ফন্ট সাইজ:
থিম:
The rogue pair

পর্ব 38

লেখক: Farjana and fatema

চারপাশে তখন হাসি-ঠাট্টায় জমজমাট পরিবেশ।
হঠাৎ করেই পুরো জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেল।

ইফরা চমকে চারদিকে তাকাল।
পরমুহূর্তেই সামনের দিকটায় একটা আলো জ্বলে উঠল।
আলোর ফোকাস গিয়ে পড়ল একজনের ওপর।

সাদা রঙের শার্ট, সঙ্গে ব্রাউন ফরমাল প্যান্ট। হাতে একটা মাইক্রোফোন। ধীর পায়ে সে সবার সামনে দিয়ে এগিয়ে আসছে।

তার কণ্ঠে ভেসে এলো মৃদু সুর—
— "Happy birthday to you... Happy birthday to you... Happy birthday, happy birthday, happy birthday to you, my dearest..."

কণ্ঠটা কানে যেতেই ইফরা যেন পাথর হয়ে গেল।

তার শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল।

এই কণ্ঠ সে চেনে।

খুব ভালোভাবেই চেনে।

ইফরার চোখ স্থির হয়ে গেল সামনের মানুষটার দিকে।
লোকটাও ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে আসতে সরাসরি ইফরার চোখের দিকে তাকাল।

ইয়েরিন পুরো ব্যাপারটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই দেখছিল। কিন্তু ইসরাত, সিফাত আর ফাহিমের চোখে তখন স্পষ্ট বিস্ময়।
তারা যেন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না—এই লোকটা কে!

আর মেহরাব?

সে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। তার চোখে স্পষ্ট প্রশ্ন।

লোকটা কে?

তাকে তো সে আগে কখনো দেখেনি।

লোকটা ধীরে ধীরে ইফরার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট একটা বক্স বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
বক্সটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ভেতরে বেশ দামি কিছু রয়েছে।
ইফরা কয়েক মুহূর্ত বক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সেটা নিজের হাতে না নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইসরাতের হাতে দিয়ে দিল।
ইসরাতও অবাক হয়ে বক্সটার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইফরা এবার ধীর গলায় লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "কেন এসেছেন?"

লোকটার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— "আমি আসব না তো কে আসবে?"

উত্তরটা শুনে ইফরার মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে যেন এই ধরনের তেরামি মার্কা উত্তর একদমই আশা করেনি।
বিরক্তি, অস্বস্তি আর পুরোনো পরিচয়ের মিশ্র একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠল তার চোখেমুখে।
তবুও সে আর কিছু বলল না।
ইফরার নীরবতায় লোকটাও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

ঠিক তখনই ইয়েরিন মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— "Okay everyone, meet my new PA, Mr. Arman."

কথাটা শুনে আবার যেন এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল।
ইসরাত বিস্ফারিত চোখে আরমানের দিকে তাকিয়ে রইল।
সিফাত আর ফাহিমও একে অপরের দিকে তাকাল।

আর মেহরাব?

তার দৃষ্টি এবার গিয়ে থামল ইফরার মুখে।

ইফরার এই লোকটাকে চেনা, আর লোকটার ইফরার জন্মদিনে এভাবে এসে হাজির হওয়া—দুটো বিষয়ই তার মনে নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিল।

তবে সে কিছু বলল না।
শুধু নীরবে পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

পার্টি আবার আগের মতোই জমে উঠল।

কেউ গান চালিয়ে দিল, কেউ গল্পে মেতে উঠল, কেউ আবার কেক আর খাবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। ইসরাত আর সিফাত নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে, ফাহিমও কম যায় না—একটার পর একটা মজা করে সবাইকে হাসিয়ে তুলছে। ইয়েরিনও স্বাভাবিকভাবেই সবার সঙ্গে কথা বলছে।

শুধু ইফরাই যেন পুরো পরিবেশের বাইরে।

চারপাশে এত মানুষ, এত হাসি-আনন্দ—তবুও তার কিছুই যেন কানে ঢুকছে না।

সে এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। চোখের সামনে সবাইকে দেখলেও মনটা যেন অন্য কোথাও আটকে আছে।

আরমান।

নামটা বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

এতদিন পর হঠাৎ করে তার সামনে এসে দাঁড়াবে—এটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

ইফরা অজান্তেই একবার দূরে তাকাল।

আরমান তখন ইয়েরিনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার মুখে স্বাভাবিক হাসি, যেন আজকের এই উপস্থিতি একদমই সাধারণ কোনো ব্যাপার।

ইফরার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরে উঠল।

সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

ইসরাত কিছুক্ষণ ধরে ইফরাকে লক্ষ্য করছিল। অবশেষে কাছে এসে তার পাশে বসে কনুই দিয়ে আলতো ধাক্কা দিল।

— "এই, কী হয়েছে তোর?"

ইফরা চমকে তাকাল।

— "কিছু হয়নি তো।"

ইসরাত ভ্রু কুঁচকে বলল,

— "কিছু হয়নি মানে? এতক্ষণ ধরে তোকে দেখছি। সবাই যেখানে পার্টি করছে, সেখানে তুই এমন মুখ করে বসে আছিস কেন?"

ইফরা জোর করে একটা হাসি এনে বলল,

— "আরে কিছু না। একটু মাথা ধরেছে।"

ইসরাত বিশ্বাস করল না।

— "মাথা ধরেছে, নাকি অন্য কিছু?"

ইফরা এবার চুপ করে গেল।

কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে বলল,

— "ইসরাত, আরমান এখানে কেন এসেছে?"

ইসরাত অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

— "আমি কী করে জানব? তুই তো ওকে চিনিসই।  আর ওকে নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। ridiculous,,

ইফরা ঠোঁট কামড়ে নিচের দিকে তাকাল।

— "চিনি বলেই তো অবাক হচ্ছি।"

ইসরাত আর প্রশ্ন করল না। শুধু বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

এদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মেহরাবও ইফরার অস্বাভাবিক আচরণটা লক্ষ্য করছিল।

সারাদিন যে মেয়েটা এক মুহূর্তও চুপ থাকেনি, আজ সে এতটা চুপ কেন—বিষয়টা তার চোখ এড়ায়নি।

মেহরাব ধীরে ধীরে ইফরার দিকে এগিয়ে এসে বলল,

— "are you ok ?"

ইফরা মাথা তুলে তাকাল।

— "yess"

— "sure?"

— "হ্যাঁ। আমি ঠিক আছি।"

মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— "তোমাকে কিন্তু ঠিক মনে হচ্ছে না।"

ইফরা এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

— "বললাম তো ঠিক আছি। আপনি এত প্রশ্ন করছেন কেন?"

মেহরাব আর কিছু বলল না।

— "আচ্ছা।"

সে সরে গেল।

ইফরা আবার একবার আরমানের দিকে তাকাল।

আরমানও ঠিক সেই মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

দুজনের চোখাচোখি হতেই ইফরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

তার ভেতরের অস্বস্তিটা যেন আরও বেড়ে গেল।

এত মানুষ, এত আনন্দের মাঝেও আজ তার মনটা কেবল একটা কথাই ভাবছে—

আরমান কেন ফিরে এসেছে?

পার্টির ভিড়ের মধ্যেও মেহরাবের চোখ বারবার ইফরার দিকে চলে যাচ্ছিল। মেয়েটার মুখে হাসি থাকলেও বোঝাই যাচ্ছিল, আরমানের আসার পর থেকেই সে অস্বস্তিতে আছে।

অবশেষে মেহরাব আর চুপ থাকতে পারল না।

সে ইয়েরিনের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

— "ইয়েরিন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"

ইয়েরিন তখন হাতে একটা জুসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেহরাবের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

— "জিজ্ঞেস করার আগে বলুন, আপনার প্রশ্নটা আমার উত্তর দেওয়ার মতো কি না।"

মেহরাব ভ্রু কুঁচকাল।

— "আরমান কে?"

ইয়েরিন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

— "কেন? জানার এত আগ্রহ কেন?"

— "আগ্রহের কিছু নেই। শুধু আজকে ওকে প্রথম দেখলাম। আর ইফরার সঙ্গে ওর পরিচয় বেশ পুরোনো বলেই মনে হলো। তাই জিজ্ঞেস করলাম।"

ইয়েরিন ইচ্ছে করেই মেহরাবকে একটু খোঁচা দিয়ে বলল,

— "আপনি তো মাত্র কয়েকদিনের জন্য আমাদের বাড়িতে আছেন। এত কম সময়ে বাড়ির সবার ব্যাপারে এত খোঁজখবর নেওয়ার কী দরকার?"

মেহরাব শান্ত গলায় বলল,

— "কারও ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছি না। শুধু জানতে চেয়েছি।"

— "তাহলে জেনে কী করবেন?"

— "কিছুই না।"

ইয়েরিন এবার মুচকি হেসে বলল,

— "তাহলে না জানলেও তো আপনার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।"

মেহরাব এবার একটু বিরক্ত হলো।

— "ইয়েরিন, তুমি কি সব কথার উত্তর এভাবে ঘুরিয়ে দাও?"

— "আপনি যদি এমন প্রশ্ন করেন, তাহলে হ্যাঁ।"

মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— "ঠিক আছে। না বলতে চাইলে বলার দরকার নেই। কিন্তু এমনভাবে কথা বলার দরকার নেই।"

ইয়েরিন এবার জুসের গ্লাসটা টেবিলে রেখে সরাসরি তার দিকে তাকাল।

— "আপনিও কিন্তু খুব বেশি ভদ্রতার সঙ্গে প্রশ্ন করেননি।"

— "আমি তো শুধু আরমানের পরিচয় জানতে চেয়েছি।"

— "আরমান আমার নতুন PA। এতটুকুই জানলেই আপনার জন্য যথেষ্ট।"

মেহরাব অবাক হয়ে বলল,

— "আপনার personal assistant?

— "জি। কোনো সমস্যা?"

— "না। তবে ইফরার জন্মদিনে ওর এভাবে আসার বিষয়টা একটু অদ্ভুত লাগল।"

ইয়েরিন সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল মেহরাবের আসল কৌতূহল কোথায়।

ইচ্ছে করেই এবার আরও একটু খোঁচা দিয়ে বলল,

— "অদ্ভুত লাগার কী আছে? ইফরাকে চেনে, তাই এসেছে।"

মেহরাব চুপ।

ইয়েরিন আবার বলল,

— "বরং আপনার এত ভাবার কী আছে, সেটাই বুঝছি না।"

মেহরাবের কণ্ঠ এবার কিছুটা শক্ত হয়ে গেল।

— "আমি ভাবছি না।"

— "দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।"

— "আপনি যা মনে করেন করুন।"

ইয়েরিন হেসে বলল,

— "বাহ! তাহলে তো ব্যাপারটা বেশ মজার।"

মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল,

— "কী মজার?"

— "কিছু না। আপনি যেহেতু বলছেন ভাবছেন না, তাহলে ধরে নিচ্ছি সত্যিই ভাবছেন না।"

কথাটা বলেই ইয়েরিন সরে যেতে লাগল।

মেহরাব পেছন থেকে বলল,

— "ইয়েরিন।"

ইয়েরিন থেমে ফিরে তাকাল।

— "জি?"

— "তুমি ইচ্ছে করে আমাকে জ্বালাচ্ছো, তাই না?"

ইয়েরিনের মুখে এবার স্পষ্ট হাসি ফুটে উঠল।

— "অবশেষে বুঝলেন!"

মেহরাব বিরক্ত চোখে তাকিয়ে রইল।

— "তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে।"

ইয়েরিন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

— "আমিও তো তাই ভাবছিলাম।"

দুজনের কথাকাটাকাটি দেখে পাশ থেকে সিফাত আর ফাহিম একে অপরের  দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দাড়িয়ে রইল।।

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইফরা কিছুই বুঝতে না পেরে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

ইয়েরিন চলে যাওয়ার সময় মনে মনে মুচকি হাসল।

মেহরাব যে আরমানের ব্যাপারে অস্বাভাবিক রকম কৌতূহলী হয়ে উঠেছে—এটা তার চোখ এড়ায়নি।

আর এই বিষয়টা নিয়ে তাকে একটু জ্বালানো যাবে, এই সুযোগটা সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 38 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন