ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি

পর্ব 31

লেখক: F. Tabassum

ইনায়া আইরার খুনসুটিতে তখন ড্রইংরুম মুখরিত, ঠিক তখনই অ্যারিসের ভিডিও কল এলো। সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝেও ইনায়া আর আইরার খবর নেওয়াটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
"ইনায়া, তোমার কিছু লাগবে? ফেরার পথে নিয়ে আসব?" অ্যারিস স্ক্রিনের ওপাশ থেকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু অ্যারিসের কথা শেষ হওয়ার আগেই স্ক্রিনের সামনে ছোট ছোট হাত নেড়ে আইরা চিৎকার করে উঠল, "বা... বা... বা... বা...!"

অ্যারিস এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তার কলিজার টুকরো মেয়েটি প্রথম শব্দ হিসেবে তাকেই ডেকেছে! খুশিতে অ্যারিসের চোখ ভিজে এল। অন্যদিকে ইনায়ার খুনসুটি মাখা অভিমান— সে কত চেষ্টা করেছে মেয়েকে 'মাম্মা' বলা শেখাতে, কিন্তু আইরা নাছোড়বান্দা। তার মুখে সারাদিন এখন একটাই বুলি 'বাবা'। ইদানীং হাসলে ওর মাড়িতে ছোট দুটো মুক্তোর মতো দাঁতও দেখা যায়।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
রাতের ঢাকা শহরে হালকা পাতলা একটা মিঠে ঠাণ্ডা পড়েছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দশটা। অন্যদিন অ্যারিস অনেক আগেই বাসায় ফেরে, কিন্তু আজ তার দেখা নেই। ইনায়া বারবার কল দিচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। এর আগে এমনটা কখনো হয়নি, তাই ইনায়ার মনে কিছুটা ভয় জমতে শুরু করল। অস্থির হয়ে সে আইরাকে তার শাশুড়ির কাছে রেখে বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে অ্যারিস বাসায় ঢুকল। তার গায়ে একটা কালো রঙের ওভারসাইজড কোট, যা দিয়ে সে নিজেকে অদ্ভুতভাবে ঢেকে রেখেছে। ইনায়া কিছু একটা সন্দেহ করলেও সে তখন কিছু জিজ্ঞেস করল না। অ্যারিসকে ফ্রেশ হওয়ার সুযোগ দিয়ে সে খাবার আনতে চলে গেল।

খাবার নিয়ে রুমে ঢুকতেই ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল। দেখল অ্যারিস কোট খুলে নিজের ক্ষতবিক্ষত শরীরকে নিজেই ব্যান্ডেজ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। শরীরের কয়েক জায়গায় গভীর ক্ষত, রক্ত চুইয়ে পড়ছে। ইনায়াকে দেখে সে লুকাতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

ইনায়া কোনো কথা না বলে খাবারের থালাটা একপাশে রাখল। ধীরস্থিরভাবে তুলো আর অ্যান্টিসেপ্টিক নিয়ে অ্যারিসের পাশে বসল। খুব যত্ন করে রক্ত পরিষ্কার করে সে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। অ্যারিস যন্ত্রণায় একবারও উঁহু শব্দ করল না, শুধু অপলক দৃষ্টিতে ইনায়ার সেবা করা দেখছিল। ইনায়া পুরোটা সময় একটাও কথা বলেনি। ব্যান্ডেজ শেষ করে হাত ধুয়ে এসে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, "নিজের হাতে খেতে পারবে নাকি খাইয়ে দিতে হবে?"

অ্যারিস ইনায়ার এই শান্ত মূর্তির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে হয়তো একগাদা প্রশ্ন বা বকাঝকা আশা করেছিল। সে কোনো কথা না বলে বাচ্চার মতো হাঁ করল। ইনায়া মুচকি হেসে এক গ্রাস এক গ্রাস করে খাইয়ে দিতে শুরু করল।
কয়েক লোকমা খাওয়ানোর পর অ্যারিস আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি জানতে চাইবে না আমার এই অবস্থা কীভাবে হলো?"
ইনায়া আবার এক গ্রাস মাখাতে মাখাতে বলল, "রক্ত দেখে মনে হচ্ছে ঘটনাটা ঘণ্টাখানিক আগের। আর আঘাতের ধরন বলে দিচ্ছে কোনো ধারালো ছুরি দিয়ে কেউ হামলা করেছে, তাও পেছন থেকে। কার সাথে এমন হাতাহাতি করলে, ইষান?" ইনায়া নিজেই আবার মাথা নেড়ে বলল, "না, ইষানের এত সাহস নেই যে সে তোমার গায়ে হাত তুলবে।"
অ্যারিস ইনায়ার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়ে হাসল। তবে সে আসল কথাটি ভাঙল না, শুধু ইনায়ার গালে একটা গভীর চুমু দিয়ে তার ভালোবাসার জানান দিল। ইনায়াও আর জোর করল না, সে জানে, সময় হলে অ্যারিস নিজেই সব বলবে।
খাওয়া শেষ করে অ্যারিস মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, — — — "আইরা কোথায়?"
— "মায়ের কাছে।" ইনায়া ছোট করে উত্তর দিল।
— "নিয়ে এসো ওকে, ওকে ছাড়া আমি ঘুমাতে পারব না।" অ্যারিসের কণ্ঠে এক অদ্ভুত আর্তি।
ইনায়া আইরাকে আনতে শাশুড়ির রুমের দিকে পা বাড়াল। আইরা তার বাবাকে দেখা মাত্রই খুশিতে হাত-পা ছুড়তে লাগল। অ্যারিসের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার সেই মিষ্টি সুরে ডেকে উঠল, "বা... বা..." অ্যারিস তার সমস্ত ব্যথা ভুলে মেয়েকে জাপটে ধরল, তাকে অজস্র চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল।

পরদিন সকাল .....
ইনায়া রোহানকে মেসেজ পাঠাল, "আরাফাত কোথায়?"
রোহানের উত্তর আসতে দেরি হলো না, "বস, সেদিন ইউনিভার্সিটিতে আসার পর থেকেই লোকটা হাওয়া। আমরা চারদিকে খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও ওর টিকিটাও পাওয়া যাচ্ছে না।"
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে লিখল, "ওর ব্যাপারে আর কে কে জানত?"
"আপনি আর আমি ছাড়া আর কেউ না।" রোহানের সংক্ষিপ্ত জবাব।
ইনায়া আর কথা বাড়ালো না, শুধু লিখলো, "ওকে।"

বিকালের দিকে এক চাঞ্চল্যকর খবর ছড়িয়ে পড়ল। পদ্মা নদীর পাড়ে এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। খুনি এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, চেনার উপায় না রাখতে পুরো শরীর এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। তবে ফরেনসিক আর ডিএনএ টেস্টের পর পুলিশ নিশ্চিত করল— লাশটি ২৪ বছর বয়সী আরাফাতের, যার বাসা ছিল মতিঝিলে।

খবরটা শুনে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। আপদ বিদায় হয়েছে! কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে খটকা লাগলো— এতটা নৃশংসভাবে তাকে কে মারতে পারে? পুলিশ অনেক তদন্ত করেও কোনো ক্লু পেল না, আর ইনায়াও আর বেশি মাথা ঘামাল না, মৃত মানুষ নিয়ে তার শোক করার সময় নেই। তার উপর হয় যদি শত্রু !
ঠিক তখনই তার পাশে অ্যারিস বসল। অ্যারিস ইনায়ার খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "সারপ্রাইজটা কেমন ছিল?"
ইনায়ার চোখের মনি স্থির হয়ে গেল। সে একবার টিভির পর্দার দিকে তাকাচ্ছে আর একবার শান্ত মেজাজে বসে থাকা অ্যারিসের দিকে। ইনায়া কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "এর মানে সেদিন তুমি ওকে শেষ করতে গিয়েই ইনজিউর্ড হয়েছিলে?"
অ্যারিস খুব স্বাভাবিকভাবেই মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ বলল। ইনায়া কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, "অনেক বেশি ব্যথা লেগেছে বুঝি?"
অ্যারিস আবার মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ বলে ইনায়া আদুরে গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "সব ভালো হয়ে যাবে, আর কষ্ট পেও না।"
অ্যারিস এবার পেছন থেকে ইনায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল, তার কাঁধে মুখ ডুবিয়ে একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "নাউ আই ফিল মেন্টাল পিস।"
_______________________________

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন