তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
-----
সবাই নাশতা শেষ করে একে একে যে যার বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। তাসিফাও যাওয়ার আগে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় জানিয়ে দিল, সেও এবার বাসায় ফিরছে। জুয়িনও হালকা মাথা নেড়ে তাকে বিদায় জানাল।
বাসায় ফিরে তাসিফা আর দেরি করল না। নিজের রুমে ঢুকে কাবার্ড খুলে সুতির একটা আরামদায়ক জামা বের করল। জামাটা হাতে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল গোসল করতে।
অন্যদিকে জুয়িনও আর বসে থাকল না। তার বাসাটা একেবারে অগোছালো হয়ে আছে। যেখানে-সেখানে জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। তাই প্রথমেই সে ঘর গোছানোর কাজে লেগে গেল।
এক এক করে ছড়িয়ে থাকা জিনিসগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখল। সোফার কুশনগুলো ঠিক করে দিল, টেবিলের ওপরের অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলল। পুরো বাসাটা একটু পরিপাটি করে নিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল।
সব কাজ শেষ করে প্রয়োজনীয় কাপড় নিয়ে জুয়িনও ওয়াশরুমে ঢুকে গেল গোসল করতে।
গোসল শেষে রুমে ফিরে এলো সে। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে বিছানার পাশে এসে বসল।
------
তাসিফা আয়রা বেগমকে আগেই বলে দিয়েছে, আজ সে বাসায় লাঞ্চ করবে না। ইয়াশ সবাইকে ট্রিট দেবে। আয়রা বেগমও তেমন কিছু বললেন না। মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে তিনিও নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
তাসিফা গোলাপি রঙের একটা চুরিদার পরে নিল।
পোশাকটা ঠিকঠাক করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে দেখে নিল। এরপর কপালে স্টোনের ছোট্ট একটা টিপ দিল। ঠোঁটে নুড কালারের লিপস্টিক লাগিয়ে চুলগুলোও হাত দিয়ে একটু ঠিক করে নিল।
ব্যস, তৈরি তাসিফা।
অন্যদিকে জুয়িন অফহোয়াইট কালারের একটা পোলো টি-শার্টের সঙ্গে সাদা প্যান্ট পরে নিল। হাতে ঘড়িটা পরতে পরতে আয়নার দিকে একবার তাকিয়ে নিল সে। সব ঠিকঠাক দেখে ফোনটা হাতে তুলে তাসিফাকে কল করল।
তাসিফা তখন জুতা পরছিল, বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফোনের স্ক্রিনে জুয়িনের নাম ভেসে উঠতেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গেই কলটা রিসিভ করল।
-"হ্যালো।"
ওপাশ থেকে জুয়িনের কণ্ঠ ভেসে এলো,
-"বের হয়ে গেছিস?"
তাসিফা শান্ত স্বরে বলল,
-"না, এখনও বের হইনি। জুতা পরছি।"
কথাটা শুনে জুয়িনের মুখে হালকা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল। সে বলল,
-"ওহ, তাহলে ভালোই হলো। তুই আমার সাথেই চল। আমি তাহলে নিচে অপেক্ষা করছি। তুই জুতা পরে নিচে চলে আয়, তাড়াহুড়ো করিস না।"
তাসিফা এক মুহূর্ত থেমে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। যদিও জুয়িন তাকে দেখতে পাচ্ছে না, তবু স্বভাববশতই যেন তার কথার সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-"আচ্ছা, ঠিক আছে।"
বলেই কল কেটে দিল।
-------
জুয়িন বাইকের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে। এক পা মাটিতে রাখা, আর অন্য পা বাইকের পাশে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে অপেক্ষা করছে সে।
কিছুক্ষণ পর তাসিফা নিচে নামতেই জুয়িনের চোখ সেদিকে যায়। তাসিফাকে দেখামাত্রই সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
তাসিফাও তাকে দেখেই মৃদু হাসে। ধীরে ধীরে জুয়িনের দিকে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিয়ে হেসে বলে,
-"খুব সুদর্শন লাগছে আপনাকে, জুয়িন ভাইয়া।"
প্রশংসাটা শুনে জুয়িনের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। তাসিফার বলা শেষ শব্দটা কানে যেতেই তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে যায়।
‘ভাইয়া’ ডাকটা এখন আর ঠিক আগের মতো ভালো লাগে না তার।
তবু তাসিফার সামনে সেটা প্রকাশ না করে জুয়িন দুহাত বুকের কাছে গুঁজে বাঁকা হেসে বলে,
-"ভাইয়া থেকে সাইয়া হয়ে গেলাম। তাও ভাইয়া ডাকিস কেন?"
তাসিফা মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
-"মাই উইশ, হুহ।"
জুয়িন কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাসিফার এই দুষ্টুমি দেখে তার নিজেরও হাসি পাচ্ছে। তবে তাকে একটু জ্বালানোর সুযোগটাও হাতছাড়া করল না।
হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখ করে জিজ্ঞেস করে,
-"পেত্নী চিনিস?"
তাসিফা কিছু না বুঝেই বলে,
-"হ্যাঁ।"
জুয়িন এবার আরও গম্ভীর হওয়ার ভান করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তোকে আজ একদম পেত্নীর মতো লাগছে।"
কথাটা বলেই আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হেসে ফেলে জুয়িন।
তাসিফার মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। সে চোখ সরু করে জুয়িনের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে এমন একটা ভাব যে, আর একটা কথা বললেই হয়তো জুয়িনকে আজ ভালোই শিক্ষা দেওয়া হবে।
জুয়িনও তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে সেটা বুঝে যায়। হাসিটা ধীরে ধীরে থামিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে চুপ করে যায় সে।
তাসিফা ভ্রু তুলে তাকিয়ে বলল,
-"কী হলো? চুপ করে গেলেন কেন?"
জুয়িন মুখটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
-"কিছু না।"
-"কিছু না মানে?"
-"কিছু না মানে কিছু না।"
তাসিফা এবারও গরম চোখে তাকিয়ে থাকে। জুয়িন আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বাইকের ওপর উঠে বসে। তারপর পেছনে তাকিয়ে তাসিফার জন্য জায়গা করে দেয়।
তাসিফাও ধীরে ধীরে বাইকের পেছনে উঠে বসে। বসার পর নিজের ওড়নাটা ঠিক করে নেয়, যাতে চলার সময় কোনো সমস্যা না হয়। এরপর ভারসাম্য ঠিক রাখতে স্বাভাবিকভাবেই দুহাত জুয়িনের কাঁধে রাখে।
জুয়িন একবার পেছনে তাকিয়ে তাসিফা ঠিকমতো বসেছে কি না দেখে নেয়।
-"বসেছিস ঠিকমতো?"
-"হ্যাঁ।"
তাসিফা ছোট করে উত্তর দেয়।
জুয়িন আর কিছু বলে না। বাইকের হ্যান্ডেলে দুহাত রেখে সামনে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে বাইকটা স্টার্ট দেয়।
ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশের নীরবতা কেটে যায়। তাসিফা জুয়িনের কাঁধে হাত রেখেই বসে থাকে। আর জুয়িনও স্বাভাবিক গতিতে বাইক চালাতে শুরু করে। দুজনেই এবার কাচ্চি ডাইনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
-----
ভণ্ডপার্টির সবাই কাচ্চি ডাইনের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। রিদ আর সিয়ামও একটু আগেই এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
ইয়াশ চারপাশে তাকিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
-আজকের আবহাওয়াটা সুন্দর অনেক।"
তাসনিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। মনে হয় বৃষ্টি হবে।"
রিদ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
-"জুয়িন আর তাসিফা কি একসাথে আসবে?"
ইয়াশ মিচকে হেসে বলল,
-"বিয়াইত্তা কাপল ওরা। একসাথেই তো আসবে।"
কথাটা শুনে বাকিরা হেসে উঠল।
হঠাৎ সবার চোখ রাস্তার দিকে চলে গেল। দূর থেকে একটা বাইক এগিয়ে আসছে। বাইকের ওপর জুয়িন, আর তার পেছনে বসে আছে তাসিফা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জুয়িন তাদের সামনে এসে বাইকটা থামাল।
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে এক পা পিছিয়ে গিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
-"জুয়িন ভাই, আর একটু হলে তো আমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যেতাম!"
জুয়িন তাসিফাকে বাইক থেকে নামার ইশারা করে ইয়াশের দিকে তাকাল। মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
-"বাঁচিয়েই তো রেখেছি। মেরে তো আর দিইনি, ভাই।"
ইয়াশ চোখ বড় বড় করে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল।
জুয়িন আর কিছু না বলে বাইকটা পাশে পার্ক করে রাখল। তারপর বাইক থেকে নেমে তাসিফার দিকে তাকাল।
তাসিফা হেসে বলল,
-"চলো, এবার ভেতরে যাই।"
সবাই সম্মতি জানিয়ে কাচ্চি ডাইনের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সিঁড়ি দিয়ে সবাই একসঙ্গে উপরে উঠতে শুরু করল। উঠতে উঠতেই হঠাৎ তাসিফা টের পেল, তার জুতার ফিতাটা খুলে গেছে।
সামনে থাকা সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে।
তাসিফা একবার নিজের জুতার দিকে তাকাল। ফিতাটা ঠিক করে লাগানোর জন্য নিচু হতে হবে, এই চিন্তাটাই তার কাছে বেশ ঝামেলার মনে হলো। তাই সে কিছু না করে খোলা ফিতা নিয়েই হাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর হাঁটতে গিয়ে তার বেশ অসুবিধা হতে লাগল। তাই ধীরে ধীরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
এদিকে জুয়িন রিদ আর সিয়ামের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল সবার পেছনে থাকা তাসিফার দিকে।
জুয়িনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
সে কিছুক্ষণ তাসিফার হাঁটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিচে তাকিয়ে দেখল, তার জুতার ফিতা খোলা।
জুয়িন আর কিছু না বলে কথা থামিয়ে তাসিফার দিকে এগিয়ে গেল।
তাসিফার সামনে গিয়ে সে সিঁড়িতেই ঝুঁকে বসে পড়ল।
তাসিফা অবাক হয়ে নিচের দিকে তাকাল।
জুয়িন শান্ত স্বরে বলল,
-"আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।"
বলেই সে যত্ন করে তাসিফার জুতার ফিতাটা লাগিয়ে দিতে লাগল।
তাসিফা একদৃষ্টিতে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ছোট্ট কাজটাও তার কাছে যেন ভীষণ আপন মনে হলো।
ফিতাটা সুন্দর করে লাগিয়ে জুয়িন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তারপর তাসিফার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-"জুতার ফিতা খুলে গেছে, আমাকে একবার বললেই তো হতো। এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলি কেন?"
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বলল,
-"ধন্যবাদ।"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
-"তোর ধন্যবাদ তোর কাছেই রাখ।"
কথাটা বলেই জুয়িন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করল।
তাসিফা মুচকি হেসে তার পেছন পেছন যেতে লাগল।
-----
সবাই একসঙ্গে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রেস্টুরেন্টের ভেতরে তখন বেশ ভিড়, প্রায় সব টেবিলই ভর্তি। তাই খালি টেবিলের জন্য সবাইকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হলো।
কিছুক্ষণ পর অবশেষে একটি টেবিল খালি হলো। সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে টেবিলটাকে ঘিরে বসে পড়ল। সবাই বসে পড়তেই ইয়াশ টেবিলের ওপর রাখা মেনুটাটা হাতে তুলে নিল।
ইয়াশ মেনুটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ধীরে ধীরে সেটি টেবিলের ওপর রেখে দিল। কী কী খাবার নেওয়া যায়, তা নিয়ে আর ভাবল না। সবাই যেহেতু কাচ্চি খেতেই এসেছে, তাই আর দেরি না করে পাশ দিয়ে যাওয়া একজন ওয়েটারের দিকে হাত তুলে তাকে ডাকল।
ওয়েটারও ইশারা বুঝতে পেরে তাদের টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। হাতে থাকা ছোট নোটপ্যাডটা বের করে সে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জ্বি স্যার, কী অর্ডার করবেন?”
ইয়াশ একটু সোজা হয়ে বসে ওয়েটারের দিকে তাকাল।
-“সাত প্লেট কাচ্চি নিয়ে আসবেন।”
ওয়েটার মাথা নেড়ে অর্ডারটা লিখে নিল। ইয়াশ তখন একবার টেবিলের চারপাশে তাকাল। পানীয়ের অর্ডারটা দেওয়া হয়নি, তাই সবার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
-"আচ্ছা, তোমরা কে বোরহানি খাবে আর কে কোকাকোলা খাবে? সবাই বলে দাও, একসঙ্গেই অর্ডার করে দিচ্ছি।"
তাসিফা বেশি কিছু না ভেবেই বলল,
-"আমি কোকাকোলা খাব।”
তার পাশেই বসে থাকা তাসনিমও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“আমিও কোকাকোলা খাব।”
ইয়াশ হালকা করে মাথা নেড়ে এবার বাকিদের দিকে তাকাল। বাকিরা জানাল, তারা বোরহানি খাবে।
সবার কথা শোনার পর ইয়াশ আবার ওয়েটারের দিকে ফিরে বলল,
-“তাহলে দুইটা কোকাকোলা আর পাঁচটা বোরহানিও নিয়ে আসবেন।”
ওয়েটার অর্ডারটা নোটপ্যাডে লিখে নিয়ে একবার মিলিয়ে নিল। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
-“জ্বি স্যার।”
বলে সে চলে গেল।
ইয়াশও চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সবাই এবার একটু স্বস্তি পেল। নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলতে বলতে তারা খাবার আসার অপেক্ষা করতে লাগল।
------
দীর্ঘক্ষণ ধরে খাবারের অপেক্ষায় বসে থাকার পর অবশেষে তাদের অপেক্ষার অবসান হলো। ওয়েটার একে একে সবার অর্ডার করা খাবার টেবিলে পরিবেশন করতে লাগল। সবার সামনে কাচ্চির প্লেট, বোরহানির গ্লাস আর কোকাকোলার বোতল সাজিয়ে দিয়ে সে সরে গেল।
আর দেরি না করে সবাই একসঙ্গে খেতে শুরু করল।
কাচ্চি বরাবরই সবার বেশ পছন্দের। তাই খেতে বসে আর বিশেষ কোনো কথাবার্তা নেই, সবাই বেশ মন দিয়ে খাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু-একজন নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে, আবার পরক্ষণেই খাবারের দিকেই মন দিচ্ছে।
এর মাঝেই হঠাৎ তাসিফার গলায় খাবার আটকে গিয়ে সে কাশতে শুরু করল। একটানা কয়েকবার কাশতে কাশতে তার চোখে পানি চলে এলো।
তাসিফা কিছু বলার আগেই জুয়িন দ্রুত টেবিলের ওপর থাকা পানির বোতলটা হাতে তুলে নিল। বোতলের ক্যাপ খুলে পানিটা তাসিফার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"পানি খা।”
তাসিফা তাড়াতাড়ি বোতলটা হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেল। একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর বোতলটা নামিয়ে জুয়িনের দিকে তাকাল।
জুয়িন শান্ত গলায় বলল,
-“আস্তে খা। এভাবে তাড়াহুড়ো করে খেলে তো গলায় আটকে যাবেই।”
তাসিফা চুপচাপ মাথা নেড়ে আবার নিজের প্লেটের দিকে তাকাল।
এদিকে টেবিলের বাকি সবাই সরু চোখে একবার জুয়িনের দিকে, আরেকবার তাসিফার দিকে তাকাল। তাদের চোখেমুখে কেমন একটা চাপা হাসির ভাব।
জুয়িন অবশ্য সেদিকে বিশেষ পাত্তা দিল না। যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে আবার খেতে শুরু করল।
-----
খাওয়া শেষে সবাই যেন একেবারে লোড হয়ে আছে। পেট ভরে যাওয়ায় কারও আর নড়াচড়া করার ইচ্ছেটুকুও নেই। তবে জুয়িন অবশ্য পরিমাণমতোই খেয়েছে।
সাদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো বন্ধ, দেখে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে তাকে আর কিছুতেই নড়ানো যাবে না।
ইয়াশ সেটা দেখে দুষ্টুমি করে সাদের পেটে হাত রেখে বলল,
-“মামা, ট্যাংকি পূর্ণ হয়ে গেছে? আর খাবি কিছু?”
সাদ চোখ না খুলেই জবাব দিল,
-“হ্যাঁ, খাবো।”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে বলল,
-“আল্লাহ! সাদ, তোর পেটে কি হাতি আছে? এখনও জায়গা আছে?”
সাদ এবার চোখ খুলে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“থাকবে না কেন? নিচে গেলে আইসক্রিম খাওয়াবি।”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
-“তুই খাওয়াবি।”
এবার জুয়িন ভ্রু কুঁচকে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“এখানে গ্যাঞ্জাম করো না। আমি খাওয়াবো আইসক্রিম। যাও।”
জুয়িনের কথা শুনে মুহূর্তেই সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ইয়াশ খুশিতে বলে উঠল,
-“এই জন্যই আপনাকে এত ভালোবাসি, জুয়িন ভাই!”
কথাটা বলেই সে জুয়িনের দিকে চোখ টিপ দিল।
ইয়াশের কাণ্ড দেখে জুয়িনও হেসে ফেলল। বাকিরাও সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।
------
সবাই ধীরে-সুস্থে কাচ্চি ডাইন থেকে নিচে নেমে এলো। খাওয়া শেষ হওয়ার পরও সবার মুখে তৃপ্তির ছাপ। এতক্ষণ রেস্টুরেন্টের ভেতরের ব্যস্ততা আর খাবারের গন্ধে ভরা পরিবেশের পর নিচে এসে যেন একটু খোলামেলা লাগছে।
কাচ্চি ডাইনের নিচে আশপাশজুড়ে বেশ কয়েকটা ছোট-বড় দোকান। মানুষের আনাগোনাও কম নয়। তার মাঝেই রাস্তার একপাশে একটা আইসক্রিমের দোকান চোখে পড়তেই জুয়িন সেদিকে তাকাল।
সে সবাইকে এক পাশে দাঁড়াতে বলে আইসক্রিম কিনতে চলে গেল।
বাকিরা রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। জুয়িন চলে যাওয়ার পর ইয়াশ নিজের মোবাইলটা বের করল। এতক্ষণে খাওয়া-দাওয়া শেষ, সবাই একসঙ্গে আছে,
এই সুযোগে একটা ছবি না তুললে যেন তার চলবেই না।
-“এই, সবাই কাছে আসো। একটা ছবি তুলি।”
ইয়াশের ডাক শুনে সবাই একটু কাছাকাছি হয়ে দাঁড়াল। ইয়াশ মোবাইলটা সামনে তুলে ধরল তারপর হাসিমুখে একটা সেলফি তুলে নিল।
ছবি তোলার পরও মোবাইলটা হাতে নিয়েই ইয়াশ ছবিটা দেখতে লাগল। তার মুখের হাসি দেখে বোঝাই যাচ্ছে, ছবি তার বেশ পছন্দ হয়েছে।
এরপর সবাই নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তায় মেতে উঠল। আশপাশের ব্যস্ততা, দোকানগুলোর সামনে মানুষের ভিড়,সব মিলিয়ে জায়গাটা বেশ প্রাণবন্ত। হাসি-ঠাট্টার মাঝেও তাসিফার মনটা অবশ্য পুরোপুরি সেখানে নেই।
সে মাঝে মাঝেই রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে।
জুয়িন কোন দিক দিয়ে গেছে, সেই দিকেই তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে জুয়িনকে দেখা গেল। তার এক হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ। কাছে আসতেই বোঝা গেল, ব্যাগের ভেতর সাতটা আইসক্রিম।
জুয়িন কাছে এসে পলিথিনের ব্যাগটা সবার সামনে ধরতেই ইয়াশের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
সবাই ব্যাগ থেকে নিজেদের আইসক্রিম নিয়ে নিল। তাসিফাও নিজের আইসক্রিমটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে প্যাকেট খুলল। প্যাকেটটা খোলার পর ভেতরের আইসক্রিমটা বের করে নেওয়ার আগেই তার চোখে পড়ল, প্যাকেটের গায়ে সামান্য আইসক্রিম লেগে আছে।
তাসিফা এক মুহূর্তও না ভেবে প্যাকেটের গায়ে লেগে থাকা আইসক্রিমটুকু চেটে নিল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খালি প্যাকেটটা ফেলে দিল।
ঠিক সেই সময় একজন অন্ধ ভিক্ষুক ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে থাকা ছোট্ট থালাটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে করুণ গলায় বলতে শুরু করল,
-“ও বাবা, ও মা'রা, আমারে কয়ডা টাকা দাও না। আমি জন্ম থেইকাই অন্ধ। আমার মাইয়াডার বিয়া দেওনের লাইগা কয়ডা টাকা লাগবো। দাও না বাবা, আল্লায় তোমাগো ভালা করব।”
লোকটার কথা শুনে ইয়াশের চোখ যেন কপালে উঠে গেল। কয়েক মুহূর্ত অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে বড় বড় চোখ করে বলে উঠল,
-“চাচা, আপনি জন্ম থেকে অন্ধ হলে আপনার মেয়ে হলো কীভাবে?”
কথাটা শেষ হতেই সাদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার মুখ দিয়ে ফিক করে হাসি বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেও হাসিটা আর পুরোপুরি আটকাতে পারল না।
জুয়িনও এক মুহূর্তের জন্য মাথা নিচু করে ফেলল। ঠোঁট দুটো চেপে ধরে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করছে। তার চোখেমুখেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ইয়াশের প্রশ্নটা শুনে সে নিজেও বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে।
তাসিফা চোখ বড় বড় করে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের হাসিটা লুকানোর জন্য ঠোঁটের কোণে হাত চাপা দিল। আশপাশের পরিবেশটাও মুহূর্তের জন্য কেমন অদ্ভুত হয়ে গেল। ইয়াশের সরল প্রশ্ন আর সাদের চাপা হাসি মিলিয়ে পরিস্থিতিটা সামলানো কঠিন।
অন্ধ লোকটা অবশ্য ইয়াশের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত আমতা-আমতা করে দাঁড়িয়ে থেকে আবার থালাটা সামনের দিকে বাড়িয়ে বলল,
-“কয়ডা টাকা দাও না বাবা, গরিব মানুষ, মাইয়াডার বিয়া দিতে হইব।”
জুয়িন এবার নিজেকে সামলে নিল। তার মুখের হাসিটাও মিলিয়ে গেল।
লোকটা সত্যি বলছে কি না, সেটা যাচাই করার মতো পরিস্থিতি তার নেই। কথাগুলো মিথ্যা হলেও কাউকে কিছু দিলে তার নিজের তো কিছু কমে যাবে না। আর লোকটা মিথ্যা বললেও আল্লাহ তো সবই দেখছেন।
জুয়িন আর কিছু না ভেবে পকেটে হাত দিল। মানিব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে লোকটার থালায় রেখে দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
-“নিন।”
-----
সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত।
জুয়িন সবার আগেই নিজের আইসক্রিম খেয়ে শেষ করেছে। এখন সে একপাশে দাঁড়িয়ে বাকিদের দিকে তাকিয়ে আছে।
তাসিফা তখনও নিজের আইসক্রিমটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে খাচ্ছিল। হঠাৎ একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের হাতে থাকা আইসক্রিমটার দিকে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর আবার জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"খাবেন আমার থেকে?"
জুয়িন তাসিফার দিকে তাকাল। তার হাতে থাকা আইসক্রিমটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার তাসিফার মুখের দিকে তাকাল। হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
-"দে।"
তাসিফা কোনো সন্দেহ না করেই নিজের হাতে থাকা আইসক্রিমটা জুয়িনের মুখের সামনে এগিয়ে ধরল।
সে ভেবেছিল, জুয়িন হয়তো সামান্য একটু খাবে। কিন্তু জুয়িন যে এমন কাণ্ড করবে, সেটা তাসিফা ভাবতেও পারেনি।
জুয়িন একবারেই পুরো আইসক্রিমটা মুখে পুরে নিলো।
তাসিফা কয়েক মুহূর্ত চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
-"জুয়িন ভাইয়ায়ায়ায়া! আমার আইসক্রিম!"
তাসিফার চিৎকারে বাকিরাও তাদের দিকে ফিরে তাকাল।
জুয়িনের মুখে তখনও আইসক্রিম। সে নির্বিকারভাবে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
-"খাবি? আমার মুখেরটা খাবি?"
তাসিফার মুখ সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল। সে বলল,
-"ইস! না!"
জুয়িন হেসে ফেলল।
তাসিফা এবার অভিমানী গলায় বলল,
-"আমার আইসক্রিমটা পুরোটা খেয়ে ফেলেছেন! এখন আমি খাবো কী?"
জুয়িন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
-"তুই তো নিজেই খেতে দিয়েছিলি।"
-"আমি কি জানতাম আপনি পুরোটা খেয়ে ফেলবেন?"
জুয়িন এবারও কিছু বলল না। শুধু মিটমিট করে হাসতে লাগল।
তাসিফা তার দিকে তাকিয়ে আরও বিরক্ত হয়ে বলল, -"আমার আইসক্রিম বের করেন মুখ থেকে।"
তাসিফার কথা শুনে জুয়িন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মুখের আইসক্রিম বের করে দিতে বলছে! কথাটা শুনেই তার নিজের কেমন যেন বমি বমি লাগল।
সে আর কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত আইসক্রিমটা খেয়ে ফেলল।
তাসিফা হতাশ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো ধীরে ধীরে পানিতে টলমল করতে শুরু করল।
তাসিফা কিছু না বলে মুখটা ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তাসিফার এমন অবস্থা দেখে ভণ্ডপার্টির সবাই এবার তাদের দিকে এগিয়ে এলো।
ইয়াশ নিজের হাতে থাকা আইসক্রিমটা তাসিফার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-"নে, আমারটা খা। তাও কাঁদিস না।"
তাসিফা আইসক্রিমটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
-"না।"
সাদও নিজের আইসক্রিমটা এগিয়ে দিয়ে বলল, -"আমারটা নে। আমি আরেকটা কিনে নেবো।"
তাসিফা এবারও নিলো না।
-"লাগবে না।"
তাসনিম তাসিফার পাশে এসে দাঁড়িয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
-"আইসক্রিমের জন্য কান্না করছিস? পাগলি!"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তুই হাসিস না তো।"
তাসনিম হাসি চেপে বলল,
-"আচ্ছা, হাসছি না।"
কিন্তু তার মুখের হাসিটা কিছুতেই লুকানো গেল না।
এদিকে জুয়িন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাসিফার অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
তাসিফার চোখ এবার জুয়িনের ওপর পড়তেই সে আরও বিরক্ত হয়ে গেল। সে বলল,
-"আপনি আবার হাসছেন কেন?"
জুয়িন মুখ গম্ভীর করার চেষ্টা করে বলল,
-"কই? হাসছি না তো।"
-"হাসছেন!"
-"আচ্ছা, একটু হাসছি।"
তাসিফা চোখ ছোট করে তাকাল আর বলল,
-"আমার আইসক্রিম খেয়ে আবার হাসিও পাচ্ছে আপনার?"
জুয়িন এবার একটু নরম গলায় বলল,
-"আচ্ছা, এত রাগ করার কী আছে? আমি তোকে আরেকটা কিনে দেবো।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল আর বলল,
-"লাগবে না।"
-"লাগবে না?"
-"না।"
জুয়িন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"রিল্যাক্স, গাইজ। তোমাদেরটা তোমরা খাও। আমি ওকে বাসায় যাওয়ার সময় কিনে দেবো।"
এদিকে তাসিফা মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নিজের আইসক্রিমটাও ঠিকমতো খেতে পারেনি সে। এতক্ষণে তার মুড পুরোপুরি অফ হয়ে গেছে।
আর জুয়িন তাসিফার অভিমানী মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বেশ মজাই পাচ্ছে।
-----
সময় কেটে গেল। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। আকাশজুড়ে কালো মেঘ জমে আছে। ধীরে ধীরে বাতাসের গতিও বাড়তে শুরু করেছে।
এখন বিকেল পাঁচটা। ভণ্ডপার্টির সবাই নিজেদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। বিদায় জানিয়ে রিদ আর সিয়ামও যে যার গন্তব্যের পথে চলে গেছে।
সবাই চলে যাওয়ার পর জায়গাটা হঠাৎ করেই বেশ ফাঁকা লাগল।
জুয়িন ধীরে ধীরে বাইকের কাছে গিয়ে তার ওপর বসে পড়ল। এরপর একবার চারপাশে তাকিয়ে তাসিফার দিকে চোখ ফেরাল।
তাসিফা তখনও মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগের অভিমানটা এখনো কাটেনি।
জুয়িন কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর তাসিফার ফুলে থাকা মুখ দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
জুয়িনের হঠাৎ মনে হলো, আজ তাসিফার মুডটা ভালো করার জন্য তাকে একটু ঘোরানো যাক। কোথাও নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় যাওয়ার দরকার নেই। আজ শুধু বাইক নিয়ে ঘুরবে। যতক্ষণ ভালো লাগে, ততক্ষণ।
তাই সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তাসিফা, দ্রুত বাইকে উঠ।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর অভিমানী গলায় বলল,
-"আমি রিকশায় করে চলে যাব। আপনার সঙ্গে যাব না।"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
-"কেন?"
-"এমনিই।"
-"আচ্ছা।"
জুয়িন আর কিছু বলল না। বরং বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-"ভেবেছিলাম আজ তোকে রাত পর্যন্ত বাইক রাইড করাব। অনেকক্ষণ ঘুরতাম। কিন্তু তুই যেহেতু যেতে চাস না, তাহলে আমি একাই যাই।"
কথাটা বলেই জুয়িন বাইকের চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
তাসিফা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জুয়িন সত্যিই বাইক স্টার্ট দিতে যাবে, ঠিক তখনই তাসিফা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। প্রায় উড়তে উড়তেই এসে জুয়িনের পেছনে ধপ করে বসে পড়ল।
জুয়িন কিছু বলার আগেই তাসিফা তার কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল,
-"চলুন।"
জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর লুকিং গ্লাসে তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।
এই তো একটু আগেও বলছিল, তার সঙ্গে যাবে না।
জুয়িন তাসিফার এই বাচ্চামিতে হেসে মাথা নাড়ল।
-"এই তো। এতক্ষণে বুদ্ধি হয়েছে।"
তাসিফা কিছু বলল না। শুধু হাসতে হাসতে জুয়িনের কাঁধে হাত রেখেই বসে রইল।
জুয়িন বাইক স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বাইকটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
আজ কোথায় যাবে, সেটা নিয়ে তাদের কারোরই কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যও নেই। যেখানে ভালো লাগবে, সেখানেই যাবে। যতক্ষণ তাসিফার মন ভালো থাকে, ততক্ষণই চলবে।
বাহিরে তখন বাতাস বেশ জোরে বইছে। তাসিফার চুল বাতাসে উড়তে শুরু করেছে। কালো মেঘে আকাশ আরও অন্ধকার হয়ে আসছে।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ তাসিফার গালে ঠান্ডা পানির ফোঁটা এসে পড়ল।
সে চমকে আকাশের দিকে তাকাল। টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে।
প্রথমে বৃষ্টি খুব হালকা ছিল। কিন্তু বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটার সংখ্যাও বাড়তে লাগল।
তাসিফার মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল।
জুয়িনও লুকিং গ্লাসে তাসিফার মুখটা দেখতে পেল। তার হাসিটা দেখে জুয়িনের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠল।
তাসিফা এবার জুয়িনের কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর ভারসাম্য ঠিক রেখে তার কোমরের চারপাশে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
জুয়িন একটু চমকালেও কিছু বলল না। বরং লুকিং গ্লাসে আবারও তাসিফার দিকে তাকাল।
তাসিফা তখন চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ফোঁটা উপভোগ করছে। মুখে একটুকরো প্রশান্ত হাসি।
বৃষ্টির ফোঁটা ধীরে ধীরে ঘন হতে লাগল। রাস্তার চারপাশের মানুষজন যে যার মতো আশ্রয় খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেউ ছাতা খুলছে, কেউ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
আর অন্যদিকে জুয়িন বাইক থামাল না। বৃষ্টির মধ্যেই ধীরে ধীরে বাইক চালিয়ে যেতে লাগল।
তাসিফা আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল।
জুয়িন লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে বলল,
-"এত খুশি হওয়ার কী আছে?"
তাসিফা হেসেই বলল,
-"অনেকদিন পর বৃষ্টিতে ভিজছি।"
-"বৃষ্টিতে ভিজতে অনেক ভালো লাগে?"
-"হুম। অনেক।"
জুয়িন মৃদু হেসে বলল,
-"তাহলে আজ ভালো করে ভিজ।"
তাসিফা আর কিছু বলল না। শুধু জুয়িনকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টির মধ্যে বসে রইল।
বাতাসে দুজনের চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পোশাক ধীরে ধীরে ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তার চারপাশও ঝাপসা হয়ে এসেছে।
তবুও তাদের কারোরই সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
-----
টানা তিন ঘণ্টা ধরে জুয়িনের সঙ্গে বাইকে চড়ছে তাসিফা।
বৃষ্টি এখনও থামেনি। কখনো একটু জোরে, আবার কখনো গুঁড়িগুঁড়ি করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তাঘাট বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে বাইকের চাকার ছিটকে দেওয়া পানির শব্দও শোনা যাচ্ছে।
তিন ঘণ্টা ধরে বাইকে বসে থাকলেও তাসিফার অবশ্য এতে কোনো বিরক্তি নেই। বরং জুয়িনের পেছনে বসে বৃষ্টিভেজা রাস্তা দেখতে দেখতে কখন যে এতটা সময় কেটে গেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
কিছুক্ষণ পর সামনে একটা ছোট্ট টং দোকান চোখে পড়ল।
জুয়িন বাইকের গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে দোকানটার সামনে দাঁড় করাল। বাইক থামিয়ে সে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর পেছনে ফিরে তাসিফার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-"চা খাবি?"
তাসিফা এক মুহূর্তও ভাবল না। মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানিয়ে দিল।
বৃষ্টির সময় গরম চা খাওয়ার মধ্যে যেন আলাদা একটা আনন্দ আছে। বিশেষ করে এমন বৃষ্টিভেজা রাস্তায় কয়েক ঘণ্টা বাইকে ঘোরার পর এক কাপ গরম চা বেশ ভালোই লাগবে।
জুয়িন কিছু বলার আগেই তাসিফা ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল।
জুয়িনও বাইকটা দোকানের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখল। এরপর তাসিফাকে নিয়ে টং দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল।
দোকানটা খুব একটা বড় নয়। টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটা জায়গা। ভেতরে দুটো কাঠের বেঞ্চ রাখা। একপাশে চুলার ওপর কেটলি বসানো, আর তার পাশেই কয়েকটা কাচের ছোট কাপ সাজিয়ে রাখা।
বাইরে তখনও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।
জুয়িন আর তাসিফা পাশাপাশি একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
জুয়িন দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"দু-কাপ চা দেন।"
দোকানদার মাথা নেড়ে চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
তাসিফা চুপচাপ বসে ছিল। কয়েক ঘণ্টা ধরে বাইকে থাকার পরও তার মধ্যে অস্থিরতা নেই। বরং এই ছোট্ট দোকান, বৃষ্টির শব্দ আর পাশে বসে থাকা জুয়িন, সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটাকে তার বেশ ভালো লাগছিল।
হঠাৎ করেই তাসিফা একটু নড়েচড়ে জুয়িনের কাছাকাছি হলো। তারপর আচমকাই জুয়িনের কাঁধে নিজের মাথাটা রেখে দিল।
জুয়িন একটু অবাক হয়ে তাসিফার দিকে তাকাল।
তাসিফা অবশ্য সেদিকে কোনো খেয়ালই করল না। ধীরে ধীরে জুয়িনের হাতটা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
জুয়িন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-"কী হয়েছে?"
তাসিফা চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু স্বরে বলল,
-"উঁহু, কিছু না।"
জুয়িন আর কিছু বলল না।
তাসিফার মাথাটা তার কাঁধেই রাখা রইল। জুয়িনও তাকে সরিয়ে দিল না। শুধু সামনে তাকিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির শব্দের মাঝেই তাসিফা হঠাৎ বলল,
-"আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো।"
জুয়িন তাসিফার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"কী কথা বলব?"
তাসিফা চোখ খুলে জুয়িনের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
-"আপনি আমাকে কবে থেকে ভালোবাসেন?"
প্রশ্নটা শুনে জুয়িন সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিল না।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তাসিফাও অপেক্ষা করতে লাগল তার উত্তরের জন্য।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। কিন্তু জুয়িনের মুখে কোনো কথা নেই।
তাসিফা এবার একটু আগ্রহ নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
-"বলুন না।"
জুয়িন এবার তার দিকে তাকাল।
কণ্ঠে কোনো বিশেষ ভাব না এনে বলল,
-"জানি না।"
তাসিফার মুখের হাসিটা সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল।
এটা কেমন কথা? ভালোবাসে, অথচ কবে থেকে ভালোবাসে সেটাই জানে না!
তাসিফার মুখটা একটু মলিন হয়ে গেল। সে জুয়িনের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল না ঠিকই, তবে আগের মতো শক্ত করে জড়িয়ে রাখলও না।
জুয়িন তাসিফার মুখের পরিবর্তনটা লক্ষ্য করল। তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
-"তবে..."
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
জুয়িন কথাটা বলে একটু থামল। তারপর ধীর স্বরে বলল,
-"তোর চোখজোড়া যখন প্রথম দেখেছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল, এই চোখজোড়ার দ্বারাই আমি একদিন মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হব।"
কথাটা শুনে তাসিফা যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল।
জুয়িনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
এই কথার ভেতরে ঠিক কতটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে, সেটা হয়তো পুরোপুরি বোঝার মতো শব্দ তার কাছে নেই। কিন্তু এটুকু সে বুঝতে পারল, জুয়িনের কাছে তার চোখ দুটো প্রথম থেকেই আলাদা কিছু ছিল।
বৃষ্টির শব্দের মাঝেও দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো।
এরই মধ্যে দোকানদার দুজনের সামনে দু-কাপ চা এনে রাখলেন।
ছোট কাচের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। গরম চায়ের মিষ্টি গন্ধটাও বৃষ্টিভেজা বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
দোকানদার কাপ দুটো রেখে বললেন,
-"এই নেন।"
জুয়িন মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানাল।
দোকানদার আবার নিজের কাজে ফিরে গেলেন।
তাসিফা ধীরে ধীরে জুয়িনের হাত ছেড়ে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল। কাপের গরমটা হাতের তালুতে লাগতেই সে একবার ফুঁ দিয়ে চায়ে ছোট্ট একটা চুমুক দিল।
জুয়িনও নিজের চায়ের কাপে মন দিল। দুজনের মাঝে আবার নেমে এলো নীরবতা। কেউ আর কোনো কথা বলল না।
শুধু দুজনের হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, আর সামনে অবিরাম পড়ে চলা বৃষ্টি।
টিনের ছাউনিতে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ একটানা বাজতে থাকল।
তাসিফা চায়ে চুমুক দিতে দিতে একবার আড়চোখে জুয়িনের দিকে তাকাল।
জুয়িন তখনও চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
তাসিফা কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকল।
#চলবে
[বিশাল বড় একটা পর্ব দিয়েছি আজ! এবার কিন্তু ছোট ছোট কমেন্ট করলে চলবে না, এত বড় পর্বের বিনিময়ে বড় বড় কমেন্ট চাই! কে কতটা উপভোগ করেছো, কোন অংশটা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, সবকিছু খুলে বলবে। বড় বড় কমেন্ট চাই কিন্তু!]