১২তম পর্ব
এক নতুন শুরুর অপেক্ষায়
___________
সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে আভার ঘরে এসে পড়েছে। টেবিলের ওপর বই-খাতা সাজানো। অনেক দিন পর আজ আভা মন দিয়ে পড়তে বসেছে। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা। তাই পড়াশোনায় আর অবহেলা করতে চায় না সে।
আভা একটা অঙ্ক করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল। কলমটা টেবিলে রেখে জানালার বাইরে তাকাল।
কয়েক দিন আগের সেই বিকেলটা মনে পড়ে গেল। ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে নিচে আরিয়ানকে দেখেছিল সে। ছেলেটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। কেন দাঁড়িয়ে ছিল, সেটা আভা জানে। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে নিজেকে বেশি ভাবতে দিতে চায় না।
ঠিক তখনই মাহমুদা বেগম ঘরে এলেন।
মাহমুদা: কী রে মা, পড়াশোনা হচ্ছে?
আভা: হুম আম্মু।
মাহমুদা: সামনে তো পরীক্ষা। এবার ভালো করে প্রস্তুতি নিতে হবে। এতদিন শরীর খারাপ ছিল, এখন আর অবহেলা করিস না।
আভা: চেষ্টা করছি।
মাহমুদা: আর শোন, দুপুরে তোর পছন্দের খাবার রান্না করব। কী খাবি বল?
আভা: তোমার যা ইচ্ছা।
মাহমুদা: সব সময় আমার ইচ্ছা চলবে কেন? তোরও তো কিছু পছন্দ আছে!
আভা মৃদু হেসে বলল,
আভা: তাহলে মুরগির মাংস আর পোলাও করো।
মাহমুদা: আচ্ছা, আমার মেয়ের আবদার বলে কথা!
মা চলে যেতেই আভা আবার বইয়ের দিকে মন দিল।
অন্যদিকে স্কুলে...
ক্লাসরুমে আজ বেশ হইচই চলছে। বার্ষিক পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে বলে সবাই অপেক্ষা করছে।
ইরফান বেঞ্চে বসে খাতা উল্টাচ্ছিল। পাশে আরিয়ান বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
ইরফান: কিরে, আবার কী চিন্তা করছিস?
আরিয়ান: কিছু না।
ইরফান: তোর এই কিছু না শুনতে শুনতে আমার কান পেকে গেছে।
আরিয়ান: তুই একটু চুপ থাকতে পারিস না?
ইরফান: পারি। কিন্তু তোর মুখটা দেখলে চুপ থাকতে ইচ্ছা করে না।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।
ইরফান হেসে বলল,
ইরফান: আচ্ছা, একটা কথা বল। আভা কি তোর সঙ্গে কখনো নিজে থেকে কথা বলে?
আরিয়ান: কেন বলবে?
ইরফান: বাহ! তাহলে তুই শুধু ওর দিকে তাকিয়ে থাকিস, আর ও তোকে দেখেও না?
আরিয়ান: সব সময় এমন না।
ইরফান: ওহ! তাহলে বুঝি মাঝে মাঝে তাকায়?
আরিয়ান কিছু বলল না।
এমন সময় ক্লাসে শিক্ষক প্রবেশ করলেন। সবাই নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল।
শিক্ষক: তোমরা সবাই জানো, সামনে তোমাদের বার্ষিক পরীক্ষা। তাই এখন থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। আজ তোমাদের পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে। কেউ যেন কোনো বিষয়ে অবহেলা না করো।
সবাই একসঙ্গে সম্মতি জানাল।
শিক্ষক একে একে সবার হাতে রুটিন দিলেন।
ইরফান নিজের রুটিন দেখে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল।
ইরফান: এই যে, এবার কিন্তু কোনো অজুহাত চলবে না। ভালো রেজাল্ট করতে হবে।
আরিয়ান: তুই আগে নিজের রেজাল্টের চিন্তা কর।
ইরফান: আমার চিন্তা নেই। আমি তো ভালো ছাত্র।
আরিয়ান: বেশি আত্মবিশ্বাস ভালো না।
দুজনেই হেসে উঠল।
টিফিনের সময়...
আভা এখন স্কুলে ফিরেছে শুনে বান্ধবীদের মুখে হাসি। চারজন মিলে মাঠের একপাশে বসে গল্প করছে।
ইসরাত: আচ্ছা, তোরা রুটিন দেখেছিস?
তানু: হ্যাঁ। প্রথম পরীক্ষাই বাংলা।
তিথি: আমার তো গণিত নিয়ে ভয় লাগছে।
নাইমা: ভয় পেলে হবে? এখন থেকে সবাই মিলে পড়ব।
ইসরাত: ঠিক বলেছিস। আভা, তুই কিন্তু আমাদের পড়াবি।
আভা: আমি কেন?
তানু: কারণ তুই ভালো ছাত্রী। আর আমাদের মধ্যে তোর মতো শান্ত মেয়ে আর নেই।
আভা: শান্ত হলেই কি সবাইকে পড়াতে হবে?
সবাই হেসে উঠল।
ইসরাত হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
ইসরাত: আচ্ছা আভা, তোর এখন সব ঠিক আছে তো?
আভা: হুম।
ইসরাত: সেদিনের ঘটনাটা নিয়ে আর মন খারাপ করিস না। আমরা সবাই তো আছি।
আভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আভা: জানি। তোরা পাশে আছিস বলেই হয়তো আবার স্কুলে আসতে পেরেছি।
তিথি আভার হাতটা ধরে বলল,
তিথি: আমরা সব সময় থাকব।
নাইমা: এবার এসব বাদ। পরীক্ষা শেষ হলে কোথাও ঘুরতে যাব।
তানু: হ্যাঁ! আর আভাকে এবার আমাদের সঙ্গে যেতেই হবে।
আভা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
দূর থেকে ছেলেদের মাঠের দিকে তাকিয়ে ইরফান বলল,
ইরফান: দেখ, তোর মানুষটা আবার বন্ধুদের সঙ্গে হাসছে।
আরিয়ান তাকিয়ে দেখল। অনেক দিন পর আভার মুখে এমন হাসি দেখছে সে।
আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
ইরফান: কী রে, এত খুশি কেন?
আরিয়ান: ও হাসছে।
ইরফান: তাতে তোর কী?
আরিয়ান: কিছু না।
ইরফান: তোর এই কিছু না-র পেছনে অনেক কিছু আছে।
আরিয়ান হেসে মাথা নিচু করল।
বাড়ি ফেরার পথে...
স্কুল ছুটি হওয়ার পর আভা বান্ধবীদের সঙ্গে গেটের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ইরফানের ডাক এল।
ইরফান: এই যে আভা!
আভা দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল।
ইরফান: একটা কথা ছিল।
আভা: কী?
ইরফান: তুই কি বার্ষিক পরীক্ষার জন্য আলাদা করে পড়াশোনা করছিস?
আভা: হ্যাঁ, কেন?
ইরফান: আসলে আমরা কয়েকজন মিলে বিকেলে পড়ার একটা পরিকল্পনা করছি। সবাই মিলে পড়লে ভালো হবে। তুই চাইলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারিস।
আভা একটু অবাক হলো।
আভা: কারা কারা থাকবে?
ইরফান: আমি, আরিয়ান আর কয়েকজন। তোদের বান্ধবীরাও চাইলে আসতে পারে।
তানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
তানু: আমি কিন্তু রাজি!
ইসরাত: আগে বাসায় জিজ্ঞেস করতে হবে।
নাইমা: পড়াশোনার জন্য হলে সমস্যা হওয়ার কথা না।
আভা: আচ্ছা, বাসায় কথা বলে জানাব।
ইরফান: ঠিক আছে। আরিয়ান তোকে পড়ার সময় জানিয়ে দেবে।
কথাটা বলেই ইরফান আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
আরিয়ান চোখের ইশারায় তাকে চুপ করতে বলল।
আভা বিষয়টা খেয়াল করলেও কিছু বলল না।
বিকেল...
আভা নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। এমন সময় ফোনে একটা মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর।
অপরিচিত: আসসালামু আলাইকুম।
আভা কিছুক্ষণ নম্বরটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আভা: ওয়ালাইকুম আসসালাম। কে?
অপরিচিত: আমি আরিয়ান।
আভা একটু অবাক হলো। আরিয়ানের নম্বর তার কাছে আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এভাবে সরাসরি মেসেজ আসবে ভাবেনি।
আভা: জি, বলুন।
আরিয়ান: ইরফান বলেছে তোদের পড়ার পরিকল্পনার কথা?
আভা: হ্যাঁ।
আরিয়ান: তুই আসবি?
আভা: বাসায় জিজ্ঞেস করে জানাব।
আরিয়ান: আচ্ছা। আর একটা কথা...
আভা মেসেজের অপেক্ষায় রইল।
আভা: জি, বলুন।
কয়েক মিনিট কোনো উত্তর এল না।
অবশেষে মেসেজ এল।
আরিয়ান: এতদিন স্কুলে আসিসনি। এখন ভালো আছিস তো?
আভা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ তার কাছে এমন করে জানতে চেয়েছে, অনেক দিন হয়ে গেছে।
আভা: জি, ভালো আছি।
আরিয়ান: ভালো থাকিস।
এরপর আর কোনো মেসেজ এল না।
আভা ফোনটা পাশে রেখে আবার বই খুলল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে বারবার তার চোখ ফোনের দিকে চলে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে আরিয়ান নিজের ঘরে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার ছোট ভাই আরহাম ঘরে ঢুকে বলল,
আরহাম: ভাইয়া, কার সঙ্গে কথা বলছ?
আরিয়ান: বন্ধুর সঙ্গে।
আরহাম: ছেলে বন্ধু, নাকি মেয়ে বন্ধু?
আরিয়ান: তোর এত কিছু জানতে হবে কেন?
আরহাম হেসে বলল,
আরহাম: বুঝেছি! নিশ্চয়ই মেয়ে বন্ধু!
আরিয়ান একটা বালিশ ছুড়ে মারল।
আরহাম হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত...
আভা পড়ার টেবিলে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ মা ঘরে এসে বললেন,
মাহমুদা: মা, ইসরাতের মা ফোন করেছিলেন। তোরা নাকি সবাই মিলে একসঙ্গে পড়াশোনা করবি?
আভা: হ্যাঁ আম্মু। ইরফান বলেছিল।
মাহমুদা: ভালো কথা। তবে পড়াশোনার বাইরে যেন অন্য কিছুতে সময় নষ্ট না হয়।
আভা: আচ্ছা আম্মু।
মাহমুদা: আর শোন, তোর বাবা বলছিলেন পরীক্ষার পর তোদের একটা সুখবর দেবেন।
আভা অবাক হয়ে তাকাল।
আভা: কী সুখবর?
মাহমুদা: সেটা তো আমি জানি না। তোর বাবাই বলবেন।
আভা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিন্তু তার মনে কৌতূহল তৈরি হলো।
পরদিন স্কুলে...
সকালের অ্যাসেম্বলি শেষ করে সবাই ক্লাসে ফিরছিল। এমন সময় প্রধান শিক্ষক মাইকে ঘোষণা দিলেন,
প্রধান শিক্ষক: আগামী সপ্তাহ থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি তোমাদের একটা বিষয় জানিয়ে রাখছি। এ বছর যারা ভালো ফলাফল করবে, তাদের জন্য স্কুলের পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সবাই আনন্দে কথা বলতে শুরু করল।
ইরফান আরিয়ানকে বলল,
ইরফান: এবার কিন্তু প্রথম হতে হবে।
আরিয়ান: তুই হলেই তো হয়।
N খবর আসতে চলেছে, যা তার পরিচিত পৃথিবীটাকে নতুন করে সাজিয়ে দেবে।
চলবে...