ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 19

লেখক: মিশু

____

তাসিফা নিজের বাসায় এসে দরজা লাগিয়ে দিলো। 
আজ তার মন ভীষণ ভালো। বুকের ভেতর প্রজাপতি উড়ছে। জুয়িনের কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই আর জুয়িন আজ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল।

খুশিতে সে নিজেকে সামলাতে পারছে না। লাফাতে লাফাতে গিয়ে টিভি অন করল। ইউটিউবে ঢুকে "দেব'এর |Le Paglu Dance|" গানটা ফুল ভলিউমে প্লে করে উরাধুরা নাচতে লাগল।  রুমের মাঝখানে ঘুরে ঘুরে, হাত-পা ছুড়ে নাচছে।

কিছুক্ষণ নাচানাচি করে তাসিফা হাঁপিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলো।  ঠিক তখনই দরজার কলিং বেল বেজে উঠল।

তাসিফা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। দেখল তার বাবা-মা এসেছে।  বাবার হাতে শুধু একটা পিজ্জার প্যাকেট।

আয়রা বেগম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, 
-"কোনো অসুবিধা হয়নি তো তোর? একা একা ভয় পেয়েছিলি?"

তাসিফা হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, 
-"না আম্মু। কোনো সমস্যা হয়নি।"

আলমগীর আলম পিজ্জার প্যাকেটটা তাসিফার হাতে দিয়ে বললেন, 
-"এটা খেয়ে নে মা তাড়াতাড়ি। ঠান্ডা হয়ে গেলে টেস্ট থাকবে না।"

তাসিফা বাবার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে বলল, 
-"আচ্ছা। আমি রুমে গিয়ে খাচ্ছি। তোমরা ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও।"

বলেই তাসিফা খুশি মনে নিজের রুমে চলে গেলো।

----
পরের দিন~

আজ তাসিফা ভার্সিটিতে একদম খুশিমনে এলো। কালকের কথা ভেবে বারবার লজ্জা লাগছে আবার ভালোও লাগছে।

ভার্সিটির মাঠে প্রবেশ করেই দেখল তার বন্ধুরা ঘাসের উপর গোল হয়ে বসে আছে।  তাসিফা গিয়ে তাদের মাঝে ধপ করে বসে পড়ল।

তাসিফা লাজুক হেসে বলল, 
-"জানিস গত কাল কি হয়েছে?"

সবাই একসাথে কৌতূহল নিয়ে বলল, 
-"কি হয়েছে?"

তাসিফা লজ্জায় গাল লাল করে গত কাল রাতের সব ঘটনা খুলে বলল। কীভাবে জুয়িন জড়িয়ে ধরেছিল,কি বলেছিল সব।

ইয়াশ লাফ দিয়ে উঠে বলল, 
-"বাপরে! মাম্মাহ জুয়িন ভাই তোকে জড়িয়ে ধরেছিল? সিরিয়াসলি?"

তাসিফা লজ্জায় মাথা নিচু করে "হ্যা" বলল।

তাসনিম মুচকি হেসে বলল, 
-"জুয়িন ভাই মেইবি তোকে সত্যিই পছন্দ করে রে তাসু।"

তাসিফা লজ্জা পেয়ে কিছু বলতে পারল না। শুধু ওড়নার কোণা খুটতে লাগল।

সাদ দাঁত কেলিয়ে বলল, 
-"দোস্ত জুয়িন ভাই তোকে কি দেখে পছন্দ করবে? তোর তো মাথা ভর্তি গোবর ছাড়া কিছুই নেই।"

কথাটা শুনে তাসিফার মাথায় রাগ চড়ে গেলো। 
পাশেই একটা পানির বালতি ছিলো। তাসিফা রেগে, দৌড়ে গিয়ে বালতিটা নিয়ে সাদের দিকে ছুড়ে মারতে যাবে, সাদ "ভৌ" করে দৌড় দিলো।

তাসিফাও সাদের পেছনে দৌড়াতে লাগল। 
রাগের চোটে তাসিফা বালতি ভর্তি পানিগুলো সাদের দিকে ছুড়ে দিলো।

কিন্তু সাদ সরে যাওয়ায় সব পানি গিয়ে পড়ল সোজা জুয়িনের উপর।

জুয়িন মাত্রই ভার্সিটিতে প্রবেশ করেছিল। সাদা শার্টটা পানিতে ভিজে একদম গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে। কপাল আর চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। দেখতে রাগী হলেও মারাত্মক সুন্দর লাগছে।

তাসিফা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। 
তাড়াতাড়ি বলল, 
-"সরি, সরি। আমি দেখিনি আপনাকে।"

জুয়িন রাগী চোখে তাসিফার দিকে তাকালো। 
তাসিফা ভয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, 
-"সরি বললাম তো। আমার কোনো দোষ নেই। সব দোষ সাদের।"

জুয়িন রাগী চোখে সাদের দিকে তাকালো। 
সাদ দ্রুত মাথা দুলিয়ে বলল, 
-"না ভাই, আমি কিছু করিনি।"

তাসিফা তা দেখে রেগে বলল, 
-"মিথ্যুক কোথাকার। আমাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছিস!"

সাদ দাঁত কেলিয়ে দৌড়ে পালালো।  আর এদিকে তাসিফা জুয়িনের সামনে একা দাঁড়িয়ে রইলো।

তাসিফা মাথা নিচু করে কাচুমাচু হয়ে বলল, 
-"সরি।"

জুয়িন ভ্রু কুচকে তাসিফাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 
-"তোর সরি'র মায়ের বাপ। এটার রিভেঞ্জ আমিও নিবো। নেহাৎ এখন আমার হাতে সময় নেই। ক্লাস শুরু হবে।"বলেই ভেজা শার্টেই হন হন করে ক্লাসের দিকে চলে গেলো।

তাসিফা আহাম্মকের মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। দূর থেকে ভন্ডপার্টিরা ফিসফিস করে হাসছে।

---

আজ তিরান স্যারের ক্লাস নেই। খবরটা শুনে ভন্ডপার্টিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। কারণ তিরান স্যার মানেই ভন্ডপার্টিদের জন্য আতঙ্ক।

একটা ক্লাস করেই সবাই ডিসিশন নিলো আজ আর ক্লাস করবে না। 
ইয়াশ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল, 
-"চল সবাই বসুন্ধরায় যাই। আমার আব্বু আজকে অনেকদিন পর মোটা অংকের টাকা দিছে। শপিং করবো। তোরা সবাই ও চল।"

ব্যস, আর কথা লাগে না। সবাই একসাথে "চল" বলে উঠল।

---

দুপুর ১২টা। ভন্ডপার্টিরা বসুন্ধরা সিটির বিশাল কাঁচের গেটের সামনে দাঁড়ালো। ঢাকার সবচেয়ে বড় আর জমজমাট শপিং মল এটা। ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা এসির বাতাস গায়ে লাগল। উপরে ৮ তলা পর্যন্ত কাঁচের ছাদ, মাঝখানটা ফাঁকা। প্রতিটা ফ্লোরে ঝাড়বাতির আলো আর মানুষের ভিড়।

নিচের দিকের ফ্লোর গুলাতে মেয়েদের সব কিছু। থ্রি-পিস, গোল জামা, শাড়ি, ওয়েস্টার্ন ড্রেস, ব্যাগ, জুতা, কসমেটিক্স, জুয়েলারি। আড়ং, কে-ক্রাফট, ইয়েলো, সিক্স এর বড় বড় শোরুম। মেয়েরা ওইদিক দিয়ে গেলে আর বের হতে চায় না।

আর উপরের ফ্লোর গুলাতে ছেলেদের রাজ্য। ফরমাল শার্ট, টি-শার্ট, জিন্স, জ্যাকেট, স্নিকার্স, ঘড়ি, সানগ্লাস। জেন্টল পার্ক, ক্যাটস আই, এক্সক্লুসিভ এর দোকান। সাথে মোবাইল আর গ্যাজেটের শোরুমও আছে।

একদম উপরে ৭ম ফ্লোরে বিশাল ফুড কোর্ট। KFC, Pizza Hut, Nando's, Coffee World। শপিং করে সবাই ওখানেই বসে রেস্ট নেয়। আর ৮ম ফ্লোরে সিনেমা হল আর প্লে জোন।

ইয়াশ তাসনিম ও তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল, 
-"তোদের যেটা লাগবে সেটা কিনে নে। আমি আর সাদ ৪র্থ তলায় যাচ্ছি। আমাকে কল করিস। আমি টাকা পাঠিয়ে দিবো নে।"

তাসিফা মুখ ব্যাঙ্গিয়ে বলল, 
-"ঠিক আছে।"

তাসনিম তাসিফার হাত ধরে টান দিলো, 
-"চল তাসু। আজ তুই আর আমি সেইম ডিজাইনের সুন্দর একটা ড্রেস কিনব।"

ইয়াশরা লিফটে করে উপরে চলে গেলো। 
আর তাসিফারা নেমে গেলো নিচের ফ্লোরে।

---

২ ঘন্টা পর সবাই ৭ম ফ্লোরের ফুড কোর্টে এসে দাঁড়ালো। সবার হাতে শপিং ব্যাগ। সাদের হাতে কোল্ড কফি।  ইয়াশ ৫টা টি-শার্ট আর দুইটা ব্ল্যাক জিন্স কিনেছে। সাদ শুধু একটা শার্ট কিনেছে।  তাসিফা আর তাসনিম আকাশী রঙের একটা গোল জামা নিয়েছে।

হঠাৎ ইয়াশের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে "জুয়িন ভাই"। 
ইয়াশ ঢোক গিলে কল রিসিভ করল।

ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলল,
-"কোথায় তোমরা?"

ইয়াশ ভয়ে ভয়ে বলল, 
-"ব...বসুন্ধরা সিটিতে ভাই। শপিং এ আসছি।"

জুয়িন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 
-"তাসিফাও আছে?"

ইয়াশ বলল, 
-"হ্যা ভাই।"

জুয়িন গম্ভীর স্বরে বলল, 
-"খেয়াল রেখো তাসিফার।"বলেই টুট টুট করে ফোন কেটে গেলো।

তাসনিম প্রফুল্ল হয়ে বলল, 
-"গাইস, চল আগামীকাল মেঘনা নদী থেকে ঘুরে আসি?"

সাদ আর ইয়াশ হেসে বলল, 
-"হ্যা যাওয়া যায় তো।"

তাসিফা খুশি হয়ে বলল, 
-"ভাই অনেকদিন পর তাহলে নৌকায় চড়া হবে।"

সাদ বলল, 
-"আমি লাস্ট নৌকায় চড়েছিলাম ক্লাস নাইনে থাকতে। তারপর আর ওঠা হয়নি।"

তাসিফা মুখ ছোট করে বলল, 
-"আর আমি ছোট থাকতে চড়ে ছিলাম বন্ধু।"

তো সবাই সিদ্ধান্ত নিলো আগামীকাল সবাই ঘুরতে যাবে মেঘনা নদীতে।
---

বাসায় ফিরেই তাসিফার সারা শরীর ঘামে চিপচিপ করছিল। রোদে আর ঘোরাঘুরিতে একদম ক্লান্ত লাগছে। তাই দেরি না করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।

ঠান্ডা পানির ঝাপটায় শরীরটা একটু জুড়ালো। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। হাতের ভেজা জামা-কাপড় গুলো বেলকনির রশিতে মেলে দিলো।

রুমে এসে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল। হাত-পায়ে নরম করে লোশন মাখল। মুখে হালকা ময়েশ্চারাইজার আর ঠোঁটে লিপবাম ছুঁইয়ে দিলো। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিলো।

ডাইনিং রুম থেকে তখন আয়রা বেগমের ডাক ভেসে এলো, 
-"তাসিফা, খাবার দিয়েছি। খেয়ে নে।"

তাসিফা ওড়না ঠিক করতে বলল, 
-"মা, যোহরের নামাজটা পড়ে আসি। তুমি আমার জন্য একটু অপেক্ষা করো।"

নামাজের জায়নামাজ বিছিয়ে ১২ রাকাতের জায়গায় ১০ রাকাত নামাজ আদায় করে নিলো। মনটা কেমন শান্ত শান্ত লাগছিল। নামাজ শেষে খাবার টেবিলে বসে গেলো খাবার খেতে।

---

বিকেলের রোদটা নরম হয়ে এসেছে। তাসিফা ছাদের দরজা খুলে উপরে উঠল। চারপাশে হালকা বাতাস।

ছাদে উঠেই চোখ গেলো সামনের ফ্ল্যাটের দিকে। জুয়িনের ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তাসিফা দুবার টোকা দিলো।

কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেলো। দরজায় দাঁড়ানো জুয়িন। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। গায়ে সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। এলোমেলো চুলগুলো কপালের উপর পড়ে আছে।

তাসিফাকে দেখে জুয়িন কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ একপাশে সরে দাঁড়াল। ইশারায় ভেতরে আসতে বলল।

তাসিফা পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকল। আর ঢুকেই থমকে গেলো। এত সুন্দর ফ্ল্যাট! ও ভেবেছিল ১-২ টা রুম হবে। কিন্তু এখানে চারটা রুম। ঝকঝকে ফার্নিচার, দামি শোপিস, দেয়ালে সুন্দর লাইট। পুরো ঘরটাই খুব সুন্দরভাবে  সাজানো।

জুয়িন সোজা নিজের বেডরুমে গিয়ে বসল। তাসিফাও পেছন পেছন গেলো।  ঘরটায় ঢুকতেই চোখ আটকে গেলো। বিশাল একটা বিছানা, পাশে বড় পড়ার টেবিল। টেবিলে বই-খাতা এলোমেলো, একপাশে ম্যাকবুক রাখা। সোফা, এসি, সব আছে।

তাসিফা আস্তে করে বিছানার এক কোণায় বসল। আর বসেই চমকে উঠল। এত নরম আরামদায়ক বিছানা ও জীবনেও ছোঁয়নি।

জুয়িন এতক্ষণ আড়চোখে তাসিফাকে দেখছিল। হঠাৎ মুচকি হেসে বলল, 
-"বাসা দেখা শেষ?"

তাসিফা চমকে তাকাল। আমতা আমতা করে বলল, 
-"না... মানে হ্যাঁ, শেষ।"

জুয়িন উঠে গিয়ে ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে ওর হাতে দিলো। তাসিফা ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে ফেলল। তারপর আস্তে করে বলল, 
-"থ্যাংক ইউ।"

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল। 
-"ভয় লাগছে না? একটা অপরিচিত ছেলের বাসায় একা বসে আছিস?"

তাসিফা সাহস দেখিয়ে হাসল, 
-"ভয় পাবো কেন? আমি কি ভীতু নাকি?"

জুয়িন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তারপর আস্তে আস্তে তাসিফার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। 
-"ওহ? তুই ভীতু না?"

তাসিফা জুয়িনকে এগিয়ে আসতে দেখে সত্যিই ঘাবড়ে গেলো। ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। 
-"আমার... আমার বাসায় যেতে হবে।"

জুয়িন হঠাৎ ওর হাতটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। তাসিফা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুক ধুকপুক করছে।

জুয়িন ফিসফিস করে বলল, 
-"এই না বললি তুই ভীতু না? এখন তোর সাহস কোথায় গেলো? হুম?"

তাসিফা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর দৌড়ে দরজা খুলে নিজের বাসায় চলে গেলো।

অন্যদিকে জুয়িন হো হো করে হাসতে লাগল আর বিরবির করল,
-"আমার ভীতু সোনা।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 19 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন