ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 18

লেখক: মিশু

---
সন্ধ্যায় ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে এলো তাসিফা। ড্রইং রুমে তার বাবা আলমগীর আলম ও মা আয়রা বেগম সোফায় বসে টিভিতে "দেব" এর অ্যাকশন মুভি দেখছেন। টিভির ভলিউম একটু জোরেই।

তাসিফা চুপচাপ গিয়ে এক কোণার সোফায় বসল। মুখটা একদম মলিন।

আলমগীর আলম মেয়ের মুখ দেখেই বুঝলেন তার মন খারাপ। তিনি টিভির রিমোট হাতে নিয়ে ভলিউম কমিয়ে বললেন, 
-"কি হয়েছে মা? মন খারাপ?"

তাসিফা ছোট করে মাথা নাড়িয়ে "হ্যা" বলল।  আলমগীর আলম হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কাছে ডাকলেন। তাসিফা বাচ্চাদের মতো বাবার বুকে গিয়ে মুখ গুঁজল। 

মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আলমগীর আলম নরম গলায় বললেন, 
-"কেন মন খারাপ আমার মায়ের? কেউ কিছু বলেছে?"

তাসিফা ফিসফিস করে বলল, 
-"জানি না।"

আয়রা বেগম চায়ে চুমুক দিয়ে হেসে বললেন, 
-"এই বয়সে মেয়েদের মুড সুইং হয়। তোমার মেয়েরও হয়তো তাই হয়েছে। টেনশন করো না।"

তাসিফা কোনো উত্তর দিলো না। শুধু বাবার বুকের উষ্ণতাটুকু অনুভব করল। এই একটা জায়গাতেই তার সব কষ্ট, সব ভয় দূর হয়ে যায়।

---

সন্ধ্যার নাস্তা শেষে তাসিফা নিজের রুমে চলে এলো। বাইরে ঝড়ো বাতাস বইছে। জানালার পর্দা উড়ছে। তাসিফা জানালার কাছে গিয়ে গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়ালো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা কিছুতেই ভালো হচ্ছে না।

হঠাৎ বিছানার উপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল।  তাসিফা গিয়ে ফোন হাতে নিলো। দেখল "আননোন নাম্বার" থেকে কল এসেছে।

ভ্রু কুঁচকে কল রিসিভ করল। 
-"আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?"

ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। শুধু নিশ্বাসের শব্দ।

তাসিফা আবার বলল, 
-"হ্যালো? কে? কথা বলছেন না কেন?"
-"......"

দুইবার জবাব না পেয়ে তাসিফার মাথা গরম হয়ে গেলো। সে রেগে বলল, 
-"বাল ফালানোর জন্য কল করছিস জানোয়ার? এক থাপ্পড় দিবো, কান ভি-টিভির মতো ঝিরঝির করবে। ফোন রাখ।"

বলেই ঠাস করে কল কেটে দিলো।

আর অন্যদিকে  তিরান মোবাইল কানে নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল।  সে শুধু তাসিফার গলার আওয়াজটা শুনতে চেয়েছিলো। কিন্তু মেয়েটার এত তেজ!  তিরান বিড়বিড় করল, "বাপরে।"

---

পরের দিন~
আজ ভার্সিটিতে আসার একদম ইচ্ছে ছিলো না তাসিফার। কিন্তু ভন্ডপার্টিরা সকাল থেকে ২০ বার কল দিয়ে জোর করে এনেছে।

ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসের উপর মাদুর পেতে বসেছে চারজন। ইয়াশ সাদের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে আর আকাশ দেখছে। তাসনিম আজ নিজ হাতে চিকেন বিরিয়ানি রান্না করে টিফিন বক্সে করে এনেছে।

ঠিক তখনই গেট দিয়ে ঢুকলো জুয়িন আর তার বন্ধুরা। জুয়িনের কাঁধে গিটার। গায়ে ধূসর রঙের পোলো টি-শার্ট, কালো ফরমাল প্যান্ট। কপালের উপর এলোমেলো চুল। হাতে চকচকে রোলেক্সের ঘড়ি। 

তাসিফা এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো।  যাকে নিজের করা যাবে না, তাকে দেখে কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কি?

জুয়িনও দূর থেকে তাসিফাকে দেখল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বন্ধুদের সাথে ক্লাসের দিকে চলে গেলো।

তাসনিম চারটা চামচ বের করে বলল, 
-"নে, সবাই ঠিক করে বস। আজ স্পেশাল বিরিয়ানি।"

ইয়াশ উঠে বসে চামচ হাতে নিয়ে বলল, 
-"এটা কি চিকেন বিরিয়ানি?"

তাসনিম গর্বের সাথে বলল, 
-"হ্যা। নিজের হাতে রান্না করেছি।"

সাদ এক চামচ  মুখে দিয়েই বলল, 
-"উফ! বাঁচালি। এই কয়েকদিন শুধু বিফ বিরিয়ানি খেয়ে মুখ পচে গেছে।"

তাসিফা খেতে খেতে বলল, 
-"দোস্ত সত্যি অনেক মজা হয়েছে। তুই এত ভালো রান্না কবে শিখলি?"

তাসনিম হাসল, 
-"আগে একদম পারতাম না। পুড়ে যেত। এখন আস্তে আস্তে প্র্যাকটিস করে শিখে গেছি। এখন বাসার সবার ফেভারিট আমার হাতের বিরিয়ানি।"

সাদ হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 
-"দোস্ত, আমার ব্রেকাপ হয়ে গেছে।"

কথা শুনে সবাই থেমে গেলো।  ইয়াশ লাফ দিয়ে উঠে বসল, 
-"মাদারবোর্ড! তোর গার্লফ্রেন্ড ছিলো? আমাদের বলিসনি কেন?"

সাদ মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, 
-"সরি। ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিবো। তার আগেই ব্রেকাপ হয়ে গেলো।"

তাসিফা না হেসে পারল না, 
-"আমাদের জানাসনি তাই আল্লাহ তোর ব্রেকাপ করিয়ে দিয়েছে ।"

তাসনিম জিজ্ঞেস করল, 
-"ব্রেকাপ কীভাবে হলো?"

সাদ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
-"অনলাইনে পরিচয়। নাম দিয়া। লং ডিস্টেন্স রিলেশন। ১ মাসও হয়নি।  গতকাল রাতে কল দিয়ে বলে 'জান, ৫০০ টাকা বিকাশ করো। এমবি কিনবো। নাহলে তোমার সাথে কথা বলবো কীভাবে?" আমিও ভালোবাসার ঠেলায় সাথে সাথে টাকা পাঠায় দিলাম।  ৫ মিনিট পর দেখি, আমাকে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, নাম্বার সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছে।"

তাসিফা আর তাসনিম একসাথে হো হো করে হেসে উঠল।  তাসনিম হেসে বলল,
-"দিয়া মেয়েটা তোকে সুন্দর করে বলদ বানিয়ে দিছে।"

ইয়াশ তখন দাঁত কেলিয়ে গান ধরল, 
-"ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে.. 
বল না এখন তুই খুঁজিস কারে? 
রাত জেগে আজ আর প্রেম হয় না.. 
বোবা ফোনটাও আজ কথা বলে না!.. 
বেইমান হয়ে গেলি স্বার্থপর।"

ইয়াশের সুরে গান শুনে তাসিফার হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে এলো। 
সাদ মুখ গোমড়া করে বলল, 
-"শালারা! ব্রেকাপের শোক পালন করতে দিবি না? সান্ত্বনা না দিয়ে গান গাইতেছিস?"

ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"আরো করো প্রেম। কপালে বাঁশ ছাড়া কিছু নাই তোমার।"

চারজনের হাসিতে ক্যাম্পাসের নিস্তব্ধ সকালটা মুহূর্তেই জমে উঠল।

-----

ভন্ডপার্টিরা মাত্র ক্লাসে এসে বসল। ঠিক তখনই ক্লাসের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন তিরান স্যার।  আর আজ তিরান স্যারকে দেখে পুরো ক্লাসের মেয়েরা "থ" হয়ে গিয়েছে।

আজ তিরান স্যারকে একটু বেশিই হ্যান্ডসাম লাগছে। গায়ে নেভি ব্লু কালারের ব্লেজার। ভেতরে ধবধবে সাদা শার্ট।নেভি ব্লু ফরমাল প্যান্ট আর হাতে কালো ঘড়ি। চুলগুলো জেল দিয়ে ব্যাকব্রাশ করা। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।

তাসনিম ফিসফিস করে তাসিফার কানে বলল, 
-"দোস্ত, স্যারকে আজ পুরা হিরোর মতো লাগতেছে। ব্লু ব্লেজারে সেই লাগতেছে।"

ইয়াশও ফিসফিস করে বলল, 
-"মামা, স্যারের গেটআপ দেখে তো ক্রাশ খাইলাম।"

তাসিফা কিছু বলল না। শুধু একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। এসব ব্যাপারে তাসিফা মাথা ঘাটাল না।

তিরান স্যার ক্লাসে ঢুকেই সবার দিকে একবার চোখ বুলালেন। চোখ যেতেই আটকে গেলো পেছনের বেঞ্চে বসা তাসিফার উপর। এক পলক তাকিয়ে থেকেই চোখ সরিয়ে নিলেন।তারপর ফাইলটা টেবিলে রেখে বললেন,
-"সবাই বই বের করুন।আজকের ক্লাসটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট।"

-----
সবাই তিরান স্যারের কথা অনুযায়ী বই বের করল। আর নোটস করতে লাগল মনোযোগ দিয়ে।

তিরান স্যার মুখে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বোর্ডে পড়া বুঝাতে লাগলেন।

হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল তাসনিমের দিকে। তাসনিম তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তিরান স্যার ভ্রু কুচকে তাকাতেই তাসনিম ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলদের মতো হেসে দিলো।

তিরান স্যার বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন আর আবার পড়া বুঝাতে লাগলেন।

---

ক্লাস শেষে ভন্ডপার্টিরা লাইব্রেরি রুমের দিকে হাটা ধরল।  লাইব্রেরি রুমে তিরান স্যার একটা চেয়ারে বসে ফাইল ঘাটাঘাটি করছেন।

আচমকা জুয়িনও লাইব্রেরি রুমে প্রবেশ করল। হাতে একটা মোটা বই।

হঠাৎ তাসিফার মাথায় শয়তানি বুদ্ধি এলো। সে নিজের বন্ধুদের চোখ টিপ মেরে তিরান স্যারের দিকে এগিয়ে গেলো।

জুয়িন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে তাসিফা আর তিরান স্যারের দিকে। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।

তাসিফা হাসিমুখে তিরানের সামনে এসে দাঁড়ালো। মিষ্টি করে বলল, 
-"স্যার কেমন আছেন?"

তিরান চোয়াল ঝুলে গেলো। ভ্রু কুচকে বলল, 
-"হুম ভালো। আপনি কেমন আছেন তাসিফা?"

তাসিফা মুখে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে বলল, 
-"জ্বী একদম বিন্দাস আছি।"

এতক্ষণ ধরে জুয়িন তাসিফা আর তিরানের কথোপকথন শুনে মাথার ভেতর আগুন জ্বলছে। হাত মুঠো করে নিল শক্ত করে।

জুয়িন বিরবির করল, 
-"তাকে জ্বালাতে চেয়েছিলাম আমি, আর অন্যদিকে সে আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।"

আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না। হন হন করে বইটা টেবিলে রেখে বেরিয়ে পড়ল লাইব্রেরি রুম থেকে।

তাসিফা আড়চোখে জুয়িনকে বেরিয়ে যেতে দেখল। আর মনে মনে কুটিল হেসে বলল "কাজ হয়েছে"।

তাসিফা তিরানের দিকে তাকিয়ে বলল, 
-"স্যার আসি। ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম।"

বলেই তাসিফা নিজের বন্ধুদের কাছে চলে এলো।

ইয়াশ ভ্রু কুচকে বলল, 
-"ব্যাপার কি? হঠাৎ তিরান স্যারের সাথে কথা বলতে গেলি যে?"

তাসিফা দাঁত কেলিয়ে হাসল, 
-"জুয়িন ভাইয়াকে জেলাস করানোর জন্য।"

তাসনিম চোখ ছোট ছোট করে বলল, 
-"গ্রেট আইডিয়া। জুয়িন ভাইয়া তো রেগে রুম থেকে বের হলো।"

সাদ দাঁত কেলিয়ে বলল, 
-"১০০% জেলাস হয়েছে।"

---

ভার্সিটি শেষে সবাই নিজেদের বাসায় চলে গেলো। তাসিফার বাসার নিচে রিক্সা এসে থামল। তাসিফা ভাড়া মিটিয়ে গেট দিয়ে ঢুকবে তখনই জুয়িনও বাইক নিয়ে গেটে ঢুকে পড়ল।

তাসিফা জুয়িনের বাইকের হর্ণ শুনে আঁতকে উঠে ভয়ে।

জুয়িন বাইক পার্ক করে আঙুলে বাইকের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে তাসিফার দিকে তাকালো। চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে।

গম্ভীর গলায় বলল, 
-"তোর তো সাহস দিন দিন অনেক বেড়ে যাচ্ছে।"

তাসিফা মুখ বেঙ্গিয়ে বলল, 
-"আপনার কি তাতে?"

জুয়িন বাঁকা হেসে তাসিফার কাছে এগিয়ে এলো, 
-"আমার কি তাতে? তোকে আমি এখানে এখন মেরে পুঁতে রাখতে পারব, সেটা তুই জানিস?"

তাসিফা ভয় পেলো না। বরং গলা উঁচু করে বলল, 
-"তো মারুন? আমি কি ধরে রেখেছি আপনাকে?"

তাসিফা যেন জুয়িনের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। 
জুয়িনের মেজাজ ভীষণ খারাপ হচ্ছে। দাতে দাত চেপে বলল, 
-"জবান ভেঙ্গে দিবো তোর। চুপ থাক।"

তাসিফার চোখে পানি টলমল করছে। এই লোক কোন অধিকারে তার সাথে এসব জোর খাটাচ্ছে?

তাসিফা আর কিছু বলল না। দ্রুত নিজের ব্যাগ বুকে চেপে সিঁড়ি দিয়ে তিন তলায় উঠে গেলো।

পেছন থেকে জুয়িন তাকিয়ে রইলো। রাগে নাক ফুলছে তার।

---
আজ সন্ধ্যা বেলা ভন্ডপার্টিরা তাসিফার বাসায় এসে হাজির। তাদের দেখে অবাক হলো তাসিফা।

ভন্ডপার্টিরা ড্রইং রুমের সোফায় এসে গা এলিয়ে দিলো। 
ইয়াশ হাপাতে হাপাতে বলল, 
-"ভাই তোদের বাসার সিড়ি গুলা এতো উঁচু উঁচু ক্যান? মনে হচ্ছে ২০ তলা সিড়ি বেয়ে আসছি।"

তাসিফা হেসে বলল, 
-"আচ্ছা তোরা একটু বোস। আমি শরবত নিয়ে আসছি তোদের জন্য।"

বলেই শরবত বানাতে চলে গেলো তাসিফা। কিছুক্ষণের ভেতরে তাসিফা তিন গ্লাস শরবত ট্রে তে করে এনে টি-টেবিলের উপর রাখল। 
তিনজন নিজেদের শরবতের গ্লাস উঠিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো।

ইয়াশ শরবতের গ্লাস টি-টেবিলে রেখে বলল, 
-"আন্টি কোথায়? উনাকে দেখছি না যে?"

তাসিফা বলল, 
-"আম্মু আর আব্বু ঘুরতে গিয়েছে। এসে পড়বে ১০ বা ১১ টার মধ্যে।"

ইয়াশ তারপর বলল, 
-"রেডি হয়ে নে। ছাদে যাবো আমরা।"

তাসিফা ভ্রু কুচকে বলল, 
-"মানে? হঠাৎ ছাদে কেন যাবো?"

সাদ দাতঁ কেলিয়ে বলল, 
-"তোর রোমিও তার বারবিকিউ পার্টিতে আমাদের এটেন্ড করতে বলেছে।"

তাসনিম বুঝিয়ে বলল, 
-"জুয়িন ভাইয়া দুপুরে ইয়াশকে কল করে জানিয়েছে যে সন্ধ্যায় ছাদে চলে আসতে সবাইকে। জুয়িন ভাইয়া ও তার বন্ধুরা বারবিকিউ পার্টি করবে।"

তাসিফা মুখ ছোট করে বলল, 
-"না। আমি যাবো না। তোরা যা।"

ইয়াশ লাফ দিয়ে উঠল। আর বলল, 
-"তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।"

তাসিফা চোখ উল্টিয়ে বলল, 
-"তো? আমি যাবো না।"

তাসনিম ভ্রু নাচিয়ে বলল, 
-"কেনো যাবি না?"

তাসিফা বলল, 
-"আমার ইচ্ছে।"

সাদ ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, 
-"তাসিফা চল। তোকে ছাড়া গেলে জুয়িন ভাইয়া আমার আর ইয়াশের পা ভেঙ্গে গলায় ঝুলায় দিবে।"

তাসনিম হেসে দিলো সাদের কথা শুনে। 
তাসিফাকে অনেক জোরাজোরি করে রাজি করাতে পেরেছে ভন্ডপার্টিরা ছাদে যাওয়ার জন্য।

তাসিফা নিজের রুমে এসে গোলাপি রঙের গোল জামা পড়ে নিলো। গলায় ওড়না জড়িয়ে নিলো।

----

সন্ধ্যার হালকা বাতাসে ছাদের ঝিকিমিকি লাইটগুলো দুলছে।  সবাই ছাদে এসে থামল। আজকের ছাদটা একদম অন্যরকম। চারপাশে রঙিন ছোট ছোট ফেইরি লাইট ঝুলানো। মাঝখানে বড় সাদা চাদর বিছিয়ে গোল করে বসার ব্যবস্থা। একপাশে টেবিলে নান রুটি, গরম পরোটা, কোল্ড ড্রিংকস আর টাটকা সালাদ সাজানো। তার পাশে কাঁচের বাটিতে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ-ধনেপাতার টক-ঝাল চাটনি।

আরেক কোণায় কয়লার বারবিকিউ গ্রিল। কয়লার ধোঁয়া আকাশে মিশছে। সাথে মাংস পোড়ার মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশ ম-ম করছে।

জুয়িনের ২ বন্ধু ব্যস্ত। রিদ হাটু গেড়ে বসে কয়লায় ফুঁ দিয়ে আগুনটা আরো জোরে জ্বালাচ্ছে। আর সিয়াম লম্বা সিকের মধ্যে মশলা মাখানো চিকেনের পিস গেঁথে গ্রিলের উপর উল্টেপাল্টে দিচ্ছে।

আর গ্রিলের একদম সামনে দাঁড়িয়ে আছে  জুয়িন।  গায়ে খয়েরী রঙের ফরমাল শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। নিচে অফ হোয়াইট কার্গো প্যান্ট আর হাতে চকচকে কালো ওয়াচ। আগুনের কমলা আলো এসে তার মুখে পড়ছে। ঘামে কপালটা চিকচিক করছে। মশলা মাখা হাতেই সে একটার পর একটা সিক গ্রিলে বসাচ্ছে। দেখতে একদম চকোলেট বয় লাগছে।

হঠাৎ জুয়িনের চোখ পড়ল ছাদের দরজার দিকে। ভন্ডপার্টিরা দাঁড়িয়ে আছে।  সে কিছু না বলে শুধু হাত দিয়ে ইশারা করল চেয়ারে গিয়ে বসতে।

সবাই টেনে টেনে চেয়ার নিয়ে গোল হয়ে বসল। বাইরে থেকে মৃদু বাতাস এসে লাইটগুলো নড়াচ্ছে।

আচমকা জুয়িনের বন্ধু সিয়াম টিপ্পনী কেটে বলল, 
-"মামা, তোর গেস্ট তো ফাইনালি আসলো। এখন বারবিকিউ জমবে।"

কথাটা শুনে তাসিফা চোখ নামিয়ে নিলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।

ইয়াশ আর সাদ একসাথে উঠে দাঁড়ালো। গিয়ে জুয়িনের সাথে কোলাকুলি আর হ্যান্ডশেক করল। 
ইয়াশ হাসতে হাসতে বলল, 
-"জুয়িন ভাই, কোনো সাহায্য লাগবে? হাত লাগাবো?"

জুয়িন গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলল, 
-"নো থেংক্স। তোমরা গিয়ে বসো। প্রায় সব হয়ে গিয়েছে।"

---

খাওয়া শেষে সবাই আবার গোল হয়ে বসল। তাসিফা একবারের জন্যও জুয়িনের দিকে তাকায়নি। কিন্তু জুয়িন আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছিল। তাসিফার অভিমানটা সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে। তাই ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ঝুলিয়ে রাখল।

সিয়াম পেটে হাত দিয়ে ঢেকুর তুলে বলল, 
-"মাম্মাহ চল পরিবেশটা আরো জমজমাট করা যাক।"

রিদ ভ্রু কুঁচকে বলল, 
-"কীভাবে?"

আচমকা ইয়াশ লাফ দিয়ে উঠল। 
-"সবাই মিলে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি? অনেক মজা হবে!"

সবাই একসাথে "হ্যা" বলে উঠল। 

ইয়াশ বলল,
-"সবাই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলাটা পারো তো?"

তাসনিম বলল,
-"আমি পারি না।খেলার নিয়মটা বলে দে।"

ইয়াশ একটা কাঁচের বোতল হাতে নিয়ে বলল, 
-"শোনো সবাই, ট্রুথ অর ডেয়ার এর নিয়ম খুব সহজ। আমি এই বোতলটা ঘোরাবো। ঘুরতে ঘুরতে বোতলের মুখটা যার সামনে এসে থামবে, তাকেই খেলতে হবে। 
তার সামনে ২টা অপশন থাকবে।ট্রুথ অর ডেয়ার।ট্রুথ নিলে, আমরা যা জিজ্ঞেস করবো তার সত্যি উত্তর দিতে হবে। মিথ্যা বলা যাবে না। ডেয়ার নিলে, আমরা যেটা করতে বলবো সেটাই করতে হবে। কোনো অজুহাত চলবে না।"

তাসনিম মাথা নেড়ে বলল, 
-"আচ্ছা বুঝেছি। শুরু কর।"

ইয়াশ মুচকি হেসে বোতলটা ঘোরালো। 
বোতলটা ঘুরতে ঘুরতে আস্তে আস্তে থামল জুয়িনের সামনে।

সাথে সাথে সবাই "হোওওও" করে চিৎকার করে উঠল।

ইয়াশ দাত কেলিয়ে বলল, 
-"ট্রুথ অর ডেয়ার জুয়িন ভাই?"

জুয়িন গলা খাঁকারি দিয়ে শান্ত গলায় বলল, 
-"ডেয়ার।"

ইয়াশ সাথে বলল, 
-"ভাইয়া একটা গান শুনান। গিটার নিয়ে।"

জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিদের দিকে তাকালো, 
-"আমার রুম থেকে গিটারটা নিয়ে আয়।"

রিদ দৌড়ে গিয়ে জুয়িনের কাঠের গিটারটা নিয়ে এলো। 
জুয়িন গিটারটা কোলে নিয়ে তারগুলোতে আঙুল ছোঁয়ালো। টুংটাং শব্দে পুরো ছাদ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে সোজা তাসিফার দিকে তাকালো। আর চোখ সরালো না।

তাসিফার অস্বস্তি লাগতে লাগল। সে চোখ নামিয়ে নখ খুটতে লাগল।

জুয়িন গিটারে সুর তুলে গাইতে শুরু করল, 

-"Nara nara nara nara naa ne..!
Jukhi teri palkon mein.. 
Mil jaaye mujhe panaah! 
Palke gire aansu bhari... 
Reh jaaye mere nishaan! 
Tute dil ki maat kar... 
Tu fikar mere humnavaa- 
Pyaar du tujhko is kadar.. 
Reh jaaye mere nishaan!.."

গান শেষ হতেই সবাই হাততালি দিলো। তাসিফার বুকের ভেতর ঝড় বইছে।

---

অনেক মজা-আড্ডার পর রাত ৯:৩০ বেজে গেলো।  সবার বাসা দূরে। কাল ভার্সিটিও আছে। তাই সবাই উঠে দাঁড়ালো।

সবাই যেতে নিতেই জুয়িন হঠাৎ তাসিফার কব্জি টেনে ধরল।  তাসিফা থমকে দাঁড়ালো। একে একে সবাই নিচে নেমে গেলো।  ছাদে এখন শুধু জুয়িন আর তাসিফা।

তাসিফা চোখ বড় বড় করে বলল, 
-"আমার হাত ধরেছেন কেন?"

জুয়িন এক টানে তাসিফাকে নিজের দিকে ঘুরালো।  তাল সামলাতে না পেরে তাসিফা সোজা জুয়িনের বুকে এসে পড়ল।

জুয়িন বাঁকা হেসে তাসিফার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো দুই আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিলো। 
তাসিফা ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই জুয়িন আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তাসিফা কাঁপা গলায় বলল, 
-"আমাকে ছা..ড়ুন।"

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে বলল, 
-"ছাড়ব না।"

-"কেন? ছাড়ুন বলছি!" 
-"তিরান স্যারের সাথে কথা বলতে না করেছিলাম না?"

তাসিফা রেগে চিৎকার করে বলল, 
-"আমি আপনার কথা কেন মানব? কে আপনি?"

জুয়িন বাঁকা হেসে বলল, 
-"আমার কথা তোকে মানতেই হবে।"

তাসিফার চোখে পানি টলমল করছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 
-"কেন মানব? আমাকে কষ্ট দিতে আপনার ভালো লাগে?"

জুয়িন ফিসফিস করে বলল, 
-"তুইও তো আমাকে কষ্ট দিয়েছিস।"

তাসিফা আর সহ্য করতে না পেরে জুয়িনের বুকে কিল-ঘুষি মারতে মারতে কেঁদে দিলো আর বলল,
-"আপনি অনেক খারাপ। আপনার গার্লফ্রেন্ড থাকা সত্বেও আমার উপর অধিকার খাটাচ্ছেন কি নিয়ে?"

জুয়িন তাসিফার দুই হাত নিজের বুকে চেপে ধরল। গভীর চোখে তাকিয়ে বলল, 
-"আমার গার্লফ্রেন্ড আছে সেটা তোকে কে বলল?"

তাসিফা ফুপিয়ে বলল, 
-"মস্করা করছেন আমার সাথে? সেদিন রেস্টুরেন্টে আপনার পাশে বসা মেয়েটা আপনার গার্লফ্রেন্ড ছিল না?"

জুয়িন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তাসিফার কান্না ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 
-"বলদ, রেস্টুরেন্টে আমার পাশে বসা মেয়েটা আমার বড় বোন ছিলো।"

কথাটা শুনে তাসিফা "থ" হয়ে গেলো। তার কান্না মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেলো। চোখের পানিতে ভেজা পাপড়িগুলো কাঁপছে। একদিনের অভিমান, রাগ, কষ্ট সব এক সেকেন্ডে গলে পানি হয়ে গেলো।

আচমকা জুয়িন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। 
হেচকা টানে তাসিফাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। খুব শক্ত করে, যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।

তাসিফার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। কি রিয়েকশন দিবে বুঝতে পারছে না। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে। শুধু বুকের মাঝে হাজারটা প্রজাপতি উড়ছে। জুয়িনের শার্টের মাঝে মিশে থাকা পারফিউমের গন্ধ আর বুকের ধুকপুক শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।

জুয়িন তাসিফার কাধে নিজের থুতনি রাখল। গম্ভীর অথচ কোমল গলায় কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, 
-"নড়িস না, এভাবেই থাক।"

তাসিফা রোবটের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। নড়ার শক্তিটুকুও নেই। লজ্জায় তার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মুচকি হাসি ঝুলে আছে। ছাদের ঝিকিমিকি লাইটের আলো এসে তাদের উপর পড়ছে। চারপাশে শুধু রাতের নিস্তব্ধতা আর দুটো মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ।

--

৩ মিনিট পর জুয়িন আস্তে করে তাসিফাকে ছেড়ে দিলো।আর গম্ভীর স্বরে বলল, 
-"অনেক রাত হয়েছে। নিজের বাসায় যা।"

তাসিফা মাথা নিচু করে ফেলল। লজ্জায় কিছু বলতে পারল না। শুধু একবার আড়চোখে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে গেলো।

পেছন থেকে জুয়িন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 18 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন