ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 20

লেখক: মিশু

---

রাত ১০টা বাজছে। বাইরে হালকা বাতাস আর রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো।

কলিংবেলের আওয়াজে আয়রা বেগম দরজা খুলে দিলেন। আলমগীর আলম বাহির থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরটা টেনে বাসায় ঢুকলেন। জুতা খুলেই সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলেন ফ্রেশ হতে।

--
অন্যদিকে তাসিফা নিজের রুমে পড়ছে।টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোয় সামনে বই-খাতা ছড়ানো। ও আগে আগেই চ্যাপ্টার শেষ করে রাখছে। কারণ পরীক্ষার আগের রাতে বেশি চাপ নিতে পারে না। কিন্তু তবুও আগে পড়লে রিভিশনের সময় সব নতুন লাগে। কলমের খসখস শব্দ ছাড়া রুমে আর কোনো আওয়াজ নেই।

রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম ভাতের ঘ্রাণ। আয়রা বেগম ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। আজ তেমন আয়োজন নেই। আলুর ভর্তা, পাতলা মসুরির ডাল আর কড়া করে ভাজা ডিম। সিম্পল কিন্তু ঘরের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খাবার।

কিছুক্ষণ পর আলমগীর আলম ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ এলেন। চেয়ার টেনে বসতে বসতে গলা উঁচিয়ে ডাকলেন, 
-"তাসিফা, খেতে এসো মা।"

তাসিফা বই বন্ধ করে কলমটা গুছিয়ে রাখল। তারপর আস্তে আস্তে খাবার টেবিলে এসে বসল।

তিনজন চুপচাপ খাচ্ছে। হঠাৎ আলমগীর আলম ভাত মাখতে মাখতে বললেন, 
-"তাসিফা, তোমার মিড টার্ম কবে শেষ হবে?"

তাসিফা ডাল দিয়ে ভাত মাখছিল। মুখ তুলে বলল, 
-"আগামী মাসের ৮ তারিখে শুরু হবে বাবা। আর শেষ হবে ১৫ তারিখে।"

আলমগীর আলম একটু ভেবে বললেন, 
-"মিড টার্ম শেষ হলেই তোমার বড় ফুপ্পির বাসায় যেতে হবে। উনি বারবার বলছে সবাইকে নিয়ে কয়েকদিন থাকতে। ১৭ তারিখে হাসিব আমেরিকা থেকে দেশে ফিরবে।"

তাসিফা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। 
-"হাসিব কে বাবা?"

আয়রা বেগম হেসে তাসিফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। 
-"তোর ফুপাতো ভাই। হাসিব চৌধুরী। তোর মনে নেই? তুই যখন পিচ্চি ৫ বছরের ছিলি, তখন ১৪ বছরের হাসিব ওর মামার সাথে আমেরিকায় পড়তে চলে গিয়েছিল। ১৪ বছর পর দেশে ফিরছে।"

তাসিফা মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু ছোটবেলার ঝাপসা স্মৃতিতে হাসিবের মুখটা নেই। ও শুধু বলল, 
-"১৪ বছর পর?"

আলমগীর আলম গর্ব করে বললেন, 
-"ছেলেটা ছোটবেলায় খুব ভদ্র ছিলো। লেখাপড়ায়ও ভালো। এখন নিশ্চয়ই লম্বা-চওড়া হয়ে একদম নায়কদের মতো লাগবে।"

আয়রা বেগম খিলখিল করে হেসে বললেন, 
-"নায়কদের মতোই লাগবে। ছোটবেলায়ই কি সুন্দর ছিলো ছেলেটা।"

তাসিফা খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। তারপর দৌড়ে গিয়ে বাবাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। আদুরে গলায় বলল, 
-"বাবা,কালকে বন্ধুদের সাথে মেঘনা নদীর তীরে যাবো? নৌকায় চড়বো। যাই প্লিজ?"

আলমগীর আলমের কপালে চিন্তার ভাঁজ। 
-"না মা। নদীতে রিস্ক বেশি।"

তাসিফার মুখটা সাথে সাথে ফুলে গেলো। ঠোঁট উল্টে বলল, 
-"বাবা প্লিজ। আমার সাথে ইয়াশ আছে, সাদ আছে, তাসনিম আছে। ওরা থাকতে আমার কি হবে? আমরা শুধু নদীর পাড়ে বসবো, নৌকায় একটু ঘুরবো। প্রমিস আর কিছু করবো না।"

মেয়ের আবদার ফেলতে পারলেন না আলমগীর আলম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 
-"আচ্ছা যাও। কিন্তু সাবধানে থাকবে। বেশি তিরিংবিরিং করবে না। আর সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরবে।"

তাসিফা খুশিতে বাবার গালে একটা চুমু দিয়ে টেডি স্মাইল দিলো। 
-"হ্যা বাবা। প্রমিস।"

---

বাবার মুখ থেকে অনুমতি পাওয়া মাত্রই তাসিফার মনটা খুশিতে নেচে উঠল। ও আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দৌড়ে নিজের রুমে চলে এসে বিছানায় বসে ফোন হাতে নিলো আর ভন্ডপার্টি" গ্রুপে ভিডিও কল দিলো।

রিং বাজার সাথে সাথেই একে একে সবার মুখ স্ক্রিনে ভেসে উঠল।

তাসিফার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস। ও হাসতে হাসতে বলল, 
-"দোস্তরা! গুড নিউজ! বাবার অনুমতি পেয়ে গিয়েছি। কালকে যাওয়া কনফার্ম।"

ওর কথা শুনে ওপাশ থেকে হাসির রোল পড়ে গেলো।

ইয়াশ বলল, 
-"শালী! ১৯ বছর বয়সী দামড়ি হয়ে গেলো, এখনও বাবার অনুমতি লাগে?"

তাসিফা সাথে সাথে মুখটা গম্ভীর করে ফেলল। অভিমানী গলায় বলল, 
-"তোরা তো ঢাকার পোলাপান। ছোট থেকে এখানে বড় হয়েছিস। আর আমি? আমি তো গ্রামের মেয়ে। ঢাকার কিছুই চিনি না। বাবা আমাকে একা ছাড়তে ভয় পায়। যদি রাস্তায় কিছু হয়ে যায়..."

সাদ শান্ত গলায় বলল, 
-"আরে পাগলী। আমরা থাকতে তোর ভয় কিসের? আমরা তিনজন আছি না? তোকে আমরা চোখে চোখে রাখব।"

তাসিফার মুখে আবার হাসি ফিরে এলো। ও মাথা দুলিয়ে বলল, 
-"হুম।"

তখন তাসনিম বলল, 
-"সাদ, ইয়াশ শোন। কালকে তোরা দুইজন আকাশি কালারের শার্ট বা টি-শার্ট পড়ে আসবি। আমি আর তাসিফা তো গতকাল সেইম কালারের ড্রেস কিনে রেখেছি। আগামীকাল নদীর পাড়ে গ্রুপ ফটো তুলব।"

সাদ আর ইয়াশ একসাথে "ওকে ডান" বলে সায় দিলো।
আরও কিছুক্ষণ হাসি-ঠাট্টা করে কল কেটে দিলো।
ঠিক হলো, আগামীকাল সকাল ৯টায় সবাই মেঘনা নদীর তীরে যাবে।

---

পরদিন সকাল। ঘড়িতে ৮টা বাজে। বাইরে রোদেলা সকাল।

তাসিফা আজ অনেক আগে উঠেছে। গোসল করে গতকাল কেনা আকাশি রঙের গোল জামাটা বের করল। জামাটার কাপড় নরম, গলায় আর হাতায় ছোট ছোট কাজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জামাটা পড়তেই নিজেকে অন্যরকম লাগল।

চুলগুলো আঁচড়ে ছেড়ে দিলো। ঠোঁটে হালকা লিপবাম, কপালে ছোট কালো টিপ। ব্যাগে ফোন, ওয়ালেট আর পানির বোতল নিয়ে নিলো।

আয়রা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলল, 
-"মা, আমি গেলাম। সন্ধ্যার আগে চলে আসব।"

--
বাসা থেকে বেরিয়ে বিল্ডিংয়ের নিচে এসে দাঁড়ালো তাসিফা।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দূর থেকে একটা লাল রঙের মিশুক রিক্সা আসতে দেখা গেলো। রিক্সার হুড খোলা।

রিক্সা কাছে আসতেই তাসিফার মুখে হাসি ফুটল।
সামনে সাদ বসা, গায়ে আকাশি শার্ট। পেছনে ইয়াশ, গায়ে আকাশি টি-শার্ট। আর একপাশে তাসনিম। ওর গায়েও আকাশি জামা।

রিক্সা থামতেই তাসিফা উঠে বসল। রিক্সা চলতে শুরু করল।

বাতাসে তাসিফার ওড়না উড়ছে। রাস্তার দুইপাশে গাছপালা, দোকানপাট পেরিয়ে যাচ্ছে। রিক্সার টুংটাং শব্দ আর বন্ধুদের হাসির শব্দ মিলে একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে।

---

সবাই রিক্সা থেকে নামতেই তাসিফা অবাক হয়ে গেলো।
কারণ সামনে জুয়িন ও তার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে আছে।

তাসিফা চোখ বড় বড় করে ইয়াশের দিকে তাকালো।

ইয়াশ আর সাদ কিছুই হয়নি এমন ভাব করে হেসে গিয়ে জুয়িনের সাথে কোলাকুলি করল। যেন ওরা আগেই জানতো।

তাসিফা ভ্রু কুঁচকে বলল, 
-"আপনারা এখানে?"

ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল, 
-"আমিই বলেছি আসতে। একসাথে ঘুরতে বেশি মজা হবে।"

তাসিফা রেগে মুখ ফুলিয়ে বলল, 
-"আমাকে আগে বলবি না? আমি তো কিছুই জানি না!"

জুয়িন ভ্রু নাচিয়ে বলল, 
-"তোকে আগে বললে সারপ্রাইজটা নষ্ট হয়ে যেতো না?"

তাসিফা তাসনিমের দিকে তাকালো। তাসনিমও দাঁত বের করে হাসতেছে। তাসিফা বুঝে গেলো সবাই আগে থেকেই জানতো। শুধু ও-ই জানতো না।

তাসিফা আর কিছু বলল না। উনার সাথে কথা বলা মানেই ঝগড়া করা। তাই চুপ করে গেলো।

তাসিফা আশেপাশে তাকালো। আর সাথে সাথেই ওর চোখ চকচক করে উঠল।

সামনেই বিশাল মেঘনা নদী। পানির রং ঘোলাটে নীলচে। রোদের আলো পড়ে পানিতে হাজারটা চিকচিক করছে। দূরে নদীর ওপারে আবছা গাছপালা। নদীর পাড়ে ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে নদীর ঠান্ডা সোঁদা গন্ধ। কয়েকটা পালতোলা নৌকা আর ইঞ্জিনের নৌকা পাড়ে বাঁধা। মাঝিরা হাঁকডাক করছে। আকাশে সাদা মেঘের ছায়া পানিতে পড়ে এক অদ্ভুত শান্তি লাগছে।

সবাই মিলে কয়েকটা গ্রুপ ফটো তুলে নিলো। প্রথমে শুধু ভন্ডপার্টিরা একসাথে তুলল। তারপর জুয়িনদের সাথে।

তারপর সবাই ঠিক করল নৌকা ভাড়া করবে। মাঝির সাথে কথা বলে একটা বড় ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করা হলো। নৌকাটা কাঠের, সামনে ছাউনি দেওয়া।

এক এক করে সবাই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল নৌকায়।

কিন্তু তাসিফা পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুক ধুকধুক করছে। যদি উঠতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায়? নৌকা দুলছে।

আচমকা সবাইকে অবাক করে দিয়ে জুয়িন সামনে এসে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো। ইশারায় বলল ধরতে।

তাসিফা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। আশেপাশে সবাই তাকিয়ে আছে। আর কিছু না ভেবে লজ্জা মাথায় নিয়ে ও জুয়িনের শক্ত হাতটা ধরে নৌকায় উঠে পড়ল।

নৌকায় উঠতেই মাঝি ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো। "ভটভট" শব্দ করে নৌকা পাড় ছেড়ে দিলো।

প্রথমে আস্তে আস্তে, তারপর গতি বাড়ল। নৌকার দুইপাশ দিয়ে ফেনা কেটে পানি সরে যাচ্ছে। নৌকার পেছনে সাদা ঢেউয়ের লাইন। সামনে থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে সবার চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।

---

নৌকায় উঠতেই সবার মধ্যে একটা অন্যরকম ফুরফুরে ভাব চলে এলো।

রিদ আর সিয়াম, জুয়িনের বন্ধু দুইজন, একদম ভালো ভাবে ভন্ডপার্টির সাথে মিশে গেছে। ওরা ইয়াশ আর সাদকে নিয়ে নৌকার এক কোণে বসে আড্ডা জমিয়েছে। কখনো গান ধরছে, কখনো ইয়াশকে খেপাচ্ছে। ইয়াশও কম যায় না, সবার মাথায় পানি ছিটাচ্ছে। নৌকার ভেতর হাসির রোল পড়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জুয়িন একদম চুপচাপ বসে আছে। কিন্তু ওর নেশালো চোখ দুইটা এক সেকেন্ডের জন্যও তাসিফার দিক থেকে সরছে না। তাসিফা যে আকাশি জামায় বসে বাতাসে চুল উড়াচ্ছে, সেটা ও এক দৃষ্টিতে দেখছে। মাঝে মাঝে তাসিফা হাসলে জুয়িনের ঠোঁটের কোণেও হাসি লেগে যাচ্ছে।

আর তাসিফার এসবের দিকে খেয়ালই নেই।
ও আর তাসনিম নৌকার ছাউনির নিচে বসে সেল্ফি তোলার কাজে ব্যস্ত। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে, বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলছে। মাঝে মাঝে "চিজ" বলে হেসে ফেলছে।

কিছুক্ষণ পর তাসিফা নিজের ব্যাগ থেকে ৪টা চিপসের প্যাকেট বের করল। প্যাকেটগুলো সবার মাঝখানে রেখে বলল, 
-"আমি জানতাম শুধু আমরা চারজন যাব তাই চারটা চিপসের প্যাকেট নিয়ে এসেছিলাম। এখন এগুলো ভাগ করে খেলে চলবে না?"

কথা শুনে সবাই একসাথে মাথা নেড়ে "হ্যা" বলল। ইয়াশ তো সাথে সাথে একটা প্যাকেট খুলে মুখে দিয়েও দিলো।

এই ফাঁকে জুয়িন আস্তে করে নিজের মোবাইল বের করল। ক্যামেরা অন করে চুপিসারে তাসিফার ৩-৪টা ছবি তুলে নিলো। তাসিফা তখন চিপস খেতে খেতে তাসনিমের সাথে হাসছে, ও কিছুই টের পেলো না।

নৌকা মেঘনার বুক চিরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে শুধু পানি আর আকাশ। উপরে রোদ, গায়ে বাতাস। সবার হাতে চিপস, মুখে হাসি। নৌকার ভেতরটা পুরো আড্ডা আর মজায় ভরে উঠেছে।

------

সবার শরীরে ক্লান্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় ঘোরার পর পা দুটো আর চলছে না। কিছুক্ষণ আগেই সবাই নৌকা থেকে নেমেছে। এখন বিকেল চারটা বাজছে।

নদীর পাড়ে রোদটা নরম হয়ে এসেছে। বাতাসে নদীর জলের গন্ধ। সবার মুখে হাসি থাকলেও চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।তাসিফা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে ঘুম। নৌকার একটানা দুলুনিতে মাথাটা ভার হয়ে গেছে, শরীরটাও দুর্বল লাগছে।

ইয়াশ সবার দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্বল মুখে বলল,
-"চলো, এখন আরেকটা জায়গা থেকে ঘুরে আসি সবাই। এত তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে কি করব?"

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করতে করতে বলল,
-"ভাই, তোমার কি ক্ষুধা-টুধা লাগে নাই? সকাল থেকে খালি পেটে ঘুরছি।"

ইয়াশ থতমত খেয়ে হাসল।
-"আরে খেয়ে-দেয়ে তারপর যাবো সবাই। এটার কথাই বললাম আরকি। জাস্ট প্ল্যান করতেছি।"

জুয়িন আর কথা বাড়ালো না। ওর চোখ চলে গেলো তাসিফার দিকে। মেয়েটাকে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠল। তাসিফার চোখ-মুখ একদম শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট ফ্যাকাসে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে।

রিদ আর সিয়াম ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে উঠল,
-"তোমরা এখানে সাইড করে দাঁড়াও। আমরা গিয়ে দেখছি আশেপাশে কোনো হোটেল আছে কিনা। খাওয়া দরকার।" বলেই দুজন দ্রুত পায়ে হোটেল খুঁজতে চলে গেলো।

হঠাৎ তাসিফার পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। নৌকায় চড়লে অনেকেরই এমন হয়। একে বলে মোশন সিকনেস। মাথা ঝিমঝিম করে, বুকের ভেতর মোচড় দেয়, আর গা বমি বমি করে। তাসিফা আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।ও আচমকা দৌড়ে একপাশে গিয়ে বমি করে দিলো।

মুহূর্তেই জুয়িন বিদ্যুতের বেগে ছুটে গিয়ে তাসিফার কাঁপা কাঁধ দুটো নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে ধরল। আর ইয়াশকে বলল,
-"ইয়াশ! পানির বোতলটা দেও তাড়াতাড়ি।"
কণ্ঠে অস্থিরতা মিশে আছে।

তাসিফার বমি থামলে জুয়িন নিজের হাতে বোতল থেকে পানি নিয়ে আলতো করে তাসিফার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিলো। তারপর ওর মাথাটা নিজের দিকে টেনে এনে কপালে, মাথায় পানি ঢেলে দিলো। ভেজা চুলগুলো নিজের আঙুল দিয়ে আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দিলো।

ভন্ডপার্টিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এই রাগী, গম্ভীর জুয়িনের মধ্যে যে এত মায়া লুকিয়ে আছে কেউ কখনো ভাবেনি।

তাসিফার আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। ওর চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আস্তে করে ও জুয়িনের বুকের কাছটায় মাথা এলিয়ে দিলো। জুয়িনও কিছু না বলে ওকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। যেন এই বুকটাই এখন ওর একমাত্র ভরসা।

নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ জুয়িনের পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। তাসনিম, ইয়াশ আর সাদ দ্রুত এগিয়ে এসে তাসিফাকে ধরল।

জুয়িন প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল স্ক্রিনে সিয়ামের নাম ভাসছে। ও দ্রুত কল রিসিভ করল।

-"পেয়েছিস কোনো হোটেল?" অস্থির গলায় প্রশ্ন করল জুয়িন।

ওপাশ থেকে সিয়াম বলল,
-"হ্যাঁ পেয়েছি। তোরা দু কদম হেঁটে সামনে আয়। ডান দিকে তাকালেই আমাদের দেখতে পাবি। ওখানেই একটা হোটেল আছে। তাড়াতাড়ি আয়।"

জুয়িন কিছু না বলে কল কেটে দিলো। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-"সরো।"
বলেই এক হাতে তাসিফাকে নিজের সাথে আগলে নিয়ে সিয়ামদের দেখানো পথে হাঁটতে লাগল।

---

দু কদম হাঁটতেই ছোট্ট একটা পরিষ্কার হোটেল দেখতে পেলো। সবাই ভেতরে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। তাসিফার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ও ঢকঢক করে এক বোতল ঠান্ডা পানি শেষ করে ফেলল। ওর পাশের চেয়ারটাতেই জুয়িন বসেছে। একবারও সরে বসেনি।

ওয়েটার ট্রে ভরে খাবার দিয়ে গেলো। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মাখা মাখা আলুর ভর্তা, পাতলা ডাল আর ঝাল ঝাল গরুর মাংস।

ক্ষুধার্ত সবাই প্লেট ভরে ভাত নিলো। তারপর গরম ভর্তা আর মাংসের ঝোল দিয়ে খেতে শুরু করল। ক্লান্তির পর এমন গরম খাবার পেটে পড়তেই শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এলো।

তাসিফা আস্তে আস্তে খাচ্ছে। জুয়িন বারবার ওর প্লেটে ভাত আর মাংস তুলে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে পানির বোতলটা এগিয়ে দিচ্ছে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 20 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন