ফন্ট সাইজ:
থিম:
চোখের আড়ালে ভালোবাসা

পর্ব 13

লেখক: মেহেজাবিন আভা

১৩তম পর্ব

পরীক্ষার দিনগুলো

_________

সকালের আলো ফুটতেই চারদিকে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। আজ আভার বার্ষিক পরীক্ষার প্রথম দিন। ঘুম থেকে উঠেই সে গোসল করে স্কুলের পোশাক পরে নিল। এরপর পড়ার টেবিলের সামনে বসে শেষবারের মতো বইয়ের পাতাগুলো দেখে নিচ্ছে।

মাহমুদা বেগম নাশতার প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলেন।

মাহমুদা: মা, আর কত পড়বি? এবার বই বন্ধ করে নাশতা কর।

আভা: আম্মু, আরেকটু দেখি। কয়েকটা প্রশ্ন ভালো করে দেখে নিচ্ছি।

মাহমুদা: পরীক্ষার হলে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় লিখবি। সব পারবি ইনশাআল্লাহ।

আভা: দোয়া করো আম্মু।

মাহমুদা: সব সময় করি মা।

মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

নাশতা শেষ করে আভা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নিচে নামল। রাশেদ আহমেদ গাড়ির চাবি হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রাশেদ: চলো মা, আজ তোমাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসি।

আভা: তুমি যাবে বাবা?

রাশেদ: আমার মেয়ের পরীক্ষা, আর আমি যাব না?

আভা মৃদু হেসে বাবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।

অন্যদিকে...

আরিয়ান সকাল থেকেই অস্থির। নিজের বইগুলো কয়েকবার ব্যাগ থেকে বের করে আবার ঢুকিয়েছে। অথচ পড়াশোনা গত রাতেই শেষ করেছে।

তার ছোট বোন আরিশা ঘরে ঢুকে বলল,

আরিশা: ভাইয়া, তোমার কী হয়েছে?

আরিয়ান: কিছু হয়নি।

আরিশা: আজকাল তোমার সব কথার উত্তর একটা—কিছু হয়নি!

আরিয়ান: তুই কি আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করিস?

আরিশা: না, তবে তোমার মুখ দেখলেই বোঝা যায় কিছু একটা হয়েছে।

আরিয়ান হেসে বলল,

আরিয়ান: তুই আগে নিজের পড়াশোনা কর।

আরিশা: আচ্ছা, যাচ্ছি। তবে একটা কথা, পরীক্ষার চেয়ে অন্য কারও চিন্তা বেশি করো না যেন!

কথাটা বলেই আরিশা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আরিয়ান মাথা নেড়ে হাসল।

স্কুলের সামনে...

আভা বাবার সঙ্গে স্কুলে এসে নামল। গেটের সামনে ইসরাত, তিথি, তানু ও নাইমা দাঁড়িয়ে ছিল।

ইসরাত: এই যে! আমাদের পরীক্ষার্থী চলে এসেছে!

তানু: আভা, সব পড়েছিস তো?

আভা: হ্যাঁ, মোটামুটি।

তিথি: আমার কিন্তু খুব ভয় লাগছে।

নাইমা: ভয় পেলে হবে? যা পড়েছিস, ঠান্ডা মাথায় লিখবি।

ইসরাত: ঠিক আছে, আজকে সবাই ভালো পরীক্ষা দেব। তারপর পরীক্ষা শেষে একসঙ্গে বাসায় যাব।

আভা মাথা নাড়ল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে ইরফানের ডাক শোনা গেল।

ইরফান: এই যে পরীক্ষার্থীরা! এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে চল।

তার সঙ্গে আরিয়ানও ছিল।

ইরফান: আভা, প্রস্তুতি কেমন?

আভা: ভালো।

ইরফান: ভালো হলে তো কথাই নেই। আরিয়ান তো কাল রাতেও পড়েছে।

আরিয়ান: তুই কি আমার পড়ার হিসাব রাখিস?

ইরফান: অবশ্যই। বন্ধুর দায়িত্ব!

সবাই হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পর পরীক্ষার ঘণ্টা বাজল।

শিক্ষকেরা সবাইকে নির্দিষ্ট কক্ষে পাঠিয়ে দিলেন।

পরীক্ষার হলে...

আভা নিজের নির্ধারিত আসনে বসে প্রশ্নপত্র হাতে নিল। প্রথমে পুরো প্রশ্নপত্রটা একবার পড়ে দেখল। প্রশ্নগুলো পরিচিত মনে হলো। তার মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল।

সে ধীরে ধীরে লেখা শুরু করল।

অন্যদিকে আরিয়ানও মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। মাঝে একবার জানালার বাইরে তাকিয়ে আভার কক্ষের দিকটা দেখার চেষ্টা করল। তারপর নিজেই নিজের মনকে বোঝাল, এখন পরীক্ষায় মন দেওয়া দরকার।

প্রায় তিন ঘণ্টা পর পরীক্ষা শেষ হলো।

সবাই একে একে হল থেকে বেরিয়ে এল।

ইসরাত: আলহামদুলিল্লাহ! আমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে।

তানু: আমারও। তবে শেষের প্রশ্নটা একটু কঠিন ছিল।

তিথি: আমি একটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো লিখতে পারিনি।

নাইমা: যা হয়েছে হয়েছে। পরের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

ইরফান: আরিয়ান, তোর কেমন হয়েছে?

আরিয়ান: ভালো।

ইরফান: আভা, তোর?

আভা: ভালো হয়েছে।

ইরফান: তাহলে আজকে সবাই সফল!

তানু: সফল হলে তোকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে।

ইরফান: পরীক্ষা শেষ হোক, তারপর দেখা যাবে।

সবাই হাসতে হাসতে স্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই আরিয়ান আভার পাশে এসে হাঁটতে শুরু করল।

আরিয়ান: আজকে অনেক দিন পর তোকে হাসতে দেখলাম।

আভা একটু অবাক হয়ে তাকাল।

আভা: কেন?

আরিয়ান: এমনিই। আগে তোকে সব সময় চুপচাপ দেখতাম।

আভা: আমি এমনই।

আরিয়ান: জানি।

আভা আর কোনো উত্তর দিল না। দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটতে লাগল।

গেটের বাইরে এসে আভা বান্ধবীদের সঙ্গে চলে গেল।

আরিয়ান দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।

ইরফান পাশে এসে বলল,

ইরফান: কী রে, আজকে তো কথা বললি!

আরিয়ান: হুম।

ইরফান: শুধু হুম?

আরিয়ান: তোর অনেক কথা বলার অভ্যাস।

ইরফান হেসে উঠল।

এভাবে কয়েক দিন কেটে গেল।

প্রতিদিন সকালে পরীক্ষা, পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, তারপর বাসায় ফিরে পড়াশোনা। ধীরে ধীরে আভার মনও আগের মতো হতে শুরু করল।

তবে প্রতিদিন স্কুলে একটা বিষয় লক্ষ করত সে।

আরিয়ান খুব বেশি কথা না বললেও, আভা স্কুলে এসেছে কি না সেটা একবার হলেও খেয়াল করত।

আভা কখনো বিষয়টা বুঝেও না বোঝার ভান করত।

আবার কখনো নিজের অজান্তেই তার দিকে তাকিয়ে ফেলত।

একদিন...

পরীক্ষা শেষে সবাই স্কুলের মাঠে বসে ছিল।

তানু: পরীক্ষা শেষ হলে আমরা কোথাও ঘুরতে যাব। ঠিক আছে?

ইসরাত: হ্যাঁ, অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না।

তিথি: কোথায় যাব?

নাইমা: আগে পরীক্ষা শেষ হোক। তারপর সবাই মিলে ঠিক করব।

ইরফান: আমাদেরও কিন্তু নিতে হবে।

তানু: তোমাদের আবার কেন?

ইরফান: আমরা কি তোদের সহপাঠী না?

ইসরাত: আচ্ছা, তোমরাও যাবে।

ইরফান: তাহলে ঠিক আছে।

আরিয়ান এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ বলল,

আরিয়ান: সবাই একসঙ্গে গেলে ভালোই হবে।

কথাটা শুনে আভা একবার তার দিকে তাকাল।

আরিয়ানও তাকিয়ে ছিল।

দুজনের চোখাচোখি হতেই আভা চোখ সরিয়ে নিল।

কয়েক দিন পর বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো।

শেষ পরীক্ষার দিন স্কুল থেকে বেরিয়ে সবাই বেশ আনন্দ করছিল। এত দিনের পড়াশোনার চাপ যেন এক মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেছে।

আভা বান্ধবীদের সঙ্গে বাড়ি ফিরছিল।

ইসরাত: এবার কিন্তু প্রতিদিন ফোনে কথা বলব।

তিথি: হ্যাঁ, স্কুল বন্ধ থাকলে তোদের ছাড়া ভালো লাগে না।

তানু: আর আভা, তুই কিন্তু আবার হারিয়ে যাবি না!

আভা হেসে বলল,

আভা: আচ্ছা, হারাব না।

নাইমা: পরীক্ষা শেষ, এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।

আভা: ফলাফল নিয়ে এখনই চিন্তা করতে চাই না।

ওরা হাসতে হাসতে বাড়ির পথে চলে গেল।

সন্ধ্যায়...

আভা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে। চারপাশের বাতাসে শীতের আগমনী ভাব।

হঠাৎ নিচে রাস্তার দিকে চোখ পড়তেই পরিচিত একটা ছেলেকে দেখতে পেল।

আরিয়ান!

আজও সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আজ তার সঙ্গে ইরফানও আছে।

ইরফান কিছু একটা বলছে, আর আরিয়ান বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ পর ইরফান আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল,

ইরফান: চল, আজ আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই।

আরিয়ান: একটু দাঁড়া।

ইরফান: তুই কি জানিস, তোর এই অপেক্ষার কোনো শেষ আছে?

আরিয়ান: জানি না।

ইরফান: তাহলে?

আরিয়ান মৃদু স্বরে বলল,

আরিয়ান: সবকিছুর উত্তর এখনই জানতে হয় না।

কথাটা আভার কানে পৌঁছাল না। তবে দূর থেকে দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

এরপর ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নিজের ঘরে চলে গেল।

রাত প্রায় দশটা।

রাশেদ আহমেদ বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে সবাইকে একসঙ্গে বসালেন।

রাশেদ: আভা মা, পরীক্ষা তো শেষ। এবার একটু বিশ্রাম নাও।

আভা: জি বাবা।

রাশেদ: আর একটা কথা আছে।

মাহমুদা: কী কথা?

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

রাশেদ: এবার তোমাদের ফলাফল বের হলে আমরা আভার পড়াশোনা নিয়ে নতুন একটা সিদ্ধান্ত নেব।

আভা: কী সিদ্ধান্ত বাবা?

রাশেদ: সেটা সময় হলে বলব।

মাহমুদা হেসে বললেন,

মাহমুদা: তোর বাবা তোকে একটা সুন্দর চমক দিতে চায়।

আভা আর কিছু বলল না।

কিন্তু তার মনে প্রশ্ন তৈরি হলো—বাবা কী এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন?

সে জানত না, সামনে তার জীবনে আসতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। নতুন ক্লাস, নতুন দায়িত্ব, নতুন কিছু মানুষ।

আর সেই নতুন অধ্যায়ে এমন একজন মানুষ থাকবে, যার উপস্থিতি তার অজান্তেই আভার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, আরিয়ানের ফোনে তখন একটি মেসেজ এল।

বড় আপু: আরিয়ান, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। আগামী সপ্তাহে বাসায় ফিরছি।

আরিয়ান মেসেজটা পড়ে অবাক হয়ে গেল।

কারণ তার বড় বোন প্রায় দুই বছর পর দেশে ফিরছে।

কিন্তু সে জানত না, বড় বোনের এই ফিরে আসা তার জীবনে এমন এক ঘটনা নিয়ে আসবে, যার সঙ্গে আভার জীবনও জড়িয়ে যাবে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন