ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 44

লেখক: মিশু

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

-----

জুয়িন রুমের ভেতরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে আস্তে করে লাগিয়ে দিল।

ছিটকিনির ছোট্ট শব্দটা কানে যেতেই তাসিফার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এতক্ষণ বিছানার এক কোণে বসে থাকা মেয়েটা অজান্তেই সোজা হয়ে বসল। দুহাত কোলের ওপর রেখে চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

জুয়িন ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

তাসিফার চোখ দুটোও তার প্রতিটা পদক্ষেপ অনুসরণ করছে। কী বলবে, কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। অথচ কয়েক মিনিট আগেও ছাদে নিজেকে বেশ সাহসী মনে হচ্ছিল। এখন পরিস্থিতি পুরো উল্টো।

তাসিফাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন মুরগি শেয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে।

জুয়িন কাছে এসে দাঁড়াতেই তাসিফা অকারণে বিছানার চাদরটা ঠিক করতে লাগল। একবার চোখ তুলে তাকিয়েই আবার নামিয়ে নিল।

জুয়িন ভ্রু সামান্য কুঁচকে বলল,
-“কী হয়েছে?”

তাসিফা মাথা নাড়ল।
-“কিছু না।”

জুয়িন ঠোঁট চেপে হাসি আটকাল। তারপর গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
-“তোকে এক কথা কয়বার বলতে হয়? একবারে ডাকলে শোনা যায় না?”

তাসিফা হতভম্ব হয়ে বলল,
-“আমি আবার কী করলাম?”

জুয়িন আরেকটু এগিয়ে এলো,
-“তখন ইশারায় রুমে আসতে বললাম, তুই বারণ করলি। শেষমেশ তো আসতেই হলো।”

তাসিফা চোখ নামিয়ে বলল,
-“রুমে কেন ডাকলেন?”

জুয়িন ততক্ষণে একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। দুজনের মাঝে আর দূরত্ব নেই বললেই চলে।

তাসিফা অস্পষ্ট চোখে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।

জুয়িন ধীরে হাত বাড়িয়ে তাসিফার সামনের ছোট চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিল। তারপর একটু ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
-“ছাদে কী করলি?”

তাসিফা চট করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। দুহাতে নিজের জামাটা শক্ত করে খামচে ধরল।

জুয়িন তার এই অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসল। তারপর খুব আস্তে তাসিফাকে ধরে ঘুরিয়ে দিল। তাসিফার পিঠ গিয়ে আলতো করে ছুঁল জুয়িনের বুক।

জুয়িন আলতো হাতে তার চুলগুলো ঘাড় থেকে সরিয়ে নিয়ে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দিল।

গরম নিঃশ্বাস ঘাড়ে পড়তেই তাসিফার সারা শরীর কেঁপে উঠল।

তাসিফা চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। জুয়িন ধীরে ধীরে তার ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু দিচ্ছে।

জুয়িনের হাতের স্পর্শে তাসিফা একদম নেতিয়ে পড়ল। নিজেকে সামলাতে আরো শক্ত করে জামা খামচে ধরল।

একটু পর জুয়িন মুখ সরিয়ে থুতনিটা তাসিফার ঘাড়ে রাখল।

তাসিফা কাঁপা গলায় বলল,
-"কী করছেন?"

জুয়িন কিছু বলল না। শুধু পেছন থেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তাসিফার দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অবস্থা। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা যেন জুয়িনও শুনতে পাচ্ছে।

তাসিফা ফিসফিস করে বলল,
-"আস্তে ধরুন, আমার কষ্ট হচ্ছে।"

কথাটা শুনেই জুয়িনের হাত আলগা হয়ে গেল।

তারপর তাসিফাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তাসিফা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল, তাকাতেই পারছে না।

জুয়িন তার মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"তোর ঠোঁটগুলো এত ফোলা কেন? দেখলেই একদম..."

কথাটা শেষ করার আগেই তাসিফা দ্রুত হাত বাড়িয়ে তার মুখ চেপে ধরল। এই মানুষটা সত্যি সত্যিই একদিন তাকে লজ্জায় মেরে ফেলবে।

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে ইশারা করল, মুখ থেকে হাত সরাতে। তার চোখেমুখে তখনও সেই দুষ্টু ভাবটা লেগে আছে।

তাসিফা কয়েক সেকেন্ড তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জুয়িনের ইশারাটা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নিল। মুখটা ইতোমধ্যেই লজ্জায় গরম হয়ে উঠেছে তার।

জুয়িন ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
-“কথাটা অন্তত শেষ করতে দিতি।”

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে সরু চোখে তাকাল তার দিকে। মনে হলো, এই মানুষটার লজ্জা-শরম বলে সত্যিই কিছু নেই। সে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
-"আপনার না হয় লজ্জা-শরম কিছু নেই, তবে আমার তো আছে।”

জুয়িন কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুখভরা হাসি নিয়ে সামান্য ঝুঁকে তাসিফার দিকে তাকাল। সে বলল,
-"আমার কথাতেও তুমি লজ্জা পাও?"

তাসিফা যেন আচমকাই থেমে গেল।

‘তুমি’ শব্দটা কানে যেতেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। এতক্ষণ যে মেয়েটা জুয়িনের দুষ্টুমি সামলাতে ব্যস্ত ছিল, সে হঠাৎ করেই চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

আজ প্রথম জুয়িন তাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করল। কথাটা খুব ছোট। অথচ তাসিফার কাছে যেন এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।

সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে জুয়িনের চোখের দিকে তাকাল। মনে হলো, ঠিক শুনেছে তো? নাকি লজ্জার কারণে নিজের মনেই ভুল শুনছে?

জুয়িনও এবার তার সেই থমকে যাওয়া মুখটা লক্ষ্য করল। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও স্পষ্ট হলো।
তাসিফা কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় থেকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-"আপনি আমাকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেছেন?"

জুয়িন এমন একটা ভাব করল, যেন সে কিছুই জানে না।
সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"না তো।”

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছোট করে তাকাল।
-"আপনি মিথ্যে বলছেন কেন?আমি তো স্পষ্টই শুনেছি,
আপনি আমাকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করেছেন।"

জুয়িন এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারল না। হালকা হেসে মাথা নেড়ে তাসিফার দিকে তাকাল। তারপর একটু থেমে বলল,
-“হয়তো বলেছি।”

ব্যস। এই সামান্য কথাটুকুই যেন তাসিফার পুরো মনটা ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

তার মুখে ধীরে ধীরে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। চোখের দৃষ্টি নেমে গেল মেঝের দিকে। অকারণে আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের পোশাকের ভাঁজ ঠিক করতে লাগল সে।

জুয়িন চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তাসিফার এই ছোট্ট খুশিটা তার চোখ এড়াল না। বরং মেয়েটার মুখে ফুটে ওঠা লাজুক হাসিটা দেখে তার নিজের ঠোঁটেও হাসি আরও গভীর হলো।

কিছুক্ষণ দুজনের মাঝেই নীরবতা নেমে রইল।

তাসিফা ভেবেছিল, জুয়িন হয়তো আবার কোনো কথা বলে তাকে আরও লজ্জায় ফেলবে। তাই সে চোখ তুলে তাকাল না। কিন্তু পরক্ষণেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই জুয়িন তাকে আলতো এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল।

হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তাসিফা পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

নিজেকে সামলাতে গিয়ে অজান্তেই তার হাত উঠে গেল জুয়িনের টি-শার্টের কলারের কাছে। আঙুলগুলো কাপড়টা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

তাসিফা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। জুয়িনও তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখের দুষ্টু হাসিটা যেন কিছুটা থেমে গেছে। মুহূর্তটা হঠাৎ করেই আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়ে উঠল।

তাসিফা বুঝতে পারল না কী বলবে। সে অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু জুয়িনের দৃষ্টি যেন তাকে আরও কিছুক্ষণ সেখানেই আটকে রাখল।

তাসিফা এবার নিচু গলায় বলল,
-“এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?”

জুয়িন কোনো উত্তর দিল না। সে তাসিফার ঠোঁটের দিকে তাকালো। গভীর দৃষ্টিতে। তারপর ধীরে ধীরে তাসিফার চোখের দিকে তাকালো, যেন অনুমতি চাইছে।

তাসিফা কিছু বলল না, শুধু তার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। জুয়িনের মতিগতি বুঝতেই সে অজান্তেই চোখ বন্ধ করে নিল। নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।

জুয়িন একটু একটু করে এগিয়ে গেল ঠোঁটের কাছে। এত কাছে যে দুজনের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরই জুয়িন খুব আলতো করে তাসিফার ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। নরম একটা স্পর্শ।

তাসিফা কেঁপে উঠল। অজান্তেই আরও জোরে জুয়িনের কলার চেপে ধরল, যেন পড়ে যাবে।

জুয়িনের এক হাত তখনও তাসিফার কোমরে, আলতো করে আগলে রেখেছে। আরেক হাত তার গালে, বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব সাবধানে গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে।

----

দুজন দুজনের মাঝে বিভোর হয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর জুয়িন ধীরে ধীরে তাসিফার ঠোঁট ছেড়ে দিল।

দুজনেই কপালে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দই যেন নীরবতাটা ভেঙে দিচ্ছে।

তাসিফা ধীরে ধীরে জুয়িনের বুকে মাথা গুঁজে দিল। লজ্জায় তার মুখটা তখনও গরম হয়ে আছে। সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

জুয়িনও তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে বলল,
-"পানি খাবি?"

তাসিফা মাথা নেড়ে না জানাল।

জুয়িন আর কিছু বলল না। তাসিফাকে একইভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর তাসিফা খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
-"ভালোবাসেন?"

জুয়িন নিচু গলায় বলল,
-"কাকে?"

তাসিফা একটু থেমে আরও আস্তে বলল,
-"আমাকে?"

জুয়িনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চোখ বন্ধ করে বলল,
-"বুঝিস না?"

তাসিফা মাথা না তুলেই শান্ত গলায় বলল,
-"বুঝি। তবুও আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।"

জুয়িন এবার একটু দুষ্টুমি করে বলল,
-"তুই আগে বল।"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল।
-"আমি কী বলব?"

-"ভালোবাসিস আমায়?"

তাসিফার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
-"আগে আপনি বলুন। এরপর আমি বলব।"

জুয়িনও হেসে বলল,
-"লেডিস ফার্স্ট।"

তাসিফা এবার একটু অভিমানী গলায় বলল,
-"বলুন না, প্লিজ।"

জুয়িন তার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর তাসিফাকে নিজের বুকের কাছ থেকে আলতো করে সরিয়ে সামনে দাঁড় করাল।

তাসিফা অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

জুয়িন কয়েক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ স্প্যানিশ ভাষায় বলল,
-"তে কন্সিদেরো মি আমোর, আউঙ্কে নো দিগা কে তে আমো, তে কিয়েরো মুচিসিমো।"

তাসিফা একদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা কথাও বুঝতে পারেনি। কয়েক সেকেন্ড পর ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"কী বললেন?"

জুয়িন এবার আর ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কিছু বলল না। সরাসরি তাসিফার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
-"তোমাকে আমার জান মনে করি। ভালোবাসি না বললেও, ভীষণ ভালোবাসি।"

কথাটা শুনে তাসিফা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইল জুয়িনের দিকে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল। তারপর অবিশ্বাসের সুরে বলল,
-"সত্যি?"

জুয়িন সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখ করে বলল,
-"না। মিথ্যা।"

তাসিফা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে দিল।

অন্যদিকে তাসিফার হাসির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল জুয়িন কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু গলায় বলল,
-"তুই বল এবার?"

তাসিফার হাসিটা ধীরে ধীরে লাজুক হাসিতে বদলে গেল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
-"ভালোবাসি।"

জুয়িনের মুখে সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
-"আবার বল।"

তাসিফা এবার লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। তারপর খুব আস্তে বলল,
-"ভালোবাসি..."

একটু থেমে আবার বলল,
-"ভালোবাসি..."
এরপর যেন নিজের লজ্জাটাকেই পাত্তা না দিয়ে চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠল,
-"ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি!"

কথাগুলো বলেই চোখ খুলল তাসিফা।

জুয়িনের মুখের দিকে তাকাতেই নিজের বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার। মুহূর্তেই লজ্জায় পুরো মুখ লাল হয়ে উঠল।

জুয়িন হেসে ফেলল।
-"এই যে..."

আর কিছু বলার আগেই তাসিফা দ্রুত ঘুরে দরজার দিকে ছুটল। দরজা খুলে একবারও পেছনে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই জুয়িন কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে নিজের মুখে হাত দিল। গাল দুটো সত্যিই গরম হয়ে আছে।

তাসিফা তাকে ভালোবাসে। ভাবতেই তার ঠোঁটের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠল।

নিজের অজান্তেই মাথা নিচু করে হেসে ফেলল জুয়িন।

তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে লাফ দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। পাশের একটা বালিশ টেনে নিয়ে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একবার এপাশ ফিরল। আবার ওপাশ ফিরল। তারপর বালিশের দিকে মুখ গুঁজে মৃদু হেসে উঠল।

----

তাসিফা জুয়িনের রুম থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় বসল। এতক্ষণ সবাই সোফাতেই বসে ছিল। কেউ গল্প করছিল, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টায় মেতে ছিল।

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে ঠিক করল, আজ রাতে কেউ ঘুমাবে না।

হঠাৎ ইয়াশ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
-"চলো না, সবাই মিলে এখন UNO খেলি! বাসায় UNO কার্ড আছে?"

কথাটা শুনে কয়েকজন একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই জুয়িনও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো।

ইয়াশ জুয়িনকে দেখেই যেন কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল,
-"জুয়িন ভাই, আপনার কাছে UNO কার্ড আছে?"

জুয়িন স্বাভাবিকভাবে বলল,
-"হুম, আছে। তবে রুমে। আমি নিয়ে আসছি।
এই বলে জুয়িন আবার নিজের রুমের দিকে ফিরে গেল।

ইয়াশ ততক্ষণে খেলার জন্য জায়গা ঠিক করতে শুরু করল। সোফায় বসে খেলা যাবে না বলে সে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"সবাই মেঝেতে বসো। এখানে বসেই খেলব।

সবাই সম্মতি জানাল এবং সোফা ছেড়ে মেঝেতে গোল হয়ে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই UNO কার্ড নিয়ে ফিরে এলো জুয়িন। কার্ডগুলো ইয়াশের হাতে দিয়ে সেও সবার সঙ্গে মেঝেতে বসে পড়ল।

তাসিফা তাসনিমের পাশে বসেছে। জুয়িনের দিকে তাকাতেই কেমন যেন লজ্জা লাগছে তার। তাই আপাতত খেলায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল।

ইয়াশ কার্ডগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেককে সাতটি করে কার্ড দিল। বাকি কার্ডগুলো মাঝখানে উল্টো করে রাখা হলো। সেখান থেকে একটি কার্ড তুলে খেলা শুরু হলো।

একজনের পর একজন নিজের পালা অনুযায়ী কার্ড ফেলতে লাগল। কারও কার্ড না মিললে তাকে মাঝখান থেকে একটি কার্ড তুলতে হচ্ছে। কখনো কোনো অ্যাকশন কার্ড পড়তেই কারও পালা বাদ যাচ্ছে, আবার কখনো খেলার দিক বদলে যাচ্ছে।

শুরুতে সবাই বেশ শান্তভাবেই খেলছিল। তবে কিছুক্ষণ যেতেই খেলাটা জমে উঠল। কে আগে নিজের সব কার্ড শেষ করবে, সেই প্রতিযোগিতায় একে অন্যকে হারানোর চেষ্টা করতে লাগল সবাই।

----

শেষমেশ খেলায় হারল শুধু তাসনিম। এটা হওয়ারই ছিল, কারণ এই খেলায় ও আগে থেকেই একদম কাঁচা।

খেলায় প্রথম হয়েছে জুয়িন, এরপর ইয়াশ। তারপর বাকিরা।

ইয়াশ দ্বিতীয় হয়েই পুরো ঘর মাথায় তুলে ফেলেছে। সোফার উপর দাঁড়িয়ে লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে,
-"আমি সেকেন্ড! আমি ফার্স্টের পরেই! দেখেছিস তোরা?"

আর অন্যদিকে জুয়িন একদম নির্লিপ্ত, নির্বিকার হয়ে সোফার কোণায় হেলান দিয়ে বসে আছে। মুখে কোনো হাসি নেই, কোনো উত্তেজনা নেই। যেন প্রথম হওয়াটা তার কাছে কিছুই না।

কিন্তু তার চোখ স্থির নেই। একবার গোপনে, আড়চোখে তাকালো তাসিফার দিকে।

তাসিফা তখন তাসনিমের পাশে বসে আছে। তাসনিমের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে মিটমিট করে হাসছিল।
-"আরে মন খারাপ করিস না, নেক্সট টাইম জিতবি।"

ইয়াশ হঠাৎ লাফানো থামিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। তারপর চোখ বড় বড় করে বলল,
-"ওই! এখন মাত্র রাত দেড়টা বাজছে! এখন ঘুমালে হবে নাকি? রাত তো সবে শুরু! চলো এখন সবাই টিভিতে হরর মুভি দেখি?"

প্রস্তাবটা শুনে সবাই নড়েচড়ে বসল।

জুয়িন একটু ভেবে, গালে হাত দিয়ে বলল,
-"ইন্দোনেশিয়ান দেখি? কী বলো সবাই? ওগুলোর ফিলটাই আলাদা।"

এটা শুনেই সাদ ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
-"ভাই, না না! ইন্দোনেশিয়ার হরর মুভিগুলো অনেক বেশি ভয়ংকর হয়। আগেরবার দেখে আমার জ্বর চলে এসেছিল।"

জুয়িন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
-"তাও ঠিক। ভয়ংকর বলেই তো দেখতে মজা।"

ইয়াশ, রিদ আর তাসনিম ততক্ষণে হৈচৈ লাগিয়ে দিয়েছে। ওরা ইন্দোনেশিয়ান হরর মুভিই দেখবে, এটাই ফাইনাল।

তাই কী আর করার। সবাই মিলে সোফা, মেঝে দুই জায়গায় মিলেমিশে বসে পড়ল। কেউ সোফায় পা তুলে, কেউ মেঝেতে কুশন নিয়ে। রুমের বড় লাইটটাও নিভিয়ে দেওয়া হলো।

এরপর টিভিতে ইন্দোনেশিয়ার একটি হরর মুভি চালানো হলো।

শুরুতে মুভিটা সবার কাছেই বেশ বোরিং লাগছিল। কাহিনীর শুরুটা তেমন জমছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে কাহিনী যত এগোতে লাগল, ততই যেন মুভিটা জমে উঠল।

ঘরের পরিবেশও ধীরে ধীরে বদলে গেল। মুভির ভয়ের আবহটা যেন সবাইকে ঘিরে ধরেছে।

টিভিতে তখন ভূতের একটি দৃশ্য চলছে। অন্ধকার ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে চরিত্রটি। চারপাশ নিস্তব্ধ। সবাই অপেক্ষা করছে, কখন ভূতটা সামনে আসবে। তবে এখনও ভূতটি কাউকে ভয় দেখায়নি।

হঠাৎ ইয়াশ ভীতু স্বরে বলল,
-"আমার মনে হয়, আমাদের আশেপাশে কেউ আছে।"

কথাটা শুনেই সবাই কেঁপে উঠল।

জুয়িন এবার বিরক্ত হয়ে ইয়াশের মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল,
-"কেউ নেই। শুধু শুধু ভয় দেখাবে না।"

সবাই জুয়িনের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিল।
-"হ্যাঁ।"

এরপর আবার সবাই টিভির দিকে মনোযোগ দিল।

আর ঠিক তখনই হঠাৎ ভূতটা সামনে চলে এলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।

জুয়িনের হাতে তখন রিমোট ছিল। সেও ভয়ে লাফিয়ে উঠল। ভয়ে তাড়াহুড়োয় কী করবে বুঝতে না পেরে দ্রুত চ্যানেল পরিবর্তন করে দিল।

হরর মুভির বদলে টিভির স্ক্রিনে ভেসে উঠল ডোরেমন।

মুহূর্তের মধ্যেই যেন সবার ভয় অনেকটা কমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপচাপ ডোরেমনের দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর একে অপরের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই একসঙ্গে হো হো করে হেসে দিল।

জুয়িনও রিমোটটা পাশে রেখে স্বাভাবিকভাবে ডোরেমন দেখতে শুরু করল।

এরপর সবাই আবার টিভির দিকে মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ আগেও যে ঘরটা হরর মুভির ভয়ে থমথমে হয়ে ছিল, এখন সেখানে ডোরেমনের পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াচ্ছে।

সবাই নিশ্চিন্তে ডোরেমন দেখায় মনোযোগ দিল।

#চলবে

(এই পর্বের রোমান্টিক পার্টটা লিখতে গিয়ে আমি নিজেই লজ্জায় শেষ! একবার লিখছি, একবার নিজেই লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছি,এমন অবস্থা! তার ওপর রোমান্টিক পার্ট লেখার সময় একবার আব্বু এসে আমার পাশে বসে, আরেকবার আম্মু!
দুইবারই আমি এমনভাবে উঠে গেছি, যেন জীবনে কোনোদিন ওখানে বসিইনি।  আজকের পুরো দিন-রাত মিলিয়ে এই পর্বটা লিখেছি। অবশেষে শেষ করতে পেরেছি।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 44 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন