ফন্ট সাইজ:
থিম:
চোখের আড়ালে ভালোবাসা

পর্ব 16

লেখক: মেহেজাবিন আভা

১৬তম পর্ব —
অতীতের অচেনা ছায়া

_________

সকালের আলো ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে আভা। রাতের সেই ছবিটার কথা এখনো তার মাথা থেকে যাচ্ছে না।

ছবির পেছনে লেখা নামটা—সামিরা।

নামটা খুব সাধারণ হলেও বাবা-মায়ের আচরণ দেখে মনে হয়েছে, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গল্প আছে। এমন কোনো গল্প, যা তারা আভার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন।

আভা একবার ভাবল মাকে আবার জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। বাবা-মা যখন এখনই কিছু বলতে চাইছেন না, তখন জোর করে জানারও কোনো মানে হয় না।

তবুও কৌতূহলটা রয়েই গেল।

ঠিক তখনই ফোনে ইসরাতের কল এল।

— হ্যালো, ম্যাডাম! বেঁচে আছিস তো?

আভা হেসে বলল,

— না, মারা গেছি। তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস?

— বাহ! এখন তো দেখি আমার সঙ্গে মজা করাও শিখে গেছিস!

— তুই সকাল সকাল ফোন দিয়েছিস কেন?

— কারণ আজকে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।

— কীসের মিটিং?

— তোর বিদায়ের আগে আমাদের একটা পরিকল্পনা করতে হবে।

আভা একটু চুপ করে গেল।

ইসরাত সেটা বুঝতে পেরে দ্রুত বলল,

— এই যে, আবার চুপ হয়ে গেলি কেন? আমি কিন্তু এখনই বিদায়ের কথা বলছি না। তোর যেতে তো এখনো সময় আছে।

— জানি।

— আজ বিকেলে আমাদের বাসায় আসবি। সবাই আসবে। তুইও আসবি।

— আচ্ছা, চেষ্টা করব।

— চেষ্টা না, আসবি। বুঝেছিস?

— ঠিক আছে।

ফোন রেখে আভা আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সামনে যে দিনগুলো আসছে, সেগুলো হয়তো আগের মতো সহজ হবে না।

অন্যদিকে আরিয়ানের ঘরে সকাল থেকেই হইচই চলছে।

তার বড় বোন আরিশা ভিডিও কলে এসেছে। বিদেশে থাকার কারণে অনেক দিন পর ভাইদের সঙ্গে কথা বলছে।

আরিশা বলল,

— এই যে ছোট সাহেব, এত বড় হয়ে গেছিস, তবুও আপুর ফোন ধরতে এত দেরি করিস কেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

— আপু, আমি তো ফোন ধরেছি। দেরি হয়েছে তোমার কল আসতে!

— বাহ! এখন দেখি কথাও শিখে গেছিস।

পাশ থেকে আরহাম বলে উঠল,

— আপু, তুমি কবে আসবে?

— আগামী সপ্তাহে। তোদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসব।

আরহাম খুশি হয়ে বলল,

— আমার জন্য কী আনবে?

— আগে বল, পরীক্ষায় কেমন করেছিস?

আরহাম একটু থেমে বলল,

— ভালো।

আরিয়ান পাশ থেকে বলে উঠল,

— মিথ্যা বলছে। নিজের ফলাফল নিজেই দেখাতে চায় না।

আরিশা হেসে ফেলল।

— আরিয়ান, তুই এখনো আগের মতোই আছিস। ছোট ভাইকে একটু শান্তিতে থাকতে দিস না?

— ওকে শান্তিতে থাকতে দিলে তো মাথায় উঠে বসবে।

আরহাম মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— দেখেছ আপু? সব সময় আমাকে বকা দেয়।

কিছুক্ষণ হাসি-ঠাট্টার পর আরিশা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

— আচ্ছা, তোদের একটা খবর দিই?

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

— কী খবর?

— বাবা বলেছে, এবার দেশে গেলে আমরা সবাই মিলে ঢাকায় কয়েক দিন থাকব। বাবার কিছু কাজ আছে।

আরিয়ান বলল,

— তোমরা ঢাকায় থাকবে?

— হ্যাঁ। আর তুইও একদিন আমাদের সঙ্গে যাবি।

— দেখা যাবে।

আরিশা হঠাৎ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী হয়েছে তোর? এত চুপচাপ কেন?

— কিছু হয়নি।

— আমার সঙ্গে মিথ্যা বলিস না। তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে।

আরিয়ান একটু হেসে বলল,

— তেমন কিছু না। স্কুলের কিছু ব্যাপার।

— স্কুলের ব্যাপার, নাকি অন্য কিছু?

আরিয়ান এবার চোখ সরিয়ে নিল।

— আপু, তুমি না সবকিছুতেই সন্দেহ করো!

আরিশা মুচকি হেসে বলল,

— ঠিক আছে। দেশে ফিরলে সব খবর নেব।

দুপুরের দিকে আভা নিজের ঘরে বসে পুরোনো ছবিগুলো দেখছিল। মা আলমারির ওপরের তাক থেকে আরও কয়েকটি অ্যালবাম নামিয়ে রেখেছেন। সেগুলো গুছিয়ে দিতে গিয়ে আভার হাতে একটি পুরোনো খাম এল।

খামটা বেশ পুরোনো। এক পাশে কিছুটা হলদে হয়ে গেছে। খামের ওপর কোনো ঠিকানা নেই, শুধু ছোট করে লেখা—

রাশেদ আহমেদ।

আভা খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

এটা কি বাবার কোনো পুরোনো চিঠি?

খামটা খুলবে কি না ভাবছিল, এমন সময় পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল।

— আভা, কী করছিস?

আভা চমকে পেছনে তাকাল।

— কিছু না আম্মু। অ্যালবামগুলো গুছাচ্ছিলাম।

মাহমুদা বেগমের চোখ খামের ওপর পড়তেই তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।

— ওটা আমাকে দে মা।

আভা খামটা এগিয়ে দিল।

— এটা কীসের খাম, আম্মু?

মাহমুদা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— পুরোনো কিছু কাগজপত্র।

— সামিরার কোনো চিঠি?

প্রশ্নটা শুনে মাহমুদা বেগম থমকে গেলেন।

— তুই আবার সেই নাম নিয়ে ভাবছিস?

আভা শান্ত গলায় বলল,

— নামটা শুনে মনে হলো তোমরা কিছু একটা লুকাচ্ছ।

মা মেয়ের পাশে বসে পড়লেন।

— সবকিছু লুকানোর জন্য লুকানো হয় না, মা। কিছু বিষয় থাকে, যেগুলো বুঝতে সময় লাগে।

— তাহলে আমাকে বুঝিয়ে বলো না কেন?

মাহমুদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

— সময় হলে বলব। এখন শুধু এটুকু জান, সামিরা আমাদের অনেক পুরোনো পরিচিত। তার সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটা সম্পর্ক ছিল।

— কেমন সম্পর্ক?

মাহমুদা বেগম উত্তর দেওয়ার আগেই নিচ থেকে রাশেদ আহমেদের ডাক এল।

— মাহমুদা! একটু আসবে?

মা উঠে দাঁড়ালেন।

— তুই অ্যালবামগুলো গুছিয়ে রাখ। আমি আসছি।

আভা মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, এই রহস্যের উত্তর হয়তো খুব সহজ নয়।

বিকেলে আভা ইসরাতদের বাড়িতে গেল।

বাড়ির উঠানে ঢুকতেই তানুর চিৎকার শোনা গেল।

— এই যে আমাদের ঢাকাইয়া ম্যাডাম এসে গেছে!

আভা হেসে বলল,

— এখনো তো ঢাকায় যাইনি।

ইসরাত পাশ থেকে বলল,

— ওর কথা বাদ দে। ও সকাল থেকে তোর নাম ধরে বিরক্ত করছে।

তানু সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,

— আমি বিরক্ত করছি না। আমি তো ভবিষ্যতের অতিথিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি!

নাইমা হেসে বলল,

— তোর প্রস্তুতি মানে শুধু খাওয়া-দাওয়া।

তিথি আভার পাশে এসে বসল।

— কেমন আছিস?

— ভালো।

— কাল থেকে তোকে একটু চুপচাপ লাগছে।

আভা মৃদু হেসে বলল,

— বাসায় কিছু বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে।

ইসরাত পাশে বসে বলল,

— কী বিষয়?

আভা সব খুলে বলল না। শুধু ঢাকায় যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলল।

ইসরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— তুই চলে গেলে আমাদের আড্ডাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাবে।

তানু বলল,

— আমি কিন্তু ভিডিও কলে প্রতিদিন সবাইকে বিরক্ত করব।

ইরফান ঠিক তখনই উঠানে ঢুকল।

— কে কাকে বিরক্ত করবে?

তানু বলল,

— তোকে!

ইরফান হেসে বলল,

— আমাকে বিরক্ত করার জন্য আলাদা অনুমতি লাগবে না।

কিছুক্ষণ পর আরিয়ানও এল। সে উঠানে ঢুকে সবার দিকে তাকিয়ে সালাম দিল।

— আসসালামু আলাইকুম।

সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল।

ইসরাত বলল,

— আজকে আমাদের বিশেষ আলোচনা চলছে।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

— কী আলোচনা?

তানু বলল,

— আভার ঢাকায় যাওয়া নিয়ে।

আরিয়ান আভার দিকে তাকাল। আভা তখন তিথির সঙ্গে কথা বলছিল।

ইরফান একটা চেয়ার টেনে বসে বলল,

— আমার একটা পরিকল্পনা আছে।

নাইমা বলল,

— আবার কী পরিকল্পনা?

— আভা ঢাকায় যাওয়ার আগে আমরা সবাই মিলে একটা দিন ঘুরতে যাব। এমন একটা দিন, যেটা পরে মনে রাখার মতো হবে।

ইসরাত সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— এটা কিন্তু ভালো কথা!

তিথি মাথা নেড়ে বলল,

— আমারও ভালো লাগছে।

তানু বলল,

— তবে জায়গা আমি ঠিক করব।

ইরফান বলল,

— কেন? তুই জায়গা ঠিক করলে আমাদের কোথাও খেতে নিয়ে যাবি না তো?

— খাবারের কথা বাদ দে!

সবাই হেসে উঠল।

আরিয়ান এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল,

— যাওয়া যায়। তবে সবার সময় মিলিয়ে ঠিক করতে হবে।

আভা সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তোমরা এত কিছু করছ কেন? আমি তো এখনই যাচ্ছি না।

ইসরাত তার হাত ধরে বলল,

— জানি। কিন্তু সময় থাকতে কিছু স্মৃতি তৈরি করে রাখতে দোষ কী?

আভা আর কিছু বলল না। শুধু বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সন্ধ্যার কিছু আগে আভা বাড়ি ফিরল।

বাড়িতে ঢুকতেই দেখল বাবা বসার ঘরে ফোনে কথা বলছেন। তাঁর মুখ বেশ গম্ভীর।

আভা পাশ দিয়ে নিজের ঘরে যেতে চাইলে বাবা হাতের ইশারায় ডাকলেন।

— আভা, একটু বসো মা।

আভা বাবার সামনে বসল।

রাশেদ আহমেদ ফোনটা রেখে বললেন,

— আজ দুপুরে যে লোকটার কথা বলেছিলাম, তার সঙ্গে আবার কথা হয়েছে।

— কোন লোকটা, আব্বু?

— ঢাকার সেই পুরোনো পরিচিত মানুষ।

আভা চুপ করে শুনতে লাগল।

— তিনি আগামী সপ্তাহে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি ভাবছি, ঢাকায় যাওয়ার আগে একবার তাঁর সঙ্গে কথা বলব।

আভা একটু ইতস্তত করে বলল,

— উনি কি সেই সামিরা নামের মানুষটাকে চেনেন?

বাবা মেয়ের দিকে তাকালেন।

— হ্যাঁ। চেনেন।

— তাহলে সামিরার সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক?

রাশেদ আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না, মা। তবে একটা কথা বলি, সামিরা আমাদের পরিবারের খুব কাছের একজন ছিল।

— এখন নেই কেন?

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

— সময়ের সঙ্গে অনেক সম্পর্ক বদলে যায়।

আভা বুঝতে পারল, বাবা এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলতে চান না।

সে আর প্রশ্ন করল না।

রাত প্রায় দশটা।

রাশেদ আহমেদ নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলেন। মাহমুদা বেগম পাশে এসে দাঁড়ালেন।

— আজ আবার সেই লোকটার ফোন এসেছিল?

— হ্যাঁ।

— কী বললেন?

— আগামী সপ্তাহে দেখা করতে চান।

মাহমুদা বেগম একটু চিন্তিত হয়ে বললেন,

— তুমি কি মনে করো, এখন সবকিছু আভাকে জানানো উচিত?

রাশেদ আহমেদ ল্যাপটপ বন্ধ করলেন।

— পুরো বিষয়টা না জেনে ওকে কিছু বলা ঠিক হবে না। আগে আমি নিজেই নিশ্চিত হতে চাই।

— কিন্তু আভা প্রশ্ন করছে।

— করবেই। ও বড় হচ্ছে। একদিন না একদিন সব জানতে পারবে।

মাহমুদা বেগম নিচু স্বরে বললেন,

— আমি শুধু চাই না, পুরোনো কোনো ঘটনা আবার আমাদের জীবনে সমস্যা তৈরি করুক।

রাশেদ আহমেদ স্ত্রীর দিকে তাকালেন।

— আমিও চাই না। কিন্তু এবার হয়তো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পরদিন সকালে আভা ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিল। গ্রুপে বেশ কয়েকটি বার্তা এসেছে।

ইসরাত: সবাই আজ বিকেলে সময় রাখবি।

তানু: আমি জায়গা ঠিক করে ফেলেছি!

নাইমা: কোথায়?

তানু: সেটা এখন বলা যাবে না।

ইরফান: তোর জায়গা শুনে আগে থেকেই ভয় লাগছে।

তিথি: আভা আসবে তো?

আভা: আসব।

আরিয়ান: তাহলে বিকেলে দেখা হবে।

আভা ফোনটা রেখে তৈরি হতে গেল।

কিন্তু নিচে নামতেই দেখল, বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে গাড়ির চাবি।

— কোথাও যাবে, আব্বু?

রাশেদ আহমেদ বললেন,

— হ্যাঁ মা। একটা কাজে বের হব। তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি।

তিনি গাড়ি থেকে একটি ছোট বাক্স নিয়ে এলেন। বাক্সটা আভার হাতে দিয়ে বললেন,

— খুলে দেখ।

আভা বাক্স খুলে দেখল, ভেতরে একটি সুন্দর ডায়েরি আর একটি কলম।

— এটা আমার জন্য?

— হ্যাঁ। নতুন জায়গায় গেলে নতুন করে অনেক কিছু শুরু হবে। তোর ভালো লাগা, খারাপ লাগা, নতুন অভিজ্ঞতা—সব এই ডায়েরিতে লিখে রাখবি।

আভা ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বলল,

— ধন্যবাদ, আব্বু।

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

— আর একটা কথা। আগামী সপ্তাহে ঢাকায় যাওয়ার ব্যাপারে কিছু তথ্য জানতে হবে। তোর স্কুলের জন্যও কয়েকটা জায়গায় যোগাযোগ করছি।

আভা মাথা নেড়ে বলল,

— আচ্ছা।

বাবা বেরিয়ে গেলেন।

আভা ডায়েরিটা হাতে নিয়ে নিজের ঘরে ফিরল। প্রথম পাতাটা খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর কলম দিয়ে লিখল—

“কিছু জায়গা আমাদের ঠিকানা হয়, আর কিছু জায়গা হয়ে থাকে স্মৃতি। জানি না, এই গ্রাম ছেড়ে গেলে কত কিছু বদলে যাবে। শুধু চাই, আমার মানুষগুলো যেন আমার কাছেই থাকে।”

লেখাটা শেষ করে আভা ডায়েরি বন্ধ করল।

সেদিন বিকেলে সবাই নির্ধারিত জায়গায় একত্র হলো। তানু সবাইকে নিয়ে গ্রামের পাশের ছোট্ট লেকের ধারে এসেছে। জায়গাটা খুব বেশি পরিচিত নয়। চারপাশে গাছপালা, মাঝখানে শান্ত পানি, আর পাশে কয়েকটি বসার বেঞ্চ।

ইরফান চারদিকে তাকিয়ে বলল,

— বাহ! জায়গাটা তো খারাপ না।

তানু গর্ব করে বলল,

— বলেছিলাম না, আমার পছন্দ ভালো?

নাইমা বলল,

— আজ প্রথমবার তোর কোনো পরিকল্পনা ভালো লাগল।

তানু ভ্রু কুঁচকে বলল,

— প্রথমবার কেন?

ইসরাত হেসে বলল,

— কারণ তোর আগের সব পরিকল্পনা ছিল খাবারকেন্দ্রিক।

সবাই হাসল।

আভা লেকের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। পানির ওপর বিকেলের আলো পড়েছে। হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে।

তিথি এসে তার পাশে দাঁড়াল।

— সুন্দর না?

— অনেক।

— তুই ঢাকায় গেলে এমন জায়গায় যাবি?

আভা একটু ভেবে বলল,

— জানি না। তবে এই জায়গাটা মনে থাকবে।

ইতিমধ্যে ইরফান সবাইকে একসঙ্গে ছবি তোলার জন্য ডাকল।

— এই যে, সবাই এদিকে আসো! একটা ছবি তোলা হোক।

তানু বলল,

— ছবি তোলার আগে আমার চুল ঠিক করতে হবে।

ইসরাত হেসে বলল,

— তোর চুল ঠিক করতে করতে রাত হয়ে যাবে।

সবাই একসঙ্গে দাঁড়াল। মাঝখানে আভা, এক পাশে ইসরাত আর তিথি, অন্য পাশে নাইমা ও তানু। পেছনে আরিয়ান আর ইরফান।

ছবি তোলার মুহূর্তে আভা একবার পেছনে তাকাল। আরিয়ানের চোখও ঠিক তখন তার দিকে ছিল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

এক মুহূর্ত।

তারপর দুজনেই চোখ সরিয়ে নিল।

ইরফান ছবি তুলে বলল,

— হয়ে গেছে! এবার সবাই দেখে নাও।

ছবিটা দেখে সবাই খুশি হলো।

তানু বলল,

— এই ছবিটা কিন্তু আভাকে পাঠিয়ে দিতে হবে। ঢাকায় গিয়ে যেন আমাদের ভুলে না যায়।

আভা হেসে বলল,

— তোদের ভুলব কীভাবে?

আরিয়ান ধীরে বলল,

— কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া সহজ না।

কথাটা খুব আস্তে বলা হলেও আভার কানে পৌঁছাল।

সে কিছু বলল না।

রাতের দিকে সবাই বাড়ি ফিরল।

আভা ঘরে এসে ডায়েরিটা খুলল। আজকের দিনটা লিখতে বসেছিল, এমন সময় ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে বার্তা এল।

“আসসালামু আলাইকুম, আভা। তুমি নিশ্চয়ই আমাকে চেনো না। আমি সামিরা।”

আভার হাত থেমে গেল।

সামিরা!

যে নাম নিয়ে এত দিন ধরে তার মনে প্রশ্ন জমেছে, সেই মানুষ নিজেই তাকে বার্তা পাঠিয়েছে!

আভা কিছুক্ষণ পর লিখল,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনি আমাকে চেনেন?”

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

“চিনি। তোমাকে ছোটবেলায় একবার দেখেছিলাম। অনেক বছর পর তোমার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে হলো।”

আভা অবাক হয়ে গেল।

সে আবার লিখল,

“আপনি কি আমার আব্বুকে চেনেন?”

উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।

তারপর বার্তা এল—

“শুধু তোমার আব্বুকে নয়, তোমার পরিবারকে অনেক আগে থেকেই চিনি। তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে, আভা। তবে তার আগে একটা কথা জানতে চাই—তুমি কি কখনো তোমার ছোটবেলার একটি বিশেষ ঘটনার কথা শুনেছ?”

আভা দ্রুত লিখল,

“কোন ঘটনা?”

কিন্তু এবার আর কোনো উত্তর এল না।

আভা ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

— আভা, ঘুমাসনি?

বাবার কণ্ঠ।

আভা তাড়াতাড়ি ফোনটা নামিয়ে বলল,

— না আব্বু, আসো।

রাশেদ আহমেদ ঘরে ঢুকে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন।

— কী হয়েছে? এমন চুপচাপ বসে আছিস কেন?

আভা কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর ফোনটা বাবার দিকে এগিয়ে দিল।

— আব্বু, এই মানুষটা আমাকে মেসেজ করেছে।

রাশেদ আহমেদ ফোনের পর্দায় চোখ রাখলেন।

বার্তাগুলো পড়তে পড়তে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তিনি ধীরে মেয়ের দিকে তাকালেন।

— সামিরা তোকে মেসেজ করেছে?

আভা মাথা নেড়ে বলল,

— হ্যাঁ। আব্বু, আমার ছোটবেলায় এমন কী ঘটেছিল, যেটা আমি জানি না?

রাশেদ আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর মেয়ের পাশে বসে বললেন,

— আভা, তোর ছোটবেলার একটা ঘটনা আছে, যেটা তোকে একদিন বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু এত দিন বলা হয়নি।

আভার বুকের ভেতর অজানা কৌতূহল জমতে লাগল।

— কী ঘটনা, আব্বু?

রাশেদ আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— সামিরা শুধু আমাদের পরিচিত কেউ নয়। তোর জন্মের পর থেকেই সে তোর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

আভা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

— আমার জীবনের সঙ্গে?

বাবা মাথা নেড়ে বললেন,

— হ্যাঁ। আর ঢাকায় যাওয়ার পর তুই এমন কিছু জানতে পারবি, যা হয়তো আমাদের পরিবারের অনেক পুরোনো হিসাব বদলে দেবে।

আভা আর কোনো কথা বলতে পারল না।

তার মনে হলো, ঢাকায় যাওয়ার আগেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা খুলতে শুরু করেছে।

কিন্তু সেই দরজার ওপাশে কী অপেক্ষা করছে, তা এখনো অজানা।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 16 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন