ফন্ট সাইজ:
থিম:
সাহেব বাবুর বিবি

পর্ব 4

লেখক: imran

"আবার কি হলো রে মহু? বাড়ির সামনে গাড়ি, মানুষজনের ভীড়?"

"আমিও তো বুঝতে পারছি না। তবে গাড়ি,মানুষ সবই কেমন চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে এর আগে দেখেছি কোথাও।"

"আমারও তো তাই মনে হচ্ছে।"

মেঘনূর মহুয়া কলেজ শেষে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সাঁড়াশি চক্ষু মেলে। একদিনের সাক্ষাৎ এ কিছু মুখের চেনা জানায় বুঝতে পারে কাদের আগমন ঘটেছে। কেননা, এই তল্লাটে গাড়িবহর নিয়ে চলার মতো কোনো প্রাণী নেই। দিন এনে দিন খেতেই যাদের হিমশিম অবস্থা। তাদের কাছে চার চাকার গাড়ি মানে তো মরীচিকার স্বপ্ন। একমাত্র বাদলাপুরের প্রতাপশালী শিকদার বাড়ির মানুষেরাই দু তিনটে গাড়ি নিয়ে চলার সামর্থ্য রাখে। আশেপাশে তিন চার গাঁ মিলে তাদের মতো ধনাঢ্য পরিবার আর কোথাও নেই৷ তবে, সরকার বাড়িও কম যায় না। গেলো অগ্রহায়নে দশ হেক্টর জমির গোলা ভর্তি ধান চড়া দামে বিক্রি করে তারা যেন আরো নামকরা হয়ে উঠেছে । শিকদার বাড়ির সঙ্গে তাদের শেয়ানে শেয়ানে লড়াই চলে।

"ও নূর.. ও মহু এদিকে আয়.. এদিকে আয়।"

কাঁচা সড়কে পা দিতেই পিছনের বাঁশঝাড় হতে ফিসফিসিয়ে ডাক ভেসে আসে। মেঘনূর মহুয়া একযোগে তাকাতেই দেখতে পায় সুলেখাকে। মহুয়া বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বলে, "ও কি মা,তুমি এখানে কেন?"

"এদিকে আয় বলছি।"

"কিছু হয়েছে?"

"হয়নি, তবে হবে।"

মামির কথার ভাব ভঙ্গিমা বুঝতে পারে না মেঘনূর। বাড়ির সামনে টিনের সদর গেট ছেড়ে সে পিছন দিকটায় এভাবে চোরের মতো কেন লুকিয়ে আছে কে জানে? নাকি গাড়ি ঘোড়ার কারণে জায়গা পায়নি বের হতে।

শুকনো বাঁশপাতা,খড়কুটো মাড়িয়ে মেঘনূর মহুয়া সুলেখার কাছাকাছি আসতেই সুলেখা ব্যস্ত চোখে তাকিয়ে বলে,

"শিকদার বাড়ির বড় গিন্নির পা পড়েছে গরিবের ভিটায়। বউ ঝিরাও এসেছে। বাড়ির উঠোনে তাদের সব চাকর বাকর বসে আছে। একা একা মেয়েলোকদের ছাড়ে না কোথাও। তোদের জন্য পথ চেয়ে থাকতে থাকতে আমার কোমড় ধরে এলো। আজ এতো দেরি হলো কেন ফিরতে?"

মহুয়া এক নজর মেঘনূরের দিকে তাকায়। কেন দেরি হলো সেটা এই মেয়ে ভালো জানে। আসাপথে কমলদিঘির বাগানে ঢুকে দুটো ডাঁসা পেয়ারা চুরি করে পুকুর পাড়ে বসে খেয়ে তবে এসেছে। কতবার না করলো সে অথচ এই দস্যি মেয়ে শুনলোই না।

"আজ বেশি পড়াশোনা করে এসেছি কলেজ থেকে তাই দেরি হলো। কিন্তু তুমি বাঁশঝাড়ের মধ্যে এমন ঘাপটি মেরে আছো কেন মামি? আর আমাদেরই বা পথ চেয়ে আছো কেন?"

সুলেখা শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে পিছন দিকে এক নজর তাকায়। কন্ঠ নামিয়ে ধীর গলায় বলে,"সাধে কি আর দাঁড়িয়ে আছি? চুপচাপ আমার সাথে দু'জনে ঝাড়ের মধ্যে দিয়ে বাড়িতে ঢোক আয়। সোজা ঘরে গিয়ে শাড়ি বদলে নিবি শিগগির। তারপরে আমি ডাকলে বের হয়ে বড় গিন্নির সামনে আসবি।"

"আবার শাড়ি বদলাতে হবে কেন? এটাতে খারাপ কি?"

"অ মলো, এই শাড়ি পরে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সামনে গেলে তারা ভাববে তোকে আমরা ভাতে কাপড়ে মারি।"

মেঘনূর অবাক চোখে তাকায়। পরনের শাড়ির দিকে তাকিয়ে সরল গলায় বলে," কিন্তু কলেজে যাওয়ার জন্য আমার যা শাড়ি, এর চাইতে তো ভালো আর কোনো শাড়ি নেই মামি। এটা খারাপ হলে তো সবই খারাপ।"

সুলেখার শরীরে কিঞ্চিৎ ভয় এসে জমে মেঘনূরের কথা শুনে। এই নিয়েই ভয় হচ্ছিল তার। কেননা এ মেয়ে তো আর

জানে না শ্বশুর বাড়ি হতে তার জন্য কত দামি দামি ছ সাত খানা শাড়ি এসেছে গত পরশুদিন। বিয়ে কালেও কি কম পেয়েছে। সেখানেও গোটা চারেক আছে। একখানাও চোখের দেখা দেখতে পাইনি সে। তার আগেই সুলেখা নিজ সিন্দুকে তুলে ফেলেছে। এতো দামি শাড়ির লোভ সামলানো যায় নাকি।

"তোর এতো ভাবতে হবে না। খুব তো পর ভাবিস মামিকে। দু চোখের শত্রু কি না। কিন্তু আমি তো আর তা ভাবতে পারি না। ঠিকই দিল পোড়ে তোর জন্য। বিছানায় ভালো একখানা শাড়ি তুলে রেখেছি.."

মেঘনূর মামির নমুজ গলায় বলা কথা শুনে কপাল কুঁচকে বলে,"নির্ঘাত কোনো ফন্দি এঁটেছ তুমি মামি। এতো মধু মাখা কথা তো সহ্য হচ্ছে না আমার।"

মহুয়া মুখ হতে বিরক্তিকর শব্দ বের করে হাত চেপে ধরে মেঘনূরের। চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলে,"সবসময় ঝগড়া না করলেই না তোর? বেশি বেশি কথা বলিস। চুপচাপ পা বাড়া। একটা কথাও বলবি না।"

মহুয়ার কড়া কন্ঠে মেঘনূর আর প্রতিত্তুর করে না। ঝোপ ডিঙিয়ে পিছন ভিটা দিয়ে সোজা চলে যায় ঘরের দিকে।

"আয়,আয় মহু তুইও আয়। তোর জন্য একখানা ভারী সুন্দর শাড়ি বের করেছি। সেই শাড়ি পরে তুই বড় গিন্নীর সামনে যাবি..দেখিস তোকে এক দেখায় পছন্দ করে ফেলবে।"

মায়ের চকচকে চোখজোড়ার দিকে মহুয়া স্থির চোখে তাকায়। ভ্রু জোড়া বাঁকিয়ে বিস্মিত স্বরে শুধায়,"আমাকে কেন পছন্দ করবে? আমাকে পছন্দ করে কি লাভ?"

"ওরে..লাভ আছে বৈকি। বিরাট লাভ। বড় গিন্নীর যে একখানা সোনার রত্ন আছে তা তো আমরা জানতাম না৷ শহরে থাকে৷ বিরাট বাণিজ্য। সাহেবি কায়দায় মানুষ হয়েছে। কাল আসছে গ্রামের পথ মাড়াতে।"

"আবার? আবার তোমাকে লোভে পেয়েছে মা?"

সুলেখা মুখ বাঁকায় মেয়ের কথা শুনে৷ রুক্ষ গলায় বলে,"শোনো মেয়ের কথা। লোভে পাওয়ার কি আছে? তোকে দেখে যদি পছন্দ করে এতে ক্ষতি কি?"

"ওতসব আমি জানি না। কিন্তু তুমি যেসব কাজ করে চলেছো এগুলো কিন্তু ভালো হচ্ছে না মা৷ মোটেও ভালো হচ্ছে না। এতিম মেয়েটার হক মেরে খাচ্ছো। ওর তো কিছুই নেই৷ তারপরেও ওর জিনিসে এতো কেন লোভ তোমার মা??"

"খুব কথা ফুটেছে দেখি তোর মহু? এই মেয়ে তোকে মন্ত্র দিচ্ছে তাই না?"

মহুয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। নিরেট কন্ঠে বলে, "তোমার চোখে মুখে ভয়ের ছাপই যথেষ্ট তোমাকে বোঝার জন্য মা। এর জন্য মন্ত্রের প্রয়োজন নেই। এই যে,বাঁশঝাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের পথ চেয়েছিলে যাতে মেঘনূর ওই শাড়ি পরে বড় গিন্নীর সামনে না যায়। গেলেই তো তুমি ধরা পড়বে। জবাবদিহি করতে হবে৷ তাই কোমড় ধরে এলেও তুমি পথ ছাড়োনি।

তবে, মেঘনূর এতো জটিলতা না বুঝলেও আমি ঠিক বুঝি৷ ও ছেঁড়া কাপড় পরলেও কখনো আফসোস করবে না,ওর কোনো লোভ নেই এসবে। তবুও তুমি ওকে এক চিমটি ছাড় দেও না। এতো কেন আক্রোশ??"

সুলেখা মেয়ের মুখে খই ফুটতে দেখে তাজ্জব বনে যায়। খপ করে ডান হাতটা চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,"মেঘনূরের জন্য এতো দরদ না দেখিয়ে নিজের কথা ভাব একটু। পর কোনদিন আপন হয় না। তোরে বাপে আমি হাড় ক্ষয় করছি শুধু মাত্র তোকে বড় ঘরে পার করবো বলে। আর তুই কি না আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছিস? খুব নালায়েক হয়ে গেছিস? বেশি বাড় বাড়িস না মহু। ও মেয়ে পচুক মরুক তোর ওতো ভাবতে হবে না। আয় তুই।"

"মা.."

"একখানা কথা কইবি না।"

----------------------------------------------------

চকচকে আয়নার ন্যায় বাড়ি ঘর। লেপেপুছে একদম ফিটফাট । এতো বড় উঠানখানিতেও গোবর কাঁদার লেপনে ঝকঝক করছে। গরিব ঘর হলেও এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দেখে বেশ মন ধরে অগ্নিবীণার। চেয়ারে বসে পুরো বাড়ি চোখ বুলিয়ে দেখে যায়। বাবা জমিদার থাকার সুবাদে ছোট বেলা হতেই এ গ্রামে ও গ্রামে ঘোরাঘুরি করেছে সে। মানুষের সাথে মিশেছে, একপাতে খেয়েছে। আজ বহুদিন পর আবারো লাল ইট পাথরের দালান ছেড়ে কাঁচা বাড়িতে পা পড়েছে তার। কলপাড়ের বাতাবি লেবুর ফুলের ঘ্রাণ তাকে শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে এক এক করে।

"বম্মা নতুন বউ এলো।"

কানের কাছে কুমকুমের কন্ঠ ধ্বনি পেতেই চোখ তুলে তাকায় অগ্নিবীণা। সাদা পাড়ে গোলাপি রঙা শাড়ি পরিহিত মেঘনূরকে দেখা মাত্র মুখে হাসি ফোটে তার। বসা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তৎক্ষনাৎ। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মেঘনূরের সম্মুখে দাঁড়ায় সে। থুতনির নিচে হাত রেখে নরম গলায় বলে,

"কেমন আছো?"

মেঘনূর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ফেলে। ক্ষীণ কন্ঠে বলে,"ভালো। আপনি?"

"এইতো আছি। কলেজ করছো?"

"হু।"

"কোনো অসুবিধা হয়?"

মেঘনূর সন্তপর্ণে মাথা নেড়ে না জানায়। অগ্নিবীণা নমুজ হেসে বলে,"শিকদার বাড়ির বউরা কখনো একা একা বাড়ির চৌকাঠ পেরোয় না। পুরুষদের সম্মুখে খুব প্রয়োজন ছাড়া যায় না। সেখানে তোমায় পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি। কেন দিয়েছি আমি নিজেও জানি না। তবে তোমার থেকে আমি আশা করবো যতদিন না তুমি অন্য পুরুষের জিম্মায় যাচ্ছো ততদিন পর্যন্ত আমার বাড়ির কিছু টা হলেও কায়দা মেনে চলো। লোকে যেন শিকদার বাড়ির বউ নিয়ে কোনো কটুক্তি না করতে পারে।"

শান্ত গলায় ধারালো স্বরে বলা কথা মেঘনূর চুপচাপ শুনে যায়। সম্মুখে দাঁড়ানো অতি রূপবান নারীটির ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বুঝতে তার খুব একটা অসুবিধা হয় না। যতই নিজেকে মুক্তমনা পাখি মনে করুক আদতে হয়তো সেই অধিকার আর তার নেই। একদিনের কাগজ কলমে, কালিমার সুরে যে সম্পর্কে নাম লিখিয়েছে সেটাতে নিজের প্রতি পূর্ণ অধিকার সে হারিয়েছে। কিন্তু পায়ে বেড়ি বাঁধবে কি করে সে? এ যে অনেক কঠিন একটা কাজ।

"কাল তোমার স্বামীর লোক খাওয়ানো হবে৷ পুরো গ্রাম দাওয়াত করা হয়েছে। তোমার সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে মেঘনূর।

শিকদার বাড়ির বউ তুমি,তোমাকে তো যেনতেন ভাবে বলা যায় না। তাই আমি নিজে এলাম তোমাকে নিতে।"

মেঘনূর তড়িৎবেগে চোখ তুলে তাকায়। নিতে এসেছে মানে? এ কি অলুক্ষণে কথা? আজ ও বাড়ি গিয়ে কি করবে সে? খাওয়াবে তো কালকে।

অগ্নিবীণা মেঘনূরের তটস্থ ভঙ্গিমা দেখে সূক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,"কোনো আপত্তি আছে ?"

"না..না আপত্তি কেন থাকবে গিন্নী মা। কোনো আপত্তি নেই। গরিবের ভিটায় পা রেখেছেন আপনি। এতো আমার সৌভাগ্য। মেঘনূর ঠিক যাবে। স্বামীর ঘরকে কি আর অস্বীকার করা যায়?"

অগ্নিবীণা সুলেখার দিকে এক পলক তাকিয়ে ধীর গলায় বলে,"বেশ, তাহলে তো হলোই। মহুয়াকেও সঙ্গে নিয়ে যাই তবে। তোমার কোনো অসুবিধে আছে?"

মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির দেখা পেয়ে সুলেখার মুখে বিস্তর হাসি ফোটে। পিছনে জড়সড় হয়ে দাঁড়ানো মহুয়াকে টেনে সামনে নিয়ে এসে বলে,"ভারী লক্ষী মেয়ে আমার গিন্নী মা। আমি যা বলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে তা। কোনো হেরফের নেই। মাথাও বেশ ভালো৷ গেল মেট্রিকে ফাস্ট ডিভিশনে পাস তুলেছে। এ গায়ে এমন ভালো রেজাল কেউ করতে পারিনি৷ বাড়ির সমস্ত কাজবাজ হাতে হাতে করে দেয়। বাড়ি ছেড়ে ভুলেও পাড়া গাঁয়ে পা পড়ে না।"

এক প্রশ্নের ভীড়ে একগাদা সুনামের ঢেউ বইয়ে ক্ষান্ত হয় সুলেখা। অগ্নিবীণা মৃদু হেসে তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে মহুয়াকে। খানিকটা এগিয়ে এসে থুতনির নিচে হাত রেখে বলে,"দুটো মেয়েই তোমার লক্ষীমন্ত। এজন্যই তো চোখ পড়েছিল আমার তোমার ভিটেতে।"

সুলেখার প্রসন্ন মনে খানিকটা ভাঁটা পড়ে অগ্নিবীণার কথায়। তার মেয়ের সাথে এই অনাথ মেয়ের তুলনাটা ঠিকঠাক হজম হয় না। কোথায় রাজরাণী আর কোথায় চাকরাণী। নিজের মেয়েকে দিয়ে সে কুটোটিও কাটায় না আর এ মেয়ে তো দু'হাতে গোবর ভাঙে৷ আর সে কি না হবে মহুয়ার সমান।

"কি বলি বলুন গিন্নী মা, আপনার ছেলের বউমারে নিয়ে একটু চিন্তাই করতে হয় আমার আর ওর মামার। মাথা বেশি ভালো না। মেট্রিকের রেজালের দিনে কত আল্লাহর নাম জপে পাশ আনিয়ে ছেড়েছি। ফেলের ধার ঘেঁষে পাশ তুলেছে। আবার সামনের পরীক্ষায় কি যে করবে মাবুদ ভালো জানে৷ মহুয়ার মতো পড়তে চায় না..শুধু ঘোরাঘুরির অভ্যেস।"

নিজের নামে সত্য অপবাদ শুনে মেঘনূর ঠোঁটের উপর ঠোঁট কামড়ে কিড়মিড় করতে থাকে। মামি যে তার ভালো চায় না এটা প্রতি পদে পদে প্রমাণিত হয়। মুখেই শুধু মধু মাখিয়ে কাজ হাসিল করে। কি দরকার এসব পড়াশোনার কথা তোলার। পড়তে দাওও বুঝি আমাকে?? দিনের বেলায় কোনদিন বই ছুঁতে দাও? একটু বই নিয়ে বসলেই হাজার কাজের বাহানায় ডাকাডাকি শুরু করো। নিজের মেয়েকে দিয়ে করাও কোনো কাজ??

মনের মধ্যে কথা চাপিয়ে মেঘনূর আঁচলে মুখ ঢেকে ঠোঁট বাঁকায়। বড় গিন্নী না থাকলে ঠিক পায়ে পায়ে ঝগড়া লাগিয়ে দিত। উহ, আবার ঘোরাঘুরি নিয়ে কথা তোলে।

"একশোবার ঘুরবো আমি, হাজারবার ঘুরবো। নিজ গাঁয়ে ঘোরাঘুরি খারাপ নাকি? আমার গাঁয়ে আমি যা খুশি করবো,তোর কি রে কুটনি বুড়ি।"

মহুয়ার অগাধ প্রশংসা শুনে মেজো গিন্নীর ছোট পুত্রবধূ মঞ্জুরা এগিয়ে আসে। মহুয়ার কাঁধে হাত রেখে বলে,"বাহ, পাড়াগাঁয়ে এমন গুণী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। বেশ ভালো, বেশ ভালো।"

সুলেখা মোক্ষম সুযোগ ঝোঁপে বুঝে কোপ মারে। মুখজুড়ে বেদনার স্পষ্ট ছাপ ফুটিয়ে বলে," গরিব মানুষ আমরা বউমা। তিনবেলা পেটে ভাত আনতেই টান পড়ে৷ ওর বাপে আমি চিন্তায় আধখানা হয়ে যাই,এমন লক্ষীমন্ত মেয়েটারে যদি একটু ভালো ঘরে বিয়ে না দিতে পারি তাহলে কপাল ঠুকে মরতে হবে।"

"আরে না না, ওতো ভাবছেন কেন? আমরা আছি তো৷ আমরা তো এখন আপনাদের আত্নীয়৷ এতো ভালো মেয়ের জন্য ভালো সম্বন্ধ আমরা জোগাড় করে এনে দিবো৷ তাই না বম্মা?"

মঞ্জুরার নরম গলায় বলা কথায় অগ্নিবীণা ছোট করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,"কপালের মালিক আল্লাহ। আমরা মানুষ উছিলা মাত্র। মানুষের দ্বারে এমন হা হুতাশ করবে না সুলেখা, বরং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে মেয়ের ভালোর জন্য। আমরা কিছুই পারি না, সব পারেন উপরওয়ালা। তোমার মেয়ের ভালো হোক এটা আমরা চাই। আল্লাহ যদি আমাকে তোমার সাহায্যের জন্য উসিলা হিসেবে পাঠান নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাহায্য করবো। তোমার মেয়েকে সোনায় সোহাগা করে রাখতে যা যা করতে হয় করবো। এ নিয়ে মোটেও চিন্তা করবে না। ওর প্রতি নজর আমার ঠিক থাকবে।"

গিন্নী'মার শেষ কথা শুনে সুলেখার বুকের ভিতর খুশির জোয়ার ছোটে। উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার খুশিতে কথা আটকে যায়।

"আ..আপনি যে বললেন এই খুশি আমি গিন্নী মা। আপনার নজর আমার মেয়ের উপর থাকলে আর কি চাই।"

মায়ের কথা শুনে গা পুড়ে ছারখার হয়ে আসে মহুয়ার। বুকের ভিতরে ক্রোধ জমে৷ কিন্তু নিরুপায় সে। মায়ের উপর কথা বলার সাহস নেই৷ কিন্তু শাদাব ভাই ছাড়া তার জীবনে তো কারো ঠাঁই নেই। একমাত্র শাদাব ভাই তার ভালো থাকার মূল ওষুধ। তাকে ছাড়া সে কখনো কোনদিনও বিয়ের পিঁড়িতে বসবে না৷ দরকার হলে গলায় ফাঁস দিবে তবুও নয়।

"আর একটা কথা, আমার সামনে কখনো কাউকে হেয় করে কথা বলবে না সুলেখা। একমাত্র অন্যায় ছাড়া গীবত করবে না। আমি অগ্নিবীণা এসব পছন্দ করি না। প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান প্রজ্ঞা সমান নয়। পৃথিবীতে কোনো জায়গায় একযোগে ভালো ফলাফল সবাই করে না। কমবেশি হবেই।"

গিন্নী মা'র আসল রূপের একঝলক ফুটে উঠতেই উপস্থিত সবাই তটস্থ ভঙ্গিতে নুইয়ে পড়ে। ওই ধারালো কাজল চোখে চোখ রাখার মতো স্পর্ধা কারো নেই। ওই তেজি গলার বিপরীতে কারো টু শব্দ করার ক্ষমতা নেই।

উপরে উপরে ভয় করলেও মনে মনে একটু খুশিই হয় মেঘনূর। যাক শাশুড়ী নামক রূপবতী নারীটি একটু হলেও মামিকে খুঁচিয়েছে। বেশ হয়েছে। খালি নাম ফুটানো।

"ফুলমতি গাড়োয়ানকে বল গাড়ি সাজাতে।"

"জ্বি, গিন্নি মা।"

অগ্নিবীণা মেঘনূর মহুয়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে,

"তোমরা প্রস্তুতি সেড়ে নাও..."

-----------------------------------------------

নিঝুম নিগূঢ় রাত, বাদলাপুর গ্রাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাজকীয় শিকদার বাড়ির আকাশছোঁয়া মিনার আর খিলানগুলো চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে। রূপালি জ্যোৎস্না উপচে এসে পড়ছে বাড়ির বিশাল শ্বেতপাথরের উঠোনে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা কেবলই এক বিভ্রম। প্রতাপশালী শিকদার বাড়ির অন্দরে এখন চলছে এক মহাযজ্ঞ। বাইরে থেকে বাড়িটাকে নিথর মনে হলেও পেছনের বিশাল রসুইঘর আর উঠোনবাড়ি ব্যস্ততায় ভরপুর। রসুইঘরের মস্ত মস্ত তাকগুলো উপচে পড়ছে রান্নার সমস্ত জিনিসে। বস্তা বস্তা সুগন্ধি চাল, ডাল, ঘিয়ের বড় বড় টিন, আর খাঁটি মশলায় ভরপুর।

পুরো বাড়ির আলো নিভিয়ে দিয়ে মশাল, লন্ঠন আর হ্যারিকেনের আলোতে চলছে এই কর্মযজ্ঞ। কেননা, বাচ্চা থেকে বুড়ো বাড়ির সব নারীরা ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে। তাদের যেন অসুবিধে না হয় একারণে আলোর সাথে সাথে গলার স্বরও সবার বেশ নিচু। সারা রাত ধরে চলবে কাজ। বাড়ির চাকর বাকর, রান্নার লোকেদের এক মুহূর্ত জিরোবার ফুরসত নেই। মাটিতে বড় বড় আশ বঁটি পেতে বসে পেঁয়াজ, রসুন আর আদার পাহাড় কেটে চলেছে তারা। দক্ষ হাতে ঝড়োবেগে সাড়ছে কাজ।

নিস্তব্ধ রাতকে চিরে দূর থেকে ভেসে আসে ঘোড়ার খুরের শব্দ আর চাকার ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। সদর দরজা পেরিয়ে উঠোনবাড়িতে এসে থামে একের পর এক ঘোড়ার গাড়ি। গাড়িগুলোর পেছনে থরে থরে সাজানো বস্তা বস্তা তাজা তরকারি, ফলমূল আর দূর দেশ থেকে আনা সব উপাচার।

"রয়ে সয়ে নামা। এতো তাড়া কিসে?"

মেজো কর্তা খাইরুল শিকদারের গম্ভীর স্বরে চাকরেরা লন্ঠনের আলোতে আস্তেধীরে ভারী বস্তা কাঁধে নামিয়ে নিয়ে অন্দরমহলে পা বাড়ায়।

"কলিম উল্লাহ, হিসাব কষে দেখো এতেই হবে নাকি আরো লাগবে?"

"ঢের হবে। হয়ে বেঁচে যাবে।"

"বুঝে বলবে কিন্তু। পরে কম পড়লে বড় গিন্নীর রোষানলে পড়তে হবে।"

কলিমউল্লাহ জহুরি চোখে তাকিয়ে অল্প বিস্তর হাসে। মেজো কর্তার সাথে পা মিলিয়ে চলতে চলতে বলে,"নয় বছরের অভিজ্ঞতা ভুল হতে পারে না, মেজো কর্তা । এই হাতে গ্রাম খাইয়ে আসছি। বেঁচে যাবে আরো।"

খাইরুল শিকদার দু'হাতে মুঠো পাকিয়ে পিছন পিঠে রেখে কাচারি ঘরের দিকে হাঁটা ধরে। মাথা নাড়িয়ে বলে,"তাই যেন হয়।"

"বলছি,ছোট সাহেব কি এলো বলে?"

"গায়ে ঢুকে পড়েছে গাড়ি।"

"হঠাৎ আজ? কাল আসার কথা ছিল না?"

খাইরুল শিকদার খানিকক্ষণের জন্য হাঁটা থামায়। নাক উচু করে বলে,"সাহাবি মানুষ, তার উপরে রক্ত গরম। মন মর্জি চলে।"

"তা ঠিক,তা ঠিক।"

.

.

.

রাত তখন আড়াইটে ছুঁই ছুঁই। গুমোটে আঁধার ভেদ করে গ্রামের মেঠো পথ কাঁপিয়ে দূর থেকে হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ে শিকদার বাড়ির সদর তোরণে। একে একে এসে ভীড়ে তিনটে গাড়ি। কাচারি ঘরের পুরুষেরা গাড়ির গর্জন পেতেই যে যার কাজ ফেলে ছুটে আসে বাহিরে।

"ছোট সাহেব এসেছে।"

শুকুর আলীর মৃদু স্বরের হাঁকে দোতলার দালান বাড়ির পশ্চিম কক্ষে আলো জ্বেলে উঠে। খানিকক্ষণ পরেই জানালার পর্দার কাছে কোনো মানবীর ছায়া এসে পড়ে। মুখে আঁচল টেনে নজর রাখে অন্দর মুখো উঠোনের দিকে। দীর্ঘ আটমাস পর অবশেষে সেই চেনা মুখ দেখতে চলেছে সে।

গাড়ি থেকে নেমে আসে শিকদার বংশের মূল চালিকাশক্তি মুস্তাফা নওয়াজ শিকদার। ত্রিশ একত্রিশ বছরের এক সুঠাম, দীর্ঘদেহী পুরুষ। সুদর্শন চেহারায় রাজকীয় রাশভারী ভাব সাব। পরনে তার কটনের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি সাথে আলিগড়ি পাজামা। ডান হাতের কবজিতে দামি বিদেশি ঘড়ি। বাঁহাতের তর্জনী আর মধ্যমা আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে বেনসন সিগারেট। যার নীলচে ধোঁয়া তার মুখটাকে ক্রমশ গম্ভীর করে তুলেছে।

"এসো, এসো। কাচারি ঘরে বসবে নাকি অন্দরমহলে?"

"কাচারিতে চলুন। মাজদার সরকারের কলিজা এখনও বের করেননি কেন কাকা?"

ছোট কর্তা আমজাদ শিকদার মেজো ভাই এর দিকে তাকিয়ে হালকা কেশে উঠেন। গলা খাঁকারি দিয়ে কন্ঠ টেনে বলেন,

"ঝামেলা হয়েছে একটু।"

নওয়াজের চোখ সুমুখের কারোর দিকে নেই। চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে পিষে ফেলে রুক্ষ কন্ঠে বলে,"ঝামেলা উগড়ে ফেলার কায়দা কি আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে?"

"কায়দা কানুন শিকদার বাড়ির পুরুষেরা খুব ভালো করেই জানে৷ সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়।"

কাচারি ঘরে প্রবেশ করে মেজো কর্তা খাইরুল শিকদার নওয়াজকে চেয়ারে বসার ইঙ্গিত করে। আশেপাশে গ্রামের গণমান্য ব্যক্তিরা সব আগে হতেই উপস্থিত। নওয়াজকে দেখা মাত্র সবাই একযোগে উঠে দাঁড়ালে নওয়াজ হাতের ইশারায় তাদের বসতে বলেন৷ বড় চেয়ারটায় পায়ের উপর পা তুলে সু কায়দায় বসা মাত্র ভরাট কন্ঠে বলে,

"বলুন,কি সমস্যা?"

মেজো কর্তা খাইরুল শিকদার পাশের চেয়ারে বসেন আরাম করে। অতঃপর থমথমে গলায় বলেন,

"সরকার বাড়ির লোকজন কোর্টের স্টে-অর্ডার নিয়ে এসেছে। তাই একটু থমকে যেতে হলো..."

নওয়াজ বাঁকা হাসে। থুতনির নিচে হাত ঠেকিয়ে বজ্র গলায় বলে, "স্টে-অর্ডার !! শিকদার বাড়ির কোনো রকমের হালচাল কোর্ট কাচারির হুকুমে খাটে না। রায় হবে এখান থেকেই, কার্য হাসিলও হবে এখান থেকেই। সরকার বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর কাল সূর্য ডোবার আগে যদি লাঙল না চলে, তবে মাজদার সরকার আর তার ছেলেদের এই শিকদার বাড়ির দিঘির পাড়ে পুঁতে ফেলা হবে।"

উপস্থিত সবাই নওয়াজের রুদ্রমূর্তি দেখে খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। এই ছেলের চড়া জেদ, ক্ষেপাটে ভঙ্গিমা পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য যথেষ্ট। নির্দয় হৃদয়ে সামান্যতম মায়া কাজ করে না। গেল বছরে নিজস্ব কাজ হাসিল না করতে না পেরে চৌকিদার মশাইয়ের গলার রগ কাটা কাটা অবস্থা। মুমূর্ষু অবস্থায় অগ্নিবীণার হুংকারে ছাড় দিয়েছে সে। কোনমতে জান নিয়ে পালিয়েছে চৌকিদার। কিন্তু মন্ডলপাড়ার ঠান্ডু মন্ডল আর তার ভাইয়ের হয়নি জান রক্ষা। জমি নিলামের দিনে নিকষ কালো রাতে নওয়াজ শিকদারের হাতে ঠিকই খুন হয়েছে বীভৎসভাবে।

"একটু স্থির হও নওয়াজ..কাল বিশাল আয়োজন বাড়িতে। এর মাঝে সরকার বাড়ির ঝামেলা টেনে আনলে বড় গিন্নীর তোপের মুখে পড়তে হবে৷ পরশুদিন বিচার সভা ডাকি। সেখানে শেষ বারের মতো সরকারদের সাবধান করা হবে৷ না শুনলে আঙুল বাঁকানো হবে৷ এতে কে মরলো বাঁচল সে হিসেব শিকদার বাড়ির কেউ করবে না।"

নওয়াজ হাত বাড়াতেই পাশে দাঁড়ানো আহাদ তার হাতে সিগারেট তুলে দেয়। পুরু ঠোঁটের ভাঁজে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ছোট করে টান দিতে দিতে বলে,"যা করার তাড়াতাড়ি করুন। আমার ফ্যাক্টরি বসবে বাদলাপুর গ্রামে।"

"ফ্যাক্টরি??"

"কোটি টাকার বাজেট করা হয়েছে। ঢাকা থেকে সব মালামাল আসতে সময়ের ব্যাপার।"

গ্রামের মেম্বার মইনুল তালুকদার বিস্মিত স্বরে বলেন,"গ্রামে ফ্যাক্টরি চলবে কিভাবে??"

নওয়াজ তীর্যক হাসে। ঠোঁট ফুঁড়ে সিগারেটের ধোঁয়া উগড়ে বলে,"টাকা থাকলে মরুভূমিতেও ঘাস চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। আর এটা তো খাঁটি মাটি। বিলেতিরা এমনি এমনি শোষণ করেনি এ বাংলা। শুধু একটু মাথার ঘিলু খাটাতে হয়।"

এক কথা দুই কথা হতে হতে শুরু হয়ে যায় নানা কথা।

জমিজমার হিসাব কুড়াতে, বিচার সভার নানাকাজ নিয়ে শুরু হয়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। অগ্নিবীণা শিকদার যেখানে ছাড় দিয়ে দিয়ে এসেছে সেখানে নওয়াজ শিকদার একচুল ছাড় দিতে নারাজ। কঠিন ব্যবসায়ী সে। বিদেশ ঘুরে ঘুরে বাণিজ্য করে। এতো এতো সম্পদের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও গ্রামে ফ্যাক্টরির সূচনা ঘটাবে সে। আর এতেই আড়ালে আবডালে মনঃক্ষুণ্ন মেজো কর্তার বড় ছেলে উকিল ইফতেখার শিকদারের। কিন্তু এ নিয়ে টু উচ্চারণ কিংবা দ্বিমত করার সাহস নেই তার। করলেই এই সাহেব বাবু বাবার সামনে, সবার সমানে গলার টুঁটি চেপে ধরতে দ্বিধাবোধ করবে না।

.

.

.

নওয়াজের সঙ্গে আসা দুটো গাড়ি হতে সব জিনিসপত্র নামানো হচ্ছে। চাকরবাকরেরা হুলস্থুল করে সব নামী দামী,বিলাসী জিনিস একে একে অন্দরে বইয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকবার আসার সময় গোটা দোকান তুলে নিয়ে আসে এই রগচটা গম্ভীর পুরুষ। বড় বড় কার্টনে ভরা কেক বিস্কুট,বাহারি ফলের ঝুড়ি, মিষ্টি, দধি,বিদেশ ভ্রমণ করে সঙ্গে আনা ড্রাই ফ্রুটস, নানান চকলেট। কি থাকে না তাতে। দু'হাতে টাকা কামিয়ে খরচও করে দিল খুলে।

লণ্ঠনের হালকা হলদে আলোয় তৃষ্ণার্ত চোখে নিচের উঠোনের দিকে তাকিয়ে আছে অগ্নিবীণা। বড় ইচ্ছে ছিল নিচে নেমে গিয়ে বুকের ধনকে জড়িয়ে নিতে। এক ঝলক দেখে কি আর তৃষ্ণা মেটে? দেখা হতে হতে সেই সকালে। গায়ের সব মাতব্বর আর মাথা গোছের পুরুষেরা এসেছে পুত্রের সাথে বৈঠক করতে। এই মুহুর্তে কাচারি ঘরে পা রাখা মানা। পুত্রের দেখা না পেলেও পুত্রের তেজি কন্ঠ তার শ্রবণে আঘাত হানে। কেঁপে ওঠে তার অন্তরাত্মা।

"রাজপুত্তুর হতে মায়ের চোখ সরছে না বুঝি?"

অগ্নিবীণা পিছু ফিরে চায়। ছোট গিন্নি আর্জিনাকে এই অসময়ে দেখে বিস্তর অবাক হয়ে বলে,"তুমি?"

"মাফ করবেন ভাবিজান। শুকুর আলীর এক হাঁকেই ঘুম ছুটে গেছে। শহুরে পুত্রের মুখখানা দেখতে মনটা খুব আকুপাকু করছিল। তাই আর লোভ সামলাতে পারিনি।"

"দেখেছো?"

"দেখলাম তো। চোখ জুড়িয়ে গেল। কারোর নজর না লাগুক আমার বাবার গায়ে।"

অগ্নিবীণা মনে মনে পুত্রের জন্য দোয়া দরূদ পড়ে ফুঁকতে থাকেন। তবে মায়ের মন ভালো করেই জানে, ছেলের এই অসামান্য সুন্দরের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ানক রুক্ষ, জেদি আর বদমেজাজি শাসক। যার এক ইশারায় যেমন কাল হাজারো মানুষ পাত পেড়ে খাবে, তেমনই আরেক ইশারায় সরকার বাড়ির সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে। নির্দয়তার ভীড়ে সামান্য দরদটুকু ঠাঁই পাবে না।

.

.

.

"হ্যাঁ রে,মহু। এ কোনো জমিদারি নগরীতে এলাম বল তো? সব আমাকে এমন মাথায় তুলে রাখছে কেন? আমাকে দেখলেই কেমন মাথা নুইয়ে ফেলছে। মিনমিন করে কথা বলছে৷ যেন আমি এই শিকদার বাড়ির বিশেষ কেউ।"

"মধ্যরাতে তোর পাগলামি সহ্য করতে গিয়ে আমার দম ফুঁড়িয়ে যাচ্ছে নূর। উল্টা পাল্টা কথা বলবি না বলে দিলাম। এ বাড়ির বড় পুত্রের বউ তুই, তোকে তো উঁচু চোখে দেখবেই। এতে এতো অবাক হওয়ার কি আছে?

টিপটিপ পায়ে বাগান বাড়ি হতে অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ায় মেঘনূর মহুয়া। এ দস্যি মেয়ের নতুন জায়গায় সহজে ঘুম হয় না বলে একটু হাওয়া খেতে বের হয়েছিল। একা একা নতুন জায়গা জন্য সঙ্গে টেনেটুনে নিয়ে এসেছে মহুয়াকে। পুরো বাগান বাড়ি ঘুরেফিরে, হাওয়া খেয়ে পেট মন ভরে অবশেষে ফিরছে অন্দরের দিকে।

"বারে, অবাক হবো না? এরা যদি জানতো যাকে সালাম করছে, চোখ নিচু করে কথা বলছে সে নিজেও তাদের মতোই দাসীগিরি করে নিজের বাড়িতে তাহলে তো চোয়াল হা হয়ে যাবে।"

মেঘনূর কথাখানি শেষ করতেই খিলখিল করে হেসে উঠে। ভারি মজা লাগছে তার। মামির বাড়িতে দু পয়সার সম্মান পায় না, হাড় খাটুনি খেটে দু মুঠো ভাত গেলে আর সেই কি না এখানে এসে পেটপুরে ভোজন করছে, সবাই তাকে সম্মান করছে। ব্যাপার খানা আজব নয়তো কি।

"জীবনের প্রথম কাতলা মাছের মাথা খেয়েছি আজ। কি স্বাদ বাপরে বাপ। আজ আর কাল ভালো মন্দ খেয়ে বাড়িতে গিয়ে মামিকে শোনাবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন