আচমকা নাজমুল উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল: এখন সবাই চুপ করো এখন তৃধা আম্মা আমাদের সবাইকে আহিয়ান আব্বার গল্প বলবে। ওর কথা শুনে জুঁই ও তৃধা বাদে সকলেই একসঙ্গে হাততালি দিল। এই মুহূর্তে তৃধা সকলের দিকে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সবাই তাকিয়ে আছে তৃধার দিকে।
জুই মজা করে সকলের উদ্দেশ্যে বলল: শুধু শুধু তোরা মেয়েটার কষ্ট বাড়িয়ে দিস না এমনিতেই মেয়েটা দুই বছর যাবত আগুন ছাড়া তাপে পুড়ছে।
তখন সজীব পাস থেকে বলল: কেন ওই ব্যাটা সমস্যা কি? আমাদের বান্ধবী কি দেখতে সুন্দর?না ..?
সজিবের সাথে তাল মিলিয়ে নাজমুল বলে উঠলো: দেশে ফিরলে আমাকে খবর জানাইশ বান্ধবী ... পিটাইয়া ওর বাপের নাম ভুলাইয়া দিমু...কোন খানদানি বংশের মহারাজা হইছে যে আমাদের বান্ধবী কে এভোএড করে ...?
তৃধা এবার সকলের উদ্দেশ্যে বলল: enough! অনেক হয়েছে এবার তোর আমার বংশ নিয়ে কথা বলা চোখ বন্ধ কর ...
সজীব বলল তৃধার উদ্দেশ্যে: তোর বংশ নিয়ে আমরা আবার কখন কি বললাম...? আমরা তো কথা বলছিলাম ওই সিনিয়র ভাইয় কে নিয়ে..
এখনই ওটাকে নিজের বংশ ভেবে নিয়েছিস..? উপস্থিত সকলে হেসে দিল ওর কথা শুনি একমাত্র জুই বাদে।
তৃধা বন্ধুদের কিভাবে বুঝাবে এখন বুঝতে পারছে না অতঃপর অন্যদিকে তাকিয়ে মেনি গলায় বলল : আহিয়ান ভাই আমার বংশের ছেলে আমার কাজিন আই মিন আমার চাচাতো এবং ফুফাতো ভাই।
ওর কথা শুনে সকলেই অবাকের চরম পর্যায়ে। তারপর নীল বলে উঠলো: বুঝলাম তোর কাজিন হয় কিন্তু চাচাতো ফুফাতো ভাই একসাথে কিভাবে হয়...?
ওর কথা শুনি সজিব ও বাবলা ওর পক্ষ নিল এই প্রথমবার তারপর উত্তর জানতে চাইলে তৃধার কাছে..
তৃধা কে চুপ থাকতে দেখে যে সকলের উদ্দেশ্যে বলল: তৃধার বাবার চাচাতো ভাই তৃধার ফুপ্পিকে বিয়ে করে এখনো ওরা জয়েন্ট ফ্যামিলি তাই একসঙ্গে খান বাড়িতে সবাই থাকে....
সজীব বলল: আহা সেই লেবেলের প্রেম তো... এক বাড়িতে প্রেম করার মজাই আলাদা..!!
সজিবকে থামিয়ে দিয়ে বলল: আমার মনে হচ্ছে আমরা সবাই মিল টপিক থেকে সরে যাচ্ছি....
তৃধার মাথায় গাট্টা দিয়ে বলল: আর একটা প্রশ্ন করতে পারবো না শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুই আমাদেরকে বলবি....
তৃধা নাক মুখ কুঁচকে বলল : একদম মাথায় থাপ্পর দিবি না তাহলে কিছু বলবো না...
নাজমুল: ওকে দিব না.. কিন্তু এখন সবটা আমাদেরকে স্পষ্ট করে বল...
তৃধা বলতে শুরু করলো : আহিয়ান ভাই ছোটবেলা থেকেই প্রায় দশ বছর বাড়িতেই ছিল আই মিন দেশে ছিল তারপর সে বিদেশে চলে গেল তখন আমি ছোট ছিলাম বাড়িতে থাকতে তার সাথে আমার অনেক ঝগড়া ও মারামারি হতো সে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম বাড়ির সবাই ফোনে কথা বললেও আমি কখনো ফোনেও কথা বলিনি তাকে আমার বিরক্ত লাগতো। কিন্তু দীর্ঘ বারো বছর পর যখন সে দেশে ফিরল তখন তার ব্যবহার আচরণ মায় বাধলো....
তৃধা একটু থেমে যেতে সবাই চিল্লিয়ে বলে উঠলো: তারপর তারপর....?
তৃধা বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল: অতিথি পাখি হয়ে এসেছিল আমার অতিথি পাখি হয়ে ফিরে গেছে নিজ গন্তব্যে....
শোভা আফসোস করে বলল: আমি যাওয়ার আগে কিছু বলে যায়নি.. কেন এমন করলো...?
তৃধা বললো : না... শুধু বলে গেছে ভাগ্যে থাকলে আবার দেখা হবে....
নাজমুল রেগে গিয়ে বলল : এটা আবার কেমন কথা..? উনি ফিরে গিয়েছেন ওনার প্রয়োজনে ভালো কথা... কিন্তু যাওয়ার আগে কিছু বলে যাবেন না.. কেন গিয়েছেন... কবে ফিরবেন.. কিছু তো বলে যাবেন ... কিন্তু উনিতে তোকে explain করলো না..
তৃধা রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলল : কারোর explanation চাইনা আমার তাই তার দেওয়া ফোনটাও ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি...
তৃধা: উনি আমার সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করেছেন যার দ্বারা আমি কষ্ট পেয়ে জুইয়ের বাসায় চলে গিয়েছিলাম কিন্তু এক রাত থেকে ছটফট করে আমি পরের দিন বাড়ি চলে এসেছিলাম এসে দেখি উনি চলে গেছে আর একটা গিফট বক্স রেখে গেছে সেটার ভেতরে ফোন রেখে গেছে একটা চিরকুট রেখে গেছে...
বাবলা আশিক বলল: সবই বুঝলাম কিন্তু এখন হয়েছেটা কি....?
ওর কথা শুনে জুই বলল কি হয়েছে সেটা আমি বলি : আহিয়ান ভাইয়া চলে যাওয়ার পর তৃধা মানসিকভাবে অনেক ভেঙ্গে পড়ে তারপর আমি আর আহিয়ান ভাইয়ার বোন আহিয়া আপু মিলে ওকে অনেক ভাবে চেষ্টা করার পর সুস্থ করে উঠলাম। তারপর থেকেই তৃধা আর আগের মত হাসে না আগের মত চাঞ্চল্যতা ওর মাঝে নেই। গত দুই বছরে ও আহিয়ান ভাইয়ের সাথে একবারও যোগাযোগ করেনি কিন্তু প্রতিদিন সকালে আহিয়ান ভাইয়া বাড়ির কারো না কারো ফোনে কল দিত তৃধা চুপচাপ তার কণ্ঠসুন্ত বলতে পারিস.. কিন্তু কিছুদিন যাবৎ এখন আর আহিয়ান ভাইয়া বাড়ির কারো ফোনে কল দেয় না সেটা নিয়েই মূলত তৃধা disturb.....
নাজমুল বলল: ও মাগো ট্রু লাভ.... তৃধা মুভ আন করেছি ঠিকই কিন্তু আহিয়ান ভাইকে এখনো মন থেকে ভালোবাসে তৃধা অপেক্ষা করে আহিয়ান ভাই ফেরার
তৃধা রেগে গিয়ে বলল: না একদমই না আমি কারো অপেক্ষা করি না আমি নিজের মত নিজে বাঁচতে চাই..
নাজমুল শোন আমি বলি: এখন তো এটা বলিস না যে তুই আহিয়ান ভাইকে মন থেকে ভালোবাসিস না.... আর তুই যদি আইন দেখে এতেই ভালোবাসিস তাহলে ঐ এহসান ছেলের সাথে কেন যোগাযোগ রাখিস....
তৃধা এবার ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলল : আমি এহসানের সাথে কোন যোগাযোগ রাখছি না। গত দেড় বছরে উনার সাথে আমার এক বড় কথা হয়নি। উনি আমার পাপাদের মন জয় করেছে। আমার বড় কথা মানে আহিয়ান ভাইয়েরা এহসানকে অনেক পছন্দ করে। সরাসরি কেউ না বললেও আমি বুঝি খান বাড়ির সকলেই চাই এহেসানের সাথে আমার বিয়েটা হোক। কিন্তু আমি আমার পাপাকে সরাসরি না করে দিয়েছি আশা করছি পাপা সাবটা সামলে নিবে...
নাজমুল বলে উঠলো : এমন শশুর খুব কম মানুষই পায়, যে কিনা নিজের ছেলের গার্লফ্রেন্ডকে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এখন তোর করণীয় হচ্ছে তুই আহিয়ান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ কর অথবা সে দেশে ফেরা পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা কর, আর ওই এসানকে সোজাসুজি বলবে যে তুই তাকে বিয়ে করতে পারবি না। তোদের একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তিনটা জীবনই নষ্ট হয়ে যাবে তাই ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ভালো......
পর্ব ৪৬
ঘড়ির কাঁটা থেমে নেই টিকটিক করতে করতে পার হয়ে গিয়েছে আরো একটি মাস একটি মাসে আহিয়ান একবারও কল করিনি এ নিয়ে বাড়ির সকলেই প্রথম প্রথম চিনতে তো থাকলেও পরে আহিয়ার কাছ থেকে শুনেছি আহিয়ান নাকি পড়াশোনা নিয়ে অনেক ব্যস্ত তাই কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। কিন্তু তৃধা জানি আহিয়ান ভাই শুধু শুধু যোগাযোগ বন্ধ করেনি বড়পাপার সাথে তার কোন কিছু নিয়েই ঝামেলা হয়েছে তাই সে যোগাযোগ বন্ধ করেছে । আগামীকাল থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হচ্ছে। আজকে বিকেল থেকেই তার আয়োজন শুরু হয়েছে। বাড়ির হেলথিং হ্যান্ড পদ্মের বাবাকে নিয়ে আলী আহমেদ খান প্রতিবারের মতো এবারও বাজার করতে গেলেন । তৃধা রমজান মাসে খাওয়া নিয়ে অনেক তালবাহানা করে তাই তারা বেছে বেছে নাতনির জন্য হাসের মাংস ও মাছ যেগুলো খেতে তার নাতনী পছন্দ করে সেগুলো কিনে নিলেন এবং বাড়ির সকলের জন্যই দেখে দেখে বাজার করলেন ।
আজ রাতে প্রথম তারাবি থাকায় আবির, তানভীর, আদি , মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান তারা সকলেই বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাসায় ফিরছেন। বাসায় ফিরে যখন শুনেছেন আবির তার বাবা আলী আহমেদ খান বাজার করতে গিয়েছিলেন তখন তো রেগে মেঘে আগুন হওয়ার অবস্থা। আবিরের রাগে সবাই গুটিয়ে গিয়েছে তৃধা সোফায় বসে গাজর খাচ্ছি আর মিটমিট হাসছে তাই দেখে আলী আহমেদ খান এসে তৃধার কান টেনে ধরে...
তৃধা ব্যথা তুললো চিৎকার করে বলল: আও দাদুভাই ব্যাথা পাচ্ছি...
আলী আহমেদ খান হাসতে হাসতে বললেন: তাহলে মিটমিট হাঁসছিলি কেন...?
তৃধা: কালকে থেকে আমি আর কিছু খাইতে পারবো না তাই খাচ্ছিলাম আর মনে মনে সেটা ভেবেই হাসছিলাম...
আলী আহমেদ খান ওর কথা শুনে হেসে দিলেন...
আবির গম্ভীর মুখেই ওপরে চলে গেলেন। মেঘ এসে বলল আব্বাজান আপনি কেন বাজারে গেলেন। আলী আহমদ খান বললেন আমাকে দেখতে বুড়ো মনে হলেও আমার গায়ে এখনো অনেক শক্তি।
রাত এগারোটা নামাজ পড়ে খেয়ে দেয়ে রুমে এসে তৃধা দেখলো এহসান অনেকগুলো কল করেছে। তৃধা বিরক্ত হয়ে ফোনটা একপাশে রেখে বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করবে তার আগে আবার ফোনটা ভাইব্রেট হচ্ছে তাই কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরেই তৃধা বলল হ্যালো কে বলছেন...? আমি এখন ঘুমাচ্ছি, সূর্য উদয় হওয়ার পর আমাকে কল করবেন। এহসান কি কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিল তৃধা।
এহসান বলছিল হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে তাই আর কল দিয়ে বিরক্ত করল না ছোট্ট একটা মেসেজ লিখলো: good night
তৃধা মেসেজটি পড়ে মুখ ভেংচি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালবেলা মসজিদের মাইকে উঠুন উঠুন জাগুন জাগুন সেহরি খান রোজা রাখুন শব্দ শুনে ঘুম ভাঙলো তৃধার। কিন্তু তার চোখ বন্ধ ছিল উঠবে তার আগে পানি এসে পড়ল তারপরে পানি পড়তে সে হালকা হালকা তাকালো তাকিয়ে দেখতে পেল সামনে সাদা থ্রিপিস পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে ভাবলো হয়তো ভুল লেখছে তাই চোখ কচলে আবার তাকালো তাকিয়ে দেখলো মেয়েটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে তারপর সে স্বপ্ন দেখছি সেটা ভেবে মেয়েটিকে ছুটে গেল কিন্তু সে মেয়েটিকে ছুতে পেরে লাফ দিয়ে উঠলো আহিয়া আপু....
আহিয়া খিল খিল কন্ঠে হেসে উঠলো। তৃধা আহিয়া কে জাপট ধরে ধরে বলল : আপু তুমি এসেছো....!
আহিয়া আবারও হেসে বলল: কেমন সারপ্রাইজ দিলাম হুম...??
তৃধা: আহিয়া কে জড়িয়ে ধরে বলল আমি অনেক খুশি হয়েছি আপু তুমি আশায়।
আহিয়া বলল: এত অল্পতে খুশি হলে চলবে...? তোর জন্য তো লন্ডন থেকে এর থেকে বরং গিফট নিয়ে এসেছি...!!
তৃধা: কি গিফট আপু..? চলো এখনই গিয়ে লাগেজটা খুলি...
আহিয়া বলল: গল্প আড্ডা পরে হবে... মামার নিচে খেতে ডেকেছিস সেহরির সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে চল আগে খেয়ে নিই..
এ কথা শুনে তৃধা ঝটপট করে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আহিয়ার সঙ্গে নিচে চলে গেল। ওরা দ্রুত চলে গেল তৃধা মায়ের ভয়ে দ্রুত চেয়ার টেনে ডাইনিং টেবিলে বসলো ও দেখলো ডাইনিং টেবিল পুরো পরিপূর্ণ সবাই খেতে বসেছে শুধু ওরা দুজন ছাড়া। তৃধা খেতে বসে, মায়ের উদ্দেশ্যে বলল: আমাকে শুধু একটু হাঁসের মাংস দাও আর কিছু খাব না...
ওর কথা শুনে আলী আহমেদ খান বললেন: দেখেছো বৌমা আমি কেন বাজারে গিয়েছিলাম। আমিতো জানি আমার নাতনি খাওয়ার সময় তালবাহানা করে। তাই বাজারে কি এগুলো এনেছি যাতে তালবাহানা না করে।
বন্যা খানিকটা হাসের মাংস প্লেটে পুরে দিল তৃধার। তৃধা খুশিমনে এক লোকমা ভাত মুখে দিয়ে দাদুর উদ্দেশ্যে কিছু বলতে সামনে তাকাতেই সামনের চেয়ারের মানুষটিকে দেখে রুহু অব্দি কেঁপে উঠল তার। আহিয়া তৃধার রিঅ্যাকশন দেখার জন্য গত এক মাস ধরে অপেক্ষা করছে তাই খাওয়ার ছেড়ে তাকিয়ে আছে তৃধার দিকে। তৃধা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে এদিকে কে কি খাচ্ছে কে কি করছে তার দিকে তার কোন খেয়াল নেই সামনের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে আবারো তাকালো তৃধা দেখল এটা স্বপ্ন নয় বরং সত্যি। তার আহিয়ান ভাই ফিরে এসেছে। সে এত খুশি হয়েছে যা প্রকাশ করতে পারছে না খুশিতে সে হাসবে নাকি কাঁদবে সে বুঝতে পারছে না। আচমকা নাকি মুখে খাবার উঠে তৃধার কাশি উঠে গেল।