"ও মেয়ে স্কুল পাশ দিয়ে করবে টা কি? চাকরি করে কি আমাদের মুখে দু মুঠো ভাত দিয়ে বলবে, নাও মামি খাও। অনেক তো খেলাম, পড়লাম তোমাদের। এবার একটু ঋণ শোধ করি।"
"ক্ষেপেছো কেন সুলেখা?"
"ক্ষেপার কি কম কারণ রয়েছে বলছো?"
তমিজ শেখ খাবার শেষ করে হাত ধুতে ধুতে বলেন,"যতই কারণ থাকুক,মেয়েটারে দোষ দেই বা কি করে বলো? কপালে সুখ নেই জন্য স্বামী বাঁচল না। এখন পড়াশোনা করতে চাইছে ফের, করুক না।"
সুলেখা শব্দ করে ডালের বাটিটা রাখে। গলার স্বর বাড়িয়ে মেঘনূরের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে,"বিদ্ব্যান হয়ে কি দেশসেবা করবে? মাস্টারগিরি করবে? বলি, তোমার মেয়েটাও যে বড় হচ্ছে সেদিকে খেয়াল আছে তো? নাকি একজনকেই মাথায় চড়িয়ে নাচবে?"
"চটছো যে,খরচা তো আর আমরা দিচ্ছি না।"
"তো কে দিবে?"
তমিজ শেখ পানি পান করে ভরাপেটে বিছানো পাটিতে আরাম করে বসেন। দাঁত খিলান করতে করতে হাসি হাসি মুখ করে বলেন,"শিকদার বাড়ি হতে খরচা আসবে। তারা নূরের ভরণপোষণের জন্য দায়িত্ব নিয়েছে। যদি জানে, তাদের পুত্রবধূ ফের পড়াশোনা করতে চায় তাহলে তারাই সে খরচা দিবে। আমাদের কানাকড়িও খরচা হবে না।"
সুলেখার কন্ঠ নেমে আসে তরতর করে । মাথার উপর জ্বলন্ত বাল্বের আলোতে মুখ তার চকচক করে উঠে। অবাক চোখে তাকাতেই তমিজ শেখ মাথা নাড়িয়ে হাসে।
"বলছো কি গো তুমি? এ কি সত্যি?"
"সত্যি।"
"কত দিয়েছে?"
"মাস খরচা বেশ দিয়েছে। বলেছে শেষ তারিখে শিকদার বাড়ির মেজ সাহেবের সাথে দেখা করতে।"
"কতদিন এমন চলবে?"
"যতদিন না কোন গতি হচ্ছে।"
সুলেখার তিরিক্ষি মেজাজ এক লহমায় শান্ত হয়ে যায়। মুখে ফোটে উজ্জ্বল হাসি। নরম গলায় ধীর কন্ঠে বলে,"তাহলে আর বলছো কি! এর মধ্যে আমার মেয়েটার বড় ঘর দেখে একটা আগে গতি করে নেই। তারপর যা হয় দেখা যাবে। ওতো তাড়া কিসের? পড়তে চাইছে, পড়ুক না।"
"সুযোগ দেখে গলে গেলে চলবে না সুলেখা। তোমারও একটু সাবধান হতে হবে। সোনার ডিম পাড়া হাঁস আমাদের নূর৷ ওর সাথে ঝগড়াঝাটি একটু কম করে করো। পাছে মেয়ে যদি বলে, চললাম শ্বশুরবাড়ি এখানে আর থাকছি না। তখন কিন্তু সব হারাতে হবে।"
"না..না। যেতে দেওয়া যাবে না। ও মাথা খারাপ মেয়ের সঙ্গে আমি আর লাগতে যাবো না৷ কাজের কাজ তো ঠিকই করে। শুধু শুধু বিবাদে জড়িয়ে কি লাভ? "
"বুঝতে পেরেছো যেহেতু তাহলে আর কথা বাড়াচ্ছি না। খেয়েছে?"
"না।"
"ডাকো শিগগির ।"
সুলেখা ডাকার জন্য উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কি একটা ভেবে আবার বসে পড়ে। মুখে হাসি বিদায় করে কপাল ভাঁজ করে বিরক্ত গলায় বলে,"একটা না হয় সোনার ডিম পাড়া হাঁস পেয়েছি গো মহুয়ার বাপ। কিন্তু তোমার ভাগ্নেকে কি করবে বলো? ওকে এমন করে বসে বসেই খাওয়াবে বুঝি? এর থেকে তো কানাকড়িও আসছে না।"
"বেশি লোভে পড়ো না সুলেখা। মৃদুলকে দিয়ে আমি যে খাটুনি খাটাই, আমার বাকি দুই কর্মচারী ওর ধার ঘেঁষতে পারে না। চুপ আছে ভালো আছে। যা বলছি করে চলেছে। বোন বিয়ে দিয়ে যে এতো টাকা কড়ি আসছে ও ছেলে এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না।"
"বলো কি? ও তোমার সাথে ছিলো না?"
"দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম মাথা খাটিয়ে। আর আমার দোকানের হিসাব পত্তর সব ওই দেখাশোনা করছে। কোনদিন এক পয়সা এদিক সেদিক করেনি। এমন ভরসা্যোগ্য ছেলে এ যুগে পাবে?"
সুলেখা ফের নমুজ হয়ে যায়। মুখ দিয়ে বের হয় না কোনো কথা। তমিজ শেখ স্ত্রীর পানে তাকিয়ে বলেন," দুটোই সোনার ডিম পাড়া হাঁস। সময় থাকতে কাজে লাগিয়ে নেই। তারপরে যা হবে দেখা যাবে। কদিন পর তো মৃদুল চাইবে বিয়ে করতে, তখন কি আর পারবো বলো?"
"শোনো গো, যাই করো তাই করো। ও ছেলে বিয়ে করলে কিন্তু আলাদা খাবে। আমি কিন্তু পারবো না আর ভাত দিতে।"
"দিতে বলেছে কে?"
"মনে থাকে যেন।"
"থাকবে থাকবে। যাও এখন, মেয়ে দুটোকে খেতে ডাকো। রাত তো অনেক হলো। মৃদুল আজ আর ফিরবে না রাতে। মোকামে পাঠিয়েছি।"
----------------------------------------------------
মাথার উপরে লম্বা তারের সঙ্গে ঝুলছে বাল্ব। হলুদ রঙের আলোতে পুরো ঘর ছেয়ে আছে চারদিকটা জুড়ে। ছোট্ট ঘরটাতে খাটের উপর দু পা আড়াআড়ি ভাঁজ করে আধশোয়া হয়ে আছে এক রমণী। মুখে কলম ঠেকিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খাতার দিকে।
" জাদুবিদ্যা করে মানুষ বশ করা যায়, অংক বশ করা যায় না কেন?"
"আবার শুরু করলি তুই?"
"মজা করছি না আমি। সত্যি বলছি, যদি করা যায় তো সামনের আমাবস্যার রাতে মন্ত্র পড়ে এই হতচ্ছাড়া অংকগুলোকে মাথায় ঢুকিয়ে নিবো।"
মহুয়া খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে। দু পা ভাঁজ করে খাতার পৃষ্ঠা উল্টিয়ে অংকের সমাধান করতে করতে বলে,"শাদাব ভাইকে বলিস বুঝিয়ে দিবে।"
"যমের কাছে জেনেশুনে ধমক খেতে যাবো? তার চেয়ে এ অংক আমার না বোঝাই ভালো।"
"হ্যাঁ রে নূর..।"
"কি?"
"শাদাব ভাইকে কেমন লাগে তোর?"
"অংক মাস্টারদের কখনো কারো ভালো লাগে?"
মহুয়া কলম থামায়। চোখ তুলে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলে,"আমার তো বেশ লাগে।"
"অংক পারলে ভালো তো লাগবেই। আমার মতো হলে ভালো লাগতো না।"
"অংক ছাড়াও ভালো লাগে।"
"মানুষ হিসেবে ভালো মানুষকে ভালো লাগা স্বাভাবিক।"
"আমার তাকে সবদিক থেকে ভালো লাগে।"
মেঘনূর কোন প্রতিত্তুর করে না। সে তার একখানা কুচুটে অংক নিয়ে ব্যস্ত। সমাধানের আগো গোড়া খুঁজে পাচ্ছে না। এই নিয়ে নির্ঘাত তাকে কাল শাদাব ভাই এর ধমক শুনতে হবে।
"আমি বুঝি না, গায়ের হাওয়া বাতাস লাগিয়েও এই লোকটা এতো সুন্দর ফর্সা কেমন করে হয়। অথচ আমাদের দেখ কাল নাগিনী ভুতনি।"
"ঢঙের জুড়ি নেই তোর মহু । আর কত চাস ফর্সা হতে?"
মহুয়া লাজুক হাসে। ধীর কন্ঠে বলে,"শাদাব ভাইয়ের মতো।"
"ফর্সা মানুষ যারা তারা শুধু ফর্সাই হতে চায়। অথচ আমায় দেখ, শ্যামলা হয়েও ওসব মাথায় আসে না৷ মাঝে মাঝে অবশ্য সাবান দিয়ে ডলি, তা কাজের কাজ হয় না। খোদা যা দিয়েছে এই খুশি।"
"তুই শ্যামলা হলে কি, চেহারা তো তোর পূর্ণিমার চাঁদ।"
"চেহারার চেয়ে গায়ের রঙের কদর বেশি৷"
"সত্যি বলছিস?"
"সত্যি কি না জানি না। চোখে যতটুকু দেখেছি সেই ভেবে বললাম।"
মহুয়া বই খাতা বন্ধ করে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। চোখ তার জ্বলজ্বল করছে। গায়ের রঙ তার ফর্সার কাতারে বেশ পড়ে। মেঘনূরের সাথে তুলনা করলে যে কেউ বলবে এ মেয়ে ঢের ফর্সা৷ আর সাদা চামড়ার মূল্য যে কতখানি সেটা তার ভালো করেই জানা। সাদা চামড়া হলেই মানুষের নজরে আসতে তেমন কোনো অযুহাত লাগে না। আর এই সুখেই সে অধীর স্বপ্ন বোনে কাউকে নিয়ে।
"ও নূর অনেক তো হলো পড়া। এবার চল মা দুটো খেয়ে নে।"
সুলেখার মিষ্টি স্বরে মেঘনূর মহুয়া একসঙ্গে তব্দা খেয়ে উঠে। অবাক নয়নে একে অপরে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। ছোট হতে বড় বেলা অব্দি মামির মুখে এতো মিষ্টি সুরে ডাক কখনো শুনেছে কি না মনে পড়ে না মেঘনূরের। কেননা তীর্যক বাণী, ঝগড়াঝাটি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। একদন্ড মিল পরে না দুজনের। আর সেই কি না আজ এতো মধু মিশিয়ে ডাকছে?
শুকনো ঢোক গিলে মেঘনূর। বিস্মিত গলায় বলে," আবার কি ফন্দি এঁটেছো মামি?"
মহুয়া মেঘনূরের কথা শুনে হাতে চিমটি কাঁটে। চামড়ার উপর নখের আঁচড় পড়তেই মেঘনূর কপাল কুঁচকে বলে, "উহঃ এত জোরে চিমটি কাটছিস কেন? ভুল কি বলেছি? গেলো কয়েকশত বছরে মামি ফন্দি আঁটা ছাড়া কখনো আমার সাথে ভালো করে কথা বলেছে ?"
মহুয়া নিরুত্তর হয়ে মায়ের পানে তাকায়। সুলেখা মেঘনূরের কথা এই প্রথম আমলে নেয় না। নিজেকে বোঝায়, সোনার ডিম পাড়া হাঁস একটু ছটফট, জ্বালাতন করবেই। তাই বলে তো আর অবলা প্রাণীর সঙ্গে লাগতে যাওয়া যাবে না। একটু হজম করা শিখতেই হবে।
"ওমন বলছিস কেন রে মা? আমি তোর মামি হই না? মামিরা কি পর হতে পারে?"
"দুনিয়াতে মা ছাড়া কেউ কারো আপন হতে পারে না। তুমি তো সেখানে মামি.."
"ওমন বলতে নেই মা। আয় খাবি আয়। রাত তো অনেক হলো।"
"কি কাজ করতে হবে সেটা বলো। কাল সকালে আমার পড়তে যেতে হবে। সময় পাবো না। আদা পেঁয়াজ বাটনা বাটতে হবে তো?"
সুলেখা মুখে বিস্তর হাসি টেনে বলে,
"ও আমি বেঁটে নিতে পারবো। তোর করতে হবে না।"
মেঘনূর বই খাতা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। শাড়ির আঁচল টেনেটুনে ঠিক করে বলে,"এখন ভালো সেজে বলছো,কাল সকাল না পেরোতেই ঝগড়া লাগিয়ে বলবে,বাটা ঘষা কেন করে দিলাম না৷ বসে বসে শুধু আমি আর আমার ভাই তোমাদের অন্ন ধ্বংস করছি। ওতো ভালো সাজার দরকার নেই মামি্। যতদিন এ বাড়ি আছি, কাজ আমার করে খেতেই হবে। বসে বসে বাপ মা ছাড়া কেউ ভাত দিবে না। চলো।"
সুলেখা কথা বাড়ায় না। বরং মনে মনে খুশি হয়। বোকাসোকা মেয়ে হলেও কাজের জায়গায় বেশ বুদ্ধিমতি। কেমন বুঝে নিলো বাটা ঘষা তাকেই করতে হবে। যাক বাঁচা গেলো তবে।
মেঘনূর ঘরের দোর পেরোতে গিয়ে হুট করে পা থামিয়ে ফেলে। কিছু একটা ভেবে মামির দিকে সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে বলে, " আজ খাওয়ার জন্য এতো আদর করছো। ভাতে আবার বিষ টিষ মেশাওনি তো?"
সুলেখা মুখে আঁচল চেপে অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠে। ভেজাগলায় বলে,"এতোবড় কথা বলতে তোর দিল কাঁপলো না নূর? আমাকে তুই এতোটা পাষাণ ভাবিস? আমি তোর ভাতে বিষ মেশাবো?"
মেঘনূর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,"আমার বিশ্বাসটুকু ভেঙেচুড়ে ফেলেছো তুমি মামি। তাই মাঝে মাঝে ভয় হয়।"
"এজন্য তুই খাওয়ার আগে এক মুঠো তরকারি মাখা ভাত আগে মিনিকে খাওয়াস তাই না?"
মহুয়ার সরু চোখের প্রশ্নে মেঘনূর খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। শাড়ির আঁচল নাচিয়ে যেতে যেতে বলে,"জানের ভয় কার না আছে।"
--------------------------------------------
"তুই এমন কেন রে নূর? মা যখন একটু ভালো করে কথা বলে, তুই একটু পারিস না ভালো করে কথা বলতে?"
"মন থেকে ভালো করে কথা বললে বলতাম।"
"তুই বুঝি খুব বুঝিস কোনটা মন থেকে বলে আর কোনটা এমনি বলে?"
মেঘনূর শিল নোড়া দিয়ে পেঁয়াজ বাটতে বাটতে নাক টানে। পেঁয়াজের ঝাঁঝ তার চোখে জল এনে ছেড়েছে। মৃদু হেসে বলে,"আমি তোদের মতো ওতো বুঝে সুঝে কথা বলি না। আমার মনে যে জবান, মুখেও সেই জবান। এর হেরফের হয় না। তবে, এটুকু ঠিক বুঝতে পারি।"
"মায়ের সঙ্গে তোর বিরোধ কি মিটবে না কোনদিনও?"
"বিরোধ কিসে? সে আমায় বলে আমি তারে বলি। কাটাকুটি হয়ে যায়। চুপ তো আর থাকি না।"
মহুয়া মেঘনূরের পাশে পিঁড়ে টেনে বসে৷ নিকষ রাতে বারান্দা হতে মশলার ঘ্রাণ ছড়িয়েছে বেশ। পাশের জঙ্গল হতে ঝিঁঝি পোকা আর নেড়ি কুকুরের ডাক ভেঙে আসছে। অস্পষ্ট ঘোলাটে বাল্বের চারপাশে ছোট ছোট পোকারা ভীড় জমিয়েছে মাথার উপরে।
পেঁয়াজ বাটা শেষ করে মেঘনূর শুকনো মরিচে একটু পানি মিশিয়ে ফের বাটা শুরু করে। বাটতে বাটতে নোড়ার উপর শুকনো মরিচগুলো লাল টকটকে হয়ে উঠে। মহুয়া মরিচ বাটার তীব্র ঝাঁঝ সইতে পারে না। পিঁড়ি সরিয়ে একটুখানি পিছিয়ে বসে সে। অথচ মেঘনূর কি দিব্যি বেঁটে চলেছে। হাতের ডগা লালচে হয়ে হয়তো জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ মেয়ের কোনো হেলদোল নেই তাতে। সে আপনা কাজে ব্যস্ত।
নিস্তব্ধ রাতে বাড়ির পিছনের জঙ্গলে ঝুপ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ ভেসে আসে। মেঘনূর ততক্ষণে বাটা থামিয়ে সজাগ দৃষ্টি মেলে বলে,"তাল পড়লো?"
"হরি কাকার বাগান বাড়িতে পড়লো মনে হচ্ছে।"
"তুই একটু বস। আমি কুড়িয়ে নিয়ে আসছি।"
মেঘনূর উঠতেই মহুয়া হাত টেনে ধরে। সাবধানী চোখে তাকিয়ে বলে,"খবরদার যাবি না নূর,রাত অনেক হয়েছে। দেখছিস না কি ঘুটঘুটে অন্ধকার। জঙ্গলের মধ্যে সাপ পোকার আড্ডা এখন। আর হরি কাকা যদি টের পায়, দেখিস কাল ভোরেই বাবার কাছে নালিশ দিতে আসবে।"
"তোর ভয় তুই কাছে রাখ। সাপ পোকা, হরি কাকার সাধ্যি নেই মেঘনূরকে ধরার। তুই চুপ করে বসে থাক। আমি যাবো আর নিয়ে আসবো।"
"না করলে তো শুনবি না। যা তবে৷ আমি টর্চ ধরছি।"
" এখন না। ফেরার পথে সুপারি তলায় আমি ডাক ছাড়লে টর্চ ধরিস।"
মেঘনূর কোনমতে হাত ধুইয়ে শাড়ির আঁচলে হাত মুছে ছোটে তাল কুড়াতে। এই অন্ধকার রাতেও তার কোনো ভয়ডর নেই শরীরে। যেটা করতে চাইবে সেটা করেই ছাড়বে। অথচ সিকিভাগ লাভটুকু হয় না তাতে। এই যে তাল কুড়িয়ে আনবে ঠিকই ভাগে পাবে না আধখানাও।
মহুয়ার বেশ খারাপ লাগে মেঘনূরের জীবন দেখে। ভীষণ আফসোস হয়। তবে মুখ ফুটে বলতে পারে না কোনো কথা। হয়তো মায়ের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় সমবেদনা জানানো কিংবা সাহায্য করা হতে বিরত থাকতে বলা হয়েছে তাকে। ছোটবেলা হতে এই মেয়ে গাধার খাটুনি খেটে আসছে। এখন পর্যন্ত তা চলমান। পড়াশোনা নামে মাত্র। পরীক্ষার সময় সে নিজে সকাল বিকেল পড়ে। আর এই মেয়ে সারাদিন কাজ শেষে রাতে কি একটু গুনগুনিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ক্লান্ত শরীর তার আর চলে না। মহুয়ার মেধা তালিকায় নাম আসে উপরে আর মেঘনূরের নাম থাকে একদম শেষের দিকে। পার্থক্য আকাশ পাতাল।
তবুও মেঘনূর কি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বেঁচে থাকে। ওর যেন সবেতেই আনন্দ, সবেতেই সুখ। মুখ ফুটে কোন অভিযোগ নেই, কোনো বাহানা নেই। কাজ দেখে কোনো ভয় নেই। ও হেসেখেলে বেড়ায় গায়ের এ মাথা ছেড়ে ও মাথা। ওর দূরন্তপনা, অবুঝ কথাবার্তা, ডানা মেলে উড়ে চলাতে নেই কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম।
------------------------------------------------------
প্রভাতের রাঙা আলো পূর্বের আকাশে রঙিন হয়ে ফোটে। গাছে গাছে বাসা বাঁধা পাখিগুলো কিচিরমিচির স্বরে ডেকে উঠে আনমনে। দিনের শুরু হতেই হাঁকডাক আরম্ভ হয় চারদিক হতে। ও পাড়ার গোয়ালা বসুরাম পাল সকাল সকাল দুধ দুইয়ে সাইকেলে করে ছোটে হাটের দিকে। যাওয়াপথে তার কিরিং কিরিং বেলের আওয়াজ দিব্যি কানে এসে লাগে। কাঞ্চননী পাগলি এক ঝাঁক হাঁস তাড়াতে তাড়াতে পুকুর ঘাটের দিকে রওনা হয়। রাস্তার সাথে ঘর হওয়াতে প্যাক প্যাক আওয়াজে একটু ভালো করে ঘুম হওয়ার জো নেই।
মহুয়ার ঘুম না ভাঙলেও মেঘনূর উঠেছে আজ বেশ সকাল করে। উঠোন ঝাঁট, বাসন মাজাসহ সকালের যাবতীয় কাজ একহাতে সেড়ে কলপাড়ে যায় পরিষ্কার হতে। হালকা নীল রঙের একখানা শাড়ি পরেছে সে। আঁচল সুন্দর করে ভাঁজ করে কাঁধে এঁটে নেয়ছে। লম্বা চুলগুলোতে করেছে বিনুনি। শ্যামলা মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা ছাড়া পড়ে না কোন প্রসাধনীর ছোঁয়া।
"মহু উঠ..পড়তে যাবি না?"
"আর একটু পরে.."
"তুই থাক, আমি গেলাম তাহলে। সময় হয়ে গেছে।"
"একটু দাঁড়া।"
"এমনি পড়া পারি না। এটার জন্য ধমক খেতে হয়। এর উপর দেরি করে গেলে শাদাব ভাই আমাকে বলবে,তোর আর পড়তে আসতে হবে না। বেরিয়ে যা।"
মহুয়া চোখ খুলে মেঘনূরের আর্তনাদিত সুর শোনে। এক দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে লাফ দিয়ে উঠে সে। চোখ ডলতে ডলতে বলে,"আরেকটু আগে ডাক দিবি না? একটুখানি দাঁড়া চোখে মুখে পানি দিয়েই আসছি।"
"ভোর হতে ডাকলেও তুই উঠবি না।"
মহুয়া হাতে পায়ে তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে নেয়৷ পরনের শাড়িটা পাল্টে গায়ের রঙের সঙ্গে মানানসই বেগুনী রঙা সুতি একখানা শাড়ি পর। চুলগুলো মেঘনূরের দেখাদেখি সে নিজেও বিনুনি করে। বাপের তার কাপড়ের ব্যবসা। মাগুরা ডাঙা হাটখোলায় নিজস্ব দোকান। সেই সুবাদে অল্প বয়স হতেই শাড়ি পরার অভ্যাস গড়ে উঠেছে।
"চল..চল। হয়েছে।"
"নির্ঘাত আজ বকুনি খেতে হবে।"
---------------------------------------------------------
একাদশ শ্রেণির সকাল সাতটার ব্যাচে পড়ে নয়জন ছাত্র ছাত্রী। এখানে মোটামুটি সবাই নিয়মিত আসলেও আসে না শুধু মাত্র একজন ছাত্রী। সেটা হলো মেঘনূর। এক মাসের লম্বা সময়টাতে সে কামাই করে অর্ধেক দিনের মতো। কাজের বেলায় কোন বাহানা না থাকলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে তার হাজার বাহানা তৈরি হয়ে থাকে। এসব জটিল বিদ্যা তার নবপ্রস্ফুটিত মস্তিষ্ক নিতে পারে না। বরং সে মুক্তমনা পাখির ন্যায় ডালে ডালে উড়ে বেড়াতে চায়। সময় এবং নিয়মের কঠিন বেড়াজালের ভিতরে আবদ্ধ থাকা তার জন্য ভীষণ দূর্ভেদ্য।
শাদাব ভাইয়ের ইতিমধ্যে অংকের অধ্যায় খোলা শুরু হয়ে গেছে। বোর্ডে অংক তোলার মাঝে ছটফটিয়ে এসে হাজির হয় দুজন ছাত্রী। শাদাব এক পলক সেদিক চেয়ে নিজ কাজে মত্ত হয়। অবশেষে এই মেয়ে এলো তাহলে। মনে মনে তো ভেবেই নিয়েছিল আজকেও হয়তো আসবে না। নির্ঘাত কোনো বাহানা সাজাবে।
মহুয়া মেঘনূর শেষের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ে। টপাটপ বই খাতা বের করে অন্য সবার মতো অংক তুলতে লেগে পড়ে দ্রুত হাতে।
শাদাব সুন্দর করে স্পষ্ট ভাষায় বোর্ডে তোলা অংক ভেঙে ভেঙে বুঝায় প্রত্যেককে। একবার ছেড়ে বারেবারে বুঝায়। সবাই তার কথার তালে তালে মাথা নেড়ে সায় জানায়। মেঘনূর নিজেও চায় সায় জানাতে। কিন্তু কোথায় জানাবে বুঝতে পারে না। অথচ তার পাশে বসা মহুয়া সমানে মাথা নাড়িয়ে জোরে জোরে শাদাব ভাইয়ের সঙ্গে বলে চলেছে। কিভাবে পারে কে জানে। নিশ্চয়ই জ্বিনের কারবার।
"এই অংকটা করে আমাকে দেখাবে সবাই।"
শাদাব ভাইয়ের দেওয়া অংক সমাধান করতে শুরু করে সবাই। মেঘনূর নিজে খানিকটা চেষ্টা করে আর এগুতে পারে না। এতো দিন পর পর পড়তে এসে তার সবকিছু নতুন লাগে। এবার তো এসেছে একদম এগারোদিন পর। সব অচেনা লাগছে।
"অন্যের খাতার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? পারবি না?"
মেঘনূর গমগমে পুরুষালি স্বর শুনে হালকা কেঁপে ওঠে। যম ভূতটা কখন যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি সে। মহুয়ার খাতা হতে দৃষ্টি সরিয়ে সে নিজ খাতার পানে চায়।
"পারবি না?"
"ব..বুঝি না অংক।"
"শাদাব ভাই আমি বুঝেছি। দেখুন হচ্ছে কি না?"
মহুয়া প্রফুল্লচিত্তে খাতা বাড়িয়ে দেখায়। নিজের সক্ষমতা শাদাব ভাইকে জানাতে গিয়ে তার ঠোঁটের হাসি বেশ চওড়া হয়ে আসে। ইশ্ সে যদি মেঘনূরের জায়গা বসতো আজকে তাহলে শাদাব ভাইয়ের একটু কাছাকাছি হতে পারতো। কাল থেকে সাইডে বসবে।
"হুম হচ্ছে। শেষ কর।"
গম্ভীর মুখোয়বে অংক দেখে মহুয়ার পানে খাতা বাড়িয়ে দেয় শাদাব। চোখ তুলে তাকায় না অব্দি তার দিকে। অথচ মেয়েটা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কি তাল বাহানাই না করে চলে সবসময়।
"মহুয়া পারে তুই পারিস না কেন? বাড়িতে কি পড়াশোনা করিস না?"
মেঘনূর নিরব থাকে। যখনই পড়তে আসে এসব বকা তার জন্য তোলা থাকে। সেজন্যই মূলত আসতে চায় না সে। আর এই অংকের যমও বেছে বেছে শুধু তাকেই বকে। অন্যসবার চেয়ে ধমকও খায় বেশি।
" বিয়ে টিয়ের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পড়াশোনায় মন দে। অংকে তো মনে হয় না পাশ হবে।"
শাদাব থমথমে মুখোরেখায় মেঘনূরের খাতা কলম টেনে সামান্য নিচু হয়ে অংকের সমাধান করে দিতে থাকে। সেই সাথে শুরু থেকে ভেঙে আস্তে ধীরে বুঝিয়ে দেয় কিভাবে কি হলো। ছোট বাচ্চাদের মতো তার এই বুঝিয়ে দেওয়ার ধরন অশান্ত চঞ্চল রমণীর মস্তিষ্কে থিতু হতে থাকে বেশ।
"বুঝতে পেরেছিস?"
"হু।"
"পারবি করতে?"
মেঘনূর ভয়ে হ্যাঁ বলতে পারে না। সে জানে তার পড়া ধরে রাখার সময়সীমা বেশ কম। এখন মাঝপথে আবার ভুলে গেলে সমস্যা।
"নিজে একটা চেষ্টা কর। সমস্যা হলে বলবি।"
"আচ্ছা।"
শাদাব সামনে চলে যায়। সবার করা অংকগুলো এক নিমিষে দেখে আবার অন্য অংকে চলে যায়। এদিকে মেঘনূর ঘষে মেজে টেনে টুনে কোনোভাবে অংক মেলায় মহুয়ার সাহায্য নিয়ে। আর এতেই দূর্গম গিরি জয় করার মতো মুখে হাসি ফোটে তার। অবশেষে সবার মতো সেও পারলো অংকের জট খুলতে। তার মানে, তার মস্তিষ্ক কিছুটা হলেও পড়াশোনায় সচল রয়েছে, শুধু একটু পরিচর্যা প্রয়োজন।
"নূর।"
বাম পাশে ছেলেদের বেঞ্চ হতে ডাক আসে মেঘনূরের। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সে। কবির কন্ঠ নামিয়ে ধীরে ধীরে বলে,"আজ কলেজে যাবি?"
"হু। তুই?"
"যাবো।"
"মনু ভাই তোর খোঁজ নেয়।"
"নিক। আমার কি?"
"বলেছি তোর বিয়ে হয়েছে। কষ্ট পেয়েছে খুব।"
"ভালো হয়েছে।"
"কিন্তু স্বামী মরে গিয়েছে শুনে আবার খুশি হয়েছে।"
মেঘনূর সরু চোখে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকায়। শক্ত গলায় বলে,"খুশি তো আমার হওয়ার কথা। তার খুশি হয়ে লাভ কি? যতই ঘ্যান ঘ্যান করুক কাজ হবে না। বেশি বাড়লে মেরে ঠ্যাঙ্গা বানিয়ে দিবো।"
কবির মাথা নিচু করে আড়ালে হেসে বলে,"তোর মামার দোকানে কাল থেকে ফের ঘুরঘুর শুরু করেছে।"
"যা খুশি করুক।"
"শোন একটা কথা।"
"আবার কি?"
"আব্বা বললো শিকদার বাড়িতে নাকি বড়সড় আয়োজন হতে চলেছে। মনে হয় তোর স্বামীর মানুষ খাওয়াবে গা সুদ্ধ লোক দাওয়াত করিয়ে। বড় বড় গাড়ি করে শহর থেকে মানুষ আসবে অনেক। ছোট সাহেব ও নাকি আসবে। তিনটে গরু কিনেছে কাল হাট থেকে।"
"বলিস কি?"
" এলাহি কান্ড। আব্বা তো তাই বললো।"
"হওয়া অস্বাভাবিক না। অনেক বড়লোক তারা।"
"আমাদের একটু দাওয়াত দিস। খাওয়ার উছিলায় শিকদার বাড়ি দেখে আসবো।"
মেঘনূর হেসে উঠে। মুখে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে বলে,"আমাকেই দাওয়াত দিবে কি না। আমি তো ও বাড়ির এখন কেউ না। বুড়ো মরে গিয়েছে, সব সম্পর্কও শেষ।"
"তোরে দিবে।"
দুজনের চলমান গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুরের মাঝে পড়ার সময় পার হয়ে যায়। সাড়ে আটটা বাজতেই শাদাবের আজকের মতো পড়ানোর সমাপ্তি ঘটে। একে একে সবাই বের হওয়া শুরু করে।
মেঘনূর বন্দি খাঁচা হতে মুক্তি পেয়ে তাড়াতাড়ি বই খাতা গুটিয়ে বের হওয়ার উদ্যত নেয়। শাদাবকে কাটিয়ে সামনে দিয়ে বের হওয়া মুহুর্তে গমগমে আওয়াজে ভেসে আসে,
"শোন।"
মেঘনূর যাওয়া পথে থমক দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে শাদাবের পানে জিজ্ঞাস্যদৃষ্টিতে তাকাতেই শাদাব শান্ত স্বরে বলে,
"কালকে থেকে সাইডে বসবি না।"
"কেন?"
"বসবি না এটা মনে রাখ। কেন সেটা শুনতে হবে না।"
মেঘনূর অবোধের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। বেঞ্চের সাইডে বসতে কি সমস্যা বুঝতে পারে না। তবে এ নিয়ে দ্বিরুক্তিও করে না সে। কি জানি হতে পারে, সাইডে বসলে হয়তো তার মতো গাধী ছাত্রীর অংকের উত্তর মেলে না।