১১তম পর্ব
__________
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। মাঝে মাঝে হালকা বাতাস বইছে। চারদিকে কেমন একটা নিরবতা।
আভা আজও স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়নি। প্রতিদিনের মতো নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। টেবিলের ওপর বই-খাতা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। অথচ কয়েক দিন ধরে বইয়ের পাতায়ও মন বসছে না তার।
মাহমুদা বেগম কয়েকবার মেয়ের ঘরে এসে উঁকি দিয়েছেন। মেয়েটা আগের মতো হাসে না, কারও সঙ্গে কথা বলে না। এমনকি বান্ধবীদের ফোন এলেও কথা বলতে চায় না।
মাহমুদা: আভা, মা কী করছিস?
আভা: কিছু না আম্মু।
মাহমুদা: এভাবে আর কত দিন থাকবি? স্কুলের পরীক্ষাও তো সামনে। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে না?
আভা: পড়ব আম্মু।
মাহমুদা: শুধু পড়ব বললেই তো হবে না। মনটা একটু ভালো করার চেষ্টা কর। যা হয়েছে, সেটা নিয়ে আর ভাবিস না।
আভা কোনো উত্তর দিল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
মাহমুদা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
মাহমুদা: আচ্ছা, তুই একটু ফ্রেশ হয়ে নে। আমি তোর জন্য নাশতা নিয়ে আসছি।
মা চলে যেতেই আভা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অন্যদিকে...
স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। পাশে ইরফান। আজকাল ইরফান আর আরিয়ানের বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে।
ইরফান: কিরে, তোর কী হয়েছে বল তো?
আরিয়ান: কিছু হয়নি।
ইরফান: কিছু হয়নি মানে? কয়েক দিন ধরে দেখছি তুই কেমন চুপচাপ হয়ে গেছিস। ক্লাসেও মন নেই, মাঠেও মন নেই।
আরিয়ান: ভালো লাগছে না।
ইরফান: আভার জন্য?
আরিয়ান এবার ইরফানের দিকে তাকাল।
আরিয়ান: তুই সবকিছু বুঝিস কীভাবে?
ইরফান হেসে বলল,
ইরফান: বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধি লাগে না। তুই প্রতিদিন স্কুলে এসে একবার গেটের দিকে তাকাস। তারপর ক্লাসে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকিস। মেয়েটা আসছে না, তাই তো?
আরিয়ান কিছু বলল না।
ইরফান: আচ্ছা, ওর সঙ্গে তোর কোনো কথা হয়েছে?
আরিয়ান: না।
ইরফান: তাহলে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করিসনি কেন?
আরিয়ান: চেষ্টা করব কীভাবে? ও তো কারও সঙ্গে কথা বলছে না।
ইরফান: সময় দে। হয়তো একটু সময় দরকার ওর।
আরিয়ান চুপ করে মাঠের একপাশে তাকিয়ে রইল।
টিফিনের সময় ইসরাত, তিথি, তানু আর নাইমা একসঙ্গে বসে আছে।
তানু: তোরা কেউ আভার সঙ্গে কথা বলেছিস?
ইসরাত: কাল ফোন দিয়েছিলাম। ধরেনি।
তিথি: আমিও দিয়েছিলাম। ওর আম্মু ফোন ধরেছিলেন। বললেন, আভা নাকি বিশ্রাম নিচ্ছে।
নাইমা: এভাবে চলতে থাকলে তো পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে পারবে না।
ইসরাত: আমার তো ওকে ছাড়া স্কুলই ভালো লাগে না।
তানু: আভা এলে আগে ওকে অনেক বকব। এতদিন আমাদের সঙ্গে কথা না বলে থাকা যায়?
তিথি মৃদু হেসে বলল,
তিথি: আগে আসুক, তারপর বকিস।
সবাই হেসে উঠলেও ইসরাতের মনটা খারাপ হয়ে রইল।
বিকেল...
আভা ছাদে এসেছে। অনেক দিন পর একটু খোলা বাতাসে দাঁড়িয়েছে সে। ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকাতেই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল।
রাস্তার পাশে একটা পরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিয়ান!
আভা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান রাস্তার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাড়ির দিকেও চোখ তুলছে। যেন কাউকে খুঁজছে।
আভা বুঝতে পারল, সে কার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান ফোন বের করে কারও সঙ্গে কথা বলল। তারপর আবার বাড়িটার দিকে তাকাল।
আভার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
নিজের অজান্তেই সে আরেকটু সামনে এগিয়ে এল। কিন্তু আরিয়ান তাকে দেখতে পেল না। কারণ আভা ছাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল।
প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর আরিয়ান ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেল।
আভা অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরছিল—
ছেলেটা কি সত্যিই শুধু তাকে একবার দেখার জন্য এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল?
রাত...
আভা নিজের ঘরে বসে পড়ার টেবিল গুছাচ্ছিল। হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল।
ইসরাতের মেসেজ।
ইসরাত: কিরে, আর কতদিন আমাদের এভাবে ভুলে থাকবি?
আভা মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আবার মেসেজ এল।
ইসরাত: কাল স্কুলে আসবি। তোকে ছাড়া আমাদের একদম ভালো লাগে না।
এরপর তানুর মেসেজ।
তানু: তুই না এলে কিন্তু তোর বাসায় চলে আসব!
আভা এবার মৃদু হাসল।
অনেক দিন পর তার মুখে একটু হাসি ফুটল।
সে লিখল,
আভা: দেখি।
মেসেজ পাঠাতেই ওপাশ থেকে ইসরাতের রিপ্লাই এল।
ইসরাত: এই দেখি-টেখি চলবে না। কাল আসবি, ব্যস!
আভা আর কিছু লিখল না। ফোনটা পাশে রেখে বই খুলে বসল।
পরদিন সকাল...
আজ আভা অনেক দিন পর স্কুলের পোশাক বের করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখল। তারপর সেই পরিচিত মাস্কটা হাতে নিল।
মাহমুদা বেগম মেয়েকে স্কুলের পোশাকে দেখে অবাক হলেন।
মাহমুদা: মা, আজ স্কুলে যাবি?
আভা: হুম আম্মু।
মাহমুদা: আলহামদুলিল্লাহ! যা, মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। আর কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ করবি না।
আভা মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
স্কুলের গেটের সামনে...
আরিয়ান প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ গেটের দিকে তাকাতেই তার চোখ থেমে গেল।
একটা পরিচিত মেয়ে ধীরে ধীরে স্কুলের ভেতরে ঢুকছে।
সাদা পোশাক, কাঁধে ব্যাগ আর মুখে সেই পরিচিত মাস্ক।
আভা!
আরিয়ান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
ইরফান পাশ থেকে বলল,
ইরফান: কী হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,
আরিয়ান: আভা এসেছে।
ইরফান গেটের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
ইরফান: অবশেষে!
আরিয়ান আর কিছু বলল না। শুধু মেয়েটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্যদিকে আভা বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করতেই ইসরাত দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
ইসরাত: এই মেয়ে! এতদিন কোথায় ছিলি তুই?
আভা: বাসায়।
তানু: বাসায় ছিলি, নাকি আমাদের ভুলে গিয়েছিলি?
আভা: আরে না!
তিথি: এখন কেমন আছিস?
আভা: ভালো আছি।
নাইমা: তাহলে আর ছুটি নেওয়া যাবে না। সামনে পরীক্ষা।
সবাই মিলে হাসতে লাগল।
ঠিক তখনই দূর থেকে আরিয়ান তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। তার সঙ্গে ইরফানও আছে।
ইরফান: এই যে, আমাদের হারিয়ে যাওয়া সহপাঠিনী অবশেষে ফিরে এসেছে!
তানু হেসে বলল,
তানু: হ্যাঁ, অনেক কষ্টে ফিরিয়ে এনেছি।
আভা শুধু মৃদু হাসল।
আরিয়ান সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
আরিয়ান: কেমন আছো?
আভা একবার তার দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে ছোট্ট করে বলল,
আভা: ভালো।
শব্দটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু আরিয়ানের কাছে যেন অনেক দিনের অপেক্ষার পর পাওয়া একটা উত্তর।
সে আর কিছু বলল না।
শুধু মনে মনে ভাবল, মেয়েটা অন্তত আবার স্কুলে ফিরেছে।
কিন্তু সে জানত না, সামনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এমন কিছু ঘটনা, যা তাদের পরিচিত এই স্কুলজীবনটাকেই বদলে দিতে চলেছে।
চলবে...