প্যালেসের একদম পেছনের সেই গোপন জায়গাটার অস্তিত্ব মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন মানুষই জানে।
অন্ধকারের মাঝে মাটির নিচে তৈরি ঘরগুলো যেন একেকটা নতুন রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
ইয়েরিন ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে একটি কক্ষের সামনে দাঁড়ালো।
সেই দরজার উপরে কিংবা আশেপাশে কোনো কিছুই লেখা নেই। এখানকার প্রতিটি দরজাই দেখতে একই রকম। কোনো চিহ্ন নেই, কোনো নাম নেই, নেই কোনো পরিচয়।
তবে ইয়েরিন কোনো দিকে না তাকিয়েই নির্দিষ্ট সেই দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলো।
আগের রুমটার তুলনায় এই কক্ষটা বেশ বড়।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার ফাইল আর কাগজপত্র। কিছু ফাইল টেবিলের ওপর, কিছু আলমারিতে সাজানো, আবার কিছু এমনভাবে রাখা যেন অনেকটা সময় কেউ সেগুলো স্পর্শ করেনি।
ইয়েরিন ভেতরে গিয়ে ধীরে একটি কালো সোফায় বসতেই মাথা নিচু করে একজন লোক কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো।
— "ম্যাম, একটা নতুন অর্ডার এসেছে। একটু দেখুন প্লিজ।"
ইয়েরিন কোনো কথা না বলে লোকটার হাত থেকে ফাইলটা নিলো।
এই কোম্পানি থেকে প্রায়ই তাদের কাছে অর্ডার আসে। তবে এবারের অর্ডারটা অন্যবারের তুলনায় বেশ বড়।
প্রায় কোটি টাকার অর্ডার।
ইয়েরিন কয়েক মুহূর্ত ফাইলটা মনোযোগ দিয়ে দেখলো। তারপর ধীরে ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে বললো,
— "ওদিকের কী খবর? সব মাল ঠিকঠাক যাচ্ছে?"
লোকটা মাথা নিচু করেই বললো,
— "জি ম্যাম। আপাতত কোনো সমস্যা হয়নি।"
— "ওকে। এই অর্ডারটা কনফার্ম করে দাও।"
ইয়েরিনের কথা শুনে লোকটা সামান্য দ্বিধায় পড়ে গেলো।
— "ম্যাম... এতগুলো জিনিস একবারে পাঠানো একটু রিস্ক হয়ে যাবে।"
ইয়েরিন এবার তার দিকে তাকালো।
— "রাহিদ কোথায়?"
— "ম্যাম, ও আগের মালগুলো পৌঁছে দিতে গেছে।"
— "ঠিক আছে। অর্ডারটা একবারেই যাবে। ঝামেলার বিষয় আমি দেখে নেবো।"
কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বললো,
— "আর পেমেন্ট?"
— "ওনারা বলেছেন, আপনি রাজি থাকলে অর্ধেক পেমেন্ট আগেই করে দেবে।"
ইয়েরিন ঠান্ডা চোখে ফাইলটার দিকে তাকিয়ে বললো,
— "ওদের বলো, ফুল পেমেন্ট আগে দিয়ে নিতে পারলে নেবে। নয়তো অর্ডার ক্যানসেল।"
— "জি ম্যাম।"
লোকটা মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই ইয়েরিন আবার তাকে ডাকলো।
— "শোনো।"
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলো।
— "জি ম্যাম?"
ইয়েরিন সোফায় হেলান দিয়ে ধীর কণ্ঠে বললো,
— "এবারের অর্ডারটা নিয়ে খুব সাবধান থাকবে একটা ভুলও মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।"
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
— "জি ম্যাম, বুঝতে পেরেছি।"
— "ভালো।"
লোকটা চলে যেতেই পুরো কক্ষটা আবার নীরব হয়ে গেলো।
ইয়েরিন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো হয়তো শুধু কিছু কাগজপত্রই মনে হবে।
কিন্তু এই কাগজগুলোর প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন সব নাম, এমন সব চুক্তি আর এমন কিছু গোপন লেনদেন—যার খবর এই প্যালেসের বাইরের মানুষদের জানার কথা নয়।
প্যালেসের উপরে সবাই ইয়েরিনকে চেনে দেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানির মালিক হিসেবে।
একজন সফল ব্যবসায়ী।
একজন কঠিন স্বভাবের সিইও।
কিন্তু মাটির নিচের এই জগতটার কথা খুব কম মানুষই জানে।
আর যারা জানে...
তারা সবাই ইয়েরিনের প্রতি বিশ্বস্ত।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা কালো ফোনটা বেজে উঠলো।
ইয়েরিন ধীরে ফোনটার দিকে তাকালো।
এই ফোনে খুব বেশি মানুষের যোগাযোগ করার অনুমতি নেই।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে কল রিসিভ করলো।
— "বলো।"
ওপাশ থেকে শান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো,
—" নতুন অর্ডারটা দেখেছেন?"
ইয়েরিন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে বললো,
—" দেখেছি।"
— "এত বড় অর্ডার একসাথে নেওয়াটা কি ঠিক হবে?"
ইয়েরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
— "আমি কখন থেকে ঠিক-বেঠিকের হিসাব করে ব্যবসা করছি?"
ওপাশের মানুষটা চুপ করে গেলো।
ইয়েরিন টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে আবার বললো,
— "আমাদের কাছে যারা আসে, তারা সবাই একটা বিষয় জানে।"
—" কি ম্যাম?"
— "আমরা যা কথা দেই, সেটা রাখি। কিন্তু তার বদলে আমাদের পাওনাটাও পুরোটা চাই।"
— "আর যদি তারা রাজি না হয়?"
ইয়েরিনের চোখ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এলো।
— "তাহলে তারা অন্য কোথাও যাবে।"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ইয়েরিন ধীর কণ্ঠে বললো,
— "আর একটা কথা মনে রেখো..."
—" জি ম্যাম।"
— "এই ব্যবসা নিয়ে কেউ বেশি জানার চেষ্টা করবে না। যতটা তোমার কাজ ততটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকো।"
ওপাশের মানুষটা এবার কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— "বুঝতে পেরেছি ম্যাম।"
কলটা কেটে দিয়ে ইয়েরিন ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিলো।
তারপর ধীরে একটি কালো ফাইল নিজের দিকে টেনে নিলো।
ফাইলটার ভেতরে কয়েকটি কোম্পানির নাম লেখা।
তবে প্রতিটি কাগজের একদম নিচে একই চিহ্ন।
Y.
ইয়েরিন কিছুক্ষণ সেই অক্ষরটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা ঠান্ডা হাসি ফুটিয়ে ফাইলটা বন্ধ করে দিলো।
এই ব্যবসার নিয়ম খুব সহজ।
বিশ্বাস নিয়ে কাজ শুরু হবে।
কিন্তু বিশ্বাস ভাঙলে...
ফিরে আসার পথটা আর আগের মতো সহজ থাকবে না।
ঠিক তখনই দরজায় তিনবার শব্দ হলো।
ইয়েরিন কোনো দিকে না তাকিয়েই বললো,
— "ভেতরে আসো।"
দরজা খুলে একজন লোক দ্রুত ভেতরে ঢুকলো।
তার মুখের অস্বাভাবিকতা দেখেই ইয়েরিনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেলো।
— "কী হয়েছে?"
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু কণ্ঠে বললো,
— "ম্যাম... আমাদের আগের একটা চালান নিয়ে কেউ খোঁজ নেওয়া শুরু করেছে।"
কক্ষের ভেতরের পরিবেশ মুহূর্তেই যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেলো।
ইয়েরিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।
—" কে?"
লোকটা নাম বলার আগেই ইয়েরিনের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
তবে সেই হাসিতে আনন্দের কোনো ছাপ ছিল না।
— "আমি জানতাম... একদিন কেউ না কেউ আসবেই। অবশেষে তুমি এগোচ্ছো।"
লোকটা অবাক হয়ে ইয়েরিনের দিকে তাকালো।
ইয়েরিন ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
— "রাহিদ ফিরলে তাকে আমার কাছে পাঠাবে।"
— "জি ম্যাম।"
লোকটা দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
ইয়েরিন কিছুক্ষণ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে আবার সোফায় বসলো।
অন্ধকার কক্ষের নীরবতার মাঝে তার ঠোঁটের সেই ঠান্ডা হাসিটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
------
ঠিক তখনই আবার দরজায় শব্দ হলো।
— "ভেতরে আসো।"
একজন লোক ভেতরে এসে ইয়েরিনের সামনে একটি কালো খাম রেখে বললো,
— "ম্যাম, এটা একটু আগে আপনার জন্য এসেছে।"
ইয়েরিন খামটার দিকে তাকালো।
গাঢ় কালো খামের মাঝখানে সোনালি অক্ষরে লেখা—
Mahira Yerin
The Mafia of Mafias
ইয়েরিনের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
সে ধীরে খামটা খুললো।
ভেতরে থাকা কালো কার্ডটায় লেখা—
Tomorrow Night
The Underworld Gathering
A special invitation awaits the Mafia of Mafias.
নিচে শুধু একটি ঠিকানা আর সময় দেওয়া ।
ইয়েরিন কার্ডটা কিছুক্ষণ দেখে ঠান্ডা গলায় বললো,
— "বেশ... দেখা যাক, কাল রাতে কারা ইয়েরিনের জন্য এত বড় আয়োজন করেছে।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে আবার বললো,
— "ইফরার জন্যও সবকিছু রেডি রাখবে। কাল রাতে ও আমার সাথেই যাবে।"
— "জি ম্যাম।"
ইয়েরিনের ঠোঁটের কোণে ধীরে সেই পরিচিত ঠান্ডা হাসিটা ফুটে উঠলো।
[ তোমরা প্লিজ বেশি বেশি রেসপন্স কইরো 🙂🤏]