--
তাসিফা নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। হঠাৎ একটি মেয়ে তাসিফার পাশে এসে বসল। মেয়েটির শরীরে গোলাপি রঙের চুরিদার, চুল খোলা, চোখে হালকা কাজল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ পরিপাটি ।
মেয়েটা হেসে বলল,
-"হাই, আমি তাসনিম। তোমাকে ক্লাসে দেখলাম,নতুন তাই না?"
তাসিফা মুখ থেকে স্যান্ডউইচ সরিয়ে অবাক হয়ে তাকালো। সকালের রেগিং-এর পর কেউ নিজে থেকে কথা বলছে ভাবতেই পারেনি।
-"হ্যাঁ... আমি তাসিফা। আজই ফার্স্ট ডে।"
তাসনিম তাসিফার হাতের স্যান্ডউইচের দিকে তাকিয়ে হাসলো,
-"একা একা খাচ্ছো? ভাগ দিবে না?"
তাসিফা হেসে অর্ধেক স্যান্ডউইচ তাসনিমের দিকে এগিয়ে দিলো।
-"নাও, ভাগাভাগি করেই খাই। একা খাওয়া বোরিং।"
তাসনিম স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে বলল,
-"যাক বাঁচালে। ক্যান্টিনের খাবার একা খেতে ভালো লাগে না। আচ্ছা ওই রিদি-টিদিরা তোমাকে জ্বালাচ্ছিল না? ওরা সবাইকে ডিস্টার্ব করে। তুমি জুয়িন ভাইকে লাভ ইউ বলেছো, শুনলাম। সাহস আছে বলতে হবে!"
তাসিফা লজ্জায় লাল হয়ে গেল,
-"ধুর, ওরা জোর করছে তাই।তুমি সব শুনে ফেলছো?"
-"হ্যাঁ, পুরা ভার্সিটি শুনেছে। তবে তুমি ভয় পেয়েও না। জুয়িন ভাই কাউকে পাত্তা দেয় না, তোমাকেও দিবে না। তাই টেনশন নাই।" বলেই চোখ টিপ দিলো তাসনিম।
তাসিফার মনটা হালকা লাগলো। প্রথম দিনেই একটা বন্ধু পেয়ে গেছে।
-"তোমার পুরো নাম কি?"
-"তাসিফা আলম।তোমার?"
-"তাসনিম দিশা।"
হঠাৎ তাসনিম তাসিফার ব্যাগ থেকে একটা কলম নিয়ে বলল,
-"বন্ধুত্বের সাক্ষী হিসেবে তোমার কলম আমি নিয়ে নিলাম। পরে ফেরত দিবো না কিন্তু।"
তাসিফা নকল রাগ দেখিয়ে বলল,
-"ফেরত না দিলে তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ।"
-"আচ্ছা বাবা দিবো নে। চলো ক্লাসে যাই, পরের ক্লাস মিস করলে স্যার খবর করে দিবে।"
দুজন হাত ধরে ক্যান্টিন থেকে বের হলো। সকালের ভয়, নার্ভাসনেস সব উড়ে গেল। ভার্সিটির প্রথম দিনটাই তাসিফার কাছে স্পেশাল হয়ে গেল।
দূর থেকে জুয়িন দাঁড়িয়ে পুরোটা দেখলো। ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো,
-"মেয়েটা সহজে সবার সাথে মিশে যায় দেখছি।"
সিয়াম পাশ থেকে বলল,
-"কি রে মামা কিছু ফিল হয় নাকি?"
জুয়িন ধমক দিলো,
-"চুপ থাক তুই। আমার সামনে আসতে মানা করেছি ওকে।"
বলেই হনহন করে নিজের ক্লাসে চলে এলো সে।
--
দুপুরে তাসিফা বাসায় এসে সরাসরি গোসল করতে চলে গেল।
গোসল শেষ করে ধোয়া জামা-কাপড়গুলো বেলকনিতে মেলে দিলো।
হঠাৎ তাসিফার মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি এলো। সে ঝটপট শরীরে ওড়না জড়িয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে বের হলো কাউকে কিছু না জানিয়ে।
---
তাসিফা চুপিচুপি ছাদে এলো। দেখলো ছাদের পাশের রুমটি ভেতর থেকে লাগানো, তারমানে জুয়িন ভার্সিটি থেকে চলে এসেছে। তাই তাসিফা চোরের মতো ধীরে ধীরে পা ফেলে ফুল গাছগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। সেদিন এই গোলাপ ফুলগুলো বেশ ভালো লেগেছিল তাসিফার। সে শুধু ফুলগুলো ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিলো, আর সেই বেয়াদব খ্যাক-খ্যাক ওয়ালা কি না তার সাথে এমন ব্যবহার করেছে আর তাছাড়া আজ ভার্সিটিতেও অপমান করেছে এই বেয়াদব লোকটা। তাই এখন সে এটার রিভেঞ্জ নিবে।
তাসিফা যেই না একটা ফুল ছিঁড়তে নিবে, তখনই ছাদের পাশের রুমটির দরজা ঠক করে খুললো কেউ।
তাসিফা দ্রুত ফুল ছিঁড়তে গিয়ে ভুল করে ফুলের গাছসহ টেনে নিয়ে ভোঁ দৌড় দিলো।
আর অন্যদিকে জুয়িন মাত্র শাওয়ার নিয়ে ছাদে এসেছিল বাতাস খেতে। জুয়িন তাসিফাকে খেয়াল করেনি সে সময়। জুয়িন রেলিং-এর উপর বসে ট্রাউজারের পকেট থেকে মোবাইল বের করে মোবাইল টিপতে লাগলো।
হঠাৎ জুয়িনের গাছের দিকে নজর পড়লো। জুয়িন বসা থেকে এক লাফে দাঁড়িয়ে গেল।
-"What the hell! আমার গোলাপ গাছ কোথায়!"
রাগে জুয়িনের চোখ লাল হয়ে গিয়েছে। নিশ্চয়ই তিন তলার ডাইনি মেয়েটা এমন করেছে। উফ, একটা উটকো ঝামেলা। একে তো আমি পরে দেখে নেব।
বিড়বিড় করে বলল জুয়িন।
---
সন্ধ্যায় তাসিফা তার মা-বাবার সাথে আড্ডায় বসলো। আয়রা বেগম গরম গরম সবজির পকোড়া বানিয়ে আনলেন ড্রয়িং রুমে। সোফায় বসে তিনজন জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছিল।
আয়রা বেগম বললেন,
-"তা তাসু, আজ ভার্সিটি কেমন কাটলো?"
তাসিফার মুখটা ছোট হয়ে গেল ভার্সিটির কথা শুনে। আবার ছাদে ফুল ছিঁড়তে গিয়ে ফুলের গাছসহ টেনে নিয়ে এসেছে সে কথা ও। কাল যে তার উপর টর্নেডো যাবে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে তাসিফা।
আলমগীর আলম বললেন,
-"কি হলো আম্মু? ভার্সিটির প্রথম দিন ভালো কাটেনি?"
বাবার কথায় তাসিফার হুশ ফিরলো।
-"না মানে, হ্যাঁ বাবা। আমার একজন ফ্রেন্ড হয়েছে ভার্সিটিতে। আমার কাছে তাকে খুব মিষ্টি মেয়ে মনে হয়েছে।" (রেগিং-এর কথা মা-বাবাকে বলেনি তাসিফা)।
আয়রা বেগম বললেন,
-"বাহ। মেয়ের নাম কি শুনি?"
-"তাসনিম দিশা। আমি তাকে তাসনিম বলে ডাকি।"
আলমগীর আলম বললেন,
-"একদিন দাওয়াত দিয়ে বাসায় এনো। সবাই মিলে একসাথে খুব আড্ডা দিবো।"
-"আচ্ছা বাবা।"
আয়রা বেগম বললেন,
-"আর কিছু হয়নি?"
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"আর কি হবে মা?"
আয়রা বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
-"ওমা, তোর বাবার সাথে যেমন আমার ভার্সিটিতে ধাক্কা লেগে প্রেম হয়েছে। তোর সাথে এমন কিছু হয়নি?"
তাসিফার চোয়াল ঝুলে পড়লো নিজের মায়ের কথা শুনে। আর অন্যদিকে আলমগীর আলম হাসতে লাগলেন।
আজকের দিনটা আড্ডা দিতে দিতেই কেটে গেছে এদের।