#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
----
ধীরে ধীরে আবার বৃষ্টি বাড়তে শুরু করল। দুজনের চা খাওয়াও শেষ।
জুয়িন চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে দোকানদারকে বিল মিটিয়ে দিল। এরপর তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফা বেঞ্চে বসে আছে।
জুয়িন মৃদু স্বরে তাসিফাকে বলল,
-"এখন তাহলে বাসায় ফেরা যাক?"
তাসিফা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-"হ্যাঁ।"
এরপর সে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। জুয়িনও আর দেরি করল না। দুজন বাইকের কাছে এগিয়ে গেল। এরপর বাইকে উঠে বসল।
বাইকে বসতেই তাসিফা জুয়িনের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর নিজের মাথাটা আলতো করে তার পিঠে এলিয়ে দিল। জুয়িন একবার পেছন ফিরে তার দিকে তাকাল। তাসিফার এমনভাবে জড়িয়ে ধরায় তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
তবে সে কিছু বলল না। শুধু সামনের দিকে ফিরে বাইক স্টার্ট দিল।
এই বৃষ্টির মধ্যেই জুয়িন বাইক চালিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তাসিফাও আগের মতো তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।
----
কিছুটা দূর যেতেই একটা আইসক্রিমের দোকান দেখতে পেল জুয়িন। বাইকের গতি কমিয়ে রাস্তার পাশে থামল সে। এরপর তাসিফাকে নামতে বলে নিজেও বাইক থেকে নেমে পড়ল।
তাসিফা বাইক থেকে নেমে চারপাশে একবার তাকাল। তারপর জুয়িনের দিকে ফিরে কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-"হঠাৎ এখানে নামতে হলো কেন?"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির আভাস ফুটিয়ে বলল,
-"একটু পরেই দেখতে পাবি।"
কথাটা বলেই তাসিফার হাত ধরে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
দোকানের ভেতরে ঢুকেই জুয়িন কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল। এরপর দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"আপনাদের দোকানে যত রকমের আইসক্রিম আছে, সব প্যাক করে দিন।"
কথাটা শুনে তাসিফার চোখ রীতিমতো কপালে উঠে গেল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে একবার জুয়িনের দিকে তাকাল, তারপর তাড়াতাড়ি তার হাতটা চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
-"পাগল হয়ে গেছেন আপনি? এত আইসক্রিম কে খাবে?"
জুয়িন যেন এমন প্রশ্নের জন্যই অপেক্ষা করছিল। একবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
-"আর কে খাবে? তুই খাবি।"
তাসিফা হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা যে সত্যিই এমন কিছু করতে পারে, সেটা তার ধারণারও বাইরে ছিল। সে বলল,
-"আমাকে কী রাক্ষস মনে হয় আপনার কাছে? এতগুলো আইসক্রিম কি একটা মানুষ খেতে পারে? আমার লাগবে না কোনো আইসক্রিম।"
জুয়িন এবার চোখ সরু করে তার দিকে তাকাল আর বলল,
-"বেশি কথা বলিস না। তোর আইসক্রিমটা তো আমি খেয়ে ফেলেছিলাম। আর তোর যে আইসক্রিম ভীষণ পছন্দ, সেটাও আমার জানা আছে।"
তাসিফা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে অসহায় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বোঝানোর সুরে বলল,
-"আইসক্রিম আমার পছন্দ, সেটা ঠিক আছে। তাই বলে দোকানের সব আইসক্রিম কিনে ফেলতে হবে? শুধু শুধু এত টাকা অপচয় করার কী দরকার?"
জুয়িনের মুখের অভিব্যক্তিতে অবশ্য কোনো পরিবর্তন হলো না। সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-"তোর পেছনে খরচ করলে আমার টাকা অপচয় হবে না। এখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।"
কথাটা বলে সে আবার দোকানদারের দিকে মনোযোগ দিল।
তাসিফা মুখ খুলেও আর কিছু বলতে পারল না। লোকটার সঙ্গে তর্ক করে যে বিশেষ কোনো লাভ হবে না, সেটা সে বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে। তবু এতগুলো আইসক্রিম কেনার বিষয়টা তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানদার বিভিন্ন স্বাদের আইসক্রিম দুইটি পলিথিনের ব্যাগে ভরে কাউন্টারের ওপর রাখল। এরপর ব্যাগ দুটো জুয়িনের দিকে এগিয়ে দিল।
জুয়িন ব্যাগ দুটো হাতে নিয়ে তাসিফার দিকে বাড়িয়ে দিল।
-"নে, ধর।"
তাসিফা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ব্যাগ দুটো হাতে নিল। ব্যাগের ভেতরে থাকা আইসক্রিমগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মুখটা আরও মলিন হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, লোকটার মাথায় যে কী চলে, সেটা বোঝা সত্যিই মুশকিল।
এদিকে জুয়িন নিজের মানিব্যাগ বের করে আইসক্রিমের পুরো দাম মিটিয়ে দিল। এরপর দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাসিফাকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
তাসিফা তখনও ব্যাগ দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে। জুয়িন বাইকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে বলল,
-"আপনি সব সময় বাড়াবাড়ি করেন।"
কথাটা শুনে জুয়িন তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফার বিরক্ত মুখটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে শুধু বলল,
-"আচ্ছা।"
তাসিফা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণ ধরে এত কিছু বলার পরও লোকটার মুখে শুধু একটা ‘আচ্ছা’! যেন সে খুব স্বাভাবিক কোনো কথা বলেছে।
-"আচ্ছা মানে কী? আমি যে বলছি, আপনি বাড়াবাড়ি করেন, সেটা বুঝতে পারছেন?"
জুয়িন এবার হালকা হেসে বলল,
-"হুম, বুঝতে পারছি।"
-"তাহলে?"
-"তাহলে আবার কী?"
তাসিফা বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই লোকটার সঙ্গে কথা বলাই বৃথা! সে আর কিছু না বলে আইসক্রিমের ব্যাগ দুটো সাবধানে ধরে বাইকের পেছনে গিয়ে বসল।
জুয়িনও বাইকে উঠে বসল। এরপর পেছনে ফিরে একবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"ব্যাগ দুটো ভালো করে ধরে রাখিস। পড়ে গেলে কিন্তু আবার কিনে দেব।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল আর বলল,
-"আবার কিনে দিবেন মানে? আর একটাও কিনবেন না আপনি।"
জুয়িন মৃদু হেসে বাইক স্টার্ট দিল আর বলল,
-"দেখি।"
তাসিফা মনে মনে বিড়বিড় করল। লোকটার সঙ্গে কথায় পারা সত্যিই অসম্ভব।
বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তার ওপর এগিয়ে চলল। তাসিফা এক হাতে ব্যাগ দুটো সামলে অন্য হাতে জুয়িনের কাঁধ আঁকড়ে ধরল।
আর বাইক চালাতে চালাতে জুয়িনের ঠোঁটের কোণে লেগে রইল মৃদু হাসি। তাসিফার ছোট ছোট আবদার, অভিমান আর পছন্দ-অপছন্দগুলো যে তার কাছে কতটা মূল্যবান, তা মুখে বলে বোঝানোর মানুষ সে নয়। বরং নিজের মতো করেই তাসিফাকে বুঝিয়ে দিতে ভালোবাসে, মেয়েটা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
----
কিছুক্ষণ আগেই দুজন নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছে।
তাসিফা নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে কলিং বেল চাপল। বৃষ্টির পানিতে পুরোপুরি ভিজে চুপসে গেছে সে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে, আর পরনের পোশাকটাও শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে তার এমন অবস্থা হয়েছে যে, নিজেকে দেখলে এখন তার নিজেরই হাসি পাবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আয়রা বেগম দরজা খুলে দিলেন। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি একটু অবাক হলেন। তাসিফার ভেজা চুল আর পোশাকের দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
-“এ কী অবস্থা করেছিস নিজের? তাড়াতাড়ি ভেতরে আয়।”
তাসিফা কোনো কথা না বলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। হাতে থাকা পলিথিনের ব্যাগ দুটো নিয়ে ফ্রিজের কাছে গেল। এরপর ব্যাগ দুটো ফ্রিজে রেখে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
আয়রা বেগম ততক্ষণে মেয়ের কাছে এগিয়ে এসেছেন। তাসিফার এমন ভেজা অবস্থা দেখে তিনি চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-“বৃষ্টিতে ভিজেছিস কেন? আর এত রাত হলো কীভাবে?”
প্রশ্ন দুটো শুনে তাসিফা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে কী উত্তর দেবে, তা মনে মনে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। সত্যিটা বলা সম্ভব নয়, তাই স্বাভাবিক একটা উত্তরই দিতে হবে তাকে।
তাসিফা ঢোক গিলে মায়ের দিকে তাকাল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,
-"আসলে মা, দুপুরে লাঞ্চ শেষ করে সবাই একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেছে।”
কথাটা বলে সে মায়ের মুখের দিকে তাকাল। আয়রা বেগমের চোখেমুখে তখনো উদ্বেগ স্পষ্ট। মেয়ের এমন ভেজা অবস্থা দেখে তিনি যে খুব একটা নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না, তা বোঝাই যাচ্ছে। তিনি চিন্তিত স্বরে বললেন,
-"ঘুরতে গিয়েছিলি, ভালো কথা। কিন্তু এত বৃষ্টি হচ্ছে, আর তুই একেবারে ভিজে চুপসে গেছিস, একটু সাবধানে থাকতে পারিস না?”
তাসিফা মায়ের কথা শুনে চুপ করে রইল। এখন আর কথা বাড়াতে চায় না সে। তার চেয়ে বরং যত দ্রুত সম্ভব ভেজা কাপড় বদলে নেওয়াই ভালো।
আয়রা বেগম আবার বললেন,
-“এখন আগে গিয়ে গোসল করে নে। এভাবে ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।"
মায়ের কণ্ঠে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েকে নিয়ে তাঁর চিন্তার শেষ নেই।
তাসিফা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-“আচ্ছা, মা।”
এরপর আর দেরি না করে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঘরের দরজার কাছে পৌঁছে একবার পেছনে ফিরে মায়ের দিকে তাকাল সে। আয়রা বেগম তখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাসিফা তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য আরেকবার হাসল। তারপর ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল।
ঘরে ঢুকেই তাসিফা দ্রুত কাবার্ডের কাছে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় বের করে নিল। এরপর কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
----
অন্যদিকে, জুয়িনও নিজের বাসায় ফিরে গোসল সেরে নিল। গোসল শেষে ঘরে এসে বিছানায় বসতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। সারাদিনের ধকলের পর শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। তার ওপর প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। এখন আর কোনো কিছু করতেই ইচ্ছে করছে না।
রাতের খাবারের কথা মনে পড়তেই জুয়িনের আলসেমি লাগল। নিজেকেই রান্না করে খেতে হবে, আবার খাওয়া শেষে সবকিছু গুছিয়ে রাখার ঝামেলাও আছে। এসব করতে গেলে আরও কিছুক্ষণ জেগে থাকতে হবে। এত ঝামেলা করার চেয়ে আজ না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া ভালো মনে হলো তার।
জুয়িন ভাবল, একবেলা না খেলে তেমন কিছু হবে না। সকালে উঠে কিছু একটা খেয়ে নিলেই চলবে। তাই রাতের খাবারের চিন্তা আপাতত বাদ দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
বালিশে মাথা রাখতেই চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। সারাদিনের ক্লান্তি আর ঘুমের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল জুয়িন।
----
তাসিফা গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল। গোসলের আগে পরা জামাকাপড়গুলো ধুয়ে নিয়েছে সে। সেগুলো হাতে নিয়ে ধীর পায়ে বারান্দায় চলে গেল।
বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে আছে। বাতাসও বেশ জোরে বইছে।
তাসিফা বারান্দায় এসে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ঘরের ভেতরে জামাকাপড় শুকানোর জন্য কোনো রশি নেই। তাই বাইরে এত বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও জামাকাপড়গুলো বারান্দার রশিতে মেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তার। একে একে সব জামাকাপড় মেলে দিয়ে সে হাত দুটো ঝেড়ে নিল।
এরপর বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে বাইরে তাকিয়ে রইল তাসিফা। বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস এসে তার মুখে লাগছে। বাতাসের দাপটে তার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে মুখের ওপর পড়ছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টির ছিটে এসে লাগছে গালেও। তবুও তার মধ্যে বিরক্তির কোনো ছাপ নেই। বরং বৃষ্টির এমন পরিবেশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালোই লাগছে তার।
তাসিফা চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখল কিছুক্ষণ। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটানা মাটিতে পড়ছে। চারপাশের পরিচিত পরিবেশটাও যেন বৃষ্টির কারণে অন্য রকম হয়ে উঠেছে। ঠান্ডা বাতাসে তার ভেজা চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল না সে। বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে নিজের রুমে ফিরে এল তাসিফা।
এদিকে আয়রা বেগম বেশ কিছুক্ষণ ধরেই তাসিফাকে খাবার খাওয়ার জন্য ডাকছিলেন। মায়ের ডাক কানে আসতেই আর দেরি করল না সে। দ্রুত পায়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে চলে গেল।
ডাইনিং রুমে ঢুকতেই তাসিফার চোখ পড়ল খাবার টেবিলে বসে থাকা বাবার দিকে। আলমগীর আলমও সেখানে বসে আছেন। সম্ভবত তাসিফা যখন গোসল করছিল, তখনই বাসায় ফিরেছেন তিনি। তাই সে সময়
বাবার সঙ্গে দেখা হয়নি তাসিফার।
তাসিফা এগিয়ে গিয়ে বাবার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল। বসতে বসতেই একবার বাবার দিকে তাকাল সে।
আলমগীর আলম প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই মেয়ের দিকে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর ভ্রু কুঁচকে এল।
-"এই সময় গোসল করেছ কেন, মা?"
বাবার প্রশ্ন শুনে তাসিফা একটু থমকে গেল। কী উত্তর দেবে, তা যেন মুহূর্তের জন্য মাথায় এল না তার। একবার বাবার দিকে তাকাল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
আয়রা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়েই তাসিফা বুঝতে পারল, মা এখনো বাবাকে এ ব্যাপারে কিছু বলেননি। অর্থাৎ, বাবার কাছে বিষয়টা এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
তাসিফা মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"বাবা, গরম লাগছিল, তাই গোসল করে নিয়েছি।"
কথাটা বলেই বাবার দিকে তাকাল সে। মুখে হাসিটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যেন তার কথায় কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। আলমগীর আলম মেয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। মেয়ের কথাটাই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে চুপ করে গেলেন।
এরপর সবাই খেতে বসে পড়ল।
আজকের রাতের খাবারের আয়োজন বেশ সাধারণ। আয়রা বেগম লাউশাক ভাজি করেছেন, সঙ্গে রয়েছে মসুর ডাল। খাবার টেবিলে বসে আয়রা বেগম তাসিফার প্লেটে ভাত তুলে দিলেন। তারপর ভাতের সঙ্গে লাউশাক ভাজি দিলেন।
তাসিফা ভাতের সঙ্গে শাক মেখে খেতে শুরু করল। ধীরে ধীরে খাবার মুখে তুলছে সে। মাঝে মাঝে প্লেটের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কখনো বাবা-মায়ের কথাও শুনছে।
বাইরে তখনো একটানা বৃষ্টি পড়ছে। সেই বৃষ্টির শব্দের মধ্যেই পরিবারের রাতের খাবার চলতে থাকল।
----
পরের দিন,
প্রতিদিনের মতো ভণ্ডপার্টির সবাই ভার্সিটির মাঠে ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসে আছে। তবে তাদের আড্ডার অন্যতম প্রধান সদস্য ইয়াশের এখনও দেখা নেই।
তাসিফা একবার মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখে নিল। তারপর চারপাশে চোখ বুলিয়ে ইয়াশের খালি জায়গাটার দিকে তাকাল। ছেলেটা সাধারণত আড্ডায় এসে একবার বসলে আর উঠতে চায় না। অথচ আজ এত দেরি করছে।
তাসিফা কিছুটা কৌতূহলী হয়ে বলল,
-“ইয়াশের আজ আবার কী হলো? আসবে না নাকি?”
সাদ ঘাসের ওপর দুই হাতের ভর দিয়ে একটু হেলান দিয়ে বসেছিল। তাসিফার কথা শুনে সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
-"আমাকে বলেছে আসবে।”
তাসনিম এবার কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
-"কোনো বিপদে পড়েছে নাকি? এতক্ষণ তো সাধারণত দেরি করে না।”
তাসনিমের কথা শুনে সাদ প্রথমে তার দিকে তাকাল, তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
-“ওই শালা বিপদে কীভাবে পড়বে? সে নিজেই তো মানুষকে বিপদে ফেলে আসে! ওর মতো নিরীহ মানুষ আর দুইটা পাওয়া যাবে না।”
কথার শেষটায় সাদের ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি দেখে তাসিফা আর তাসনিম হেসে উঠল। দুজনের হাসি দেখে সাদ নিজেও হেসে ফেলল।
কিন্তু তাদের হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই দূর থেকে কাউকে রীতিমতো দৌড়ে আসতে দেখা গেল। ছেলেটার দৌড়ানোর ভঙ্গি দেখে প্রথমে কেউ তেমন গুরুত্ব না দিলেও কাছে আসতেই বোঝা গেল, সে আর কেউ নয়, স্বয়ং ইয়াশ।
ইয়াশকে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। ইয়াশ কাছে এসেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। ধপ করে সবার মাঝে বসে পড়ল। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে , চুলগুলো এলোমেলো, আর মুখে ফুটে আছে এমন এক আতঙ্কের ছাপ, যেন এইমাত্র কোনো ভয়ংকর বিপদ থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।
কয়েক সেকেন্ড হাঁপানোর পর সে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে সে বলল,
-"মামা, আজকে তো আমি মরেই যেতাম।"
কথাটা শুনে সবাই একসঙ্গে তার দিকে ঘুরে তাকাল।
-“কেন? কী হয়েছিল?”
প্রশ্নটা একসঙ্গে ছুটে আসতেই ইয়াশ একবার সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবার লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল,
-“ভাই, বাসার সামনে মাদারবোর্ড মার্কা কয়েকটা কুত্তা ছিল! শালাগুলা এমন দৌড়ানি দিছে, কী আর বলমু! রিকশায় না উইঠা দৌড়াইতে দৌড়াইতে এখানে আইছি।"
কথা বলতে বলতে ইয়াশ এমনভাবে হাত-পা নেড়ে ঘটনাটা বোঝাতে লাগল, যেন কুকুরগুলো এখনও তার পেছনে লেগে আছে। তার অবস্থা দেখে তাসিফা প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষণেই চোখ সরু করে তার দিকে তাকাল।
-"এক মিনিট! তুই কি আগে কুকুরগুলোর সঙ্গে কিছু করেছিস?”
তাসিফার প্রশ্ন শুনে ইয়াশের হাত নাড়ানো থেমে গেল। মুখের অভিব্যক্তিও মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
-“আ-আমি আবার কী করব?”
সাদ এবার বসার ভঙ্গি সোজা করে ইয়াশের দিকে তাকাল। তাসনিমও চোখ ছোট করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আর তাসিফা এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন ইয়াশের মুখ দেখেই সব বুঝে ফেলেছে।
তিনজনের এমন সন্দেহভরা দৃষ্টি দেখে ইয়াশ অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল।
-“আরে, তোরা এমনভাবে তাকায় আছিস কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করছি নাকি?”
সাদ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
-"সেটা তো তোর কাহিনি শুনলেই বোঝা যাবে। বল, কী করেছিস?”
-“কী করব মানে? কিছুই করি নাই!”
ইয়াশের গলার জোর দেখে তাসিফা এবার মুচকি হাসল।
-"আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই কিছু করিসনি। কুকুরগুলোও কোনো কারণ ছাড়াই তোকে দেখে দৌড়ানি দিয়েছে। তাই তো?”
তাসিফার কথায় ইয়াশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর সবার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অসহায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতগুলো পরিচিত মানুষের সামনে আর মিথ্যা বলে লাভ নেই, সেটা বোধহয় সে বুঝে গেছে।
শেষমেশ মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বলল,
-“আরে, কুত্তাগুলারে ঘুমাইয়া থাকতে দেইখা ভালো লাগে নাই। তাই মুখ দিয়া জোরে বাঁশি বাজাইছি। এরপর শালাগুলা ঘুম থেইকা উইঠা আমার পিছে লাগছে! আমি কি জানতাম নাকি এমন করবে?”
কথাটা বলেই সে এমন একটা নিরীহ মুখ করে সবার দিকে তাকাল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষটা এখন তাদের সামনে বসে আছে।
কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ইয়াশের পিঠে একটা চাপড় মেরে হেসে বলল,
-“শালা! তোর এত চুলকানি কেন? কুত্তাগুলা শান্তিতে ঘুমাইতেছিল, তোর আবার ওদের ঘুম ভাঙানোর শখ জাগল কেন?”
তাসিফা এতক্ষণ ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করছিল। এবার আর পারল না। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা হলো তার। সে বলল,
-“তুই আসলেই একটা পাগল! ঘুমন্ত কুকুরের ঘুম ভাঙিয়ে এখন আমাদের কাছে এসে এমন ভাব করছিস, যেন তোর সঙ্গে অন্যায় হয়ে গেছে!”
ইয়াশ সবার কথা শুনে প্রথমে মুখ গম্ভীর করে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু বন্ধুদের হাসাহাসি দেখে বেশিক্ষণ আর গম্ভীর থাকতে পারল না। নিজেও হেসে উঠল। তারপর বুক ফুলিয়ে বলল,
-"তোরা কেউ আমার কষ্টটা বুঝবি না! এত দূর দৌড়াইয়া আসছি, একবার কেউ জিজ্ঞেসও করলি না আমি ঠিক আছি কি না!”
ইয়াশের কথা শুনে তাসিফা আর তাসনিম একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। সাদ তো হাসতে হাসতে ইয়াশের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ফেলেছে।
ইয়াশও এবার বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে লাগল। তবে হাসতে হাসতেই একবার সবার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, যেন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছে, আর কখনো কাউকে নিজের এমন বিপদের কথা বলবে না।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটুকু দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বন্ধুদের এই খুনসুটিতে তার মোটেও আপত্তি নেই। বরং এমন হাসি-ঠাট্টা আর দুষ্টুমিই তো তাদের প্রতিদিনের আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
#চলবে