রাত অনেক হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিল।
ইসরাত রান্নাঘর থেকে ফল কেটে নিয়ে এসে টেবিলে রাখল।
— "এবার কেউ না বলবে না। এগুলোও শেষ করতে হবে।"
ফাহিম হেসে বলল,
— "তুমি কি আমাদের মানুষ ভাব, নাকি খাবারের ডাস্টবিন?"
— "অনেক কষ্ট করে কেটেছি। খেতেই হবে।"
সবাই হেসে উঠল।
সিফাত ফলের প্লেটটা ইসরাতের হাত থেকে নিয়ে বলল,
— "এত দৌড়াদৌড়ি করছ কেন? একটু বসো।"
— "আমি ঠিক আছি।"
— "তাও বসো। বাকিটা আমরা দিচ্ছি।"
ইসরাত আর কিছু বলল না। শুধু আস্তে করে সোফায় বসে পড়ল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
ইফরা সেটা দেখে মনে মনে হাসলেও কিছু বলল না।
এদিকে ইয়েরিন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। সবার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত ভাবে বারান্দায় যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
কেউ কিছু বলার আগেই সে বাইরে চলে গেল।
রাফিয়ানের চোখ অজান্তেই ওর যাওয়ার দিকে চলে গেল।
ফাহিম সেটা দেখে মুচকি হেসে বলল,
— "ভাই, কী দেখছেন?"
রাফিয়ান স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "কিছু না।"
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, মেয়েটা অন্যদের মতো নয়। সবাই যেখানে আড্ডায় মেতে আছে, সেখানে সে একা একটু নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইয়েরিন ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করছিল। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর এই প্রথম নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে।
ঠিক তখনই ইসরাত এসে পাশে দাঁড়াল।
— "কী রে, একা দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
— "এমনি। ভেতরে অনেক শব্দ লাগছিল।"
— "চল, আর পাঁচ মিনিট। তারপর সবাই মিলে ছাদে যাব।"
ইয়েরিন ছোট করে মাথা নাড়ল।
— "আচ্ছা।"
ভেতর থেকে সিফাতের ডাক ভেসে এল,
— "রাত! সবাইকে নিয়ে এসো।"
ইসরাত হেসে বলল,
— "আসছি!"
তারপর ইয়েরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "চল।"
দুজন একসাথে ভেতরে ঢুকে গেল।কিছুক্ষণ পর সবাই ছাদে উঠে গেল। রাতের হালকা বাতাসে গরমটা অনেকটাই কমে গেছে। চারপাশে ছোট ছোট আলোর ঝিলিক।
ফাহিম দুই হাত মাথার পেছনে রেখে বলল,
— "উফ! এমন আবহাওয়ায় আড্ডা না দিলে জমেই না।"
ইফরা হেসে বলল,
— "তুমি তো যেকোনো আবহাওয়াতেই আড্ডা দিতে পার।"
— "সেটাও ঠিক।"
সবাই হেসে উঠল।
ইসরাত ছাদের একপাশে রাখা টবের গাছগুলোতে পানি দেওয়া শুরু করতেই সিফাত এগিয়ে গেল।
— "আরে, এই রাতের বেলা এগুলো?"
— "সারাদিন সময় পাইনি।"
— "দাও, আমি দিচ্ছি।"
— "না, আমি পারব।"
সিফাত আর কথা না বাড়িয়ে ওর হাত থেকে পানির ঝাঁঝরিটা নিয়ে নিল।
— "দুই মিনিটের কাজ।"
ইসরাত একটু ভ্রু কুঁচকে তাকালেও কিছু বলল না। শুধু আস্তে করে অন্যদিকে গিয়ে দাঁড়াল।
ফাহিম মুচকি হেসে ইফরার কানে কানে বলল,
— "দেখছ? একজন কাজ খুঁজে বেড়ায়, আরেকজন কাজ করতে দেয় না।"
ইফরা হেসে বলল,
— "চুপ, শুনে ফেলবে।"
ওদের কথা শুনে ইসরাত চোখ রাঙিয়ে বলল,
— "আমি কিন্তু সব শুনতে পাচ্ছি!"
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।
এইসব হাসি-ঠাট্টার মাঝেও ইয়েরিন একটু দূরে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। কারও কথায় মাঝে মাঝে হালকা হাসলেও নিজে থেকে কিছু বলছিল না।
রাফিয়ানও বেশি কথা বলছিল না। তবে অজান্তেই তার চোখ মাঝে মাঝে ইয়েরিনের দিকেই চলে যাচ্ছিল।
হঠাৎ হালকা বাতাসে ইয়েরিনের চুল মুখের ওপর এসে পড়ল। বিরক্ত হয়ে সে হাত দিয়ে চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে নিল।
এক মুহূর্তের জন্য রাফিয়ান তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেরই খেয়াল হতেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
'কী হচ্ছে আমার?'
মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
ঠিক তখনই ফাহিম বলে উঠল,
— "একটা খেলা খেলব সবাই রাজি ?"
ইসরাত আগ্রহ নিয়ে বলল,
— "কী খেলা?"
— "ট্রুথ অর ডেয়ার!"
ইফরা সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলল।
— "তোমার মাথায় এসবই আসে।"
— "আরে, মজা হবে।"
সিফাত বলল,
— "আমার আপত্তি নেই।"
ইসরাতও হাত তুলল।
— "আমিও খেলব।"
ইফরা মাথা নেড়ে বলল,
— "ঠিক আছে, আমিও।"
সবাইয়ের দৃষ্টি এবার ইয়েরিনের দিকে গেল।
ইয়েরিন শান্ত গলায় বলল,
— "তোরা খেল। আমি দেখব।"
ফাহিম মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— "না না, সবাইকে খেলতে হবে।"
— "ইচ্ছা করছে না।"
এক কথায় উত্তর দিয়ে সে আবার আকাশের দিকে তাকাল।
ফাহিম আর জোর করল না।
রাফিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মেয়েটা যে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করে না, সেটা তার ভালোই বোঝা হয়ে গেছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ইয়েরিনের এই গম্ভীর স্বভাবটা তাকে বিরক্ত করার বদলে আরও কৌতূহলী করে তুলছিল।
আর ইয়েরিন?
রাফিয়ান যে মাঝেমধ্যে ওর দিকে তাকাচ্ছে, সেটা সে খেয়ালই করেনি। করলেও হয়তো গুরুত্ব দিত না।ফাহিম টেবিলের ওপর রাখা খালি কাঁচের বোতলটা হাতে নিয়ে বলল,
— "তাহলে শুরু করা যাক!"
সবাই গোল হয়ে বসে পড়ল। ইয়েরিন একটু দূরে বসেছিল। খেলতে রাজি না হলেও সবার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত বসে গেল।
ফাহিম বোতলটা ঘুরিয়ে দিল।
ঘুরতে ঘুরতে বোতলের মুখ এসে থামল ইফরার দিকে।
— "ট্রুথ নাকি ডেয়ার?"
— "ট্রুথ।"
— "এই বাড়িতে সবচেয়ে বেশি কাকে বিশ্বাস করিস?"
ইফরা এক সেকেন্ডও না ভেবে বলল,
— "রিন আর রাত।"
সবাই মাথা নাড়ল। উত্তরটা যেন আগেই জানা ছিল।
এরপর ইফরা বোতল ঘুরাল।
এবার সেটা গিয়ে থামল ফাহিমের সামনে।
কয়েক রাউন্ড হাসি-ঠাট্টা, ট্রুথ আর ডেয়ার চলল। ছাদের পরিবেশটা একেবারে জমে উঠল।
কিছুক্ষণ পর আবার বোতল ঘুরল।
এবার বোতলের মুখ এসে থামল ইসরাতের সামনে।
ফাহিম দুষ্টু হেসে বলল,
— "এইবার পালানোর রাস্তা নেই। ট্রুথ না ডেয়ার?"
ইসরাত একটু ভেবে বলল,
— "ট্রুথ।"
ফাহিম ঠোঁট কামড়ে হাসল।
— "আচ্ছা বলো... তুমি কি কাউকে পছন্দ কর?"
প্রশ্নটা শুনে ইসরাত একদম চুপ হয়ে গেল।
ইফরা আর ইয়েরিন একসাথে ওর দিকে তাকাল।
সিফাতও নিঃশব্দে ইসরাতের উত্তর শোনার অপেক্ষায় রইল।
কয়েক মুহূর্ত পর ইসরাত আস্তে করে বলল,
— "...হ্যাঁ।"
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— "কে?"
ইসরাত মাথা নাড়ল।
— "একটা প্রশ্ন ছিল। উত্তর দিয়ে দিয়েছি।"
ফাহিম প্রতিবাদ করল,
— "না না, নামও বলতে হবে।"
ইফরা হেসে বলল,
— "নিয়ম অনুযায়ী একটা প্রশ্নই করা যায়।"
ফাহিম মুখ বাঁকিয়ে চুপ করে গেল।
কিন্তু ইসরাতের লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর নিচু হয়ে যাওয়া চোখই অনেক কিছু বলে দিচ্ছিল।
ইফরা একবার সিফাতের দিকে তাকাল।
সিফাতও ইসরাতের দিকেই তাকিয়ে ছিল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
সবাই কিছু সময় আড্ডা দিল।
কিছুক্ষণ পর রাফিয়ান উঠে দাঁড়াল।
— "অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। এবার আমার ওঠা উচিত।"
ইফরা বলল,
— "এত তাড়াতাড়ি?"
— "কাল সকালে একটু কাজ আছে।"
ইসরাতও উঠে দাঁড়াল।
— "আচ্ছা, কিন্তু আবার আসবেন। পরেরবার আর এত অনুরোধ করতে হবে না।"
রাফিয়ান হেসে মাথা নাড়ল।
— "ইনশাআল্লাহ।"
সিফাত বলল,
— "চলুন, আমি গেট পর্যন্ত দিয়ে আসি।"
দুজন একসাথে বাইরে বেরিয়ে এল।
রাতের বাতাসটা বেশ ঠান্ডা। কয়েক মুহূর্ত দুজনই চুপচাপ হাঁটল।
হঠাৎ রাফিয়ান বলল,
— "ইয়েরিন এখন কেমন আছে?"
সিফাত একবার ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।
— "শারীরিকভাবে অনেকটাই ভালো।"
— "আর... মানসিকভাবে?"
— "মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ার মতো মেয়ে ইয়েরিন নয়। "
রাফিয়ান কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর ধীর স্বরে বলল,
— "বুঝতে পেরেছিলাম।"
সিফাত গেট খুলতে খুলতে বলল,
— "আপনি যদি কখনো ওকে রাগী বা অভদ্র মনে করেন, কিছু মনে করবেন না। ও ইচ্ছে করে এমন করে না।"
রাফিয়ান হালকা হাসল।
— "আমি তো ওকে অভদ্র মনে করিনি।"
বরং... ওর নীরবতার পেছনে যে
একটা গল্প আছে, সেটাই বেশি মনে হয়েছে।
সিফাত কিছু বলল না। শুধু মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
রাফিয়ান গাড়িতে ওঠার আগে একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। দ্বিতীয় তলার একটি বারান্দার পর্দা হালকা নড়ে উঠল। কেউ আছে কি না বোঝা গেল না।
তবুও অকারণেই তার মনে হলো, হয়তো ইয়েরিন এর ঘর ওইটা।
পরক্ষণেই নিজেই নিজের ভাবনায় হেসে ফেলল।
— "আচ্ছা, আমি চলি।"
— "সাবধানে যাবেন, ভাই।"
গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে থেকে চলে গেল।
সিফাত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ফিরে এল। আর অজান্তেই, গাড়ির ভেতরে বসে থাকা রাফিয়ানের মনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল সেই কম কথা বলা, বিরক্ত মুখের মেয়েটির ছবি।
রাফিয়ান গাড়িতে বসেও ভাবতে লাগলো এই রহস্যময় মেয়েটির কথা,,এমন ভয়ানক গভীর জঙ্গলের মাঝে প্যালেস টা দেখতে একদম ভুতুরে!
রাফিয়ান প্রথমে জঙ্গলের রাস্তায় ঢোকার সাহসই পায় নি পরে ফাহিম একজন গার্ড কে পাঠিয়ে তাকে জঙ্গলের বাইরের রাস্তা থেকে নিয়ে এসেছে,,
রাফিয়ান একবার সিফাত কে জিজ্ঞেস করেছিল এমন গভীর জঙ্গলে জন মানবহীন জায়গায় কেন তারা এই প্যালেস বানিয়েছে?
উত্তরে সিফাত বলেছিল এটা ইয়েরিনের চয়েস সে নীরব পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে,,
প্যালেসের বাইরের সতর্ক গার্ড দের দেখেও রাফিয়ান বেশ অবাক ছিলো প্রত্যেকের হাতে বন্দুক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন কোনো শিকারী নিজের শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে,,
রাফিয়ানের কৌতুহলী দৃষ্টি দেখে সিফাত নিজেই বলেছিল এরা কেবল এই প্যালেসের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এখানে আছে,,
এরা সবাই ইয়েরিনের স্পেশাল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত,,
রাফিয়ান কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে সিফাত বলেছিল আমি জানি রাফিয়ান ইয়েরিন কে নিয়ে তোমার মনে অনেক কৌতুহল জন্মেছে তবে আমি বলবো তা এখানেই মাটি চাপা দিয়ে দাও,,ওর বিষয়ে বেশি জানতে চাওয়া বা বেশি কৌতুহল প্রকাশ করা মানে নিজের মৃত্যুকে নিজের দিকে ডাকা,,
রাফিয়ান কেবল সব অবাক হয়ে শুনেছিল,,তবে আর প্রশ্ন করে নি সে মনে মনে ভাবতে লাগলো কে এই ইয়েরিন এই গভীর জঙ্গলে থাকতে চাওয়া কোনো সাধারণ মানুষের ইচ্ছে হতে পারে না,, আর এই এত গার্ড আবার সিফাত বললো এই সব গার্ড গুলো ইয়েরিনের নিজের প্রশিক্ষণে তৈরি? সব প্রশ্ন ছাপিয়ে কেবল একটা কথা তার মনে জ্বলজ্বল করে উঠলো,সিফাতের বলা সেই কথা ইয়েরিনের বিষয়ে বেশি জানতে চাওয়া আর কৌতুহল প্রকাশ করা মানে নিজের মৃত্যুকে নিজের দিকে ডাকা,,এর মানে কি??
কে হতে পারে ইয়েরিন? যাকে ঘিরে এত রহস্য,,।।
হঠাৎ কোলাহল আর গাড়ির হর্ণ শুনে তার ভাবনা ছুটলো,,এতকিছু ভাবতে ভাবতে রাফিয়ান খেয়ালই করে নি যে সে শহরের রাস্তায় পৌঁছে গেছে,,
রাত প্রায় ২:১৭ এর দিকে রাফিয়ান বাড়িতে পৌঁছে বেল বাজালো কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা দরজা খুলে বললেন ,,,,
-"এই তোর আসার সময় হলো? কত করে বলি রাত বিরেতে এত বাইরে থাকবি না আমার চিন্তা হয়,,"
রাফিয়ান হেসে তার মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,,,
-"আরে মা এত চিন্তা করো না তোমার ছেলে এখন বড় হয়ে গেছে,, আচ্ছা মা এবার বলো তুমি ঘুমাও নি কেনো? তোমার শরীর তো বেশি ভালো না,,।।"
রাফিয়ান এর মা রুনিয়া বেগম বললেন,,
-" তুই বাইরে থাকলে আমার চিন্তায় ঘুম হয় না বাবা এত রাত করলি কেন??"
-" মা তোমাকে তো বলেই গেলাম আমার এক ফ্রেন্ড এর বাসায় আজ দাওয়াত ছিলো ওদের বাড়ি টা একটু দূরে তাই এত দেড়ি হলো,,।।"
-"আচ্ছা ঠিক আছে এবার ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড় আমিও ঘুমাবো,,"
রাফিয়ান সম্মতি জানিয়ে ঘুমাতে চলে গেলো..।।।