ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 50

লেখক: মিশু

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

----

তাসিফা বাসায় ফেরার পর দুপুরের খাবার খেয়ে নিজের রুমে চলে এল। রুমে এসে মাত্রই বিছানায় বসেছে, এমন সময় জুয়িনের কল এলো।

ফোনের স্ক্রিনে জুয়িনের নামটা ভেসে উঠতে দেখে তাসিফা থমকে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। জুয়িন ভাইয়া হঠাৎ কল দিয়েছেন কেন? তিনি কি কিছু জেনে গেছেন? নাকি অন্য কোনো কারণে কল করেছেন?

তাসিফা কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কলটা কেটে যাওয়ার আগেই শেষমেশ সাহস করে রিসিভ করল সে।

-“আমার বাসায় আয়। এখনই।"
ওপাশ থেকে জুয়িনের শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কথাটা বলেই তিনি কল কেটে দিলেন।

তাসিফা ফোনটা নামিয়ে নিল। মনে মনে নানা কিছু ভাবতে লাগল সে। জুয়িনের গলার স্বরে রাগের প্রকাশ না থাকলেও কথাটা শুনে স্বস্তি পেল না তাসিফা। বরং তার মনে ভয়টা আরও বেড়ে গেল। জুয়িন ভাইয়া কি সত্যিই সব জেনে গেছেন? যদি জেনে থাকেন, তাহলে এখন তার কপালে কী আছে?

কথাটা ভাবতেই তাসিফার মুখটা মলিন হয়ে গেল। এখন না গেলে জুয়িন নিজেই এসে হাজির হবেন। আর তখন যে কী হবে, সেটা ভাবতেও সাহস হচ্ছে না তার। এমনিতেই মানুষটাকে সে একটু সমীহ করেই চলে। তার ওপর যদি সত্যিই রেগে থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই।

তাসিফা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। আর দেরি না করে মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিল সে। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে আয়রা বেগমের রুমের দিকে একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিল। মা নিজের রুমে শুয়ে আছেন দেখে তাসিফা নিঃশব্দে সরে এল। এরপর সুযোগ বুঝে চুপিচুপি বাসা থেকে বেরিয়ে জুয়িনের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়াল সে।

----

তাসিফা জুয়িনের ফ্ল্যাটে এসে দেখল, জুয়িনের পুরো গুষ্টি তার বাসায় হাজির। অবশ্য পুরো গুষ্টি বলতে সবাই নয়। জুয়িনের বাবা, মা, বোন আর চাচা-চাচিরা এসেছেন। তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে তাসিফা মনে মনে আন্দাজ করল, নিশ্চয়ই জুয়িনকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এসেছেন তাঁরা।

কিন্তু এত মানুষকে একসঙ্গে দেখে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ঘরে ঢোকার পর থেকেই সবার দৃষ্টি তার দিকে ঘুরে গেলেও তাসিফা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না, কীভাবে সবার সঙ্গে কথা শুরু করবে।

সে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে এসে জুয়িনের পাশে দাঁড়াল। তারপর একবার ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।

তখনই আফসানা শিকদার তাকে দেখে মৃদু হেসে বললেন,
-"তুমি তাসিফা? তোমার সঙ্গেই তো আমার ফোনে কথা হয়েছিল, তাই না?"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল। পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে বাকি রইল না, তিনিই জুয়িনের মা। ফোনে কথা বলার সময় যাঁর কণ্ঠে এতটা আন্তরিকতা ছিল, তাঁকে সামনাসামনি দেখে তাসিফার কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করল।

সে একবার জুয়িনের দিকে তাকাল, তারপর আবার আফসানা শিকদারের দিকে।

জুয়িন চোখ গরম করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি দেখেই তাসিফার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই মুহূর্তে যে জুয়িন তাকে কিছু বলবে না, সেটা সে জানে। কিন্তু পরে একান্তে যে ভালোই কথা শোনাবে, তা নিয়েও তার কোনো সন্দেহ নেই।

তাসিফা অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল,
-"জি, আন্টি।"

আফসানা শিকদারের মুখের হাসিটা আরও প্রশস্ত হলো। তিনি যেন এতক্ষণে স্বস্তি পেলেন। তারপর সোফা থেকে উঠে তাসিফার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাসিফার কাছে এসে আলতো করে তার হাত ধরে বললেন,
-"তোমাকে ধন্যবাদ, মা।"

তাসিফা একটু অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
-"ধন্যবাদ কেন, আন্টি?"

-"কেন আবার? তুমি না থাকলে আমরা হয়তো এত সহজে জুয়িনের ঠিকানাটা পেতাম না। ফোনে কথা হলেও ছেলেটার সঙ্গে তো আমাদের দেখা হয় না। কত দিন ধরে ওকে একনজর দেখার ইচ্ছে নিয়ে আছি! কোথায় থাকে, কেমন আছে, এসবও ঠিকমতো জানতে পারি না। আজ অন্তত দুই বছর পর নিজের চোখে ছেলেটাকে দেখতে পেলাম।"

শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে আফসানা শিকদারের কণ্ঠে চাপা কষ্ট ফুটে উঠল।

তাসিফার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল। সে একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। ছেলেটা তখনো শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের কথায় তার মুখের অভিব্যক্তিতে সামান্য পরিবর্তনও দেখা গেল না।

তাসিফা বুঝতে পারল, জুয়িনের অভিমান এখনো অনেক গভীরে জমে আছে।

সে আসলে চেয়েছিল, জুয়িনের পরিবারের সঙ্গে তার দূরত্বটা কমে আসুক। এত দিন ধরে জুয়িনকে একা থাকতে দেখেছে সে। মুখে যতই কঠিন হোক, পরিবারের প্রসঙ্গ উঠলে জুয়িনের ভেতরে ঠিক কী চলে, তা তাসিফা পুরোপুরি না বুঝলেও এটুকু বোঝে, মানুষটার মনে অনেক না বলা কথা জমে আছে।

কিন্তু সেই চাওয়ার কারণে যে তাকে এখন জুয়িনের রাগের মুখে পড়তে হবে, সেটা ভাবতেই তার বুকটা কেমন করে উঠল।

এদিকে জুয়িন এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিল। এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। কঠিন গলায় বলে উঠল,
-"তোমরা আমার বাসায় কেন এসেছ?"

তার কথায় ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। একটু আগেও যে মুখগুলোতে আশার ছাপ ছিল, সেগুলো যেন হঠাৎ করেই মলিন হয়ে পড়ল।

জুয়িনের মেজো চাচা জাওয়াদ শিকদার এবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"আর কত রেগে থাকবি, বাপ? কত দিন আর এভাবে একা একা থাকবি? এবার তো বাড়ি ফিরে চল।"

জুয়িনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না।
-"না।"
একটা মাত্র শব্দ। অথচ সেই শব্দের মধ্যেই যেন তার সমস্ত অনীহা আর অভিমান প্রকাশ পেল।

জাওয়াদ শিকদার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তিনি জানেন, জুয়িন ছোটবেলা থেকেই নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যথেষ্ট দৃঢ়। একবার কোনো বিষয়ে জেদ ধরলে তাকে সহজে বোঝানো যায় না। তবে পরিবারের সঙ্গে এমন দূরত্ব তৈরি হবে, তা হয়তো তাঁদের কেউই ভাবেননি।

এবার জুয়িনের বাবা জিসান শিকদার ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"জুয়িন, বাবাকে কি ক্ষমা করা যায় না? আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি, বাবা। তুই অন্তত একবার আমার কথাটা শোন।"

জুয়িন বাবার দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে কোনো রাগের প্রকাশ না থাকলেও সেখানে জমে থাকা অভিমানটা স্পষ্ট। সে কিছু বলল না।

জুয়িনের ছোট চাচা জাঈম শিকদার এবার এগিয়ে এসে বললেন,
-"বাসায় ফিরে চল না, জুয়িন। তোর ভাইবোনেরা তোকে ভীষণ মিস করছে। বাড়িতে তুই না থাকায় সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেছে। সবাই অপেক্ষা করে থাকে, কখন তুই ফিরবি। তুই একবার ফিরে চল, বাবা।"

কথাগুলো শুনেও জুয়িন নীরব রইল।

তার এই নীরবতা উপস্থিত সবাইকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে দিল। কেউই ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, আর কীভাবে তাকে বোঝানো যায়।

এবার জুয়িনের মেজো চাচি ও ছোট চাচি তার দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁদের চোখেমুখেও উদ্বেগ স্পষ্ট।

মেজো চাচি স্নেহের সুরে বললেন,
-"এমন করিস না, বাবা। তোর বাবা সেদিন রাগের মাথায় তোকে বাড়ি ছাড়তে বলেছিলেন। উনি যে কথাটা বলে ফেলেছেন, সেটা যে কত বড় ভুল ছিল, এখন নিজেই বুঝতে পারছেন। নিজের ভুলের জন্য উনি অনুতপ্ত। আর তুইও তো জানিস, রাগের মাথায় মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলে, যেটা পরে নিজেই ফিরিয়ে নিতে চায়।"

ছোট চাচি তাঁর কথার সঙ্গে যোগ করলেন,
-"তোর বাবা এখন তোকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে এসেছেন, জুয়িন। নিজের ভুল স্বীকার করে তোকে ফিরতে বলছেন। আর কত দিন এভাবে দূরে থাকবি? বাড়িতে ফিরে চল। সবাই তোকে দেখতে চায়, তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।"

জুয়িন এবারও কোনো উত্তর দিল না। সে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কারও কথাই তার মনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।

তাসিফা নীরবে সব দেখছিল। তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছিল। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে জুয়িনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, অথচ জুয়িনের মুখের কঠোরতা একটুও কমছে না।

তবু তাসিফা চাইছিল, অন্তত আজকের দিনটা যেন অন্য রকম হয়। যেন এত দিনের অভিমান ভুলে জুয়িন একবার পরিবারের মানুষগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

এবার জিনিয়া নিজের জায়গা থেকে উঠে ছোট ভাইয়ের দিকে এগিয়ে এল। ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটু নরম গলায় বলল,
-"এমন করিস না, জুয়িন। মায়ের কথাটা অন্তত ভাব। মা তোকে কতটা মিস করে, সেটা কি তুই বুঝিস না? সারাক্ষণ তোর কথা ভাবে। তুই কোথায় আছিস, কেমন আছিস, এসব নিয়ে চিন্তা করে। আর আমাদের কথাও একবার ভাব। তোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, তোর সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। তুই কি একবারও আমাদের কথা ভাবিস না?"

জিনিয়ার কণ্ঠের শেষ দিকে অভিমান মিশে গেল।

জুয়িন এবার বড় বোনের দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বলল,
-"এসব কথা শুনতে চাই না আমি। এসব বলার জন্য এসে থাকলে সবাই আমার বাসা থেকে চলে যেতে পারিস।"

কথাটা শুনে জিনিয়া থমকে গেল। সে হয়তো ভেবেছিল, ভাই অন্তত তার কথা শুনবে। কিন্তু জুয়িনের মুখের কঠোরতা দেখে আর কিছু বলার সাহস পেল না।

আফসানা শিকদার এতক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছেলের এমন আচরণ তাঁকে ভেতরে ভেতরে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল। যে ছেলেকে নিজের হাতে বড় করেছেন, সেই ছেলেই আজ তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলছে।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন,
-"এতটা হার্টলেস কীভাবে হলো আমার ছেলেটা? সে তো আগে এমন ছিল না।"

কথাটা বলার সময় তাঁর চোখে জমে থাকা কষ্টটা আর আড়াল করা গেল না।

জিনিয়া সঙ্গে সঙ্গে মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়া অসহায়ত্ব দেখে তার নিজেরও খারাপ লাগছিল।
-"মা, তুমি শান্ত হও। আমি দেখছি।"

কিন্তু জিনিয়া নিজেও জানত না, কীভাবে ছোট ভাইকে বোঝাবে।

এবার জিসান শিকদার ধীরে ধীরে ছেলের দিকে এগিয়ে গেলেন। এতক্ষণ ধরে সবার কথা শুনেও জুয়িন যখন একবারের জন্যও নরম হলো না, তখন তিনি বুঝতে পারলেন, শুধু কথায় আর কাজ হবে না। ছেলের মনে যে কষ্টটা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন, সেটাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ তাঁর নেই।

তিনি জুয়িনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

জুয়িন বাবার দিকে তাকাল। কী বলতে যাচ্ছেন, তা বোঝার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু পরক্ষণেই এমন কিছু ঘটল, যার জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।

জিসান শিকদার ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

ঘরের সবাই যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন।

জুয়িনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাবার এমন আচরণ সে আশা করেনি। তার বাবা বরাবরই কঠোর স্বভাবের মানুষ। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনড় থাকেন, আর পরিবারের অন্যদের কাছ থেকেও সেটাই আশা করেন। সেই মানুষটিই আজ সবার সামনে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছেন।

তবে জুয়িন বাবাকে জড়িয়ে ধরল না। তার দুটো হাত শরীরের পাশেই স্থির হয়ে রইল। এত সহজে কি আর সব অভিমান ভুলে যাওয়া যায়? যে কষ্টটা তাকে নিজের বাড়ি ছেড়ে দূরে থাকতে বাধ্য করেছে, সেটা তো একদিনে তৈরি হয়নি।

জিসান শিকদার ছেলেকে আঁকড়ে ধরে কাঁপা গলায় বললেন,
-"জুয়িন, বাড়ি ফিরে চল, বাবা। বাবাকে ক্ষমা করে দে। আর তোর গায়ে হাত তুলব না। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি।"

কথাগুলো বলার সময় তাঁর গলা বারবার কেঁপে উঠছিল।
-"আমি সেদিন তোর মতামত না নিয়েই আমার বিজনেস পার্টনারের মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলাম। একবারও ভাবিনি, তোর নিজেরও কিছু বলার থাকতে পারে। তোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য দিইনি আমি। নিজের সিদ্ধান্তটাই তোর ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমি অন্যায় করেছিলাম তোর সঙ্গে, বাবা।"

তিনি একটু থামলেন। যেন পরের কথাগুলো বলার জন্য নিজেকেই শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
-"তুই যখন আমার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলি, তখনও আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পারিনি। উল্টো রাগের মাথায় তোকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলাম। একজন বাবা হয়ে নিজের ছেলেকে এমন কথা কীভাবে বললাম, বল তো? তুই আমার ওপর রাগ করবি না তো কার ওপর করবি? তোর কষ্ট পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, বাবা। কিন্তু তুই এভাবে দূরে থাকিস না। তোর অভিমান আমি বুঝতে পারছি। তবু যদি পারিস, বাবাকে ক্ষমা করে দে। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আই অ্যাম সরি, বাবা।"

শেষ কথাটা বলেই জিসান শিকদার কেঁদে ফেললেন।

তাঁর কণ্ঠে জমে থাকা অনুশোচনা আর চোখের পানি দেখে উপস্থিত সবাই অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। তাঁরা হয়তো জিসান শিকদারকে ছেলের কাছে ক্ষমা চাইতে দেখার আশা করেছিলেন, কিন্তু এভাবে ভেঙে পড়তে দেখবেন, তা ভাবেননি কেউ।

আফসানা শিকদারের চোখও ভিজে উঠল। তিনি একবার স্বামীর দিকে, আরেকবার ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর বুকের ভেতরটাও ভারী হয়ে আসছিল।

অন্যদিকে, জিসান শিকদারের কান্না দেখে তাসিফারও চোখ ভিজে উঠল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ইচ্ছে করছিল, ফুঁপিয়ে কাঁদতে, কিন্তু সবার সামনে নিজেকে সামলে রাখল।

তাসিফার মনে হচ্ছিল, একটি পরিবারের সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে! রাগ, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, সবকিছুর পরও মানুষগুলো একে অপরের কাছে ফিরে আসতে চায়। শুধু কখনো কখনো নিজের ভুলটা স্বীকার করতে অনেক দেরি হয়ে যায়।

জুয়িন এতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাবার প্রতিটি কথা তার কানে পৌঁছাচ্ছিল। যে মানুষটির ওপর সবচেয়ে বেশি অভিমান জমিয়ে রেখেছে, সেই মানুষটিই আজ নিজের ভুল স্বীকার করে তার কাছে ক্ষমা চাইছেন।

তার মনে পড়ে গেল, বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময়কার সেই অভিমান। বাবার কথাগুলো তখন তার কাছে শুধু অপমানজনকই ছিল না, ছিল ভীষণ কষ্টেরও। নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্তে তার মতামতের কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদ করায় তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল। সেই কষ্ট বুকে নিয়েই সে দূরে সরে এসেছিল।

কিন্তু আজ বাবার কণ্ঠে অনুশোচনা শুনে তার বুকের ভেতর জমে থাকা কঠিন অভিমানটা যেন একটু একটু করে নরম হতে শুরু করল।

সে কখনোই চায়নি, তার কারণে পরিবারের মানুষগুলো কষ্ট পাক। নিজের কষ্ট থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই দূরত্ব যে অন্যদেরও এতটা কষ্ট দিচ্ছে, তা সে অস্বীকার করতে পারল না।

জুয়িন ধীরে ধীরে নিজের হাত দুটো তুলল। পরক্ষণেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

জিসান শিকদার যেন ছেলের এই সামান্য সাড়াটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি আরও শক্ত করে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন।

জুয়িন বাবাকে জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলল,
-"আমিও সরি, বাবা। আমাকেও ক্ষমা করে দিও। আমিও কাউকে এত কষ্ট দিতে চাইনি।"

কথাটা বলার পর জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বাবার বুকের কাছে মাথা রেখে সে নিজের আবেগ সামলানোর চেষ্টা করল। তার সব অভিমান যে মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। কিন্তু আজ অন্তত বাবার কথাগুলোকে সে ফিরিয়ে দিতে পারল না।

জিসান শিকদার ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন স্বস্তি আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি।

ঘরের পরিবেশটাও ধীরে ধীরে বদলে গেল। আফসানা শিকদার চোখের পানি মুছে মৃদু হাসলেন। জিনিয়ার মুখেও স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। জুয়িনের চাচা-চাচিরাও যেন এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

কিছুক্ষণ পর জিসান শিকদার ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে তার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,
-"বাড়ি চল। আর এখানে থাকতে হবে না।"

জুয়িন বাবার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। এরপর মাথা নাড়ল।

তার সেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ানোতেই আফসানা শিকদারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এত দিন ধরে যে কথাটা শোনার জন্য অপেক্ষা করেছেন, আজ অবশেষে সেই কথার উত্তর পেয়েছেন।

তাসিফাও মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ ধরে তার বুকের ভেতর যে অস্বস্তিটা কাজ করছিল, সেটা কিছুটা হলেও কমে এল।

তবে সে জানে, জুয়িনের পরিবারের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি নিজের জন্য আরেকটা বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ জুয়িন যে তার ওপর রাগ করেছে, সেটা তার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

তবু এই মুহূর্তে সেসব নিয়ে ভাবতে চাইল না তাসিফা।

সে এবার সবার দিকে তাকাল। এতক্ষণ ধরে সবাইকে নিয়ে এত কথা হলো, এত আবেগের মুহূর্ত পার হলো, কিন্তু কেউ যে দুপুরের খাবার খেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কোনো খেয়ালই করেনি।

তাসিফা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-"আপনারা সবাই কি লাঞ্চ করে এসেছেন?"

তার কথায় উপস্থিত সবাই কিছুটা থমকে গেলেন। জুয়িনের মেজো চাচি এবার বললেন,
-"তাড়াহুড়ো করে চলে আসতে গিয়ে আমাদের কারও আর লাঞ্চ করা হয়নি।"

তাসিফা একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। তারপর মনে মনে হিসাব করল, জুয়িনের বাসায় এতজন মানুষের খাবারের ব্যবস্থা থাকার কথা নয়। সে একা থাকে, তাই অল্প করে রান্না করে নিজের খাবারটুকু খেয়ে নেয়। এতগুলো মানুষের জন্য সেখানে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া কঠিন।

তাই আর দেরি না করে তাসিফা হাসিমুখে বলল,
-"আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। আমি বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসছি। এতক্ষণ না খেয়ে আছেন, নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধা পেয়েছে আপনাদের।"

কথাটা শুনে জিসান শিকদার স্নেহের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।
-"এত কষ্ট করতে হবে না, মামনি। আমরা বাড়ি ফিরে খেয়ে নেব।"

তাসিফা মাথা নেড়ে বলল,
-"না, আঙ্কেল। একটু অপেক্ষা করুন। আমার মোটেও কষ্ট হবে না। আপনারা এত দূর থেকে এসেছেন, দুপুরের খাবার না খেয়ে চলে যাবেন, তা তো হতে পারে না।"

তার কথায় আফসানা শিকদারের মুখে আবারও হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটার আন্তরিকতা তাঁর ভালো লাগল। অল্প সময়ের পরিচয়েই তাসিফা যেভাবে তাঁদের কথা ভাবছে, তাতে তাঁর মনে মেয়েটার জন্য আলাদা একটা স্নেহ তৈরি হলো।

তাসিফা আর কথা বাড়াল না। একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। জুয়িন তখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, এই মুহূর্তে সে কী ভাবছে।

তাসিফা মনে মনে ভাবল, পরে যা হওয়ার হবে। আপাতত সবার খাবারের ব্যবস্থা করাই ভালো।

এরপর দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে পেছন থেকে দরজাটা টেনে দিল। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল।

----

তাসিফা বাসায় ফিরে সোজা আয়রা বেগমের রুমে গেল। ভেতরে ঢুকতেই দেখল, মা বিছানায় শুয়ে আছেন। তাসিফা মায়ের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ডাকল,
-"মা, একটু শুনো।"

মেয়ের কণ্ঠ শুনে আয়রা বেগম পাশ ফিরে তাকালেন। তাসিফাকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে বসতে বসতেই জিজ্ঞেস করলেন,
-"কী হয়েছে? কিছু বলবি?"

তাসিফা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"মা, একটু আগে জুয়িন ভাইয়াদের বাসায় ওনার পরিবারের লোকজন এসেছেন। কিন্তু ওনারা এখনো লাঞ্চ করেননি। ওনাদের জন্য কিছু খাবার দেবে? জুয়িন ভাইয়ার বাসায় তো এখন রান্না করা খাবার নেই।"

কথাটা শুনে আয়রা বেগমের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
-"কী বলিস! এখনো লাঞ্চ করেনি ওনারা?"

তিনি বিছানায় সোজা হয়ে বসে মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর আর দেরি না করে বললেন,
-"তুই একটু দাঁড়া। আমি খাবার দিচ্ছি।"

কথা শেষ করেই তিনি বিছানা থেকে নেমে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাসিফাও মায়ের পেছনে পেছনে রুম থেকে বেরিয়ে এল। তবে আয়রা বেগম একবারও জানতে চাইলেন না, তাসিফা কীভাবে জুয়িনের পরিবারের আসার খবর জানল। আপাতত তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা,ওনারা এতক্ষণ না খেয়ে আছেন, তাঁদের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাবারের ব্যবস্থা করা দরকার।

ভাগ্য ভালো, দুপুরে আয়রা বেগম গরুর মাংস আর ইলিশ মাছ রান্না করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই রান্না করেছিলেন তিনি। ফলে অতিথিদের জন্য খাবার দিতে অসুবিধা হলো না।

রান্নাঘরে গিয়ে তিনি প্রথমে খাবারের বাটিগুলো বের করলেন। তারপর গরুর মাংস আর ইলিশ মাছ আলাদা দুটি বাটিতে তুলে নিলেন। ভাত রাখলেন একটি বড় বাটিতে। সবশেষে তিনটি বাটি যত্ন করে একটি ট্রের ওপর সাজিয়ে রাখলেন।

সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে কি না, একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি। তারপর ট্রেটা দুই হাতে তুলে তাসিফার দিকে এগিয়ে দিলেন।
-"নে, সাবধানে নিয়ে যাস। খাবার যেন পড়ে না যায় আবার।"

তাসিফা যত্ন করে ট্রেটা হাতে নিল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
-"আচ্ছা, মা। সাবধানে নিয়ে যাব।"

আয়রা বেগম দরজা খুলে পাশে সরে দাঁড়ালেন, যাতে তাসিফার ট্রে হাতে বের হতে অসুবিধা না হয়। তাসিফা দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ট্রেটা দুই হাতে সামলে ধরে ধীরে ধীরে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।

-----

আফসানা শিকদার, জিসান শিকদার, জুয়িনের চাচা-চাচিরা আর জিনিয়া হাত ধুয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছেন। সবাই খেতে শুরু করার পর থেকেই রান্নার প্রশংসা করছিলেন। খাবারগুলো যে যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে, তা তাঁদের কথাবার্তাতেই বোঝা যাচ্ছিল।

আফসানা শিকদার একবার খাবারের দিকে তাকালেন, তারপর হাসিমুখে তাসিফার দিকে চেয়ে বললেন,
-"তোমার মায়ের হাতের রান্না তো ভীষণ মজার।"

তাসিফা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রশংসাটা শুনে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
-"জ্বি, আন্টি।"

আফসানা শিকদারও মৃদু হাসলেন। তাসিফার সঙ্গে কথা বলতে তাঁর ভালোই লাগছিল। মেয়েটার ব্যবহারেও একটা আন্তরিকতা আছে। নিজের ছেলের পরিবারের লোকজন এসেছে শুনে যেভাবে খাবারের ব্যবস্থা করতে ছুটে গেছে, তাতে তার প্রতি আলাদা একটা ভালো লাগা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সবাই যখন খেতে ব্যস্ত, তখনই জুয়িনের মেজো চাচির হঠাৎ কাশি শুরু হলো। খাবার গলায় আটকে যাওয়ায় তিনি কাশতে লাগলেন। তাসিফা বিষয়টা খেয়াল করতেই দ্রুত তাঁর কাছে এগিয়ে গেল। পাশ থেকে এক গ্লাস পানি তুলে তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-"এই যে, আন্টি। পানি খান।"

তিনি তাড়াতাড়ি গ্লাসটা হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেলেন। কিছুক্ষণ পর কাশি কমে এলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তারপর তাসিফার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে বললেন,
-"ধন্যবাদ, মা।"

তাসিফা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তারপর তাঁর পাশে রাখা গ্লাসটা সরিয়ে রাখতে গিয়ে জগের দিকে চোখ পড়ল। জগে খুব সামান্য পানিই অবশিষ্ট আছে। এতজন মানুষ খেতে বসেছেন, অথচ পানি প্রায় শেষ। তাই সে সবার দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
-"আমি পানি নিয়ে আসছি।"

কেউ কিছু বলার আগেই সে কিচেনের দিকে পা বাড়াল।

অন্যদিকে, জুয়িন সবার সঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছিল না। সে কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে দেখে তার মনের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এত দিন পর সবার সামনে নিজেকে সহজ করে তুলতে তার এখনো সময় লাগছিল।

তাসিফাকে কিচেনের দিকে যেতে দেখে জুয়িন একবার ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। সবাই তখন নিজেদের মতো খেতে ও কথা বলতে ব্যস্ত। কেউ তার দিকে বিশেষ খেয়াল করছে না দেখে সে নিঃশব্দে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল।

কিচেনে এসে জুয়িন দেখল, তাসিফা কাচের জগে পানি ঢালছে। তার মনোযোগ তখন পানির দিকেই। তবে পেছনে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে সে ঘুরে তাকাল।

জুয়িনকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাসিফা চমকে উঠল। হঠাৎ তাকে এভাবে পেছনে দেখে কী বলবে, বুঝে উঠতে পারল না। কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে তাড়াতাড়ি জগটা একপাশে রেখে দিল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,
-"আমি সরি। আপনার অনুমতি না নিয়েই আমি আপনার মাকে আপনার ঠিকানা জানিয়ে দিয়েছিলাম।"

কথাটা বলার পর তাসিফা জুয়িনের মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি জুয়িন রেগে যাবে! অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় হয়তো বকাঝকা করবে। এতক্ষণ ধরে মনে মনে যে আশঙ্কাটা কাজ করছিল, জুয়িনকে সামনে পেয়ে সেটাই যেন আরও বেড়ে গেল।

কিন্তু জুয়িন কিছুই বলল না।

তার নীরবতায় তাসিফা আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
সে আবারও কিছু বলার কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই জুয়িন এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে তাসিফা প্রথম মুহূর্তে একেবারে স্থির হয়ে গেল। সে ভেবেছিল, জুয়িন তাকে বকবে, হয়তো রাগ করে কথাও শোনাবে। অথচ তার বদলে জুয়িন তাকে বুকে টেনে নিয়েছে।এমন আচরণের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

কয়েক মুহূর্ত তাসিফা বুঝতেই পারল না কী করবে। তারপর ধীরে ধীরে তার অপ্রস্তুত ভাবটা কেটে গেল। জুয়িনের এই আচরণের মধ্যে রাগের কোনো চিহ্ন নেই।

জুয়িন তাসিফাকে জড়িয়ে ধরেই নিচু স্বরে বলল,
-"থ্যাঙ্ক ইউ।"

তাসিফা থমকে গেল। কথাটা শুনে তার বিস্ময় যেন আরও বেড়ে গেল। যে মানুষটার কাছে এখন সে ক্ষমা চাইল, সেই মানুষটাই কি না তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে! কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে ধীরে ধীরে জুয়িনের পিঠে হাত রাখল। তারপর মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
-"কেন?"

জুয়িনের উত্তর এল সংক্ষিপ্তভাবে,
-"এমনিই।"

তাসিফা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

কিছুক্ষণ এভাবেই তাসিফাকে জড়িয়ে ধরে থাকার পর জুয়িন নিজেই তাকে ছেড়ে দিল। তারপর যেন কিছুই হয়নি, এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"তুই পানি নিয়ে আয়। আমি গেলাম।"

তাসিফা নীরবে মাথা নাড়ল। জুয়িন কিচেন থেকে বেরিয়ে গেল। তাসিফা কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল।

----

তাসিফা কাচের পানির জগটা এনে খাবার টেবিলের ওপর রাখল। জগটা রাখার পরও সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। টেবিলে বসে থাকা জুয়িনের পরিবারের সদস্যদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। সবাই তখন খাওয়াদাওয়ায় ব্যস্ত। এর মধ্যেই জাওয়াদ শিকদার ওদের দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,
-"তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমাদের সঙ্গে বসো।"

জুয়িন চাচার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
-"চাচ্চু, আমরা তো খাব না। খেয়ে নিয়েছি।"

জিসান শিকদার খাবারের প্লেট থেকে মুখ তুলে তাকালেন। এরপর বললেন,
-"খেতে হবে না। শুধু আমাদের সঙ্গে বসো দুজন।"

বাবার কথার পর আর কিছু বলল না জুয়িন। তাসিফাও ইতস্তত না করে আফসানা শিকদারের পাশের খালি চেয়ারটায় বসে পড়ল। অন্যদিকে, জুয়িন নিজের দুই চাচার মাঝখানের চেয়ারে গিয়ে বসল।

টেবিলে তখন খাবার পরিবেশন করা ছিল। সবাই নিজেদের মতো খাচ্ছিলেন। তাসিফা চুপচাপ বসে চারপাশের কথাবার্তা শুনছিল। বাড়ির বড়দের সঙ্গে এভাবে এক টেবিলে বসে থাকতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল না, তবে নিজে থেকে কোনো কথা বলার তাড়াও ছিল না।

আফসানা শিকদার খেতে খেতে একবার তাসিফার দিকে তাকালেন। মেয়েটার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তিনি। কোথায় যেন দেখেছেন এমন একটা অনুভূতি হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু ঠিক কার সঙ্গে তাসিফার চেহারার মিল, সেটা প্রথমে মনে করতে পারছিলেন না। পরিচিত মনে হওয়ার কারণটা খুঁজতে গিয়ে আবারও চোখ পড়ল তাসিফার মুখের ওপর।

একসময় আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। খাবারের দিকে থেকে মনোযোগ সরিয়ে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"তাসিফা, তোমাকে দেখে আমার খুব পরিচিত লাগছে।"

তাসিফা তাঁর দিকে ফিরে তাকাল। কথাটা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
-"তাই নাকি?"

-"হ্যাঁ। তোমাকে দেখার পর থেকেই কেমন যেন মনে হচ্ছে, তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি। কিন্তু কোথায় দেখেছি, সেটা ঠিক মনে করতে পারছি না।

তাসিফা মৃদু হাসল। আফসানা শিকদারের কথায় বিশেষ কিছু ভাবল না সে। এমন কথা সে আগেও শুনেছে। বিশেষ করে যারা তার মাকে চেনেন, তাঁদের অনেকেই প্রথম দেখায় তার সঙ্গে আয়রা বেগমের চেহারার মিল খুঁজে পান।

আফসানা শিকদার আবারও তাসিফার মুখের দিকে তাকালেন। এবার যেন নিজের ভাবনার কারণটা খুঁজে পেলেন। মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বললেন,
-"মনে পড়েছে। আমার ছোট বোনের চেহারার সঙ্গে তোমার চেহারার অনেকটা মিল আছে।"

কথাটা শুনে জুয়িনের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে আফসানা শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"ছোট খালামণির চেহারার সঙ্গে?"

আফসানা শিকদার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন।
-"হ্যাঁ, ওর সঙ্গেই। তোমাকে দেখলে ওর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার।"

জুয়িন আর কিছু বলল না।

তাসিফা অবশ্য বিষয়টাকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিল। হেসে বলল,
-"ওহ, আচ্ছা! আমার মায়ের সঙ্গেও আমার চেহারার অনেক মিল আছে। সবাই দেখলেই বুঝে ফেলে আমরা মা-মেয়ে।"

কথাটা বলতে বলতে তাসিফার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মায়ের সঙ্গে তার চেহারার মিল নিয়ে সে নতুন করে কিছু ভাবল না। বরং আফসানা শিকদারের কথায় নিজের মায়ের কথা মনে পড়তেই স্বাভাবিকভাবে উত্তরটা দিল।

আফসানা শিকদারও মাথা নাড়লেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা বদলে গেল। তাসিফার মায়ের কথা শুনে যেন হঠাৎ করেই তাঁর মনে কোনো প্রশ্ন জেগেছে। কয়েক মুহূর্ত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর তিনি জানতে চাইলেন,
-"তোমার মায়ের নাম কী?"

প্রশ্নটা শুনে তাসিফা একটুও বিচলিত হলো না। সে জানে না, তার মায়ের নাম জানার পেছনে আফসানা শিকদারের মনে ঠিক কী কৌতূহল কাজ করছে। তাই কোনো কিছু না ভেবেই সহজভাবে জবাব দিল,
-"আয়রা বেগম।"

নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আফসানা শিকদারের হাত থেমে গেল। খাবার মুখে তোলার জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাসিফার মুখে নামটা শোনামাত্রই হাতটা আর এগোল না। তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠল বিস্ময়।

জিসান শিকদার খাবারের দিকে থেকে মুখ তুলে তাকালেন। সবার হাতও এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তাঁদের চোখেমুখেও বিস্ময় স্পষ্ট হয়ে উঠল। যেন নামটা তাঁদের কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল।

জুয়িন একবার আফসানা শিকদারের দিকে, আরেকবার অন্যদের দিকে তাকাল। সবার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে তার ভ্রু আবারও কুঁচকে গেল। একটা নাম শুনে সবাই এভাবে থমকে গেলেন কেন, সেটাই সে বুঝতে পারছিল না।

তবে পরক্ষণেই তার নিজেরও চমকে ওঠার মতো কারণ তৈরি হলো। "আয়রা বেগম।"

নামটা তার কাছে অপরিচিত নয়। মায়ের মুখে এই নাম সে আগেও শুনেছে। তার ছোট খালামণির নামও আয়রা বেগম। তবে তাসিফার মুখে মায়ের নামটা আগেও অনেকবার শুনলেও বিষয়টা নিয়ে কখনো আলাদা করে ভাবেনি জুয়িন। নামটা তার মাথায় সেভাবে গেঁথেও ছিল না।

কিন্তু আজ মায়ের মুখে ছোট খালামণির সঙ্গে তাসিফার চেহারার মিলের কথা শোনার পর, আর তাসিফার মায়ের নাম আয়রা বেগম জানার পর, বিষয়টা নতুন করে তার মনে প্রশ্ন জাগাল।

কেন যেন মনে হলো, নামের এই মিলটা নিছক কাকতালীয়ও হতে পারে, আবার এর পেছনে অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে।

জুয়িন একবার মায়ের দিকে তাকাল। আফসানা শিকদারের মুখের বিস্ময় তখনো কাটেনি। তাঁর এই অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখে জুয়িনের মনে প্রশ্নটা আরও জোরালো হলো।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 50 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন