রাত তখন প্রায় বারোটা।
শহরের অন্যপ্রান্তে একটি বিশাল বাড়ির দ্বিতীয় তলার ঘরে বসে আছে মেহরাব।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ফাইলের দিকে তাকিয়ে মেহরাব ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।
তার চোখে বিরক্তি।
ইয়েরিনকে হারানো সহজ হবে ভেবেছিল সে।
কিন্তু মেয়েটা যতটা শান্ত, তার চারপাশের দেয়াল যেন তার থেকেও কয়েকগুণ বেশি শক্ত।
মেহরাব জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
— "সরাসরি আঘাত করে লাভ নেই..."
নিজের সাথেই নিচু স্বরে বললো সে।
— "ইয়েরিনকে হারাতে হলে আগে তার দুর্বল জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে।"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো।
— "আর প্রত্যেক মানুষেরই একটা না একটা দুর্বলতা থাকে, ইয়েরিন।"
সে জানতো না—
তার প্রতিটা কথা শুনতে না পেলেও তার প্রতিটা পদক্ষেপ কেউ একজন দেখছে।
---
প্যালেসে নিজের বিশাল ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে ইয়েরিন।
ঘরের আলো খুব একটা উজ্জ্বল নয়।
সামনের দেয়ালে লাগানো বিশাল স্ক্রিনে একের পর এক ফুটেজ ভেসে উঠছে।
মেহরাবের বাড়ির প্রতিটা কোণের দৃশ্য।
ইয়েরিনের এক হাত সোফার পাশে রাখা।
অন্য হাতে ধরা গ্লাসের ভেতরের পানীয়টায় ধীরে ধীরে বরফ নড়ছে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একটুখানি ঠান্ডা হাসি।
— "দুর্বলতা খুঁজছো?"
তার কণ্ঠ এতটাই শান্ত ছিল যেন সে কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে কথা বলছে।
— "খুঁজতে থাকো।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে মাথা সামান্য কাত করলো।
— "তবে একটা কথা মনে রেখো..."
তার চোখ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে উঠলো।
"তুমি যাকে হারানোর জন্য এত চেষ্টা করছো, তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ তার নখদর্পনে।
স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরটা আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
ইয়েরিন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
ঘড়ির দিকে তাকালো না।
কারণ সে জানে—
এই সময়টাই সঠিক।
---
প্যালেসের ভেতরে সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
করিডোরগুলো প্রায় নিস্তব্ধ।
ইয়েরিন ধীর পায়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
কালো পোশাকের ওপর একটি লম্বা ডার্ক ওভারকোট।
তার হাঁটার শব্দ পর্যন্ত যেন প্যালেসের দেয়ালগুলো গিলে ফেলছে।
সে সামনে না গিয়ে প্যালেসের একদম পেছনের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে এমন একটা অংশ ছিল—
যেটা প্যালেসের অন্য জায়গাগুলোর মতো সুন্দর নয়।
বরং অনেকটাই পরিত্যক্ত।
পুরোনো দেয়াল।
ধুলো জমে থাকা মেঝে।
আর একদম শেষ প্রান্তে একটি বন্ধ ঘর।
সাধারণ কেউ দেখলে হয়তো ভাবতো জায়গাটা একদমই অপ্রয়োজনীয় ।
ইয়েরিন দরজার সামনে এসে থামলো।
একবার চারপাশে তাকালো।
তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেল।
---
ঘরটার ভেতরটা অন্ধকার।
ইয়েরিন ভেতরে ঢুকতেই ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠলো।
চারপাশে ভাঙা চেয়ার।
পুরোনো টেবিল।
কিছু ভাঙা আলমারি।
ধুলো জমে থাকা কয়েকটি জিনিস।
সব মিলিয়ে দেখে মনে হবে—
এটা প্যালেসের সবচেয়ে মূল্যহীন একটা ঘর।
কিন্তু ইয়েরিনের চোখে এই জায়গাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সে ধীরে ধীরে ঘরের একপাশে রাখা ভাঙা আলমারিটার কাছে গেল।
আলমারিটার পাশে দেয়ালের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হাত রাখলো।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর—
দেয়ালের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ এলো।
পুরোনো দেয়ালের একটি অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।
তার পেছনে দেখা গেল—
একটি গোপন দরজা।
ইয়েরিনের ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে দরজার ভেতরে ঢুকলো।
দরজার ওপাশে ছিল লম্বা একটি অন্ধকার পথ।
পাথরের দেয়াল।
নিচু আলো।
নিস্তব্ধতা।
ইয়েরিন কোনো তাড়াহুড়ো করলো না।
সে ধীরে ধীরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো।
অনেকটা পথ পেরিয়ে সামনে দেখা গেল ছোট একটি দরজা।
দেখতে সাধারণ।
কিন্তু তার ওপাশে ছিল এমন একটা জগৎ
যেটা ইয়েরিনের নিজের তৈরি মানচিত্র।
দরজাটা খুলতেই দেখা গেল নিচের দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ি।
অনেক নিচে।
মাটির গভীরে।
ইয়েরিন ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগলো।
তার চোখে কোনো ভয় নেই।
কারণ এই অন্ধকারটা তার কাছে অপরিচিত নয়।
---
অনেকটা নিচে নেমে শেষ সিঁড়িটায় পা রাখতেই সামনে বিশাল এক করিডোর দেখা গেল।
এটা কোনো সাধারণ বেসমেন্ট নয়।
মাটির নিচে তৈরি এক সম্পূর্ণ গোপন জগৎ।
করিডোরের দুপাশে একের পর এক বন্ধ দরজা।
কোথাও কঠোর নিরাপত্তা।
কোথাও গোপন নকশা আর বিশেষ যোগাযোগের ব্যবস্থা।
কোথাও এমন কিছু রহস্য—
যেগুলোর অস্তিত্ব বাইরে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
আর পুরো জায়গাটার কেন্দ্রবিন্দু—
ইয়েরিন।
তার পায়ের শব্দ শুনে করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন লোক সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
তাদের চোখে সম্মান।
কিন্তু তার থেকেও বেশি—
সতর্কতা।
ইয়েরিন কারও দিকে তাকালো না।
শুধু শান্ত কণ্ঠে বললো—
— "সব রিপোর্ট আমার রুমে পাঠাও।"
একজন নিচু স্বরে বললো,
— "জি, ম্যাম।"
ইয়েরিন থেমে গেল।
ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।
— "আর মেহরাব রাফসান?"
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
— "তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।"
ইয়েরিনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।
— "নজর রাখার দরকার নেই।"
লোকটা অবাক হয়ে তাকালো।
ইয়েরিন সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললো—
— "বেশি ভেবো না শুধু তোমার দায়িত্ব টুকু পালন করো।
কিছুদূর গিয়ে সে আবার থামলো।
মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো।
তার চোখে তখন এমন এক শান্ত আত্মবিশ্বাস—
যেটা দেখে যে কেউ বুঝে যাবে—
এই নারী কখনো শুধু খেলায় অংশ নিতে আসে না।
সে খেলার নিয়মও নিজের মতো তৈরি করে।
— "কারণ আসল মজা তখনই..."
একটু থেমে ইয়েরিন মৃদু হাসলো।
— "যখন শিকার বুঝতেই পারে না, সে কখন থেকে শিকার হয়ে গেছে।"
কথাটা বলে সে সামনে এগিয়ে গেল।
আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নীরবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
মাটির নিচের সেই বিশাল অন্ধকার জগতে—
ইয়েরিনকে তখন আর শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী মনে হচ্ছিল না।
মনে হচ্ছিল—
পুরো অন্ধকার জগতটার সবচেয়ে শান্ত...
সবচেয়ে রহস্যময়...
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক মাস্টারমাইন্ড ইয়েরিন।
[ তোমরা একটু বেশি বেশি রেসপন্স কইরো নয়তো নতুন পার্ট আপলোড দিতে ভালো লাগে না 🙂🙌 ]