দিন কয়েক কাটতেই ইনায়ার তৃতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু। প্রতিদিন ক্লাস করলেও ইষানকে এড়িয়ে চলে। অতিরিক্ত কল মেসেজ করায় ইষানকে ব্লক করে দেয়।
একদিন ক্লাসের ফাঁকে নির্জন করিডোরে ইনায়াকে একা পেয়ে ইষান দ্রুত তার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছু একটা বলতে চাইছিল সে, কিন্তু ইনায়া তার কোনো কথা শোনার আগেই প্রচণ্ড রাগে বাড়িয়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ইষানের গালে। থাপ্পড়ের চোটে ইষান স্তব্ধ হয়ে গেল। বুঝতে পারলো না ইনায়া তাকে কেনো মারছে?
ইনায়া যখন দ্বিতীয়বার হাত তুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মারিয়া এসে ঝাপটে ধরল ইনায়ার পা।
— প্লিজ ইনায়া ওকে মারিস না, তোর পা ধরে ভিক্ষা চাইছি!"
মারিয়া ভালোবাসতে না চাইলেও কেনো যেনো নিজেকে সামলাতে পারে না। ইষানের কষ্ট তার সহ্য হয় না। ইষান তাকে ভালো না বাসলে ও মারিয়া তো বাসে। সে না হয় এক তরফা ভালোবেসেই যাবে। নিজের মন কে তো আটকানো যায় না।
মারিয়ার করুণ মুখ দেখে ইনায়া আর কিছু না বলে খটখট করে সেখান থেকে চলে গেল।
ইষানের দুচোখ তখন অশ্রুতে টলমল করছে। অপমানে আর কষ্টে সে করিডোরের মেঝেই বসে পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠে সে বলতে লাগল, "একজন এক বাচ্চার বাবাকে কীভাবে পারলে বিয়ে করতে ইনায়া? আমার কী দোষ ছিল? কেন আমার ভালোবাসাটা বুঝলে না?" পাশে বসে থাকা মারিয়া ইষানের এই হাহাকার দেখছিল। সে ভালো করেই জানত, ইষান ভুল বুঝছে। আইরা অন্য কারো নয়, বরং ইনায়া আর অ্যারিসের নিজের সন্তান— তা শুধু মারিয়াই জানত।
ইষান বাসায় ফিরেই যেন এক উন্মাদনায় মেতে উঠল। ড্রয়িংরুমের দামি ফুলদানি, শো-পিস, হাতের কাছে যা পাচ্ছিল সব আছাড় দিয়ে ভাঙছে সে। তারা এই বুকফাটা হাহাকার আর ধ্বংসলীলা দেখে আশরাফ শাহ্ চিন্তিত উঠলেন। ছেলের এমন করুণ দশা তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি সামলাতে তিনি নিজেই ইনায়ার সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
পরদিন এক নির্জন জায়গায় ইনায়ার মুখোমুখি হলেন তিনি। ইষানের পাগলামি আর কষ্টের কথাগুলো যখন গম্ভীর অনুভূতিতে বলছিলেন, তখন ইনায়ার ঠোঁটে ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি।
"আপনি বলতে চাইছেন আমি আমার হাজব্যান্ডকে ডিভোর্স দিয়ে আপনার ছেলেকে বিয়ে করি?" ইনায়ার সপাটে প্রশ্নে আশরাফ শাহ্ থমকে গেলেন।
"হাজব্যান্ড ? বিয়ে হয়ে গেছে তোমার?" তার কণ্ঠ বিস্ময়। তিনি জানতেনই না যে ইনায়া ইতিমধ্যে অন্য কারো ঘরণী। ইনায়া শক্ত গলায় বলল, "হ্যাঁ, আমি বিবাহিত। আর কিছুদিন আগে আমাদের হানিমুনে ট্রিপেও আপনার ছেলে ঝামেলা করতে গিয়েছিল।"
লজ্জায় আশরাফ শাহ্-র মাথা নিচু হয়ে এল। তিনি অপরাধবোধে দমে গিয়ে বললেন, "আমি... আমি আমার ছেলেকে সামলে রাখব। আমি জানতাম না পরিস্থিতি এতদূর গড়িয়েছে।" ইনায়া আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
আশরাফ শাহ বাড়ি ফিরে ইষানকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু ইষান তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে, "বাবা, আমার ইনায়াকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও! আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। আমার ওকে চাই-ই-চাই।"
ছেলের এই জেদ আর উন্মাদনা দেখে আশরাফ শাহ্ তাকে কিছুদিন ঘরের ভেতর আটকে রাখলেন।
কয়েক সপ্তাহ পার হওয়ার পর ইষান হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করল সে, যেন ভেতরের ঝড়টা থিতিয়ে এসেছে।
অনেকদিন পর ইষান আবার ভার্সিটিতে গেল। সেদিন সেকেন্ড ক্লাসটা না করে ইনায়া যখন ক্যান্টিনের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই ইষান তার পিছু নিল। খুব শান্ত স্তরে সে ডাকল, "ইনায়া, আমাকে জাস্ট একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে প্লিজ?"
ইনায়া বিরক্ত হয়ে পেছনে ফিরে তাকাল, তার মুখে কেবল একটিই শব্দ, "কী?"— কিন্তু উত্তর শোনার আগেই ইনায়ার চোখ পড়ল কিছুটা দূরে হেঁটে যাওয়া এক রহস্যময় লোকের দিকে। লোকটাকে দেখামাত্রই ইনায়ার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ইষান আতঙ্কিত হয়ে ইনায়াকে নিজের হাতের ওপর টেনে নিল। তার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, "ইনায়া! কী হয়েছে তোমার? চোখ খোলো প্লিজ!"
ঠিক সেই মুহূর্তে আদিয়ান ঝড়ের বেগে এসে ইষানকে এক লাথি দিয়ে সরিয়ে দিল। সে ইষানকে কোনো সুযোগ না দিয়েই ইনায়াকে পাঁজাকোলা করে তুলে হাসপাতালের দিকে রওনা দিল। পথেই সে অ্যারিসকে ফোন করে সবটা জানিয়ে দিল।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় ইনায়া চোখ মেলল, দেখল পাশে অ্যারিস গম্ভীর মুখে বসে আছে।
"তুমি এখানে?" ইনায়ার কণ্ঠস্বর খুব ক্ষীণ।
"আদিয়ান ভাই কল করে আসতে বলল। এখন শরীর ঠিক আছে?" অ্যারিসের চোখে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট।
"হুমম।" ইনায়া মৃদুস্বরে জবাব দিল।
"আজ আর ক্লাস করতে হবে না, চলো বাসায় চলো।"— অ্যারিস এক মুহূর্ত দেরি না করে ইনায়াকে কোলে তুলে নিয়ে একদম গাড়িতে গিয়ে বসল।
বাসায় ফেরার পথেই ইনায়ার ফোনে রোহানের একটা মেসেজ ভেসে উঠল: "বস, আরাফাত বাংলাদেশে চলে এসেছে।"
ইনায়া শুধু টাইপ করল, "ওকে।"
------------♡