু হেসে ফেলল।কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না।

— “হয়তো।”

সে ধীরে ধীরে লিফটের সামনে এগিয়ে গেল।লিফটের বোতামটার দিকে হাত বাড়াল।একবার চাপ দিল। লিফটের দরজা খুললো কিন্তু কেউ নেই সাড়া নেই।

সে আবার চাপ দিলবে তখনই।

রিয়ান দ্রুত বলল,

— “আপু, কী করছিস?”

— “আমি ওনাকে খুঁজব।”

— “এখন?”

— “হ্যাঁ।”

— “কিন্তু কোন তলায় গেছে সেটাও তো জানিস না!”

অরোরা এইবার থেকে গেল, সত্যিই তো।

সে জানে না লোকটা কোথায় গেছে।কোন তলায় গেছে,কেন এসেছিল,কার জন্য এসেছিল,কিছুই জানে না।

শুধু জানে—লোকটার চোখের দিকে তাকানোর পর তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছে।যেন সে কাউকে হারিয়ে ফেলেছে আবারও।রিয়ান ধীরে তার হাতটা ধরে বলল,

— “চল, আপু।”

অরোরা নড়ল না।

— “আর একটু দাঁড়াই?”

রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “ঠিক আছে।”

দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।করিডোরটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে।কিছুক্ষণ আগে যে ভিড় ছিল, এখন সেখানে শুধু দু-একজন নার্স আর রোগীর স্বজনদের যাতায়াত।দূরে একটা মনিটরের টানা বিপ শব্দ শোনা যাচ্ছে।কোথাও একটা ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।হাসপাতালের জীবাণুনাশকের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।অরোরা চোখ বন্ধ করল।আর তখনই আবার সেই কণ্ঠটা তার মনে ভেসে উঠল

“তোমার criminal তোমার কাছেই আসছে, babe…”

তার শরীর শিউরে উঠল।সে হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল।

— “বেব…”

শব্দটা এত আস্তে বের হলো যে রিয়ান শুনতে পেল না।অরোরা নিজের ঠোঁটে হাত রাখল।তার মনে হলো, লোকটা তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল।না…হয়তো সে নিজেই কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছে।কিন্তু যতবার সেই স্মৃতির কাছে যেতে চাইছে, ততবারই মাথার ভেতর একটা কুয়াশা নেমে আসছে।সবকিছু অস্পষ্ট।শুধু একটা মুখ স্পষ্ট।একজোড়া চোখ স্পষ্ট।আর একটা নাম—সাইফ।অরোরা চোখ মেলে আবার লিফটের দরজার দিকে তাকাল।দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ।ওপাশে মানুষটা নেই।তবুও তার মনে হলো—এই গল্প এখানেই শেষ নয়।বরং এই এক সেকেন্ডের চোখাচোখিই হয়তো তার হারিয়ে যাওয়া গল্পের প্রথম দরজাটা খুলে দিয়েছে।রিয়ান ধীরে বলল,

— “চল, আপু।”

অরোরা এবার মাথা নাড়ল।শেষবারের মতো লিফটের দরজার দিকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।কিন্তু হাঁটতে শুরু করার আগে অরোরার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠল।সে জানে না লোকটা কে।জানে না কেন তাকে এত পরিচিত লাগে।জানে না কেন তার নাম মনে পড়ে।শুধু একটা জিনিস জানে—সে তাকে আবার দেখতে চায়।আর এবার…শুধু এক সেকেন্ডের জন্য নয়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অপরিচিত সেই পরিচিত মুখ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন