ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 17

লেখক: মিশু

--

ভন্ডপার্টিরা ক্যান্টিন থেকে খেয়ে আবার ক্লাসে ফিরে এলো। আজ ভার্সিটিতে মাত্র দুটো ক্লাস।

ক্লাসে ঢুকেই চারজন একসাথে পেছনের বেঞ্চ দখল করে বসল। ভন্ডপার্টি থাকা মানেই ক্লাস জমে যাওয়া।

ইয়াশ ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে মুখে দিতে যাবে, ঠিক তখনই সাদ ছোঁ মেরে বোতলটা নিয়ে নিলো। 
ঢকঢক করে পুরোটা পানি খেয়ে খালি বোতলটা ইয়াশের দিকে ছুঁড়ে মারল।

ইয়াশ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর কটমট করে বলল, 
-"জানোয়ার, শালার পুত, কুত্তা, বাঙ্গির পুত! তুই আমার পানি খাইলি কেন? বেয়াদব! পুরাটা খাইলি, আমার জন্য একটুও রাখলি না?"

সাদ দাঁত কেলিয়ে বলল, 
-"বাইরে গিয়ে পানি কিনে খা। তাও কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করিস না।"

ইয়াশ খেঁকিয়ে উঠল, 
-"মাদারবোর্ড! হাতে টাকা নাই দেখেই তো বোতলে করে পানি আনছি। টাকা তুই দিবি?"

সাদ মুখ বাঁকিয়ে বলল, 
-"ভাগ এখান থেকে।"

তাসিফা দুই কানে হাত চেপে ধরল। তাসনিম চেঁচিয়ে বলল, 
-"উফ! তোরা থামবি?"

সাথে সাথে দুজন চুপ হয়ে গেলো।
তাসিফা ব্যাগ থেকে নিজের বোতল বের করে ইয়াশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, 
-"নে, খা। এবার আর কেটকেট করিস না।"

ইয়াশ চোখ উল্টে বিড়বিড় করল, 
-"সব দোষ ইয়াশঘোষ।"

এর মাঝেই টাকলা স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। সবাই চুপচাপ নোট করা শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর ইয়াশ ফিসফিস করে বলল, 
-"গাইস, তোদের একটা গান শোনাই?"

সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ইয়াশ আমতা আমতা করে বলল, 
-"আরে প্লিজ শোন। গানটা মাথা থেকে যাচ্ছে না।"

তাসিফা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, 
-"গা, তাড়াতাড়ি।"

ইয়াশ গলা ঝেড়ে গাইল, 
-"সন্ধ্যাবেলা বেগুন ক্ষেতে করতে গেলাম চুরি... 
বেগুন ওয়ালা অমনি আমার হাতটা নিলো ধরি... 
ধইরা নিয়া ভইরা দিলো.. 
ধইরা নিয়া ভইরা দিলো বেগুন আমার থলিতে~ 
আর যাব না বেগুন তুলিতে, ও লো ললিতে 
আর যাব না বেগুন তুলিতে~ 
হাতে নাতে পড়লাম ধরা~ 
হাতে নাতে পড়লাম ধরা শরম লাগে বলিতে... 
আর যাব না বেগুন তুলিতে, ও লো ললিতে~ 
আর যাব না বেগুন তুলিতে~"

পুরো ক্লাস "থ" হয়ে গিয়েছে।তাসিফা ফিক করে হেসে দিলো। সাদ পেট চেপে ধরেছে। তাসনিমের অবস্থাও একই।  কারো খেয়াল নেই যে পুরো ক্লাস ওদের দেখছে।

হঠাৎ স্যার ধমক দিলেন, 
-"এই ছেলে মেয়েরা! ক্লাসে কেন ডিস্টার্ব করছেন? স্ট্যান্ড আপ!"

চারজনই আঁতকে উঠে দাঁড়ালো। মুখে তবুও হাসি।  সাদ তো হাসি আটকাতেই পারছে না।

স্যার এগিয়ে এসে বললেন, 
-"ক্লাস করতে না চাইলে বাইরে চলে যান। অযথা অন্যদের ডিস্টার্ব করবেন না।"

কথা শেষ হতেই সাদ আর তাসনিম ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড় দিলো।ওদের দেখে তাসিফা আর ইয়াশও ছুট লাগালো।

স্যার হতভম্ব হয়ে বিড়বিড় করলেন, 
-"বেয়াদব।"

---

চারজন করিডোরে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসছে। 
সাদ ইয়াশের পেটে ঘুষি মেরে বলল, 
-"শালার পুত, গান গাওয়ার আর সময় পেলি না?"

তাসিফা হাসি থামিয়ে বলল, 
-"এই কুত্তাটার জন্য ক্লাসের বাইরে আসতে হলো।"

তাসনিম বলল, 
-"ভাই ক্লাসে থাকলে আরও বেশি হাসতাম। তখন স্যার আরও বকতো।"

ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল, 
-"বাদ দে। চল, রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ করে আসি  সবাই।"

সাদ বলল,
-"বিল তুই দিবি?"

তাসনিম বলল,
-"আমার কাছে টাকা আছে।আমি বিল দিব ।চল।

সবাই রাজি হয়ে গেলো।

--

ভার্সিটির পাশের নিরিবিলি রেস্টুরেন্টটায় চলে এলো ভন্ডপার্টিরা।রেস্টুরেন্টের ডেকোরেশন ও মনোরম।

চারজন একটা টেবিলে বসতেই তাসিফার চোখ আটকে গেলো কোণার টেবিলে।

জুয়িন বসে আছে। পাশে একটা মেয়ে।  গোলাপি পাকিস্তানি থ্রি-পিস। কোমর ছোঁয়া চুল। দেখতে একদম জুয়িনের মতো ফর্সা।

তাসিফার বুক ধক করে উঠল। মেয়েটা কে?

ঠিক তখনই জুয়িনের চোখও তাসিফার উপর পড়ল। এক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকেই চোখ সরিয়ে নিলো।  যেন চেনেই না।

তাসিফার গলা ধরে এলো।

ভন্ডপার্টিরাও জুয়িনকে দেখতে পেলো।

তাসনিম ছোট ছোট চোখ করে বলল, 
-"কিরে, জুয়িন ভাইয়ার সাথে মেয়েটা কে?"

ইয়াশ বলল,
-জানি না তো।" 
সাদ ভ্রু কুচকে বলল
-"গার্লফ্রেন্ড না তো?"

তাসিফার চোখে পানি টলমল করছে। 

ইয়াশ কটমট করে বলল, 
-"তাসিফা, তুই কাঁদছিস কেন? এসব আলতু-ফালতু মানুষের জন্য চোখের পানি নষ্ট করিস না।"

তাসনিম তাসিফার হাত ধরে বলল, 
-"শোন, এটা হয়তো জুয়িন ভাইয়ার বোনও হতে পারে। জুয়িন ভাইয়াকে যতটুকু চিনি, আমার মনে হয় না ওনার কেউ আছে।"

সাদও মাথা নাড়ল। 

তাসিফা চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, 
-"আচ্ছা বাদ দে। খাবার অর্ডার কর। বাসায় যেতে হবে।"

ইয়াশ চার প্লেট বিফ বিরিয়ানি অর্ডার করল। 
খাওয়া শেষে ওরা বের হয়ে গেলো। জুয়িন তখনও মেয়েটার সাথে বসে আছে।

---

-"কিরে, কফি অর্ডার করলাম, কফি খাচ্ছিস না কেন?" প্রশ্ন করল জিনিয়া।

জুয়িন বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, 
-"তোর জন্য আমার সংসারে আগুন লেগে গেছে।"

জিনিয়া হতভম্ব হয়ে বলল, 
-"মানে? আমি কি করলাম?"

জুয়িন ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, 
-"তাসিফার কথা বললাম না তোকে? যাকে আমি একদমই পছন্দ করি না। সে আমাদের একসাথে দেখে ফেলেছে। নিশ্চয়ই আমাকে ভুল বুঝে একা একা কষ্ট পাচ্ছে।"

জিনিয়া হেসে বলল, 
-"তাকে বলে দিলেই তো হয় যে আমি তোর বড় বোন।"

জুয়িন আচমকা বাঁকা হাসল, 
-"এখন কিছু বলবো না। কয়েকদিন জ্বলুক নিজে।"

জিনিয়া কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, 
-"সে তোকে ভালোবাসে?"

জুয়িন ভ্রু কুঁচকালো, 
-"মুখে না বললেও ওর কাজ-কর্মে যা বুঝলাম, হয়তো বাসে।"

জিনিয়া বলল,
-"আর তুই?" 
জুয়িন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 
-"আই ডোন্ট নো।"

জিনিয়া টপিক ঘোরালো, 
-"শোন, প্লিজ রাগ ঝেড়ে ফেল। বাড়িতে ফিরে আয়। তোকে ছাড়া বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে ভাই।"

জুয়িনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, 
-"না। আমি আর যাবো না ওই বাড়িতে।"

জিনিয়া নরম গলায় বোঝালো, 
-"জুয়িন, বাবা সেদিন রাগের মাথায় 'বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা' বলেছিলো। এখন বাবা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। মা-বাবা দুজনেই তোকে ফিরিয়ে আনতে চায়। মা সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে। ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়াও করে না। শুধু তোর কথা জিজ্ঞেস করে।"

জুয়িন বোনের একটা কথাও শুনল না।নিজের  ইগোকেই প্রায়োরিটি দিলো।  কফিটা পর্যন্ত না খেয়ে বাইকের চাবি হাতে নিয়ে বলল, 
-"বাই।"  বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো।

---

তাসিফা বাসায় এসেই সোজা নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।  মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে ব্যথায়। কাঁধ থেকে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো মেঝেতে।  জামা-কাপড় না বদলেই বিছানায় গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।

চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। নাক লাল হয়ে গেছে, ঠোঁট কাঁপছে।  বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন।  বালিশটা অল্প সময়েই ভিজে গেলো।

তাসিফা মনে বিড়বিড় করল, 
"যদি ওনার গার্লফ্রেন্ডই থাকে,তাহলে আমাকে নিয়ে এত পজেসিভ কেন ছিলেন? এত রাগ, এত অধিকার, সবই নাটক ছিলো?

আর ভাবতে পারল না। হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করল। 
কাঁদতে কাঁদতে বলল, 
-"আমার ভাগ্যটা এমন কেন? যাকেই ভালোবাসি, তাকেই হারিয়ে ফেলি।"

একসময় কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে গেলো। চোখের কোণে পানি শুকিয়ে আছে।

----
সন্ধ্যা বেলায়~

আয়রা বেগম দরজার বাইরে থেকে ডাকছেন, 
-"এই তাসু! কি হয়েছে তোর? দরজা লাগিয়ে রেখেছিস কেন?"

তাসিফার ঘুম ভাঙলো মায়ের ডাকে।  বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলল, "বাল! দরজা লাগিয়েও শান্তি নেই।"
চোখ-মুখ মুছে দরজা খুলে দিলো।

আয়রা বেগম কপাল কুঁচকে তাকালেন, 
-"তুই ড্রেস চেঞ্জ করিসনি কেন? আর চোখ-মুখ ফুলে আছে কেন?"

তাসিফা মিথ্যা হাসল, 
-"এমনি। ভার্সিটি থেকে এসে টায়ার্ড লাগছিলো। তাই ড্রেস না বদলেই ঘুমিয়ে পড়ছিলাম।"

আয়রা বেগম বললেন,
-"অহ। যা, ফ্রেশ হয়ে নে। সন্ধ্যার নাস্তা বানিয়েছি। তাড়াতাড়ি আয়।"  বলেই চলে গেলেন।

তাসিফা আবার দরজা বন্ধ করে দিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল।  চোখ দুটো ফুলে আছে। নাক লাল হয়ে আছে। নিজেকে নিজেই চিনতে পারছে না সে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন